শিরোনাম:

গল্পকে গল্প করে তোলা হুমায়ূন

মাহবুব রেজা
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৭, ০৪:০৮
অ-অ+
গল্পকে গল্প করে তোলা হুমায়ূন

হুমায়ূন আহমেদকে বলা হয় বর্তমান কথাসাহিত্যের রাজপুত্র। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী লেখক। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আমাদের কথাসাহিত্যে যে ক’জন শক্তিমান লেখক তাদের লেখা দিয়ে এই পরিমণ্ডলকে বিশ্বে বাংলা ভাষাভাষি মানুষের কাছে বিস্তৃত করে দিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ তাদের অন্যতম শীর্ষ নাম। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘নন্দিত নরকে’ খ্যাত হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে নিজেদের অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে সাহিত্য সমালোচকরা বলছেন, বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে গল্প উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ এক বিস্ময়কর নাম, এক জাদুমাখা নাম। তিনি জানেন কিভাবে গল্প লিখতে হয়, কিভাবে গল্পকে গল্প করে তুলতে হয়।

সাধারণত সব লেখক এই দুরূহ একইসঙ্গে কঠিন কাজটি ঠিকমত করতে পারেন না। তবে হুমায়ূন আহমেদ এক্ষেত্রে অনন্য মেধার সাক্ষর রেখেছেন। বিশেষ করে বাংলা ছোটগল্পে তিনি নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেছেন তার অসাধারণ সব ছোটগল্প দিয়ে। সাহিত্য সমালোচকরা হুমায়ূন আহমেদের নানা সীমাবদ্ধতার কথা বললেও তার ছোটগল্প নিয়ে কোন সংশয় নেই তাদের। পাশাপাশি হুমায়ূন আহমেদ সমান তালে তার উপন্যাস দিয়েও দেশ বিদেশের পাঠককে বই পড়ার প্রতি হারানো আগ্রহটা নতুন করে ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন- এখানেই তার সাফল্য। শুধু কি ছোটগল্প? উপন্যাসের পাশাপাশি হুমায়ূন আহমেদ নাটক, শিশুতোষ সাহিত্য, রম্য, ফিকশন, অতিপ্রাকৃত রচনা, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, চলচ্চিত্র- সাহিত্যের সব শাখায়ই স্বচ্ছন্দ বিচরণ করেছেন এবং নিজের মুন্সিয়ানাও দেখিয়েছেন।

সাহিত্যের পাঠকরা বলছেন, হুমায়ূন আহমেদের গদ্যের সরল ভঙ্গি পাঠককে মুগ্ধ করে। পাঠকের সঙ্গে সহজবোধ্য ভাষায় তিনি যোগাযোগ গড়ে তোলেন। এই লেখক গল্প লেখা কিংবা বলার সময় একটা পদ্ধতি অনুসরণ করেন যা গল্পের পাঠককে বাধ্য করে তার সঙ্গে হেটে যেতে। আর একজন পাঠক যখন লেখকের সঙ্গে তার রচনা পড়ে হাঁটতে থাকেন তখনই প্রকাশিত হয় লেখকের সার্থকতা। হুমায়ূন আহমেদ তার গল্পের ভেতর যে মুন্সিয়ানা দেখান বরাবরই সেটা হল, গল্পের চমকপ্রদ অংশ তিনি অনুচ্ছেদের শেষে বলেন। আর একগুচ্ছ চমক রহস্যের মতো করে জমাতে থাকেন, গল্পের শেষ দিকে বলবেন বলে। এতে পাঠকের পুরো গল্পটি পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়।

হুমায়ূন আহমেদের গল্পে আরেকটা বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় সেটা হল এই লেখক গল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চমকের প্রবণতা রাখেন, পাঠক একবার তার লেখা পড়া শুরু করলে তার পক্ষে লেখা শেষ না করে ওঠা কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আরও একটি প্রবণতা তার গল্পে থাকে সেটা হল, তিনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমন ঘটনা পাঠককে শোনাতে চান, যা এর আগে পাঠক শোনেনি বা এমন ঘটনার সঙ্গে পাঠকের পরিচয় নেই। আবার কিছু গল্পে তিনি টেনে আনেন বৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা। যাকে বলে মেটা-ফিজিকস।

