শিরোনাম:

রৌদ্রজলের কাল: কবি ও কবিতার সঙ্গম

নাজমুল আহসান
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ০৯:৩৮
অ-অ+
রৌদ্রজলের কাল: কবি ও কবিতার সঙ্গম

‘শূন্যতা নিয়ে কবিই একমাত্র চলে…
কবিই একমাত্র সর্বপ্রজ্ঞা’
(শূন্যতার ফায়সালা)

অত্র কবিতায় কবি বিষয়ে কবির নিমগ্নতা ও মূল্যায়ন প্রকাশ পেয়েছে প্রাজ্ঞিক সুরে।
‘তেরপল ঢাকা ছাউনির নিচে
দাঁড়িয়ে জমাই কবির আড্ডা’
                           (সাবওয়ে ইস্টিশন)

ছাউনি বলতে যদি কবিতা বুঝি তবে বলতে হয়— তেরপল ঢাকা কবিতার নিচে দাঁড়িয়ে জমাই কবির আড্ডা। বলছিলাম কবি অয়ন আহমেদ-এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্রজলের কাল’থেকে।
 
কবিতা বিষয়ে কবি কি বলছেন দেখে নেয় যাক—
‘পাথর থেকে পাথরে বাড়ি খেয়ে
জোড়া পাতের লাইন ধরে
কবিতার শব্দ ছুটে যায়’
                     (সাবওয়ে ইস্টিশন)
 
কবিতাকে কবি এখানে রেল গাড়ির সাথে তুলনা করছেন বোধকরি। পাথর বলতে জাগতিক কাঠিন্যের দিকেই কবির ইঙ্গিত।
‘আমি বৃদ্ধ বলে নিখুঁত কুমারির গন্ধ পাই
শব্দ ভিজে আসার আগে তার দেখা পাবো’
                        (সাবওয়ে ইস্টিশন)
 
কবিতাকে কবি নিখুঁত কুমারির সাথে তুলনা করছেন। শব্দ ভিজে আসার আগে কুমারি কবিতার দেখা পাবার প্রত্যাশা ব্যক্ত করছে একান্ত শিশুর মতো।
‘বৃদ্ধ বলে আমি অনুভূতি-সচেতন
কুমারিকে ভালোবাসবো শিশুর মতন এবং
                           —আমি কাঁদবো’
 
বৃদ্ধরা অনুভূতি সচেতন হন। বার্ধক্যে তারা কুমার জীবনের স্মৃতিচারণ করেন প্রচণ্ড উত্তেজনায়। কুমারি কবিতাকে কবি এখানে শিশুর সারল্যে ভালোবেসেছেন ।
 
‘রাতের পর রাত বিবশ হেঁটে
পৌছেছি শ্বেত বাড়িটির কার্নিশের
                 নিমগ্নতার নিচে’
                     (চিঠি-ভরা জল)
 
শ্বেতবাড়ি বলতে কবিতার রাজকুমার কি কবিতাকেই ইঙ্গিত করছেন! রাতের পর রাত বিবশ হেঁটে ক্লান্ত কবি কবিতার কাছেই খুঁজছেন একপ্রস্থ সুখ ।
‘মেঘের কাছ থেকে ধার নিয়েছি মেঘের আবেগ
তারপর চিঠি-ভরা জল বসন্তের বান কাঁদে’
                           (চিঠি ভরা জল )
কবিতাকে কবি এখানে চিঠি বলছেন, যার ভরা জলে বসন্তের বান কাঁদে ।
 
কবি ও কবিতার দীর্ঘ সঙ্গম শেষে এবার আমরা কবির নিবিড় চেতনায় মনোযোগ দিবো—
অনাদি আদম আমি
     অনাবিল কলম দিয়ে
গেলমানের কাচের স্তনে কবিতা আঁকবো ।
                     (মহা কবিতার প্রতিক্ষা)
 
অত্র কবিতার অংশ বিশেষে মিথের আশ্রয়ে কবি হুরপরির স্তনে সেই কবিতাই আঁকতে চেয়েছেন যে কবিতা তার ধ্যানলয়ের একমাত্র দ্রষ্টা ।
 
রৌদ্রজলের কালে কবির মিথের ব্যবহার লক্ষনীয়—
হায়,
ঈশ্বর কী বিরাট ব্যক্তিগত!
মানুষের বেদনার সবখানি অনুমান
             (বেদনার সবখানি)
 
‘হেপাস্টাসের জবানিতে প্রমিথিউসকে শৃঙ্খলিত করবার
মতো করে বাজে তার জেওর জড়াবার’
         (হাওয়ার সৃষ্টির বেদনার আগে)
 
‘মুসার মতো স্বরে,অবুঝ আর কৈফিয়তের
সুরে বলেছি: তোমাকে মাংস খেতেই হবে ।’
           (আত্মহত্যার প্রতি পক্ষপাত)
 
‘ভেনিসিয় কাচের মতো দেহে—
দূরে বিঁধে আছে উৎসব’
       (শাইলকের ভেনিস)
 
উপমা, অলংকার আর চিত্র কল্পের একটি অভয়ারণ্য ‘রৌদ্রজলের কাল’—
 
‘সকালে ঘুম থেকে উঠে জমিনের উপর
সোনালি সূর্যের নকশাগোলা রেণুর
সঞ্জাত-আল্পনার সোনারঙ ঢুকে
গেলে বুকে জীবনকে মনে হয় বড় আয়েশের
ঠাণ্ডা জলের রঙিন ধারা ।’
     (আমার গর্ভের শিশুটি একদিন থাকবে না )
 
‘স্মৃতির সড়কেরা সুনন্দা
শুয়ে আছে পার্বত শব ।’
       ____________
‘সড়ক থেকে সড়কে পৌঁছে
নেমেছিলো পার্বত্য অন্ধকার ।’
        (শুয়ে আছে সুনন্দা)
 
‘ফুল শয্যার রাতে তার মাথার ‘পরে
অনেক রঙের তুষার আমি ছড়িয়েছিলাম
কিভাবে যেন একটু মেঘের গুঁড়ো গড়িয়ে গিয়ে
তার গড়নটাকে মেঘরঙে গড়িয়েছিল ।’
                   (মেঘকন্যা)
 
এমনি যেন চেয়ারটাতে
পৃষ্ঠাজুড়ে উল্টে আছে
পেতল রঙের দাপনা মেলে
কাজযুবতীর নগ্নদেহ__
    (কাজযুবতী)
 
‘দুঃখগুলো চলবৎ জোয়ারের মতো
সুখগুলো স্থবির ভাঁড়ের জল।’
            ____________
‘জীবন-মৃত্যু প্রেমিক-প্রেমিকার মতো:
এগিয়ে আসে একজনই প্রথম ’
          (মায়ার সব)।
 
ব্রেকিংনিউজ/ আরএস