শিরোনাম:

ফারহান ইশরাকের গল্প ‘সেক্সডল’

ফারহান ইশরাক
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ২০ জুলাই ২০১৭, ০৫:৫১
অ-অ+
ফারহান ইশরাকের গল্প ‘সেক্সডল’
প্রতীকী ছবি

এমন কিছু ঘটতে পারে, এবং তাও আবার এমন এক শুভদিনে—একদমই প্রস্তুত ছিলো না যুথি, বলতে গেলে ভাবতেও পারে নাই সে। নির্ধারিত সময়ের আগে অফিস থেকে ফিরে যে দরোজা নিজের হাতে খুলে ভেতরে ঢোকার কথা তার, তা যদি অবেলায় এমনিতেই আধখোলা দেখা যায়, এবং ভেতর থেকে কোনোপ্রকার সাড়াশব্দও না শোনা যায়, পেশাজীবী নারীর জন্য স্বভাবত ঘাবড়ে যাওয়ারই কথা। অবশ্য স্বমী-স্ত্রী দুজনকেই চাকুরি করে সংসার চালাতে হলে, বাসায় কাজের লোকের অভাব ঘটলে, ছেলেমেয়ে না থাকলে, এবং থাকলেওে একা হেঁটে দরোজার কাছে আসার মতো যথেষ্ট বয়স্ক না হলে কাকে কখন আগে এসে দরোজার ঝুলন্ত তালায় চাবি মারতে হয়, আগে থেকে তা বোঝার উপায় থাকে না। তবে বর্তমান গল্পের পেশাজীবী নারী যুথির বিষয়টা আলাদা, তার স্বামী সায়ান আহমেদ সরকারি চাকুরি করলেও ফেরার ব্যাপারে বরাবরই ঢিলে, সংস্কৃতিপাড়ায় আড্ডা জমিয়ে বিড়িতামাক দেদারসে পুড়িয়ে সন্ধ্যা সাতটা-আটটার আগে বাসায় তার মুখ দেখার উপায় নাই। না ভেজানো দরোজা দেখে এতটা যে বিস্মিত হতে হলো যুথিকে, তার পেছনে কেবল খোলা দরোজার বিভ্রাটকেই দায়ী করা চলে না; অন্য কারণও আছে নিশ্চয়ই।

যে কারণে যুথিকে এভাবে নিশ্চল পাথরের মূর্তি হয়ে কিছু সময় বোবার মতো দাড়িয়ে থাকতে হলো তার পেছনে একটা গুরুতর রহস্য তো থাকবেই। এমন ঘটনা আদতে ঘটতে পারার বিষয়ে যুথির মনে সন্দেহ অবশ্য ছিলো, এবং দিনে দিনে তা যে অবিশ্বাস্যভাবে দানা বেঁধে উঠছিলো তাও অসত্য না, তবে জটিলতার মাত্রা তার চূড়ান্ত বিকাশ চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তার নিজের জন্মতিথির মতো স্পর্শকাতর দিনকেই যে বেছে নেবে মুহূর্তের কল্পনায়ও সেটা তার মনে আসে নাই; আসার কথাও না, প্রতিদিনের মতোই যথারীতি রিকশায় চেপে অফিসে পৌছে কর্মদিবসের প্রথমভাগের বেশির ভাগ কাজ-ই সে সেরে নিয়েছিলো। নিয়মমাফিক জন্মদিনের আচার পালনের আনুষ্ঠানিকতা তাদের পরিবারে চালু না থাকলেও দুনিয়ায় আসার শুভ ক্ষণটা মনে রেখে একটু আলাদা আমেজে তাকে ছবির পটে ধরে রাখার ব্যাপারে তাদের অনীহা উল্লেখযোগ্য ছিলো না মোটেও। ছোটোখাটো উপহার বিনিময়ের একটা প্রীতিকর রেওয়াজ বছরে বছরে খসড়া রূপ থেকে বেশ কতকটা বিকশিতই হয়েছে বেলা যায়। সুতরাং এ দিনটায় যুথি-সায়ান কে কখন ঘরে ফিরবে তার হদিস দুজনেরই একটু-আধটু জানা থাকার কথা।
সকালের নাস্তা বানিয়ে ঝটপট নিজে খেয়ে সায়ানের জন্য টেবিল সাজিয়ে বেরিয়ে পড়ার একটু পরেই দ্রুত চালানো টেপ রেকর্ডারের বেগে দুটো দানাপানি মুখে পুরে সায়ানও অফিসে চলে গেছে ধরে নিতে অসুবিধা ছিলো না যুথির। 

