শিরোনাম:

বন্যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তীব্র খাবার সঙ্কট

নুরনবী সরকার, ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি
প্রকাশিত : রবিবার, ১৩ অগাস্ট ২০১৭, ০৪:২৬
অ-অ+
বন্যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তীব্র খাবার সঙ্কট
ছবি: ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি

লালমনিরহাট: জেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৫ লক্ষাধিক মানুষ। দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ হুমকির মুখে পড়েছে। পানির চাপে তিস্তা ব্যারাজের পাশে ফ্লাড বাইপাস ভেঙে যাওয়ায় লালমনিরহাটের ৫ উপজেলার অধিকাংশ এলাকার লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোর দুই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল অফিস আদালত বন্ধ হয়ে গেছে। দেখা দিয়েছে তীব্র খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট।

হুমকির মুখে পড়েছে বুড়িমারী-ঢাকা মহাসড়ক ও রেলপথ। পানিবন্দি এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বন্যার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বুড়িমারী স্থল বন্দর। হাতীবান্ধায় রেলপথ ভেঙে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পশ্চিম অঞ্চলের রেল যোগাযোগ। হাতীবান্ধা-বড়খাতা বাইপাস সড়কের বিভিন্ন স্থান ভেঙে গেছে। 

গত ৫ দিন ধরে ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে তিস্তা, ধরলা, বুড়ি তিস্তা ও সানিয়াজান নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটে শুক্রবার সকাল থেকে আবারও বন্যা দেখা দেয়। তিস্তার পানিতে জেলার ৫ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে আবারও নদীগুলোর পানি বাড়তে শুরু করে। 

দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের দোয়ানী পয়েন্টে রবিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে বিপদ সীমার ৬৫ সেঃ মিঃ উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে থাকে। পানিবন্দি লোকজন জেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজ মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়ে মানবতার সাথে জীবন যাপন করছে। গবাদি পশুগুলোকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড দোয়ানী’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে পানি আসায় তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কারণে তিস্তার তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। আমরা প্রতি মুহুর্তে বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিং করছি। তিস্তার পানি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে কী পরিমাণ পানি আসবে তা ধারণা করা যাচ্ছে না। তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় রেড এলার্ট জারি করা হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজের সব গেট খুলে দিয়েও পানির গতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাড বাইপাস পানির চাপে ভেঙে গেছে। তিস্তা তীরবর্তী এলাকার লোকজনদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে।’

তিস্তা পাড়ের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন আগের বন্যায় চর এলাকাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে গেছে। জেলার হাতীবান্ধা উপজেলায় বন্যায় সব চেয়ে বেশি ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে। যে কারণে ওই এলাকায় লক্ষ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি লোকজনের মাঝে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ভারত গজল ডোবা ব্যারেজের অধিকাংশ গেট খুলে দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই ঘর বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন। প্রচণ্ড গতিতে ময়লা ও ঘোলা পানি বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। ফলে তিস্তা পাড়ের লোকজনের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। 

পানির গতি নিয়ন্ত্রণ করতে তিস্তা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেয়া হয়েছে। ফলে তিস্তার পানিতে পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার ৬০ গ্রামের ৩ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কয়েক লক্ষ একর আমন ধানের ক্ষেতসহ অনেক ফসলি ক্ষেত তিস্তার পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বুড়িমারী-ঢাকা রেলপথ ও মহাসড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার কয়েক শতাধিক মৎস্য খামার ভেসে গেছে। 

হাতীবান্ধা উপজেলার দক্ষিন ধুবনী গ্রামের মমতাজ উদ্দিন, তছির উদ্দিন, মকবুল হোসেনসহ অনেক পানিবন্দি পরিবার অভিযোগ করেন, আমরা ৪ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় আছি। এখন পর্যন্ত আমাদের মাঝে কোন ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি। কেউ আমাদের খোঁজ পর্যন্ত করেনি। 

হাতীবান্ধা উপজেলার সিঙ্গিমারী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন দুলু জানান, তার ইউনিয়েনের অধিকাংশ এলাকা পানিদে ডুবে গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলোর তালিকা তৈরি করছেন। ইতোমধ্যে ত্রাণের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট আবেদন করেছেন। গোটা ইউনিয়নের সকল রাস্তা ঘাট ভেঙ্গে  গেছে।

হাতীবান্ধা উপজেলার সির্ন্দুনা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নুরল আমিন জানান, তার ইউনিয়নের সব মানুষই পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তিনি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলোর তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন। 

হাতীবান্ধা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফেরদৌস আহম্মেদ জানান, ইতোমধ্যে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে পানিবন্দি পরিবারগুলোর খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে উচ্চ পর্যায়ে প্রেরণ করা হবে। ত্রাণের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে । পানিবন্দি লোকজনের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাট অঞ্চলের সহকারী ট্রাফিক সুপারিয়েন্টেন্ট সাজ্জাত হোসেন জানান, রবিবার সকালে বন্যার পানির চাপে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার মেডিকেল মোড় এলাকায় রেলপথ ভেঙে গেছে। গোটা রেলপথে ছোট বড় বিভিন্ন আকারের গর্ত হয়েছে। যে কারণে রেল যোগাযোগ সাময়িক বন্ধ রয়েছে। পানি অপসরিত হলে লাইন সংস্কার শেষে এ রুটে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হবে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে পানিবন্দি পরিবারগুলোর খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। ত্রাণের জন্য উচ্চ পার্যায়ে আবেদন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়ে গেছে।

লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম)’র সংসদ সদস্য মোতাহার হোসেন জানান, গত সাড়ে ৩ বছরে তিস্তা নদীর বাম তীরে বাঁধের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রীর কাছে ১৬ বার গিয়েছি। কিন্তু তিনি একটি টাকাও বরাদ্দ দেননি। ফলে গোটা জেলা আজ পানিবন্দি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে কথা বলে বন্যা পরিস্থিতির খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। পানিবন্দি পারিবারগুলোর সহযোগিতার জন্য প্রধান মন্ত্রীর সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি/ এআর

সম্পর্কিত বিষয়ঃ   ভারত