শিরোনাম:

মিজানের হত্যার হুমকিতে সাংবাদিকের জিডি নিতে গড়িমসি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১১ জানুয়ারী ২০১৮, ০১:৫০
অ-অ+
মিজানের হত্যার হুমকিতে সাংবাদিকের জিডি নিতে গড়িমসি

পুলিশ সদর দপ্তরে প্রত্যাহার হওয়া ডিএমপির ডিআইজি মিজানুর রহমানের সাংবাদিককে হত্যার পর আত্মহত্যা হুমকি দেয়ার ঘটনায় দৈনিক যুগান্তরের সাংবাদিক নেসারুল হক খোকন জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করতে গেলে ডিএমপির ভাটারা থানা পুলিশ গড়িমসি করছে। লিখিত রেখে যান সিনিয়রা এসে সিদ্ধান্ত নেবে এমনটাই বলছে তারা। 

বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে বাংলাদেশ ক্রাইম এসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সভাপতি আবু সালেহ আকন ব্রেকিংনিউজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, আমরা (সাংবাদিক নেসারুল হক খোকনসহ) ভাটারা থানায় জিডি করতে গিয়েছিলাম এবং তা লিখিত আকারে জমা দিয়েছি। থানা থেকে জানানো হয়েছে সিনিয়রদের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে ভাটারা থানার ডিউটি অফিয়ার উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাসান ব্রেকিংনিউজকে জানান, উনি (সাংবাদিক নেসারুল হক খোকন) লিখিত দিয়েছেন। তবে এখনো খাতায় নথিভুক্ত হয়নি, প্রক্রিয়া চলছে।

ডিএমপির ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও পরিদর্শক (তদন্ত) এবং গুলশান বিভাগের উদ্ধর্তন কর্মকর্তারা মুঠোফোন জানান, মিটিংয়ে রয়েছি- পরে জানাচ্ছি বলে ঘটনা এড়িয়ে যান।

মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) ডিআইজি মিজানের হত্যার হুমকির ভয়েস রেকর্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এসেছে। রয়েছে প্রতিবেদকের কাছেও। এ ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় থেকে গতকাল বুধবার (১০ জানুয়ারি) সাংবাদিক নেসারুল হক খোকন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে  দেখা করেন।

বুধবার (১০ জানুয়ারি) নেসারুল হক খোকন বলেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করে হুমকির বিষয়টি অবগত করলাম। এসময় তিনি প্রভাবশালী ওই পুলিশ কর্মকর্তার হুমকির অডিও রেকর্ডও শুনেছেন। বলেছেন, "খোকন টেনশন করবেন না আমি বিষয়টি দেখছি।"


এদিকে বুধবার (১০ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে এক নারীকে জোর করে বিয়ে ও তার উপর নির্মম নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারের জের ধরে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব) এর সদস্য ও ক্র্যাব বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার নেসারুল হক খোকন এবং যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ তুহিনকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ক্র্যাব।

পাশাপাশি হুমকিদাতা ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার পদ থেকে সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ডিআইজি মিজানুর রহমানের ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে ক্র্যাব সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার আলম ঘটনাকে ন্যাক্কারজনক উল্লেখ করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

তারা বলেছেন, ‘সংবাদ প্রচার-প্রকাশ করায় পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমান মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) রাতে দু’জন পেশাদার সাংবাদিককে ফোন করে গুলি করে হত্যার যে হুমকি দিয়েছেন, তা শুধু অপেশাদার আচরণই নয়- রীতিমতো ক্ষমতার অপব্যবহার, ধৃষ্টতা এবং সীমা লঙ্ঘনের সামিল, বিষয়টি প্রচলিত আইনে ফৌজদারি অপরাধ। এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকরা যে পুলিশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন- এ ঘটনা তার আরেকটি জ্বলন্ত প্রমাণ।’

এছাড়া যে দুই সাংবাদিককে হুমকি দেয়া হয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ডিআইজি মিজানুর রহমানের লাইসেন্সকৃত ব্যক্তিগত পিস্তলটি পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ।