রিকশা পেতে দেরি না হওয়ায় ঘড়ির কাটা চিহ্নিত দাগের উপরে লাফিয়ে উঠার কিছুটা আগেই সে অফিসে পা রাখতে পেরেছে সেই খুশিতে মনটাও আটখানা। সন্ধ্যার আয়োজনের কথা মাথায় রেখে বাড়তি উদ্যমে যুথি তার ফাইলপত্রে দরকারি সব সইস্বাক্ষর সেরে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠিয়েছিলো যাতে দুপুরের মধ্যেই বাসায় ফেরার ব্যাপারে কোনোপ্রকার বিড়ম্বনা পোহাতে না হয়। কিন্তু এতটা আগেই যে ঘরের পথে পা বাড়াতে হবে অথবা ফিরতে হবে, সেটা সে অনুমান করে নাই, করার প্রয়োজন আসলে ছিলো-ও না। কর্তাব্যক্তিটা যে স্বভাবের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে হঠাৎ তাকে এতখানি ছাড় দিতে যাবে সেটাও তার চিন্তায় আসে নাই। যুথিকে শুভদিনের শুভেচ্ছা জানাতে যেমন তিনি কার্পণ্য করেন নাই, একবেলার অফিস সেরে বাসায় যাওয়ার হুকুমও তেমনি জারি করে ছাড়েন, যেখানে প্রতিদিনের নিয়মে ঐ হুকুম বরং উল্টাভাবেই জারি করার কথা, বলার কথা যে, খবদ্দার কেউ যেন নির্ধারিত সময়ের এক সেকেন্ড আগেও অফিস না ছাড়ে।
বাড়তি সুবিধা পেয়ে খুশি মনে রিকশা করে সোজা বাসায় চলে আসে যুথি; প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী এই সময়ে নিশ্চয়ই কেউ তার জন্য অপেক্ষা করার কথা না এবং সে কারণে রুপালি রঙের ঢাউস তালাটায় চাবি ঢুকিয়ে ফ্ল্যাটের দরোজাটাও নিশ্চয়ই তাকেই খুলতে হবে। কিন্তু এত বড়ো ঘটনা—অথবা চূড়ান্ত বিচারে অত বড়ো বিবেচিত না-ও হতে পারে—তার চোখের সামনে ঘটার জন্য অপেক্ষা করে ছিলো, জন্মদিনে সেটা তার মনে আসবে কেন? দরোজা খোলা দেখার মতো প্রথম ধাক্কা সামলে নিতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না যুথির, তবে ডান হাতের হালকা চাপে কবাটের পাল্লা সরিয়ে কিছুটা ভেতরে এগিয়ে যে শব্দটা তাকে শুনতে হয় তাতে একটা ধাক্কা খেতে হয়, ধাক্কার বেগ এতই বেশি যে হার্টের গতি বেড়ে যায় তারও দ্বিগুণ। অসময়ে দরোজা খোলা দেখে যতটা না বিস্মিত হওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি হতভম্ব হওয়ার জন্য মিলিত কণ্ঠের কিছু আওয়াজ টের পাওয়া যায়, ফ্ল্যাটের কতকটা ভেতর থেকে যা কানে আসে। আওয়াজটা কানে আসতেই আতঙ্কিত না হওয়ার উপায় থাকে না যুথির, ঘটনার আকস্মিক আঘাতে এতই ঘাবড়ে যায় সে, বুঝতেই পারে না এই মুহূর্তে কী করা যায়।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যুথির পক্ষে নানা উদ্ভ্রট পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার শক্তি অর্জন করা যেমন সম্ভব হয়েছে, তেমনি পুরুষজাতির রুচি, মর্জি বা চরিত্রের সারকথা রপ্ত করাও তার জন্য কঠিন হয় নাই। কিন্তু দপ্তরে যা পারা যায় নিজের ঘরেও তা হুবহু সম্ভব এমনও তো হয় না সবসময়। এটা সত্য, অনেক দিন থেকেই তার মনের পুরো দ্রাঘিমা জুড়ে একটা অপ্রকাশ্য বেদনার ঝাপট বইছিলো। সেই ঝাপট কোথা থেকে উঠে আসে, কোন রেখায় বয়ে চলে, কেমন তার গতিবেগ, নিজেরে একান্ত অস্তিত্বের উপরে তা কতটা ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে সে বিষয়ে অনেক দিন যাবৎ তাকে ভাবতে হচ্ছিলো। এত কিছুর পরেও জীবনের বল্গা সে টেনে ধরেই এগিয়ে যাচ্ছিলো, ডানে-বায়ে যেখানে যেমন যতি টানার দরকার তা-ও টেনে যাচ্ছিলো ঠিকঠাক। স্বাভাবিক ব্যক্তিগত পরিচর্যা, রুটিনে বাধা দিনের দায়িত্ব বুঝে নেওয়া, রাতের বিশ্রাম ইত্যাদি সবই চলছিলো স্বাভাবিক নিয়েমেই। কিন্তু সারা শরীর-মন জুড়ে বিষাদের বিক্রিয়া এমন অসহ্য হয়ে উঠছিলো যে অফিসের কাজেও পুরোপুরি মন বসাতে কষ্ট হচ্ছিলো, দুর্বহ অস্বস্তি দিনে দিনে তাকে যেন বিকল করে দিচ্ছিলো। কিন্তু এমন এক সুতায় বোনা সেই জটিলতা, এমন এক গোপনতায় গড়া সেই একান্ত উদ্বেগ যে, কারো সঙ্গে শেয়ার করা যায় কিনা সে ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছিলো তাকে। এমন বিষয়ে কারো সঙ্গে আলাপ করার কথা কল্পনা করে মনে মনে খুব লজ্জাও পাচ্ছিলো তিথি।

