শিরোনাম:

অনুস্বার বিসর্গ চন্দ্রবিন্দু

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
প্রকাশিত : শনিবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১০:০৯
অ-অ+
অনুস্বার বিসর্গ চন্দ্রবিন্দু

 বাংলা বর্ণমালা ও বানানে অনুস্বার, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দুর অবস্থান নিয়ে বির্তকটা বেশ পুরনো। অনুস্বারকে এখনো ছেঁটে ফেলার মতো সাহসী উচ্চারণ কারও মুখ থেকে বের হয়নি। তবে বিসর্গ আর চন্দুবিন্দুকে অনেকে উপেক্ষা করতে চাইছেন।
 
অনুস্বার শুদ্ধ না অনুস্বর শুদ্ধ, তা নিয়েও বাগযুদ্ধ রয়েছে। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে দুটিই শুদ্ধ এবং ব্যাকরণসম্মত। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে অনুস্বরকেই শুদ্ধ মনে হতে পারে। অনুস্বরের গঠন হচ্ছে ‘অনু + স্ব + অ (অল)’। অন্যদিকে অনুস্বারের গঠন হচ্ছে ‘অনু + স্ব + অ (ঘঞ)’।
 
অনুস্বরের পক্ষে ছিলেন হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়। তাঁর বিবেচনায় অনুস্বার অশুদ্ধ। কিন্তু জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বিবেচনায় দুটিই শুদ্ধ।
সুভাষ ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাংলা প্রয়োগ অভিধান’-এ লিখেছেন, ‘কেউ কেউ ঋগ্বেদ, প্রাতিসাখ্য এবং পাণিনির অষ্টাধ্যায়ীর প্রয়োগ অনুসরণ করে অনুস্বার শব্দটিকেই শুধু ব্যবহার্য বলেন।’
 
বাংলায় অনুস্বার শব্দটি বেশ পুরনো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়রা অনুস্বারের পক্ষে ছিলেন। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর ‘বাঙ্গালা বানান সমস্যা’ প্রবন্ধে অনুস্বারই লিখেছেন ‘আমরা বলিব, সরলতার জন্য বাঙ্গালায় কেবল অনুস্বার চালান উচিত।’
 
অন্যদিকে সৈয়দ মুজতবা আলী তার রম্য প্রবন্ধে মজা করে লিখেছেন, ‘একটা তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের বইয়ে পড়েছিলুম, বাংলা শব্দের অন্ত্যদেশে অনুস্বার যোগ করিলে সংস্কৃত হয়; ইংরেজি শব্দের প্রাগদেশে জোর দিয়া কথা বলিলে সায়েবী ইংরেজি হয়।’
 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘মুক্তির উপায়’ প্রবন্ধে লিখেছেন ‘দেখুন, আমি মুখখু মানুষ, অনুস্বার-বিসর্গওয়ালা মন্ত্রর মুখ দিয়ে বেরবে না, কী বলতে কী বলব, শেষকালে অপরাধ হবে।’ তিনি তাঁর ‘যোগাযোগ’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘তাই স্মৃতির পাড়াতেও তাদের এই অপকীর্তনের অনুস্বার-বিসর্গওয়ালা ঢাকি জুটল।’ আর ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে রয়েছে ‘সেই বাড়ির মেয়ের শুচি সংস্করণে যাতে অনুস্বার-বিসর্গের ভুলচুক না থাকে সেই চেষ্টায় লাগলেন তাঁর স্বামী।’
বোঝা যাচ্ছে, অনুস্বরের পাল্লা সে তুলনায় ভারী নয়।
 
উচ্চারণে ‘ং’ ও ‘ঙ’র মাঝে ফারাক নেই। বর্ণ হিসেবে অনুস্বার অযোগবাহ বর্ণ। বিসর্গও (ঃ) একই কাতারের। অযোগবাহ বর্ণের ব্যাখ্যায় ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘অন্য স্বর ও অন্য ব্যঞ্জনের সহিত ইহাদের যোগ কল্পিত হয় নাই, ইহারা যেন স্বর ও ব্যঞ্জনমালার বাহিরে অবস্থান করে।’
অনস্বার ও বিসর্গ উচ্চারণের সময় ও পরে কোনো স্বরধ্বনির প্রয়োজন হয় না। কিন্তু উচ্চারণকালে এই দুই অযোগবাহ বর্ণ শব্দের উচ্চারণে নানা পরিবর্তন ঘটায়।
 
১৭৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হ্যালহেডের বইয়ে স্বরবর্ণের সংখ্যা ছিল ১৬। পরবর্তী প্রায় ১০০ বছর মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগ (প্রকাশ কাল ১৮৪৯) পর্যন্ত স্বরবর্ণের সংখ্যা ১৬টিই ছিল। এগুলো হলো অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, ঋৃ, ৯, ৯৯, এ, ঐ, ও, ঔ, অ০, অঃ। বিদ্যাসাগর এই সংখ্যা কমিয়ে ১২তে নামালেন। তিনি তাঁর বইয়ের ভূমিকায় লিখলেন ‘বহুকালাবধি বর্ণমালা ষোল স্বর ও চৌত্রিশ ব্যঞ্জন এই পঞ্চাশ অক্ষরে পরিগণিত ছিল। কিন্তু বাঙ্গালা ভাষায় দীর্ঘ ঋৃ-কার ও দীর্ঘ ৯৯ কারের প্রয়োজন নাই। এই নিমিত্ত ঐ দুই বর্ণ পরিত্যক্ত হইয়াছে। আর সবিশেষ অনুধাবন করিয়া দেখিলে অনুস্বার ও বিসর্গ স্বরবর্ণ মধ্যে পরিগণিত হইতে পারে না। এই নিমিত্ত ঐ দুই বর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ মধ্যে পঠিত হইয়াছে।’
 
