শিরোনাম:

স্ট্রোক প্রতিরোধে আপনার করণীয়

মেডিকেল করেসপন্ডেন্ট,
ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি
প্রকাশিত : রবিবার, ২৯ অক্টোবর ২০১৭, ১১:০১
অ-অ+
স্ট্রোক প্রতিরোধে আপনার করণীয়

ঢাকা: প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় স্ট্রোক দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘স্ট্রোক প্রতিরোধে আপনার করণীয়’।   ঢাকা মেডিকেল কলেজ  হাসপাতালের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, যে  গত এক  মাসে ৭০জন স্ট্রোক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তবে গরমকালে এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি।  

এ বিষয়ে ঢামেকের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ কারুল হাসান সর্দার  বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রচলিত ধারণা হলো- স্ট্রোক একটি হৃৎপিণ্ডের রোগ। বাস্তবে তা কিন্তু নয়। স্ট্রোক আসলে মস্তিষ্কের রোগ। মস্তিষ্কের রক্তবাহী নালির দুর্ঘটনাই স্ট্রোক নামে পরিচিত। এ দুর্ঘটনায় রক্তনালি বন্ধ হতে পারে। আবার ফেটেও যেতে পারে। ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। স্ট্রোক সম্পূর্ণই মস্তিষ্কের রক্তনালির জটিলতাজনিত একটি রোগ। এ রোগে আক্রান্তের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবেই এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের দেশে এখন ১৫ থেকে ২০ লাখ স্ট্রোকের রোগী রয়েছে। প্রতিহাজারে গড়ে ৩ থেকে ৫ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন। সাধারণত পঞ্চাশোর্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার বেশি লক্ষ্য করা গেলেও যে কোনো বয়সেই তা হতে পারে। ৫০ বছর বয়সের পর প্রতি ১০ বছরে স্ট্রোকের ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। নারীদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার কম। ফাস্টফুডে আসক্তদের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। শিশু ও তরুণদের অনেকে খাদ্যাভ্যাসের কারণে স্ট্রোক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।


স্ট্রোক হওয়ার কারণ : অনেক কারণেই স্ট্রোক হয়। যেমন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় কারণ। ধূমপান, তামাক পাতা, জর্দা, মাদক সেবন, অতিরিক্ত টেনশন, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, রক্তে বেশিমাত্রায় চর্বি, অলস জীবনযাপন, স্থুলতা বা অতিরিক্ত মোটা হওয়া, অতিরিক্ত মাত্রায় কোমল পানীয় গ্রহণ, কিছু কিছু ওষুধ যা রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যেমন-অ্যাসপিরিন, ক্লপিডগ্রেল ইত্যাদি ব্যবহারে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে। ঘুমের সময় নাক ডাকা, ঘুমের সময় শ্বাসকষ্টজনিত উপসর্গ ছাড়াও স্ট্রোক করার কারণগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে যে কোনো ধরনের প্রদাহ অথবা ইনফেকশন ও জন্মগতভাবে ব্রেইন বা মস্তিষ্কে সরু রক্তনালি থাকা। অনেক সময় বংশানুক্রমে কিংবা আগের স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও দূরবর্তী রক্তনালি বন্ধ হওয়ার কারণে স্ট্রোক হতে পারে।

লক্ষণ : শরীরের কোথাও বা একাংশ অবশ ভাব লাগা কিংবা দুর্বলবোধ করা। কথা বলার সমস্যা অর্থাৎ কিছুক্ষণের জন্য কথা জড়িয়ে যাওয়া, অস্পষ্ট হওয়া ও একেবারে কথা বলতে বা বুঝতে না পারা।

এক চোখ বা দুচোখেই ক্ষণস্থায়ী ঝাপসা দেখা বা একেবারেই না দেখা। মাথা ঝিমঝিম করা, মাথা ঘোরা, দৃষ্টি ঘোলা লাগা, হঠাৎ করে কিছুক্ষণের জন্য হতবিহ্বল হয়ে পড়া, বমি বমি বোধ বা বমি করা। পায়ে দুর্বলবোধ করা।