দাম্পত্য বিষয়ক এক ধরণের গোপন সন্দেহ তাকে অবিরাম তাড়া করে ফিরছিলো এবং তার সঙ্গে এক প্রকার অচেতন বিষক্রিয়া মিশে গিয়ে অনেক দিন যাবৎ তাকে অস্থির করে তুলছিলো। জন্মদিনের শুভ প্রহরে বাসার দরোজায় প্রথম এসে যখন সে দাঁড়ায় তখনও তার পক্ষে বোঝার উপায় ছিলো না, যে সত্যর মুখোমুখি সে হতে যাচ্ছে তার সঙ্গে তার বয়ে বেড়ানো বেদনার সত্যিকার কোনো যোগসূত্র আবিষ্কার সম্ভব কিনা। দরোজার ওপাশে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে মাস্টার বেডরুমে ঢোকার আগে চিকন করিডোরে থমকে দাঁড়ায় সে—নড়াচড়া একদম থেমে যায় তার, পেতলের ভাস্কর্যের মতো অনেকক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। শোবার ঘর থেকে ভেসে আসা ধ্বনিগুচ্ছের অর্থবোধকতা গভীর সতর্কতায় যাচাইয়ের চেষ্টা করে যুথি, এবং তার মনে হয় তাতে সে সফল হতে যাচ্ছে। আর কোনো সন্দেহই বুঝি থাকছে না তার মনে, সব জলের মতো পরিস্কার হয়ে জটিলতার জট খুলতে যাচ্ছে বলে মনে হতে থাকে তার। এত দিন একান্ত চিন্তার অজস্র অধিবেশনে যা ভেবে আসছিলো তার একশো ভাগ প্রমাণ এখন তার সামনে হাজির হচ্ছে বলে মোটামুটি নিশ্চিৎ হয় সে। কিন্তু সেই সত্য সরাসরি মোকাবিলার সামর্থ্য সে হারিয়ে ফেলছে এমন এক দুর্বলতাও তাকে পেয়ে বসে।

