শিরোনাম:

নীল তিমির ছোবল থেকে মুক্তি কীভাবে?

ইমদাদুল হক
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১০ অক্টোবর ২০১৭, ০৬:০৯
অ-অ+
নীল তিমির ছোবল থেকে মুক্তি কীভাবে?

ব্লু- হোয়েল- নীল তিমি। সাগর নয়; ডিপ ওয়েবের এক ঘাতক গেম। ইতোমধ্যের বিশ্বে অর্ধশত কোমল প্রাণে ছোবল মেরেছে গেমটি। আমাদের টেক-প্রজন্ম আক্রান্ত হবার কথাও শোনা যাচ্ছে আত্মঘাতি এই গেমে। গেমটি খেলে ইতোমধ্যেই ঢাকার এক কিশোরীর আত্মহত্যরা কথা শোনা গেছে। অবশ্য এখন পর্যন্ত তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও ফের আমাদেরকে সতর্ক বার্তা দিচ্ছে- প্রযুক্তির প্রেমের আড়ালে 'গেম আসক্তির' বিষয়টি। কেবল গেম আসক্তিই নয়, ঘাতকক গেমের আবাহনও। কিন্তু বিষয়টি এখনও আতঙ্ক আর ভাইরাল ইস্যুতে আটকে আছে। তবে কেবল ইস্যু নয়, এই মুহূর্তে ওয়েব দুনিয়া ও প্রযুক্তির ব্যবহার বিষয়ে কৈশোরের প্রযুক্তি প্রেম নিয়ে আরও গভীর মনোনিবেশের প্রয়োজন রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো- এই নীল তিমি কিন্তু একটি নয়। এর রূপও কিন্তু সময়ে সময়ে বদলে যাচ্ছে নতুন নতুন ছকে। ছোবল মারছে জীবনের পরতে পরতে। 

তাই কালবিলম্ব না করে, প্রযুক্তি-অন্তর্জালের এই ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় খুঁজতে হবে এখনই। শিশুদের মানসিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক বিকাশে যে অবহেলা মোবাইল-পিসি প্রজন্মের মধ্যে চাপা পড়ে যাচ্ছে সে বিষয়টিও অতি-গুরুত্বের পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। কৈশোরের প্রযুক্তি প্রেম বিষয়ে 'আপডেটেড', 'ট্যালেন্ট' ইত্যাদি মোড়ক নিয়ে আনন্দে গদ-গদ হয়ে খোশ-গল্পের বিষয়ে যেন পরিণত করা না হয়, সেদিকটায় খেয়াল রাখতে হবে। শিশু-কিশোরদের হাতে মোবাইল/ট্যাব তুলে দেয়ার পর তা সে কী কাজে, কীভাবে, কতক্ষণ ব্যবহার করছে সে বিষয়েও খেয়াল রাখা চাই। 

আমার বাচ্চাটি আমার চেয়েও টেকনলোজি বেশি জানে, বোঝে এই গৌরবের আবর্তে খেই না হারিয়ে নিজেকেও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে সম্যক জেনে নেয়াটাও এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের অনেকেই প্রযুক্তিতে বুঁদ হয়ে থাকছেন। অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গেইম ইত্যাদিতে এতোটাই মশগুল যেন অফ-লাইনের সময়টা মোটেই সুখকর থাকচ্ছে না। ভার্চুয়াল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে বাস্তব জীবনের সৌন্দর্যকেই হারিয়ে ফেলছেন। এই অলীক জীবনের মোহ কাটানো এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। 

আমাদের সব অবস্থায় মনে রাখা দরকার, কোনও ভালোলাগা যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তার রূপ খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না। ভয়াল রূপ ধারণ করে। দমকা হাওয়া যেমনটা সাজানো সংসার উড়িয়ে নিয়ে যায়, তেমনি কথায় কথায় সেলিফি, ফেসবুকিং, গেম আসক্তিও। কায়িক শ্রমের অনুপস্থিতি যেমন মানসিক ক্লিবতাকে উস্কে দেয় তেমনি তাকে মৃত্যুকে বাজি ধরতেও পরোয়া করে না। জীবনের জন্য প্রযুক্তি। প্রযুক্তির যুপকাষ্ঠে জীবনের বলিদান নয়। 

