শিরোনাম:

ফাগুনের রঙ লাগুক প্রাণে

মিথুন রায়
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ০৪:১৮
অ-অ+
ফাগুনের রঙ লাগুক প্রাণে

‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সুবিখ্যাত এই পঙতি স্মরণের দিন আজ। নগরজীবনে কোথায় আছে এতো ফুল, উতলা বায়ের উন্মাদনা। না থাক! তবুও আজ ফাগুন যে এসেছে ধরায়। এমন দিনে প্রিয়ার খোঁপার চেয়ে উত্তম ফুলদানি আর কি আছে? ফাগুনের এই আগুন ঝরা দিনের আল্পনা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও অত্যন্ত রোমান্টিক মুডে চিত্রায়িত করেছেন। তাঁর বহু কবিতায়, গানে, গল্পে ঘুরে ফিরে এসেছে বসন্ত বন্দনা। ফাগুনের প্রথম প্রহরে তাই তো কবিকণ্ঠ গেয়ে ওঠে- ‘আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,/ এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়,/ সখীর হৃদয় কুসুম-কোমল--/ কার অনাদরে আজি ঝরে যায়।’/

ইট-পাথরের পাষাণ এই নগরীতে আমাদের চোখে প্রকৃতির ছোঁয়া মেলা ভার। চারপাশের ধূলিধূসরতায় তবু এই দ্বীপদেশের মনে লেগেছ আজ ফাগুন হাওয়া। বনের কোকিল কুহুস্বরে গান ধরেছে মনের বনে। প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য পেতে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে মন। কবিতার মতোই মন যেন তার হয়ে উঠে বাঁধনহারা। 

এই সময়ে বইমেলা, বিভিন্ন শিল্প প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র উৎসব, মসলিন উৎসবের মতো অনুষঙ্গগুলো বসন্তকে আরও রঙিন করে তোলে। ষোড়শী বালিকারা মাথায় ফুলের মুকুট পরে দলে দলে বের হয় পথে। ছেলেদের পোশাকেও থাকে কাঁচা রঙের ছোঁয়া। থাকে ঐতিহ্যের পরশ। সঙ্গে আড্ডা, খাওয়াদাওয়া, হইহুল্লোড় তো আছেই। 

ফাগুনের আবহাওয়াও যেন অদ্ভুত এক রূপ নিয়ে প্রকৃতিতে হাজির হয়। কখনো হালকা শীত, রোদ উঠলেই আবার উষ্ণ। তবে শীত বা গরম, কোনোটাই বেশি থাকে না বলে অনেকটাই আরামে কাটে সময়। 

কিন্তু বসন্ত শুধু তরুণ-তরুণীদেরই মাতোয়ারা করে না। মনে যদি থাকে ফাগুন দোলা তবে আশির বৃদ্ধের মনেও লাগে বসন্তের হাওয়া। তার চোখেও বসন্ত হয়ে উঠে রঙিন। আর যুগলদের কথাই শুধু বলি কেন- এই বসন্ত যে চিরপরিচিত জনদেরও ঘরের বাইরে টেনে আনে। পথের পাঁচালির অপু-দূর্গার মতো অনেক ভাই-বোন-বন্ধুও যে এই ফাগুনে অচেনা অজানায় হারিয়ে যেতে চাই দুদণ্ডের তরে। 

পয়লা ফাল্গুনকে ঘিরে রাজধানী ঢাকার মতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা আয়োজনের পসরা সাজানো হয়েছে। অনেক স্থানেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা উৎসব, স্থানীয় বইমেলার আয়োজন হয়েছে। দিনব্যাপী কিংবা কোথাও কোথাও দু-তিন দিনজুড়ে চলছে এসব আনন্দ আয়োজন। 

ফাগুনের প্রথম প্রহরেই অকৃত্রিম প্রকৃতি খুলে দিয়েছে তার দক্ষিণ দুয়ার। বইছে ফাগুন হাওয়া। শ্যামল প্রকৃতির সব গ্লানি যেন মুছে গেছে প্রকৃতির বর্ণিল সাজে। কুয়াশা মোড়ানো হাড় কাঁপানো শীতে চুপসে থাকা প্রকৃতি এই বসন্তের ছোঁয়ায় দু ডানা মেলেছে। গা ঝাড়া দিয়ে পথে পথে হাসছে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্গম। মৃদুমন্দ বাতাসে সেইসব ফুলের ঘ্রাণ জানান দিচ্ছে- প্রকৃতিতে, মানবমনে বসন্ত এসে গেছে। ঋতুর রাজা এসেছে প্রিয়তমা বাসন্তীর খোঁপায় কৃষ্ণচূড়া গুঁজে দিতে। 

তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে এই বসন্ত যেন শুধু উদযাপনে বাঁধা না পড়ে। যেন শুধু রঙিন পোশাকে থেমে না যায়। মানবমনে ফাগুনের এই পরশ হয়ে উঠে যেন নবচেতনার নবতর রূপ। পারস্পরিক প্রতিহিংসা, পরশ্রীকাতরতা, বিদ্বেষ ভুলে মানুষ যেন এই বসন্তেই গাইতে পারে- ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য।’ 

ব্রেকিংনিউজ/এমআর