ডিআইজি মিজানের নারী কেলেঙ্কারী ঘটনা পুলিশ পুলিশ সপ্তাহ শুরুর আগে ফাঁসকারী  দৈনিক যুগান্তরের অনুসন্ধান বিভাগে কর্মরত সিনিয়র সাংবাদিক নেসারুল হক খোকন ব্রেকিংনিউজকে জানিয়েছিলেন, ‘এতো বড় অপরাধের খবর তথ্য-প্রমাণসহ গণমাধ্যমে আসার পর পুলিশ সদর দপ্তরে প্রত্যাহার এবং তদন্ত চলাবস্থায় এমন হুমকির ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় মধ্যে পড়েছি। দ্রুত সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করছি।’

এরআগে, নেসারুল হক খোকন মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের নিজের ওয়ালে লেখেন, ‘আমি স্তম্ভিত। চরম নিরাপত্তাহীন। আমাকে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যার হুমকি দিলেন পুলিশ সদর দপ্তরে প্রত্যাহার হওয়া ডিআইজি মিজান। আশা করি সরকার আমার নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করবেন। এভাবে হত্যার হুমকি দেয়ায় আমি পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে বিচার দিলাম।’

রাজধানীর অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আনা জোরপূর্বক বিয়ে ও নির্যাতনের অভিযোগ গণমাধ্যমে আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) বিকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পুলিশ সপ্তাহের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের জানান, ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে পুলিশ সপ্তাহ শেষে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। পুলিশ সপ্তাহ চলছে, বিদায় দু-এক দিন পর আইজিপি-ডিএমপি কমিশনারের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত কাজ শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ডিআইজি মিজানের নৈতিক স্খলনের কথা জানতে পেরেছি। এ বিষয়ে তদন্তের পর জানতে পারব আসলে সে কতটা দোষী। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ভিত্তিতে ডিআইজি মিজানকে ডিএমপি থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ ব্যবস্থা নেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। 

কোনো ব্যক্তির দায় বাহিনী নেবে না উল্লেখ করে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধ করে কেউ পার পাবেন না। এর আগেও পুলিশের বিভিন্ন সদস্যের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ তদন্ত শেষে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় অনেকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধে অনেকেই কারাগারে রয়েছেন।’

সোমবার ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০১৮’ শুরুর আগেই আলোচনায় আসেন ডিআইজি মিজান। তার বিরুদ্ধে তুলে নিয়ে বিয়ে করে প্রতারণার অভিযোগ এনেছেন এক নারী। যদিও মিজান ওই নারীকে প্রতারক বলে দাবি করেছেন।

মিজানের স্ত্রী পরিচয় দেয়া নারী একটি জাতীয় দৈনিককে জানান, পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালের কাছে তার বাসা। সেখান থেকে কৌশলে গত বছরের জুলাই মাসে তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা মিজান। পরে বেইলি রোডের মিজানের বাসায় নিয়ে তিনদিন আটকে রাখা হয়েছিল তাকে। আটকে রাখার পর বগুড়া থেকে তার মা’কে ১৭ জুলাই ডেকে আনা হয় এবং ৫০ লাখ টাকা কাবিননামায় মিজানকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। পরে লালমাটিয়ার একটি ভাড়া বাড়িতে তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে রাখেন ইতোপূর্বে বিবাহিত মিজান।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, কয়েক মাস কোনো সমস্যা না হলেও ফেসবুকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে একটি ছবি তোলার পর ক্ষেপে যান মিজান। বাড়ি ভাঙচুরের একটি ‘মিথ্যা মামলা’য় তাকে গত ১২ ডিসেম্বর কারাগারে পাঠানো হয়। সেই মামলায় জামিন পাওয়ার পর মিথ্যা কাবিননামা তৈরির অভিযোগে আরেকটি মামলায় তাকে আটক দেখানো হয়।

দুটি মামলায় জামিনে বেরিয়ে আসার পর পুলিশ কর্মকর্তা মিজানের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তোলেন ওই নারী।

ব্রেকিংনিউজ/ এমআরএস/ এসএ