বিদ্যাসাগরের এই মৌলিক সংস্কারের ১২৫ বছর পর স্বরবর্ণে মাত্র আর একটি সংস্কার ঘটেছে, তাহলো ৯ বর্ণটি বাদ দেওয়া। এখন স্বরবর্ণ ১১টি। ব্যঞ্জনবর্ণ ছিল ৩৪টি। বিদ্যাসাগর তাতে নতুনভাবে ছয়টি বর্ণ যুক্ত করেন। অনুস্বার ও বিসর্গকে স্বরবর্ণ থেকে তিনি ব্যঞ্জনবর্ণে নিয়ে এসেছিলেন। তা ছাড়া বিদ্যাসাগর দেখলেন, ‘বাঙ্গালা ভাষায় একারের ত, ত্ এই দ্বিবিধ কলেবর প্রচলিত আছে।’ তাই এটিকেও ব্যঞ্জনবর্ণে যুক্ত করেছেন। আর ক্ষ যেহেতু ক ও ষ মিলে হয় ‘সুতরাং উহা সংযুক্তবর্ণ, এ জন্য অসংযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ গণনাস্থলে পরিত্যক্ত হইয়াছে।’ এভাবে তাঁর হাতে ব্যঞ্জনবর্ণ হলো ৪০টি।
 
বিসর্গ নিয়েও রয়েছে অন্তহীন বিতর্ক। সুভাষ ভট্টাচার্য তাঁর ‘বাংলা প্রয়োগ অভিধান’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘বাংলায় বিসর্গের ব্যবহার সম্পর্কে কোন সহজ নিয়ম নির্দেশ করা কঠিন। উনিশ শতকে এবং বিংশ শতকের প্রথম দিকে সংস্কৃতাগত শব্দের বানান নিয়ে বিশেষ মতভেদ ছিল না। সেই সময় তৎসম শব্দে বিসর্গলোপের প্রশ্নই ওঠেনি। কিন্তু তারপর থেকেই এই মত সমর্থিত হতে থাকে যে বাংলাভাষা যেহেতু সংস্কৃত নয়, তাই বাংলা শব্দে নির্বিচারে বিসর্গ দেওয়া অনাবশ্যক। বলাবাহুল্য এই মতের অন্যতম প্রবক্তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যিনি চেয়েছিলেন বাংলা ব্যাকরণ নিজের পায়ে দাঁড়াক, যিনি বলেছিলেন বাংলাভাষা ‘সংস্কৃতও অন্য ভাষার আমদানিকে কি ছাঁচে ঢালিয়া আপনার করিয়া লয়, তাহাই নির্ণয় করিবার জন্য বাংলা ব্যাকরণ’।
 
সংস্কৃতাগত বাংলা শব্দে বিসর্গের ব্যবহার উচিত কিংবা বাহুল্য সে বিষয়ে কোনো সহজ ও সর্বজনমান্য সিদ্ধান্ত অসম্ভব। তবে বিষয়টি যে আলোচনার যোগ্য তাতে সন্দেহ নেই।
 
কিছু সংস্কৃতাগত শব্দ বিসর্গযুক্ত। অন্তঃ (অন্তর) যশঃ (যশস), সদ্যঃ (সদ্যস্), জ্যোতিঃ (জ্যোতিস্), মনঃ (মনস্), প্রান্ত (প্রার্ত) ইত্যাদি। এই শব্দগুলি যখন স্বাধীনভাবে অর্থাৎ পৃথকভাবে বাংলায় ব্যবহƒত হয়, তখন এরা বিসর্গ ছাড়াই ব্যবহৃত হয়। অন্ত, যশ, জ্যোতি, মন, প্রাত- শব্দগুলির এই রূপই বাংলায় গৃহীত। কিন্তু সন্ধি সমাসে এই শব্দগুলি পূর্বপদে থাকলে বিসর্গযুক্ত রূপই স্বীকৃত অধঃপাত, অন্তঃকরণ, অন্তঃপুর, অন্তঃসার, প্রাতঃকৃত্য, প্রাতর্ভ্রমণ, প্রাতঃস্মরণীয়, মনঃকষ্ট, মনঃপুত, মনঃসমীক্ষণ, মনোবেদনা, মনোজগৎ, মনোমত, মনসিজ, জ্যোতির্ময়, জ্যোতিস্মান, জ্যোতিরিন্দ্র, জ্যোতির্লোক। এইসব শব্দের মধ্যস্থিত বিসর্গ সম্পর্কে সংস্কৃত ব্যাকরণের সঙ্গে আমরা একটা আপস করে নিয়েছি। বাংলায় শব্দের মধ্যস্থিত বিসর্গ উচ্চারণে তার প্রভাব রেখে যায়। সাধারণত শব্দের মধ্যে বিসর্গ থাকলে বিসর্গের পরবর্তী উচ্চারণ বর্ণটির উচ্চারণ দ্বিত্ব হয়। অধঃপাত শব্দের উচ্চারণ অধোপ্পাত। এইসব শব্দে বিসর্গ তাই বাহুল্য নয়। এবং এইসব শব্দে বিসর্গলোপের কথা রবীন্দ্রনাথও বলেননি।
 