দুই
বাংলাদেশের ছোটগল্পকারদের মধ্যে নিঃসন্দেহে তার হিউমার সেন্স অদ্বিতীয়; তিনি জাতীয় জীবনের নানা ঘটনাকে বরাবরই ব্যঙ্গাত্মক রূপে প্রকাশ করার সক্ষমতা দেখিয়েছেন, যেখানে প্রাধান্য লাভ করেছে হাস্যরসময় বর্ণনাভঙ্গি। এই অন্যতম প্রবণতার কারণে বাংলাদেশের ছোটগল্পের ভুবনে তিনি সফলমাত্রার গল্প যোগ করেছেন।হুমায়ূন আহমেদতারা বলছেন, জীবনকে তিনি দেখেছেন সহজ ও প্রত্যক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে। জীবনের নানা ঘটনাকে, অভিজ্ঞতাকে তিনি এমন নিপুণতার সঙ্গে তার গল্পে বর্ণনা করেছেন যে, পাঠকের কাছে তা অতি পরিচিত প্রাত্যহিক জীবনের ঘটনা বলে মনে হয়। মধ্যবিত্তের পরিবার কাঠামোর মধ্যে ঘটতে থাকা পিতার শাসন, মায়ের আদর, বোনের স্নেহ, মামার পাগলামি, ফুপীর মৃত্যুু, বাবার অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার জন্য নতুন পোশাক পরতে না পারার দুঃখ, ছোটবোনের মৃত্যুু, বিয়ের দিন বাড়ি থেকে উচ্ছেদ এবং শৈশব-কৈশোর-যৌবনের দিনগুলোকে হুমায়ূন আহমেদ তার গল্পে সহজভাবে চিত্রিত করতে পেরেছেন।

হুমায়ূন আহমেদের গল্প উপন্যাস পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না এরকম কথা বেশ প্রচলিত আছে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক অভীক দত্ত তার ‘হুমায়ূন আহমেদের ছোট গল্প এবং তার চরিত্রেরা’ শীর্ষক এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের সাথে প্রথম পরিচয় আমার শারদীয়া ‘দেশ’ এর মাধ্যমে। ওনার ‘নীল মানুষ’ উপন্যাসটি পড়ে বেশ চমকে গিয়েছিলাম। আসলে কখন যে শুরু করেছিলাম পড়তে আর কখন যে শেষ হয়ে গেছিল নিজেই বুঝতে পারি নি। হুমায়ূন আহমেদ পড়ার সময় এক অদ্ভুত আনন্দ পাই। তরতরিয়ে চলা নদীর মত ভাষা, সহজ সরল গদ্যে পাঠককে আকৃষ্ট করার এক অন্য রকম ক্ষমতা আছে ভদ্রলোকের। ঠিক যে গদ্যের ভাষা টেনে রেখেছে ওনার পাঠকদের। অকারণ হেঁয়ালি নেই, ন্যাকামি নেই, টানটান পাঠ অভিজ্ঞতা।

তারপর থেকে যেটা আমি করলাম সেটা হল পাগলের মত হুমায়ূন আহমেদ পড়া শুরু করলাম। বাড়িতে বেশ কিছু বই ছিল, সেগুলি গোগ্রাসে শেষ হল, তারপর কলকাতা বইমেলার জন্য শুরু হল টাকা জমানো। দুটো দুটো করে সমগ্র কেনা, তারপর একে একে যেখানে যা লিখে ফেলেছেন তা গোগ্রাসে গিলে ফেলা।

প্রচুর লেখার ফলে কখনও একই প্রসঙ্গ ওনার অজান্তেই তার লেখায় ঘুরে ফিরে এসেছে, আশ্চর্যজনকভাবে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিফলনও পাওয়া গিয়েছে, কিন্তু তিনি এমনভাবে পাঠককে তার লেখার সাথে জড়িয়ে নিতে জানতেন যে পাঠক কখনোই সেটাকে খুঁজে বেড়ায়নি। বরং চেয়েছে আরও বেশি করে তার লেখা পড়তে। এই সৌভাগ্য সব লেখকের হয় না, এ এক বিরল গুণ। হুমায়ূন আহমেদের লেখনী নিয়ে বিশেষ করে হিমু আর মিসির আলী নিয়ে লিখেছি এর আগে। আমার মনে হয় এবার ওনার ছোটগল্প নিয়ে লেখা দরকার। এমন নির্লিপ্ত ভাবে, নিজের মত পাঠকের উপর না চাপিয়ে, স্বল্প পরিসরে জাদু সৃষ্টি করা ছোটগল্পগুলি এক অদ্ভুত আমেজ এনে দেয়। গল্পগুলি পড়ার পরেও মনে অনেকক্ষণ রেশ থেকে যায়।