উপসর্গ : স্ট্রোকের মারাত্মক উপসর্গ হচ্ছে অজ্ঞান হওয়া, খিঁচুনি, তীব্র মাথাব্যাথা ও বমি।

চিকিৎসা : স্ট্রোক হয়ে গেলে চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। যদি খেতে না পারেন, তবে নাকে নল দিয়ে খাবার ব্যবস্থা করা হয়। প্রস্রাব ও পায়খানা যাতে নিয়মিত হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে প্রস্রাবের রাস্তায় ক্যাথেটার দিতে হবে। চোখ, মুখ ও ত্বকের যত্ন নিতে হবে। বেডসোর প্রতিরোধ করার জন্য নিয়মিত পাশ ফেরাতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি অনেক স্ট্রোক রোগীর হার্টের রোগ থাকে। এসব ক্ষেত্রে কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শের প্রয়োজন হয়। অন্যান্য চিকিৎসা স্ট্রোকের ধরন অনুযায়ী করা হয়। যেমন- ইশকেমিক স্ট্রোকের বেলায় অ্যাসপিরিন, ক্লোপিডগ্রিল জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। রক্তক্ষরণের কারণে স্ট্রোক হলে অপারেশনের প্রয়োজন পড়ে।

সব হাসপাতালেই থাকা উচিত একটি স্ট্রোক কেয়ার ইউনিট, যেখানে ডাক্তার, নার্স, থেরাপিস্ট এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সমম্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে স্ট্রোক রোগীর চিকিৎসা দেবেন। একজন স্ট্রোক রোগীর প্রয়োজন হয় নিউরোলজিস্ট এবং নিউরো সার্জনের। অনেক স্ট্রোক রোগীর অপারেশন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

অনেক রোগীর শ্বাসকষ্ট, বেডসোর ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। তার রেসপিরেটরি মেডিসিন স্পেশালিস্ট, প্লাস্টিক সার্জনসহ সবার সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। রোগীর অঙ্গ সঞ্চালন করে জড়তা কাটিয়ে তুলতে রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসনের জন্য ফিজিওথেরাপিস্ট প্রয়োজন হয়। রোগী কথা বলতে না পারলে প্রয়োজন স্পিচ থেরাপিস্টের। স্ট্রোক কেয়ার ইউনিট, সমন্বিত স্ট্রোক কেয়ার টিমের ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসায় আসবে সুফল, রোগী ও রোগীর স্বজন হবে চিন্তামুক্ত, রোগী লাভ করবে আরোগ্য।  চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধ করা সম্ভব। 

প্রতিরোধ সম্ভব : স্ট্রোক মস্তিষ্কের কঠিন রোগ এবং তা প্রতিরোধযোগ্য। ব্রেইনের কোষগুলো একবার নষ্ট হলে পুনরায় পুরোপুরিভাবে কার্যকরী হয় না অথবা জন্মায় না। চিকিৎসার চেয়ে এ রোগ প্রতিরোধ উত্তম। স্ট্রোক হলে অনেক সময় রোগী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে। এ জন্য সুনির্দিষ্ট ও জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলে কিংবা শহরে যে কোনো হাসপাতালে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ধূমপান, মদ্যপান, মাদক দ্রব্য, তামাক পাতা ও জর্দা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। হৃৎপিণ্ডের রোগের চিকিৎসা, রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চর্বি ও শর্করাযুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফাস্টফুড, বাদাম, সন্দেশ-রসগোল্লা, দুধ-ঘি-পোলাও, বিরিয়ানি, পাঙ্গাশ-চিংড়ি-কাঁকড়া, গরু বা খাসির মাংস, নারকেল বা নারকেলযুক্ত খাবার ইত্যাদি কম খাওয়া উচিত। শাকসবজি, অল্প ভাত, পাঙ্গাশ-চিংড়ি-কাঁকড়া বাদে যে কোনো মাছ, বাচ্চা মুরগি ও ডিম খেলে কোনো ক্ষতি হয় না। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। বাড়তি ওজন কমাতে হবে।

 ব্রেকিংনিউজ/এএইচ/এনএআর