কিছু শব্দের মধ্যস্থিত বিসর্গের লোপ হয় বিকল্পে। বিসর্গের পর স্ত, স্ব বা স্বঃ থাকলে বিকল্পে বিসর্গের লোপ হয়। অন্তস্থ বা অন্তঃস্থ, মনস্থ বা মনঃস্থ, দুস্থ বা দুঃস্থ, নিস্তব্ধ বা নিঃস্তব্ধ, নিস্পৃহ বা নিঃস্পৃহ। এই বিকল্পের নিয়মটি থাকার ফলে এই জাতীয় শব্দের বিসর্গ সম্পর্কে কোন বিতর্ক নেই।
 
যত মতভেদ ও দ্বিধা অন্ত্য বিসর্গ নিয়ে। প্রায়ই দেখা যায় একই লেখক কখনো শব্দের অন্তে বিসর্গ রেখেছেন, কখনো বা বর্জন করেছেন।
 
প্রমথ চৌধুরী অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্ত্য বিসর্গ বর্জন করারই পক্ষপাতী ছিলেন।
 
এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য অনেক স্পষ্ট। প্রথম জীবনে তিনিও শব্দের অন্তে বিসর্গ ব্যবহার করেছেন। পরে ক্রমশ তার মনে হয়েছে অন্ত্যবিসর্গ বাংলাভাষা ও ব্যাকরণের সঙ্গে সঙ্গতিহীন ও তার পক্ষে অস্বভাবী। তাকে জিইয়ে রাখা অনর্থক (এটা ঘটতে পেরেছে অ-কারের প্রতি ভাষার উপেক্ষাবশত- বাংলাভাষা-পরিচয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
 
রবীন্দ্রনাথের অনুসরণে অন্যান্য সাহিত্যিকও ক্রমে অন্ত্যবিসর্গ বর্জন করলেন (যে সব পাঠ্যান্তরের উল্লেখ পাওয়া যায় সেগুলো অতিশয় গৌণ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্পষ্টত বর্জনীয়- বুদ্ধদেব বসু, কালিদাসের মেঘদূত ভূমিকা; বায়ুস্থিত মল ক্রমশ জমা হতে থাকে- রাজশেখর বসু, আমাদের পরিচ্ছদ, চলচ্চিন্তা; স যখন কোনো ব্যঞ্জনবর্ণের পূর্বে যুক্ত হইয়া থাকে তখন তৎপূর্বে বিসর্গ লিখিলেও চলে, না লিখিলেও চলে; যথা, নিষ্পন্দ, নিষ্পৃহ, প্রাতস্নান- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; অ ব্যতীত অন্য সমস্ত স্বরবর্ণের পূর্বে বিসর্গযুক্ত আকারের বিসর্গ লোপ হয়Ñ সংস্কৃতশিক্ষা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সেই বাড়ির মেয়ের শুচি সংস্করণে যাতে অনুস্বার-বিসর্গের ভুলচুক না থাকে সেই চেষ্টায় লাগলেন তাঁর স্বামী- শেষের কবিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
১৯৩৬ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান সংস্কার সমিতি বিধান দিয়েছিল: ‘বাংলা বিসর্গান্ত শব্দের শেষের বিসর্গ বর্জিত হইবে, যথা- আয়ু, মন, ইতস্তত, ক্রমশ, বিশেষত ইত্যাদি।’
 
কিন্তু মণীন্দ্রকুমার ঘোষ এই নির্দেশের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তার প্রধান যুক্তি দুটি- এক, অন্ত্যবিসর্গ বর্জন করলে উচ্চারণ ভুল হবার সম্ভাবনা। বিসর্গ আছে বলেই শব্দগুলি ‘এখনও অ-কারান্ত আছে।’ দুই, বিসর্গ বর্জিত হলে সন্ধি সমাসে বিপর্যয় ঘটবে; নভোচর, যশেচ্ছা, তেজেন্দ্র’ প্রভৃতি দুষ্ট সন্ধিতে বাংলা গ্রন্থ ছেয়ে যাবে। মণীন্দ্রকুমারের এই যুক্তির অত্যন্ত প্রবল সন্দেহ নেই, তবে এ বিষয়ে এতখানি কঠোর না হলেও চলে। প্রথমত, সংস্কৃতের উচ্চারণ বাংলায় প্রায়ই বজায় থাকে না। সেটাই স্বাভাবিক এবং এতে আক্ষেপেরও কিছু নেই। এমন কী সংস্কৃতমনস্ক পণ্ডিতও বাংলায় ফল, বন, দান, দানব প্রভৃতি শব্দের অ-কারান্ত উচ্চারণ করেন না। দ্বিতীয়ত, সন্ধি-সমাসে ভুলের কথা ভেবে অন্ত্যবিসর্গ বর্জন করা চলবে না- এই পরামর্শ মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। আসলে সন্ধি-সমাসে ভুলের কথা ভেবেই হয়তো এই সিদ্ধান্ত করা হয়েছিল যে, শব্দের মধ্যস্থিত বিসর্গ বর্জন করা হবে না। বস্তুত মণীন্দ্রকুমার যে উদাহরণ গুলি দিয়েছেন সেগুলি অন্ত্যবিসর্গের নয়, শব্দমধ্যস্থিত বিসর্গের; আর ওই বিসর্গ সম্পর্কে তো কোনো বিতর্ক নেই।
 