তার ছোটগল্পগুলি তিনি শুরু করছেন সাদা ক্যানভাসে খুব অবহেলাভরে রঙ দিয়ে, যেন ইচ্ছা নেই, তারপর ধীরে ধীরে ছবিটা যত পরিষ্কার হচ্ছে, তত গল্পের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছে পাঠক। গল্পের প্লটের বৈচিত্র্য অভাবনীয়। ছোট ছোট ব্যাপারগুলিকে নিয়ে যে এমন সব গল্প লেখা যায় না পড়লে কে জানত!’

একই লেখায় তিনি আরও উল্লেখ করছেন, ‘…একই ভাবে গল্পের মধ্যে আধিভৌতিক এবং কল্পবিজ্ঞানের ব্যাপারস্যাপারও অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ভাবে উপস্থাপিত করেছেন তিনি। ‘পিঁপড়া’ গল্পটাই যেমন। ডাক্তার নূরুল আফসারের কাছে এক আজব রুগি আসে। সে নাকি যেখানেই যায় তাকে পিঁপড়া এসে ঘিরে ধরে। এই জ্বালায় সে কোথাও যেতে পারে না। বিভিন্ন পন্থাও সে আবিস্কার করেছে পিঁপড়ে আটকাবার কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় নি। সারাশরীরে গুঁড় মেখে বসেও ছিল একবার। তাতে নাকি পাঁচদিন কোন পিঁপড়ে আসেনি। বিষে বিষক্ষয়। ছদিনের দিন থেকে আবার পিঁপড়ের জ্বালাতন শুরু হয়ে যায়। আরেকবার নদীর মাঝখানে নৌকা নিয়ে বসেছিল। তিনদিন গিয়ে চারদিনের দিন থেকে আবার নৌকাতেই পিঁপড়ে হানা দিল। আর এই গল্পের ভেতরে গল্প খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, রুগীর চরিত্রের কদর্যতম দিকের কথা। খুব হালকা ভাবে গল্পটা শুনিয়েছেন গল্পকার অথচ পড়ার সময়ে গা শিউরে উঠবেই পাঠকের। 

একইভাবে, ‘অচিন বৃক্ষ’, ‘ওইজা বোর্ড’, ‘ ভয়’, ‘জিন-কফিল’, ‘নিজাম সাহেবের ভূত’, ‘মৃত্যুগন্ধ’, ‘নিমধ্যমা’, ‘যন্ত্র’, ‘খেলা’, ‘পিঁপড়া’, ‘জীবন যাপন’, ‘খবিস’ ইত্যাদি গল্পে খুঁজে পাওয়া যাবে এক অদ্ভুত প্লট, প্রথম জীবনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় একা একা ঘুরে বেড়াতেন লেখক, এই গল্পগুলির কনসেপ্ট সম্ভবত সেই সময়েরই ফসল।’

হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্পকে শিল্প বোদ্ধারা তুলনা করছেন বিশ্বসাহিত্যের ক্লাসিক গল্পগুলোর সঙ্গে। তারা বলছেন, সাহিত্য মূল্যের দিক থেকে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প সব দিক থেকেই বিশ্ব সাহিত্যের অন্যান্য গল্পের প্রায় সমকক্ষ। বাংলা ছোটগল্পে তার গল্প মধ্যবিত্ত বাঙালির আশা, দুঃখ বেদনা কান্নাকে যেভাবে, যেমাত্রায় তুলে ধরা হয়েছে তা তার আগে কেউ পারেননি। (লিখা: সংগৃহিত)

লেখক: সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

ব্রেকিংনিউজ/এমআর