কয়েক মুহূর্তে যুথির অন্তর্জগতে অনতিদীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের নানা চিত্র একের পর এক পাঁকিয়ে এসে একটা বজ্রবিদ্যুৎময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। শরীরের উপরের অংশের ভার পায়ের শক্তিতে বহন করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে, তার মনে হয় কেন্দ্রীয় স্নায়ুপদ্ধতি বিগড়ে গিয়ে স্থবির মাংসপিণ্ডের মতো এখনই সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়বে, তার মেরুদণ্ড ধ্বসে গিয়ে সে যেন প্রকাণ্ড অ্যামিবার রূপ নেবে। হঠাৎ আগুন ধরে যাওয়া রাজপ্রাসাদের মতো যেন সে জ্বলতে থাকে—বাইরে তার একটুও ধোঁয়া নাই, ছাঁইভস্ম নাই, দৃশ্যমান হলকার তো প্রশ্নই ওঠে না। ভেতরের অগ্নিকাণ্ড যুথির কাছে প্রকৃত অগ্নিকাণ্ডের চেয়ে প্রবল সত্য হয়ে ধরা দেয়, আটকে যাওয়া ভিডিওচিত্রের বিশৃঙ্খলায় সেই আগুনের শিখা তার সমস্ত অস্তিত্বকেই গ্রাস করতে থাকে। তার মনে হয়, কেবল এটুকু অভিমানী ধারণাই তাকে কিছুটা আশ্বস্ত করে যে সায়ান তো এতটা স্খলিত চরিত্রের মানুষ হওয়ার কথা নয়, প্রথম রাতের পরে প্রথম সূর্য যখন দাম্পত্যের বাস্তব অধ্যায়ের সুচনা করেছিলো তখনও তো তাকে একজন দায়িত্ববান মানুষই মনে হয়েছিলো তার। একটা স্পর্শকাতর বিষয়ের উদাসীনতা বাদ দিলে অন্য কোনো দিক থেকেই তো তাকে দায়িত্বহীন ভাবার উপায় থাকে না। দুজনের সম্পর্কে প্রেমাত্মক আবিষ্কারের পূর্ব-পটভূমি না থাকলেও বিয়ের প্রথম দিনগুলোতে যৌথ জীবনের বহু সৌন্দর্যই তো তাদের আঙিনায় ফুটে উঠতে পেরেছিলো।
এই ঘোর অনটনের মুহূর্তে সুস্থ্য বুদ্ধির যেটুকু অবশিষ্ট আছে যুথির, তাতেও তার ভাবতে ইচ্ছে করে সায়ান মোটামুটি রুচিশীল মেজাজের মানুষ—শিক্ষা, সংবেদনশীলতা বা সাংস্কৃতিক রুচির ঘাটতিও তার তেমন একটা চোখে পড়ে নাই কখনো। সরকারী প্রতিষ্ঠানে মাঝারি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করে যা উপার্জন করে তার সঙ্গে যুথির মাইনে যোগ হয়ে সংসারের চাকা অচল হওয়ার মতো অভাবে তো তাদের পড়তে হয় নাই। পেশাগত দক্ষতা ও সুনামের বেলায় ফার্সস্টক্লাস না হলেও কলিগদের কেউ তার দায়িত্বহীনতা বা অসততর ব্যাপারে জোর গলায় কিছু বলতে পেরেছে এমনও তো নয়।

গল্পের পটভূমিতে কর্মস্থলে সায়ানের পারঙ্গমতার প্রশ্ন জরুরি নয় বলে চারদেয়ালের নাট্যমঞ্চে তার ভূমিকা কেমন সেটাই জানা জরুরি। ক্রান্তিকালে যুথির অনুভবের ধারাভাষ্য থেকে যা জানা গেলো তাতেও সায়ান যে বিমূঢ় লাম্পট্যের অভিযোগে নিন্দিত হতে পারে তা-ও নয়। যুথি ও সায়ানের বিয়ের প্রথম দিক থেকেই স্বামী হিসেবে সায়ানকে দায়িত্ববান ও অনুভূতিশীল পুরুষ হিসেবেই দেখা গেছে সবসময়। যুথির কেবল মনে হয়েছে, সব-বিয়য়ে কর্তব্যনিষ্ঠ হলেও শরীরী ঘনিষ্টতায় সায়ান অনেকটাই নিস্পৃহ ও উদাসীন। যুথিকে এ-ও ভাবতে হয়েছে যে, যৌনশৈথিল্য সব ক্ষেত্রে অন্য নারীতে আসক্তি প্রমাণ করে না, শিথিলতার আরো অনেক কারণ থাকতে পারে। তাছাড়া লাম্পট্য বা পরাসক্তির চিহ্ন সে কখনো নিজের চোখে দেখে নাই বা প্রত্যক্ষ সন্দেহের উৎসও আবিস্কার করতে পারে নাই।