শব্দের অন্ত্যবিসর্গের লোপ বর্তমানে এতই প্রতিষ্ঠিত যে সে সম্পর্কে আপত্তি অহেতুক। আধুনিক বাংলায় অতঃপর, অন্তঃকরণ, অন্তঃপুর, অন্তঃশীল, মনঃকষ্ট, মনঃক্ষুণ্ন, নভশ্চর, সদ্যোজাত প্রভৃতি শব্দ যেমন অবিতর্কিত, তেমনই প্রতিষ্ঠিত বিশেষত, মুখ্যত, অন্তত, গৌণত, প্রধানত, সম্ভবত। আমরা সর্বত লিখতে পারি, কিন্তু অবশ্যই সর্বতোভাবে লিখব। কারণ শব্দের মধ্যস্থিত বিসর্গ আমরা বর্জন করছি না। ব্যাকরণ ভাষার বিশৃঙ্খলা দূর করে তাকে সংহত করে। তবে একথাও মনে রাখা দরকার যে ব্যাকরণ ভাষার অনুগামী পুরোগামী নয়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বানান-সংস্কার সমিতির অন্যান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি যাই থাক, বিসর্গের বিষয়ে সমিতি পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতারই প্রমাণ রেখেছেন। ভাষার গতির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেই তারা নির্দেশ দিয়েছেন।
 
বিসর্গ তার আগের স্বরধ্বনিকে আশ্রয় বা অবলম্বন করে উচ্চারিত হয়। অন্যদিকে এই স্বরধ্বনির উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী বিসর্গটিরও উচ্চারণস্থান বদলে যায়। এই কারণে এটা আশ্রয়স্থানভোগী বর্ণ আখ্যা পেয়েছে। কারণ বিসর্গ নিজেই নির্দিষ্ট উচ্চারণস্থান বঞ্চিত বর্ণ। বিসর্গ যে ধ্বনির সাহায্যে উচ্চারিত হয়, তার উচ্চারণ স্থান দখল করে।
 
শব্দের শেষে থাকলে বাংলায় বিসর্গ বর্ণের ধ্বনি ‘হ’ ধ্বনির কাছাকাছি। যেমন যাঃ, আঃ, ওঃ। তবে শব্দের মাঝে থাকলে পরবর্তী ব্যঞ্জনের দিত্ব হয়। যেমন দুঃসাধ্য > দুশশাদধো, দুঃখ > দুখখো।
 
 
প্রকৃতপক্ষে বিসর্গ ও অনুস্বার স্বরবর্ণ যেমন নয়, তেমনি ব্যঞ্জনবর্ণও নয়। এই দুটি বর্ণকে অযোগবাহ বর্ণ বলা হয়। কারণ এদের নিজস্ব ধ্বনি নেই। তাই নির্দিষ্ট উচ্চারণ স্থানও নেই।

 
মুহম্মদ আবদুল হাই তাঁর ‘বাঙলা লিপি ও বানান সমস্যা’ প্রবন্ধে লিখেছেন ‘এর যথাযথ উচ্চারণ বাঙলায় নেই। ক্রমশঃ, আপাততঃ, প্রধানতঃ, সাধারণতঃ প্রভৃতি শব্দে এ-কালে বিসর্গ উচ্চারিত হয় না তা-ই নয়, বানানেও দেখানো হয় না। আঃ! ওঃ! উঃ! ইঃ! প্রভৃতি অব্যয়ে ঃ লেখা হয় বটে কিন্তু তা আশ্রয়স্থান ভাগী অঘোষ শিস ধ্বনিই; ঃ নামক অতিরিক্ত চিহ্ন ব্যবহার না করে মহাপ্রাণ অঘোষ হ্ দিয়ে তার প্রতিবর্ণীকরণ করা যেতে পারে। দুঃখ, মনঃপূত প্রভৃতি শব্দের মাঝখানে বিসর্গের ব্যবহার পরবর্তী ধ্বনির উচ্চারণকে দ্বিগুণ করে দেয়। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে বিসর্গ না রেখে তাদের ধ্বনি অনুগামী বানান দুক্খ, মনোপূত কিংবা মনপ্পূত লেখাই শ্রেয়।’
 
তবে ভিন্নমত হচ্ছে বিসর্গ একটি বাংলা বর্ণ; এটি কোনো চিহ্ন নয়। বর্ণ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। পদমধ্যস্থে বিসর্গ ব্যবহার হবে। যেমন: অতঃপর, দুঃখ, অন্তঃস্থল, স্বতঃস্ফূর্ত ইত্যাদি। পূর্ণ শব্দের শেষে বিসর্গ ব্যবহার হবে না। যেমন- ধর্মত, কার্যত, ন্যায়ত, করত, বস্তুত, ক্রমশ, প্রায়শ ইত্যাদি।
 
অর্ধ শব্দকে পূর্ণতা দানে অর্থাৎ পূর্ণ শব্দকে সংক্ষিপ্ত রূপে প্রকাশে বিসর্গ ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন- মোহাম্মদ > মোঃ, মোসাম্মত > মোসাঃ, ডাক্তার > ডাঃ ইত্যাদি। বর্তমানে এ ধরনের শব্দের বানানে ডট ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন- মোহাম্মদ > মো., মোসাম্মত > মোসা., ডাক্তার > ডা. ইত্যাদি।
 
বিসর্গ (ঃ) এর স্থলে কোলন (:) কোনোভাবেই ব্যবহার করা যাবে না। যেমন অতঃপর, দুঃখ ইত্যাদি। কারণ এটি কোনো বর্ণ নয়, চিহ্ন।
 
