শিরোনাম:

ধ্বংসের মুখে সাগরদিঘির সৌন্দর্য

খাদেমুল মামুন, উপজেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : শনিবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৫:০৮
অ-অ+
ধ্বংসের মুখে সাগরদিঘির সৌন্দর্য
ছবি: ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি

টাঙ্গাইল (ঘাটাইল): ঘাটাইলের ঐতিহ্যবাহী এবং পর্যটন সম্ভাবনাময় সাগরদিঘির সৌন্দর্য এখন ধ্বংসের মুখে। অবৈধ দখল, মাছ চাষ, পুকুরের দুই পাড়ে পল্ট্রিফার্মসহ নানা অনিয়মের কারণে জৌলস হারাচ্ছে সাগরদিঘি।

এক সময় এই দিঘীর যৌবনের আলোক ছটায় মুগ্ধ হতো প্রকৃতি প্রেমিক দর্শনার্থীরা। দিঘির পাড় ঘেঁষে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে ছিল সবুজের সমারোহ। দিঘির স্বচ্ছ পানির ঢেউয়ের শব্দ আর সবুজের নান্দনিক পরিবেশে বিষন্ন মনেও দোলা লেগে যেতো। গ্রীষ্মের খাঁ খাঁ রোদ্দুরে অচেনা পথিকের শরীর ও তৃষ্ণা দুই-ই মেটাতো এই দিঘি। তাছাড়াও এ দিঘিকে ঘিরে রয়েছে নানা রুপকথা আর গল্পকাহিনি।
 
জনশ্রুতি আছে, বহুকাল আগে পালরাজাদের শাসনামলে এ এলাকাটি ছিল ঘন বন জঙ্গলে ভরা। বন্যপ্রাণী আর জীববৈচিত্রের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল এলাকাটি। জঙ্গলের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠে মানুষের বসবাস। তবে পানির তীব্র সংকট ছিল এলাকাটিতে। পাল রাজাদের অধীনস্থ এখানকার শাসনকর্তা সাগর রাজা তার প্রজাদের সুপেয় পানির জন্য ৩৬ একর জমিতে দুই হাজার শ্রমিক আর ২ বছর সময় নিয়ে দিঘিটি খনন করেন।

প্রকৃতির খেয়ালে দিঘির গভীরতা পর্যাপ্ত থাকার পরও রহস্যজনক ভাবে দিঘির পানির কোন অস্তিত্ব খোঁজে পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে সাগর রাজা ভীষণ চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। কোন এক রাতে সাগর রাজা আদিষ্ট হন তিনি যদি তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে দীঘিতে নামায় তাহলে দিঘিতে পানি উঠবে। রাজাও তাই চায়। কাজেই যেই চিন্তা সেই কাজ। রানীকে আদেশ দেয়া হলো দিঘীতে নামার জন্য। রানীও প্রজাদের সুখের কথা চিন্তা করে দিঘিতে নামার প্রয়াস ব্যক্ত করেন। দিনক্ষণ ঠিক করা হলো। নির্দিষ্ট দিনে কৌতুহলি জনতা দিঘির চারপাশে ভিড় জমায় সাগর রাজার বিষ্ময়কর সিদ্ধান্তের বাস্তব দৃশ্য দেখার জন্য। 

এরপর রানী দিঘিতে নামলেন। কিছুদূর যেতেই দিঘিতে পানি উঠতে শুরু করে। দেখতে দেখতে রানীর সমস্ত শরীর ডুবে যেতে লাগলো। সবাই হইহুললুর শুরু করে দিল। রানীকে উদ্ধার করার সকল প্রকার চেষ্টা করেছিল রাজা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। রানীর সমস্ত শরীর পানিতে ডুবে গেল। প্রজাদের সুখের জন্য রানীর জীবন জলাঞ্জলীতে পূর্ণতা পেল সাগর রাজার দিঘি। কানায় কানায় পানিতে ভরে উঠল। সাগর রাজার নামেই দিঘিটির নামকরণ হল সাগরদিঘি।

সনাতন ধর্মাবলম্বি লোকেরা বিশ্বাস করেন যে এখনো রানীর আত্মা রাতের আধারে ঘুরেবেড়ায় দিঘির পাড়ে। তাই তারা রানীর আত্মাকে শান্ত রাখতে বিভিন্ন পূজা অর্চনা করে থাকে।

ঘাটাইল উপজেলা সদর থেকে ৩০ কি.মি. পূর্বে এই দিঘির অবস্থান। পাড় সহ মোট ৩৬ একর জমিতে দিঘিটি খনন করা হয়েছে। দিঘির পশ্চিম পাড়ের অর্ধেক জমিতে এলজিইডি’র  অস্থায়ী অফিস, বাকি অর্ধেক জমিতে গড়ে উঠেছে পল্ট্রিফার্ম, পূর্বপাড়ে সাগরদিঘি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র। উত্তর পাড়ে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং দক্ষিণ পাড়ে দাখিল মাদরাসা। দক্ষিণ-পূর্ব পাশে গড়ে উঠেছে আরেকটি পল্ট্রি ফার্ম।
  
স্থানীয় প্রভাবশালীরা সরকারের কাছ থেকে দিঘিটি পাট্টা (ইজারা) নিয়ে প্রতিবছর মাছ চাষ করে। মাছ চাষ করার জন্য মাছের খাদ্য, পল্ট্রির বিষ্ঠাসহ বিভিন্ন কেমিকেল ব্যবহার করা হয়। যার কারণে দিঘির প্রাণ ক্রমান্বয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। ভরে যাচ্ছে দিঘির তলদেশ। দুই পাড়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যেখানে উপভোগ করবে বিশুদ্ধ বাতাস আর প্রশান্তির নিঃশাস, সেখানে তাদেরকে নাক বন্ধকরে চলতে হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রকৃতি প্রেমীরা দিঘির সুনাম শুনে ঘুরতে আসে। ফিরে যায় অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা নিয়ে।

ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন আবুল কাশেম ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই সাগরদিঘিকে পর্যটন কেন্দ্র করার জন্য পর্যটন মন্ত্রণালয়ে আবেদন পত্র জমা দিয়েছি। আবেদন মঞ্জুরও হয়েছে। পর্যায়ক্রমে কাজ হচ্ছে। তবে এই সৌন্দর্যকে ধরে রাখতে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও সচেতন হতে হবে।

ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি/ এমএইচ