ধীরে ধীরে বিষয়টি তবু যুথির মনে বিরূপ ভাবনার উদ্রেক করে। প্রেমের বা অনুরাগের ব্যাপার না থাকুক, অন্য উৎস থেকে দেহের চাহিদা পূরণের সম্ভাবনা তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। স্বামীর রতি লিপ্সার প্রাবল্য গড়হাজির দেখলে স্ত্রীর মনে তার চারিত্রিক সততা বিষয়ে শুভ ধারণা যতটা জন্মায় তার চেয়ে বেশি জন্মায় সন্দেহ। পুরুষের চরিত্র বিচারের এই সনাতন মানদণ্ড যুথিও ব্যবহার করতে ভোলে নাই, সায়ানের যৌন গরজের ঘাটতি তার মনে বহুমিুখী আত্মঘাতী বিশ্লেষণের আয়োজন করেছে। নানা কার্যকারণের হাত ধরে সন্দেহবাদী জীবনের যাপনা যুথিকে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় চালিয়ে যেতে হয়েছে—সংশয় যখন চূড়ান্ত মাত্রায় ঘনীভূত, নানা বিচিত্র আঙ্গিকে ভাবতে ভাবতে দরোজার ওপাশে ঘটে যাওয়া নাটকের আগমুহূর্তেও যুথিকে প্রায় নিশ্চিত হতে হয়, সায়ানের মন অন্য কোথাও নোঙর ফেলেছে। নিশ্চয়ই সে কোনো অজানা উৎস থেকে দেহের খোরাক জুগিয়ে নিচ্ছে, হয়তো সে এই পৃথিবীর বিকল্প কোনো ভাণ্ডার থেকে রসদ খুঁজে নিয়ে তৃপ্ত হচ্ছে।

এবার যুথির বর্তমান অবস্থানের দিকে নজর ফেরানো যায়, আবহের প্রচণ্ডতায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া এই পেশাজীবী নারীর মুখে এর মধ্যে আদৌ কি কোনো নতুন আশার রশ্মি ফুটেছে? তা-ও কি সম্ভব? আকস্মিকতার আবরণ কেটে যাওয়ার পরে বেডরুমের চলমান ট্রাজেডি বিষয়ে যুথির মনে তিলপরিমাণ দ্বন্দ্ব থাকে না, অস্পষ্টতার সব মেঘ সরে যায় তার চোখে থেকে। ভেতর থেকে ভেসে আসা ধ্বনিগুচ্ছ স্পষ্ট হয়ে তার কানে যে ব্যঞ্জনা তৈরি করে তা যে যৌনশীৎকার ছাড়া অন্য কিছু হতেই পারে না সে ব্যাপারে সে নিশ্চিৎ হয়ে যায়। সায়ান প্রায় রুটিন করে প্রত্যেক দিন দুপুরে কিছু সময়ের জন্য বাসায় আসতো, নির্ধারিত পার্টনারের সঙ্গে চাদিহামতো রতিক্রিয়া সেরে আবার অফিসের কাজে বেরিয়ে যেত। সায়ান হয়তো এই প্রথম ভুল করে দরোজা বন্ধ না করেই ভেতেরে গিয়ে পার্টনারের সঙ্গে যথারীতি রতিক্রিয়া শুরু করেছিলো। এই সময়ে যুথির বাসায় না ফেরার ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতায় স্বাভাবিকভাবেই তার নিশ্চিৎ থাকার কথা, কেননা ছুটি না নিলে দিনের এই ভাগে যুথির বাসায় ফেরার প্রশ্ন ওঠে না। এটাও সত্য, আগে ফেরার খবরটা ফোন করে সায়ানকে জানানোর কথা একবার ভেবেছিলো যুথি, কিন্তু কী ভেবে আবার সিদ্ধান্ত নেয়—যাকগে, বাসায় ফিরেই ফোনটা করা যাবে।

