শিরোনাম:

আজো কাঁদে উপকূলবাসী

এস আই মুকুল, জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : রবিবার, ০৮ অক্টোবর ২০১৭, ০৩:০৪
অ-অ+
আজো কাঁদে উপকূলবাসী
ছবি: ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি

ভোলা: বাংলাদেশের এক-দশমাংশ এলাকা উপকূল। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে গড়ে ৭৪৩ জন মানুষ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০ বছরে অন্তত ৬৪ বার মনে রাখার মতো বড় ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হেনেছে। ফলে ভোলার উপকূলের জনগণকে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক প্রতিকূল পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। পানির স্তর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে মৌসুমী ঝড়ের হারও বেড়েছে। 

আবহাওয়া অধিদফতরের একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৯১ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরে ২০টি নিম্নচাপ হয়েছে। এ সকল নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় হয়েছে ১২টি। অথচ এরপরের ১০ বছরে বঙ্গোপসাগরে ৩৯টি নিম্নচাপ হয়েছে। আর এ থেকে ঘূর্ণিঝড় হয়েছে ছয়টি। এর মধ্যে ২০০৯ সাল ছিল সবচেয়ে দুর্যোগপূর্ণ বছর। ওই বছর বঙ্গোপসাগরে নয়টি নিন্ম চাপ সৃষ্টি হয়, যার মধ্যে থেকে দু’টি প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলা সৃষ্টি হয়েছে। এ দু’টি ঘূর্ণিঝড় উপকূলের জনজীবন বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। যে ক্ষতি আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি উপকূলবাসী।

১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে “ভোলা সাইক্লোন” নামে খ্যাত ঘূর্ণিঝড়। এ পর্যন্ত রেকর্ডকৃত ঘূর্ণিঝড়সমূহের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ এবং সর্বকালের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি। এ ঝড়ের কারণে প্রায় ৫ লাখ ব্যক্তি প্রাণ হারায়। যার অধিকাংশই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের সমুদ্র সমতলের ভূমিতে জলোচ্ছ্বাসে ডুবে মারা যান। এটি সিম্পসন স্কেলে “ক্যাটাগরি ৩” মাত্রার ঘূর্ণিঝড় ছিল। ঘূর্ণিঝড়টি ৮ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয় এবং ক্রমশ শক্তিশালী হতে হতে এটি উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। 



১১ নভেম্বর এর গতিবেগ সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটারে (১১৫ মাইল) পৌঁছায় এবং সে রাতেই উপকূলে আঘাত হানে। জলোচ্ছ্বাসের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপসমূহ প্লাবিত হয়। এতে ওইসব এলাকার ঘর-বাড়ি, গ্রাম ও শস্য পানির স্রোতে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ছিল ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা। সেখানে ১ লক্ষ ৬৭ হাজার অধিবাসীর মধ্যে ৭৭ হাজার জনই প্রাণ হারায়।

২০০৯ সালের ২৫ মে “ঘূর্নিঝড় আইলা” ভোলার উপকূলে আঘাত হানে। এতে মুহূর্তের মধ্যে ভোলা সদর, মনপুরা ও চরফ্যাসন উপজেলায় ৩০ হাজার ঘড়-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। সেখানকার ৪৫গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়। জলোচ্ছ্বাস হয় ৬/৭ফুট উচ্চতায়। পানিতে ভেসে যায় কয়েক’শ মাছের ঘের। বিনষ্ট হয় হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি। ঝড়ে প্রাণ হারায় ১৮জন। বেড়ি বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় বিস্তীর্ন জনপদ ও ঘর বাড়ি।

ঢালচর ইউনিয়নের স্বজনহারা মজিবল মিয়া জানান, “ওই ঝড়ের সময় আমরা কেউ ঝড়ের পূর্বভাস পাইনি। যার ফলে এখানে ক্ষয়-ক্ষতি বেশি হয়েছে। ঝড়টি মুহূর্তের মধ্যেই সব উপড়ে ফেলে। জেলেদের কয়েক’শ নৌকা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।”

চর পালিতার ঘর-বাড়িহারা বিলকিছ বেগম বলেন, “বইন্যায় সব তলায়া লইয়া গেছে, তিন দিন দইর‌্যা না খাইয়্যা আছিলাম। কোলের পোলাডারে (ছেলে) বনরুডি (পাউরুটি) খাবাইয়্যা বাচাঁইয়া রাইখছি। এমন বইন্যার কথা কি ভূইলা যাইতে পারি?”

সেদিনের ভয়াবহ কথাগুলো বলতে গিয়ে চরফ্যাসন উপজেলার কুকরী-মুকরী ইউনিয়নের মতলব মাঝি (৪২) জানান, “দুদিন দইর‌্যা না খাইয়্যা আছিলাম। ঘরবাড়ি সব ডুইব্যা আছিলো। পোলাইন ছালাইন নিয়া বেড়িরপাড়ে (বেড়িবাধঁ) খাইয়্যা না খাইয়্যা দিন পার করছি।” 

ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি/ এমএইচ