শিরোনাম:

​‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা সংকটে জনগণ’

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট,
ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি
প্রকাশিত : শনিবার, ১২ অগাস্ট ২০১৭, ০৬:৪৮
অ-অ+
​‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা সংকটে জনগণ’

ঢাকা: ‘দিনে দিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। জননিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ শনিবার (১২ আগস্ট) ‘আইনের শাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি এর আয়োজন করে।

এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকেরা আইন লঙ্ঘন করলে তাদের বিচার কীভাবে হবে সেটি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আলোচকরা। এসব বিষয় সমাধানে ন্যায়পাল নিয়োগের বিধান কার্যকর করার দাবি তোলা হয় সভা থেকে।

সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে ন্যায়পাল নিয়োগের ক্ষমতা সংসদকে দেয়া হয়েছে। ১৯৭২ সাল থেকে সংবিধানে ন্যায়পালের বিধান রয়েছে। ন্যায়পালের কাজ সম্পর্কে সংবিধানে বলা হয়েছে, ন্যায়পাল মন্ত্রণালয়সহ সকল সরকারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত ও বিচার করবে। 

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন- গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী, আইন ও সালিস কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন, ঢাবির আইন বিভাগের অধ্যাপক সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. আসিফ নজরুল, ঢাবির আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. রেদওয়ানুল হক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মানবাধিকার কর্মী শিরীন হক।

আয়োজক সংগঠনের সদস্য আইন ও সালিস কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, ‘ আলোচনার শিরোনামে স্বজ্ঞানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিবর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলা হয়েছে। কারণ বাহিনীর সঙ্গে রক্ষাকারী শব্দটি আর যায় না।’

তিনি বলেন, ‘সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে অজ্ঞাতপরিচয় লোকজন অপহরণ করে ৩ বছর আগে। অপহরণের পরপরই থানায় মামলা দায়ের করলেও কারা এর পেছনে ছিলো সে সম্পর্কে তদন্তে কিছু জানা যায়নি।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দলীয়করণের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, আইনের শাসন বিঘ্নিত হবার মতো ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা সবাই হতাশায় ভুগছি। একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে এই সমস্যার কিছুটা সমাধান করা যেতে পারে। আর এই বিচারপতিকে কি কিছু করা যায় না ? আমি কিংবা আসিফ নজরুল তো আদালত অবমাননা করি নাই। অবমাননা করছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি খাইরুল হক।’

বেলার নির্বাহী প্রধান রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘টেলিভিশন টক শোতে দেখলাম খুব কথা। যারা অপহৃত হয়ে যাচ্ছেন তারা আর কথা বলেন না। এটা বুঝবার বুদ্ধি নেই আপনাদের? কথা কেমন করে বলবে? যদি একটি অপহরণের ঘটনাই শেষ অপহরণের ঘটনা হতো, তাহলে অবশ্যই যারা অপহৃত হয়েছেন তারা এবং তাদের পরিবার কথা বলতেন। একটি অপহরণের ঘটনা সারতে না সারতেই যদি দেখেন, ৭ জন অপহরণ হয়েছেন, তাও আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে এবং এমন পর্যায় থেকে যাকে আপনি ফেলে দিতে পারবেন না।এটি তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কালচারের ভেতরে ঢুকে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ একটি ‘বিপদে পড়ার কালচারের’ মধ্যে ঢুকে গেছে। মানুষ এখন প্রতিবাদ করতে গেলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিপদে পড়ো না। রিজওয়ানা বলেন, ‘জনগণের অনাস্থা, অবিশ্বাসের জায়গাগুলো শনাক্ত করে, আস্থা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘যেসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতা চরম, অবিশ্বাস চরম, সেখান থেকে মুক্তি পেতে হলে, কোনও আইন বাতিল করতে হলে আমাদের বাতিল করতে হবে। যদি বিডিআরের নাম বদলে যেতে পারে, যে সে মূল্যবোধ নিয়ে ব্যাজ পরতে পারছে না, তাহলে র‌্যাবের ব্যাপারেও আসলে আমাদের চিন্তা করতে হবে।’সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের মতে, ‘নাগরিকরা হারিয়ে গেলে নির্বাচনে জেতা যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্রধারী নাগরিকরা হারিয়ে যায়। কেউ বলতে পারে না। পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনী বলতে পারবে না এটা তো দিনের পর দিন হতে পারে না। এটা কোনও কথা! ন্যূনতম জবাবদিহিটুকু থাকবে না? তারা সমানে গ্রেফতার করতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, কেউ তো বাধা দিচ্ছে না। কিন্তু আমরা হারিয়ে যাব কেন? তাহলে এই পরিচয়পত্র দিয়ে আমাদের লাভটা কি হলো? এটা আমাদের সুরক্ষাকবচ। আর নাগরিকরা হারিয়ে গেলে কি হবে, আগামী নির্বাচনে জেতা যাবে? কোনওভাবেই সম্ভব না। বরং নাগরিকরা যদি থাকতে পারে তাহলেই আগামী নির্বাচনে জেতা সম্ভব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘বিচারপতি খায়রুল হক ত্রয়োদশ সংশোধনীর সংক্ষিপ্ত রায়ের ১৬ মাস পরে নিজের রায় পরিবর্তন করে যে রায় দিয়েছেন, সেটি ছিলো ফৌজদারি অপরাধ।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি যে, কোনও বিচারে এটি একটি প্রতারণা। এটি জাতির সঙ্গে প্রতারণা। এর খেসারত আমাদেরকে কতভাবে দিতে হচ্ছে।’

আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমার যেটি মনে হয়েছে শুধু মানুষ গুম হয়নি। গুম হয়েছে আইনের শাসন, গণতন্ত্র। এমনকি রাষ্ট্রও গুম হওয়ার পথে রয়েছে।’তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম কালো আইন বলেও মন্তব্য করেন নজরুল। তিনি বলেন, ‘এর থেকে কালো আইন বাংলাদেশের ইতিহাসে হয়নি।’

৫৭ ধারা এবং আদালত অবমাননার আইনের প্রয়োগে দেশে যে বৈষম্য হচ্ছে তা নজিরবিহীন দাবি করে তিনি বলেন, ‘এর চেয়ে বৈষম্যমূলক প্রয়োগ আর হতে পারে না। সরকার বা তাদের কারও বিরুদ্ধে কথা বললেই মামলা হয়। অথচ দিনের পর দিন দেখি সরকার পক্ষের লোকজন সবার সম্পর্কে আজেবাজে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনুস, এবিএম মূসা বলেন কাউকে বাদ দেয়নি।’ কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হলে আদালতের গ্রহণ করার ক্ষমতা আছে কি এমন প্রশ্ন করেন তিনি।  
 
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘সম্প্রতি ঢাকা শহর যেমন চিকুনগুনিয়া নামক রোগে আক্রান্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি পুরো বাংলাদেশ যেন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত। আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছেন, তাতে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে রিভিউ করতে পারেন। কিন্তু সব পক্ষ যেভাবে এটার পিছু লেগেছে, একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি ক্ষমার অযোগ্য কাজ করেছেন। ওনার (খায়রুল হক) নিজের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন আছে আর সেগুলো উনি এখন জনগণের সামনে আনছেন। আইন কমিশনে বসে কিছু করতে পারছেন না, এখন তিনি কথা বলা শুরু করেছেন।’

সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘এটি নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি হতে পারে। এই একটি জায়গাই আছে। এটি নষ্ট করবেন না। আমাদের মৌলিক অধিকার নিচে নেমে যাচ্ছে- সেটি নিয়ে আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আগামীকাল ৭ খুন হত্যা মামলার হাইকোর্টের রায়। এটাও তো হতো না। এই ঘটনায় জড়িতদের যার যার স্ব স্ব বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছিলো। হাইকোর্টে মামলা করে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের ব্যবস্থা করতে হলো।’আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেদওয়ানুল হক।

প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ছাড়া আইনের শাসন হবে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের ভূমিকা পালন করতে পারবে না। নির্যাতন, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার এগুলোর কোনও আইনগত ভিত্তি নেই। দীর্ঘদিন যাবত মামলার তদন্ত হয় না, হলেও ধীরগতি, মাইনোরিটিদের নিরাপত্তার কোনও ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে ঘরের ভেতর আলোচনা করলেও অনুমতি নিতে হয়। ৫৭ ধারার মতো আইন এবং এর বৈষম্যমূলক ব্যবহার এবং দ্রুত রেসপন্স এর অভাব। এসব কারণে আইনের শাসন ব্যহত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর  অপরাধে জড়িয়েপড়ার প্রবণতা বেড়েছে। জবাবদিহিতার সাথে আইনের শাসন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের দেশে জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহার যতদিন বন্ধ না হবে ততদিন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না।’

আলোচনা সভার সমন্বয়ক সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘যখন কোনও ব্যক্তি কোনও ব্যক্তিকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে, তারা কোনও আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গ্রেফতার করছে। সে কারণে গ্রেফতারের পরিবর্তে তুলে নিয়ে যাওয়া, উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো বেআইনি শব্দগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে।’ যেহেতু আইনি প্রক্রিয়া না মেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে কোনও আইনগত প্রতিকার আসলে নেই বলে মন্তব্য করেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

আলোচনা সভায় গুম হওয়া সাতক্ষীরার এক পল্লী চিকিৎসকের স্ত্রী জেসমিন নাহার তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামীকে পুলিশ গুম করেছে। আমার স্বামীকে আমি ফিরে পাবো কিনা জানি না। তবে আমি এজন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে আর কোনও পরিবারকে এই ধরনের ঘটনার স্বীকার হতে না হয়।’

ব্রেকিংনিউজ/এজেডখান/এনএআর