বেডরুমে যার সঙ্গে সায়ানের অন্তরঙ্গতা নিয়ে যুথির জীবনে এত ঝড় বইছে, সায়ানের জীবনে সে আসে বিদেশ-বিভূইয়ের একটা সেলস-সেন্টার থেকে, প্রথমে জাহাজে করে, তার পরে সায়ানের সঙ্গে একান্তে লুকিয়ে তারই শোবার ঘরে। নিয়মিত সে আসে আর লুকিয়ে থাকে, এমনভাবে সে লুকায় অথবা এমনভাবে সায়ান তাকে লুকিয়ে রাখে যে কেউ তা জানতে পায় না। যুথি তো নয়-ই। হালকা গোলাপি ত্বকের আবরণে তার চেহারা এতই আকর্ষণীয় যে কেবল সায়ান নয়, যেকোনো যুবকের মনেই কামনার ঝড় তোলার জন্য যথেষ্ট। সায়ানের জার্মান প্রবাসী বন্ধু শাহরিয়ারের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই নারীর স্পর্শ ও কণ্ঠসুধা আস্বাদের সুযোগ সায়ানের কপালে কোনোদিনই জুটতো না, সেটা সে জানে। মেয়টার সঙ্গে সায়ানের সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা বহুদিনের পুরনো, বিয়ের আনেক কাল আগে থেকে তার শুরু এবং বলার কথা এই: তার সঙ্গে সায়ানের সম্পর্ক কেবল প্রেমাত্মক ও বন্ধুত্বমূলক নয়, বরং শুরু থেকই সে সম্পর্ক বিছানার, সে সম্পর্ক রতিমূলক, লিপ্সামূলক। সুশ্রী চেহারার এই নারী বিশেষ প্রেমাভিনয়সহ সব-রকমের ছলাকলায় পারদর্শী, যৌন পুলক বইয়ে দিতে তার জুড়ি নাই—সায়ান তার নীরব সাক্ষী।

সায়ানের নৈতিক পতন ও অসততার পরিমাণ এতটা সীমা ছাড়াতে পারে তা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারে নাই যুথি, তার কোনো সন্দেহ-ই ঘটে যাওয়া ঘটনার গভীরতা স্পর্শ করে নাই। বিশ্বাসভঙ্গের নাটকীয় আবিষ্কারে যুথির মনে প্রতিক্রিয়ার যে ঝড় ওঠে তা থামানোর সাধ্য একদমই তার ছিলো না। রাগে-দুঃখে-অভিমানে দরোজায় সামান্য উঁকি দিয়ে বায়ুবেগে কিচেনরুমে ফিরে আসে যুথি। পরিস্থিতির আকস্মিকতায় যুথির চোখ প্রথমে ঠাঁহর করে উঠতে পারে না চমৎকার উচ্চারণে কথা-বলা ঐ নারীমূর্তি আসলে কে, সে কি মানুষ, না অন্যকিছু—সে কি রক্তমাংসে গড়া নাকি অন্য কোনো জড় উপাদানে। যুথি হয়তো আত্মহত্যার কথাই ভেবেছিলো, অথবা বটির সদ্ব্যবহারের চিন্তাও তার মাথায় আসা অস্বাভাবিক ছিলো না।

কিছুক্ষণ পর বেডরুম থেকে বেরিয়ে আসার মুহূর্তে যুথির গোঙানি শুনে কিচেনে ঢোকে সায়ান। কিন্তু যুথির অবয়ব চোখে পড়ার আগেই কিচেনের গ্রিল ভেদ করে তার চোখ অবেলার আকাশে ঝুলে থাকা প্রকাণ্ড চাঁদের দিকে চলে যায় মুহূর্তের জন্য—চাঁদকে তার কেন যেন গর্ভবতী মনে হয়, যার মৃতবৎসা ভবিষ্যৎ জোছনার নামে দিনের আলোতে প্রহসন ঢেলে দেবে। ঘটনার অবিশ্বাস্যতায় কান্না বা অন্য যেকোনো প্রকার মানবিক প্রবৃত্তি মুহূর্তে লোপ পায় সায়ানের, সত্যের নিজস্ব অস্ত্রের মুখে নিজেকে তার মিথ্যার মতো এক দ্বিপদ মলিনতা বলে ভ্রম হয়। গুলিখাওয়া সন্ত্রাসীর মতো রুদ্ধশ্বাসে বেডরুমে ছুটে যায় সে; রতিক্রিয়া শেষে নির্ধারিত স্থানে লুকিয়ে রাখা রাবারে গড়া স্পিকিং সেক্সডলটা নিয়ে এসে মেঝের উপরে প্রচণ্ড শক্তিতে ছুড়ে মারে সে। যুথির রক্তমাখা মুমূর্ষু দেহ যা রাবারে নয়, মাংস দিয়ে বানানো, এই প্রথম তা জার্মান প্রবাসী বন্ধু শাহরিয়ারের পাঠানো রতিপুতুলের চেয়ে মূল্যবান মনে হয় তার কাছে।

ব্রেকিংনিউজ/ এমআর