তাই কেবল ব্লু হোয়েল নয়, টেক-প্রজন্মকে মাদকাসক্তির মতো প্রযুক্তি আসক্তি থেকে নিরাপদ রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে হ্যামিলিয়নের বাঁশির সুর চিনতে পারা। জোয়ারের পানিতে ঝাপ না দেয়া। এই যেমন ফেসবুকে ‘+917574999093 নম্বরটি কুখ্যাত ব্লু হোয়েল গেইম’ কর্তৃপক্ষের। এতে ফোন কল অথবা রিসিভ করবেন না। এই বার্তাটি আপনার বন্ধুদের জানিয়ে দিন। ‘ব্লু হোয়েলের আঘাত থেকে আপনার পরিবারকে রক্ষা করুন’ বার্তাটি কয়েকদিন ধরে ফেসবুক ওয়াল, মেসেঞ্জার এমনকি এসএমএস হাতে হাতে ঘুরছে। যাচাই না করেই বার্তাটি ব‍্যক্তিগত ওয়াল ও বন্ধুদের ইনবক্স করছেন অনেকেই। নম্বরটিতে ফোনকল করতে, এসএমএস বা তার থেকে আসা ফোন রিসিভ করতেও বারণ করছেন। সঙ্গে এই বার্তাটি অন্য আরও নির্দিষ্ট বা অসংখ্য লোককে ছড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ করছেন। তবে এটি একটি ভুয়া নম্বর এবং এর মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে ব্লু হোয়েল নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো ছাড়া কী বার্তা দিচ্ছি আমরা? একটু ভাবুন। 

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ফেসবুক, মেসেঞ্জার এবং এসএমএসে যেসব বার্তা আসছে সেখানে দেওয়া ফোন নম্বটি ভারতের গুজরাট রাজ‍্যের। এই নম্বরে কেউ নিজ থেকে ফোন করলেও ব্লু হোয়েলের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। প্রথমে ভারতের অনলাইনে একটি চক্র ভুয়া বার্তাটি ছড়িয়েছিলো। যা এখন বাংলাদেশে ছড়াচ্ছে। ব্লু হোয়েল গেইমটির খেলার জন্য কেউ ফোন দেয় না। যে গেমটি খেলতে চায় তাকে নিজ থেকে অ‍্যাপটি ইন্সটল করে নিতে হয়। এরপর ব্লু হোয়েলের অ্যডমিন/প্রশাসক অনুমতি দিলেই কেবল গেমটি খেলা যায়। তাই এই ধরনের বার্তা আসলেই ভিত্তিহীন। 

তারপরও মানুষের এই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির মানুষ অনলাইনে ছড়াচ্ছে ব্লু হোয়েলের ভুয়া অ‍্যাপ। অ‍্যাপগুলো মোবাইলে ইন্সটল করলে মূলত বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয়। অনেক ভুয়া অ‍্যাপ ইন্সটলের ফলে ব‍্যক্তিগত তথ‍্য চুরি হতে পারে। এছাড়া গুগলের প্লে স্টোর বা অ‍্যাপলের অ‍্যাপ স্টোরে ব্লু হোয়েল গেইমের কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমন কি ডার্ক ওয়েব ছাড়া গুগলে খুঁজেও পাওয়া যাবে না আসল ব্লু হোয়েল গেম। কেননা পাবলিকলি উন্মুক্ত নয় গেমটি।

যতটুকু জানা গেছে, বাংলাদেশে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। তবে কেবল খোঁজ খবর নয়, প্রয়োজন এ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা। সবাই মিলে অনলাইনে ছড়িয়ে থাকা এইসব ঘাতক লিংকগুলোকে ব্লকড করা; যেন কৌতুহলবশত এই লিংকের ফাঁদে কেউ না পড়ে। অবশ্য এই ব্লকড সংস্কৃতি খুব একটা কাজে লাগবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিজেদের বোধকে জাগ্রত করতে না পরবো, পারিবারিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হবো। হতাশাকে জয় করতে পারবো। জীবনের আনন্দ-বিনোদনের লাগাম নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারবো।  
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

সংশ্লিষ্ট আরো খবর