শিরোনাম:

গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছে পান

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, রাজশাহী
প্রকাশিত : শনিবার, ১৩ জানুয়ারী ২০১৮, ০৭:৪৮
অ-অ+
গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছে পান
ছবি: ব্রেকিংনিউজ

পানের পাতাই যেন সোনা। গ্রামীণ অর্থনীতিতে পান অতি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। দেশের প্রায় সব জেলাতেই কমবেশি চাষ হয়। রাজশাহীর সুস্বাদু পানের কদর সবসময়ই বেশি। আর গবেষণাভিত্তিক পান চাষে প্রতি বিঘায় আড়াই  লাখ টাকা আয় সম্ভব বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
 
তবে চাষিদের পান গবেষণাগারের দাবির বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। যার প্রেক্ষিতে কাণ্ড পচা ও পাতা মরা রোগে চাষিদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।
 
বর্তমানে রাজশাহীর পানচাষিদের পোয়া ভারি। এক পোয়া বড় পানের দাম ৩ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। মধ্যম পান প্রতি পোয়া ১৬শ’ থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
 
জানা গেছে, পারিবারিক চাহিদার সূত্র ধরে কৃষক পরিবারে প্রবেশ করে পান চাষ। শতবর্ষ আগে পান সৌখিন কৃষি পণ্য হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় আনা হয়। কখন থেকে পানকে অর্থনৈতিক বিবেচনায় আনা হয়েছে তা বলা কঠিন, তবে শতবছর আগে থেকে বাংলাদেশের পান মধ্যপ্রাচ্যের বাজার দখল করেছিল। এক সময় বাংলাদেশের সাচি পানের উপর নির্ভর করে পশ্চিম পাকিস্তানে একাধিক ওষুধ তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছিল বলে জানা যায়।
 
এখনও বিশ্বের অনেক দেশে বাংলাদেশের পানের যথেষ্ট কদর রয়েছে। তবে গবেষণার অভাবে রপ্তানীযোগ্য পান উৎপাদনে ব্যর্থ হচ্ছে চাষি। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, গত দু’দশক ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার পান বরজে রোগ ও পোকার আক্রমন দেখা দিয়েছে। রোগ-বালাই’র আক্রমন থেকে পান বরজ রক্ষা করতে না পেরে সর্বশান্ত হয়েছে অনেক চাষি।
 
তারা বলছেন,  দেশের অনেক অর্থকরি ফসলের চেয়েও অনেকাংশে লাভজনক পান চাষ। কিন্তু সনাতন চাষপদ্ধতি ও নানারোগে গাছ-পাতার পচন এ সম্ভাবনার লাগাম টেনে রেখেছে। তাই যথাযথ গবেষণা ও উদ্যোগ নিলে বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে রাজশাহীর পান।
 
পান গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি তুলে তারা আরো বলছেন, রাজশাহীর ২৪ থেকে ২৫  হাজারের অধিক পান বরজ রয়েছে। সেখানে জড়িত লাখ চাষির জীবন-জীবিকা পাল্টে দিতে পারে যথাযথ গবেষণায়। যুক্তরাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে এখানকার পানের চালান যাচ্ছে।
 
নাম না প্রকাশ করা শর্তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের এগ্রোনমী অ্যান্ড এগ্রিকালচার এক্সটেনসন বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপক বলেন, ‘বাস্তবতার নিরিখে দেখা যায় পানের পাতাই সোনা। সনাতন নিয়ম ছেড়ে আধুনিক জ্ঞানের আলোয় গবেষণাভিত্তিক পান চাষ করে বিঘায় ২/৩ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। কিন্তু পুরাতন পদ্ধতিতে পান চাষ করার কারণে চাষিদের ভাগ্যের ওপরে নির্ভর করে। কোন কোন সময় আবাদ ভাল হয়। আবার কখনো খারাপ। তাই অঞ্চলে পান গবেষণা কেন্দ্র একান্ত প্রয়োজন।
 