সাধারণত নিচের শব্দগুলোতে বিসর্গ রয়েছে: অতঃপর, অধঃকৃত, অধঃক্রম, অধঃক্ষেপণ, অধঃপতন, অধঃপতিত, অধঃস্থ, অন্তঃসত্ত্বা, অন্তঃসলিলা, অন্তঃসার, অন্তঃসারশূন্য, অন্তঃকরণ, অন্তঃকোণ, অন্তঃক্রীড়া, অন্তঃপুর, অন্তঃশত্রু, অন্তঃরাষ্ট্রিক, অন্তঃসার, অন্তঃস্থ, ইতঃপর, ইতঃপূর্বে, উচ্চৈঃস্বরে, চক্ষুঃশূল, চতুঃসীমা, ছন্দঃপতন, জ্যোতিঃপুঞ্জ, তপঃক্লেশ, দুঃশাসন, দুঃসংবাদ, দুঃসময়, দুঃসাধ্য, দুঃসহ, দুঃস্বপ্ন, দুঃসাহস, দুঃসাহসিক, দুঃস্থ, দুঃস্বপ্ন, নিঃশঙ্ক, নমঃশুদ্র, নিঃশব্দ, নিঃশর্ত, দুঃশীল, নিঃস্নেহ, নিঃশ্বাস, নিঃশ্মশ্র, নিঃশ্রেণি, নিঃসংকোচ, নিঃসংশয়, নিঃসঙ্গ, নিঃসন্তান, নিঃসন্দেহ, নিঃসম্বল, নিঃস্ব, নিঃসম্পাত, নিঃসম্বল, নিঃসহায়, নিঃসাড়, নিঃসারণ, নিঃস্ব, নিঃস্বার্থ, নিঃস্বীকরণ, নিঃশব্দ, নিঃশর্ত, নিঃশেষ, নিঃসঙ্কোচ, নিঃসংশয়, নিঃসরণ, নিঃসহায়, নিঃসাড়, নিঃসীম, নিঃসৃত, নিঃস্রাব, নিঃস্পৃহ, পয়ঃপ্রণালি, পুনঃপুন, পুনঃপ্রবেশ, পৌনঃপুনিক, প্রাতঃকাল, প্রাতঃকৃত্য, প্রাতঃক্রিয়া, প্রাতঃপ্রণাম, প্রাতঃসন্ধ্য, প্রাতঃস্নান, প্রাতঃস্মরণীয়, বক্ষঃস্থল, বয়ঃকনিষ্ঠ, বয়ঃপ্রাপ্ত, বয়ঃসন্ধি, বয়ঃস্থ, বহিঃপ্রকাশ, বহিঃশত্রু, বহিঃশুল্ক, বহিঃসমুদ্র, বহিঃস্থ, মনঃকল্পিত, মনঃকষ্ট, মনঃক্ষুণ্ন, মনঃক্ষোভ, মনঃপীড়া, মনঃপুত, মনঃপ্রাণ, মনঃসংযোগ, যশঃকীর্তন, শিরঃপীড়া, শিরঃশূল, মনঃসমীক্ষা, মনঃস্থ, সদ্যঃকৃত, সদ্যঃপক্ব, সদ্যঃপ্রবিষ্ট, সদ্যঃপ্রসূত, সদ্যঃস্নাত, স্বতঃপ্রবৃত্ত, স্বতঃপ্রকাশিত, স্বতঃপ্রণোদিত, স্বতঃপ্রমাণিত, স্বতঃস্ফূর্ত, স্রোতঃপথ।

এদিকে বাংলা বর্ণমালার মোট ৫০টি বর্ণের মধ্যে সর্বশেষ বর্ণ হচ্ছে চন্দ্রবিন্দু ( ঁ)। চন্দ্রবিন্দু ঠিক বর্ণ নয়, একে বরং বলা চলে চিহ্ন। এই চিহ্নটি বর্ণেও ঠিক কোথায় বসবে, তা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে। কারো মতে, চন্দ্রবিন্দু বসা উচিত বর্ণের ঠিক মাথার উপর। বাকিদের মত হচ্ছে, ওটাকে পুরোপুরি মাথায় তুলে লাভ নেই। বর্ণের ডানপাশে বসিয়ে দিলেই বেঁচে-বর্তে যাবে। বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও দেননি। তিনি তাঁর শব্দতত্ত্বে লিখেছেন, ‘যদি বলেন, পরবর্তী যুক্ত-অক্ষরের পূর্বে চন্দ্রবিন্দু যোগ হইতে পারে কিন্তু অযুক্ত অক্ষরের পূর্বে হয় না, সে কথাও ঠিক নহে।’
 
এই একটি মাত্র বর্ণই স্বতন্ত্র বর্ণ হিসেবে বাংলা শব্দে ব্যবহৃত হতে পারে না, বর্ণের মস্তকের উপর এটি যুক্ত হয়। বেশ নিরীহ প্রকৃতির চিহ্ন এটি, দেখতেও সুন্দর, এর উচ্চারণেও রয়েছে এক ধরনের সাংগীতিক ব্যঞ্জনা, তবু কেন যেন চিহ্নটির প্রতি বিরাগ বা বিতৃষ্ণা আছে অনেকের, বাংলাভাষার জগৎ থেকে একে বিদায় করতে পারলেই যেন তারা বেঁচে যান!
 
যারা বলেন, চন্দ্রবিন্দু অপ্রয়োজনীয়, সুতরাং একে বিদায় করা হোক, আকৃতিতে এটি অর্ধচন্দ্রসদৃশ, সুতরাং অর্ধচন্দ্র দিয়েই একে বাংলা বর্ণমালা থেকে বিদায় করা হোক। কিন্তু কেন এই কাজটি করা এত জরুরি, সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট করে কিছু বলেন না।
 
চন্দ্রবিন্দু যে বর্ণের উপর বসে, সেই বর্ণের উচ্চারণ আনুনাসিক হয়। কেবল স্বরবর্ণ ও স্বরান্ত ব্যঞ্জনের সঙ্গে এটি যুক্ত হতে পারে। বশীর আল হেলাল তাঁর ‘বাংলাভাষার নানান বিবেচনা’ বইটিতে চন্দ্রবিন্দু সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র নিবন্ধে লিখেছেন, ‘যথাযথ অর্থনিষ্পত্তির প্রয়োজনে চন্দ্রবিন্দুর যথাযথ ব্যবহার আবশ্যক।’
 
সংস্কৃত ভাষার প্রচুর শব্দ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাভাষায় তদ্ভব শব্দ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সংস্কৃত শব্দের নাসিক্য বর্ণগুলো (ঙ, ঞ, ণ, ন, ম, ং) অনেক জায়গায় তদ্ভব শব্দে এসে চন্দ্রবিন্দুর রূপ ধারণ করে। যেমন পঙ্ক > পাঁক, কঙ্কণ > কাঁকন, পঞ্চ > পাঁচ, অঞ্চল > আঁচল, দ- > দাঁড়, কণ্টক > কাঁটা; চন্দ্র > চাঁদ, সন্ধ্যা > সাঁঝ; গ্রাম > গাঁ, স্বামী > সাঁই, বংশী > বাঁশি, কংস > কাঁসা।
আবার বাংলা ভাষায় বেশ কিছু জোড়শব্দ রয়েছে যেগুলোতে চন্দ্রবিন্দু থাকা, না-থাকার কারণেই অর্থের পার্থক্য ঘটে। যেমন, রাঁধা-রাধা, বাধা-বাঁধা, গাদা-গাঁদা, কাদা-কাঁদা, কাচা-কাঁচা, ভাজা-ভাঁজা, গা-গাঁ, বা-বাঁ, কাটা-কাঁটা, বাটা-বাঁটা, গোড়া-গোঁড়া, ধোয়া-ধোঁয়া, পাক-পাঁক ফোটা-ফোঁটা, আধার-আঁধার, কুড়ি-কুঁড়ি, দাড়ি-দাঁড়ি, শাখা-শাঁখা ইত্যাদি।
বাংলাভাষায় সম্মানবাচক সর্বনাম পদের মাথায় প্রথম বর্ণের উপর চন্দ্রবিন্দু বসে। যেমন এঁর-ওঁর-তাঁর-যাঁর, এঁদের-ওঁদের-তাঁদের-যাঁদের, এঁদেরকে-ওঁদেরকে-তাঁদেরকে-যাঁদেরকে, এঁরা-ওঁরা-তাঁরা-যাঁরা, এঁকে-ওঁকে-তাঁকে-যাঁকে ইত্যাদি।
 
চন্দ্রবিন্দু পরাশ্রয়ী বর্ণ। অন্য বর্ণের আশ্রয়ে থেকে উচ্চারিত হয় বলেই একে পরাশ্রয়ী বর্ণ বলা হয়।
 
হিন্দুধর্মাবলম্বীরা এই বর্ণটিকে দু-একটি ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন। দেবদেবীর নামের পূর্বে বসে চন্দ্রবিন্দু ‘ওম্’ রূপে উচ্চারিত হয়। যেমন, ঁগঙ্গা (ওম্ গঙ্গা)। প্রয়াত ব্যক্তি স্বর্গবাসী হয়েছেন এই অর্থেও হিন্দুনামের আগে চন্দ্রবিন্দু বসে। যেমন, ঁনারায়ণচন্দ্র দে। নামের আগে যুক্ত এই চন্দ্রবিন্দু ‘স্বর্গত’ বা ‘ঈশ্বর’ রূপে উচ্চারিত হয়।
 
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষে চন্দ্রবিন্দুকে অনুনাসিক বর্ণ বলা হয়েছে। পাণিনি তাঁর অষ্ট্যাধ্যায়ী ব্যাকরণের অষ্টধ্যায়ের চতুর্থ পাদের ৫৮-৫৯ সূক্তে চন্দ্রবিন্দুকে সানুনাসিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই সূক্তদ্বয়ে দেখানো হয়েছে কি প্রক্রিয়ায় ‘ং’ চন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
 
সংস্কৃত ব্যাকরণ মতে, অনুস্বার (ং) একমাত্রা বিশিষ্ট। এই ধ্বনি অর্ধ-মাত্রায় রূপ নিলে তা চন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পাণিনি উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন কিংযুক্তম্ > কিঁয্যুক্তম্, সংযন্ত্র>সঁয্যন্ত্র, সংবৎসরঃ > সঁব্বৎসরঃ ইত্যাদি।
 
ভাষাবিজ্ঞানীরা বলেন, সানুনাসিক ধ্বনি কোনো ভাষার সমগ্র ধ্বনিরূপকে স্নিগ্ধ করে দেয়। বাংলা ও ফরাসি ভাষা শুনতে মধুর। তার অন্যতম কারণ হলো উভয় ভাষাতেই সানুনাসিক ধ্বনি প্রচুর ব্যবহৃত হয়।
 