রাজশাহীতে যুগ যুগ থেকে বংশানুক্রমে পান চাষ হয়ে আসছে। দেশে বিদেশে রাজশাহীর সুস্বাদু পানের জুড়ি নেই। এর কদর দিন দিন বাড়ছে। তাই নতুন কৃষকদেরও পান চাষে আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু পান চাষিদের প্রাণের দাবি ‘পান গবেষণা কেন্দ্র’ আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই একদিকে পানের গাছে মড়ক লাগলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পান চাষিরা, অপরদিকে এই সুযোগে দেশের কীটনাশক কোম্পানিগুলো চাষির অজ্ঞতাকে পুঁজি করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর পান চাষিদের দাবি অনুযায়ী, একটি পান গবেষণাগার স্থাপনের জন্য কৃষি বিভাগও সিদ্ধান্ত নিলেও গত ১৪ বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
 
মূলত ২০০০ সালের পর থেকে মিষ্টি সুস্বাদু পানের জন্য খ্যাত পবা-মোহনপুরে-বাগমারা উপজেলায় পানের বরজে দেখা দেয় গোড়া পচা, শিকড় পচা ও পাতা ঝরা রোগ। এই তিন রোগের কারণে পান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন স্থানীয় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা। রোগ এখনো অব্যহতভাবেই ছড়াচ্ছে। ফলে লোকসান চাষিদের ভাবিয়ে তুলেছে।
 
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে- জেলার পবা, মোহনপুর, বাগমারা, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, চারঘাট এই ছয়টি উপজেলায় এবার ১ হাজার ৮২১ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে (এর কমবেশী হতে পারে)। পান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯৫৪ মেট্রিক টন। বর্তমান বাজার মূল্যে যার গড় দাম প্রায় ৯০ থেকে একশো’ কোটি টাকা। এছাড়া রাজশাহীতে ২৫ হাজারের অধিক পান বরজ আছে। আর এই আবাদের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছে প্রায় এক লাখ পান চাষির জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যত।
 
পান চাষি মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি গ্রামের পান চাষি আলহাজ নাজিম উদ্দিন বলেন, মোড়কের কারণে অনেকবার বরজ ভেঙ্গেছি এবং গড়েছি। গত দুই বছর আগে একটি বরজে মোড়কে আমার প্রায় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর পরেও আবারো পান বরজ গড়েছি। পান ভাল হয়েছে। বর্তমান বাজারে অনেক টাকা দাম লাগবে। কিন্তু মোড়ক লাগলে আর কিছুই করার থাকে না। মোড়ক ধরলে সপ্তাহের মধ্যেই বরজের পান পচে শেষ হয়ে যায়। চাষিদেও অনেকদিনের দাবি পান গবেষণা কেন্দ্র এখনো হয়নি।
 
পান সম্পর্কে মোহনপুরের মৌগাছি উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃষি শিক্ষক নূরুল বলেন, পান চাষ একটি শিল্পও বটে। একটি শিল্প যেমন প্রতিদিন তার পণ্য উৎপাদন করে, তেমনি পান গাছও প্রতিদিন তার পান পাতা বৃদ্ধি করে। আর রাজশাহীর পান এখন দেশের সীমা ছেড়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।
 
তিনি বলেন, এ জেলার পান যাচ্ছে বৃটেন ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে। অথচ এই রফতানিযোগ্য পানের জন্য রাজশাহীতে কোন গবেষণাগার নেই। তাই সরকারের কাছে পান চাষিদের এখন প্রাণের দাবি হচ্ছে, রাজশাহীতে একটি পান গবেষণাগার স্থাপন। তাহলে এই অঞ্চলে পান চাষে বিপ্লব ঘটতে পারে।
 
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) দেব দুলাল ঢালী পানের রোগ-বালাই এবং একটি গবেষণাগার স্থাপন প্রশ্নে বলেন, এ ব্যাপারে কৃষকদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে। পানের রোগ-বালাই সম্পর্কে কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
 
তিনি আরও জানান, জীব মানেই পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে রোগ বালায়ও আক্রমন করে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক যত্ন নিলে আশানুরুপ ফল পাবেন চাষিরা। এখনো গবেষণাগার স্থাপনের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলেও জানান তিনি।
 
ব্রেকিংনিউজ/ এমএইচ