চন্দ্রবিন্দু স্বরধ্বনি ছাড়া উচ্চারিত হয় না। স্বরবর্ণের সাথে নাসিক্যধ্বনি যুক্ত করার সময়, আল্জিহ্বা ও কোমল তালু জিহ্বামূলে পুরোপুরি নামিয়ে আনা হয় না। এর ফলে স্বরবর্ণ নাসিক্য না হয়ে সানুনাসিক স্বরধ্বনিতে পরিণত হয়। এর ফলে সানুনাসিক ধ্বনি নাক এবং মুখ উভয় দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়। উল্লেখ্য, যে ধ্বনি শুধু নাক দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাকে বলা হয় নাসিক্য। এই জাতীয় ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো হলো ঙ, ঞ, ন, ণ, ম, ং।
 
নাসিক্য ধ্বনির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ধ্বনিলিপিতে কোনো পৃথক চিহ্ন নেই। তবে সানুনাসিক ধ্বনির ক্ষেত্রে আছে। এর চিহ্ন হলো ̃। এর আন্তর্জাতিক লিপি সঙ্কেত ০৩০৩। এই চিহ্নটির মূল আশ্রয়স্থান স্বরবর্ণ। তাই আন্তর্জাতিক ধ্বনিলিপিতে এই চিহ্ন স্বরধ্বনির উপর বসে।
 
হিন্দু তন্ত্রমতে চন্দ্রবিন্দুকে বিন্দুরূপার প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই কারণে শক্তিবিগ্রহের পূর্বে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করা হয়। যেমন শ্রীশ্রী ঁদুর্গা পূজা।
 
হিন্দু মৃত ব্যক্তির নামের আগে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করা হয়। মৃতব্যক্তি স্বর্গগত হয়েছে বা ঈশ্বরপ্রাপ্ত হয়েছে এই বিচারে এই ঈশ্বরের প্রতীক হিসেবে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহৃত হয়। যেমন ঁকৃষ্ণধন মুখোপাধ্যায় (মৃত ঁঁকৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়)।
 
বাংলা বানানে অধিকাংশ চন্দ্রবিন্দু আসে সংস্কৃত বানানের ঙ, ঞ, ণ, ন, ম এবং ং লোপের ফলে, অর্থাৎ তৎসম বানানের নাসিক্যধ্বনি তদ্ভব শব্দে চন্দ্রবিন্দু রূপ নেয়। এটাই নাসিক্যভবন। যেমন-
 
ঙ: অঙ্কন > আঁকা, কঙ্কন > কাঁকন, পঙক্তি > পাঁতি, পঙ্ক > পাঁক, বঙ্কিম > বাঁকা, শঙ্খ > শাঁখ।
: অঞ্চল > আঁচল, অঞ্জলি > আঁজলা পঞ্চ > পাঁচ।
ণ: কণ্টক > কাঁটা, চ-াল > চাঁড়াল পলাণ্ডু > পেঁয়াজ, ভাণ্ড > ভাঁড়, ভাণ্ডার > ভাঁড়ার, শু- > শুঁড়, ষণ্ড > ষাঁড়, হণ্টন > হাঁটা।
ন: অন্ধকার > আঁধার, ক্রন্দন > কাঁদা, গ্রন্থনা > গাঁথা, চন্দ্র > চাঁদ, ছন্দ > ছাঁদ, দন্ত > দাঁত, বন্ধন > বাঁধন, বান্দও > বাঁদর, বৃন্ত > বোঁটা, সন্তরণ > সাঁতার, সন্ধ্যা > সাঁঝ, স্কন্ধ > কাঁধ।
ম: কম্পন > আমিষ > আঁষ, কাঁপা, গ্রাম > গাঁ, চম্পক > চাঁপা, ঝম্প > ঝাঁপ, ধূম > ধোঁয়া, সমর্পণ > সঁপা, গুম্ফ > গোঁফ
: বংশ > বাঁশ, বংশী > বাঁশি, সংক্রম > সাঁকো, হংস > হাঁস।
 
মনে রাখুন: নাসিক্যধ্বনি বিলুপ্ত না হলে চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন- কর্ণ > কান, গঙ্গা > গাঙ, ঘৃণা > ঘেন্না, জন্ম > জনম, বন্য > বুনো, বান্দর > বানর, ব্রাহ্মণ > বামুন মনুষ্য > মানুষ, মাণিক্য > মানিক, যত্ন > যতন, রত্ন > রতন, রন্ধন > রান্না, লাঙ্গল > লাঙল, শাল্মলী > শিমুল, স্বর্ণ > সোনা, হাঙ্গর > হাঙর।
 
ব্যতিক্রম: কখনও দেখা যায় নাসিক্যধ্বনি বিলুপ্ত হলেও চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন- কঙ্ক > কাক, কর্দম > কাদা, কৃপণ > কিপটে, কৃষ্ণ > কালো, ঝঞ্ঝা > ঝড়, টঙ্কা > টাকা, লম্ফ > লাফ, শৃঙ্খল > শিকল।
 
অনেক ধনাত্মক, দ্বিরাবৃত্ত ও তদ্ভব শব্দের পাশাপাশি কিছু সংখ্যাবাচক শব্দ ও সম্মানসূচক সর্বনাম পদেও চন্দ্রবিন্দু বসে। আবার কোনো কোনো বিদেশি শব্দের অন্ত্যবর্ণেও চন্দ্রবিন্দু বসে। কেউ কেউ উচ্চারণ দোষে কাচ, পেচক শব্দের চন্দ্রবিন্দু জুড়ে দেন। শব্দে অযথা চন্দ্রবিন্দু লাগানোর প্রবণতায় আক্রান্ত হওয়া জরুরি নয়।
 
সাধারণভাবে যে সব শব্দে চন্দ্রবিন্দু থাকবে সেসব শব্দ হচ্ছে: আঁত, আঁশ, আঁষ, আঁধার (অন্ধকার অর্থে) আঁইশ, আঁক, আঁকড়া, আঁকশি, আঁকা, আঁটসাট, আঁটকুড়ে, আঁটা, আঁটি, আঁটুলি, আঁতড়ি, আঁতুড়, আঁধি, আঁষটে, আঁস্তাকুড়, আঁকাবাঁকা, আঁকিবুকি, আঁকিয়ে, আঁকুপাকু, আঁখি, আঁচ, আঁচড়, আঁচল, আঁচিল, আঁজলা, ইঁচড়, ইঁচড়েপাকা, ইঁদারা, উঁকি, উঁচকপালে, উঁচকপালি, উঁচানো, উঁচু, উঁচুনিচু, এঁকেবেঁকে, এঁচড়, এঁটে, এঁটো, এঁড়ে, এঁদো, ওঁচা, কাঁকড়া, কাঁকন, কাঁচা, কাঁচি, কাঁচুলি, কাঁঠাল, কাঁথা, কাঁদা, কাঁদানো, কাঁধ, কাঁপন, কুঁজ, কুঁড়ি, কুঁড়েঘর, কেঁচো, কেঁদো, কোঁচ, কৌঁসুলি, খাঁটি, খাঁদা, খিঁচ, খুঁটি, খুঁটিনাটি, খুঁত, খেঁকি, খোঁজ, খোঁড়া, খোঁয়াড়, খোঁয়াড়ি, গাঁ, গাঁইট, গাঁট, গুঁড়া, গুঁড়ি, গুঁতো, গেঁয়ো, গেঁজেল, গ্যাঁজলা, গোঁ, গোঁজ, গোঁজামিল, গোঁড়া, গোঁফ, গোঁয়ার, ঘাঁটি, ঘেঁচু, ঘাঁট, ঘোঁট, ঘুঁটি, চাঁদ, চাঁদা, চাঁপা, ছাঁদ, ছিঁচকাদুনে, ছেঁড়া, ছোঁ, ছোঁয়াচে, ছুঁচালো, ছুঁচো, ছুঁড়ি, জাঁক, জাঁতা, জুঁই, ঝাঁপ, ঝাঁপি, ঝাঁকড়া, ঝাঁকা, ঝাঁঝ, ঝাঁড়া, ঝিঁঝিঁ, ঝোঁক, ঝুঁকি, ঝুঁটি, টাঁক, ঠাঁই, ঠেঁটা, ঠোঁট, ডাঁট, ডাঁসা, তাঁত, তাঁতি, ত্যাঁদড়, তাঁবু, তুঁত, তেঁতুল, তোঁতলামি, দাঁও, দাঁড়, দাঁড়ি, দাঁদ, ধাঁচ, ধাঁধা, ধোঁয়া, ধোঁয়াশা, ধোঁয়া, পাঁক, পাঁচ, পাঁচালি, পাঁজর, পাঁজা, পাঁঠা, পাঁয়তারা, পিঁড়ি, পিঁজরা, পিঁপড়া, পুঁজ, পুঁজি, পুঁতি, পুঁথি, পেঁচ, পেঁচা, পেঁজা, পোঁ, পোঁচ, পোঁতা, ফাঁক, ফাঁকা, ফাঁকি, ফাঁড়া, ফাঁড়ি, ফাঁদ, ফাঁপা, ফাঁসি, ফুঁ, ফুঁক, ফোঁটা, ফোঁড়, ফোঁড়া, ফেঁকড়া, ফ্যাঁকড়া, ফোঁপড়, ফোঁপান, ফোঁস, বাঁ, বাঁক, বাঁকা, বাঁদর, বাঁধ, বাঁধন, বাঁধা, বাঁশ, বাঁশি, বাঁশরি, বিঁধা, বিঁধানো, বুঁদ, বাঁকা, বাঁদি, বাঁকা,বঁধু, বাঁটা, বাঁজা, বাঁট, বেঁটে, বোঁচকা, বোঁচা, ভাঁজ, ভাঁওতা, ভাঁড়, ভাঁড়ার, ভুঁড়ি, ভোঁদড়, ভোঁতা, রাঁধা, রাঁধুনি, শাঁস, শাঁখা, শুঁড়, শুঁটকি, শুঁড়ি, শুঁয়াপোকা, শোঁকা, সাঁওতাল, সাঁকো, সাঁঝ, সাঁড়াশি, সাঁতার, সিঁড়ি, সিঁদুর, সুঁই, সেঁউতি, সেঁজুতি, হাঁক, হাঁচি, হাঁটু, হাঁড়ি, হাঁপ, হাঁফ, হাঁস, হাঁসুলি, হিঁচড়ানো, হ্যাঁচড়ানো, হুঁশ, হেঁট, হেঁয়ালি, হেঁশেল, হোঁচট, হোঁতকা, হোঁদল।
 
লেখক: সাংবাদিক, বিশ্লেষক

ব্রেকিংনিউজ/জিসা