শিরোনাম:

বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা

নিভে গেল আশার বাতি!

মজহার হোসেন
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ০২ নভেম্বর ২০১৭, ০৪:৪১
অ-অ+
নিভে গেল আশার বাতি!
ছবি: ওয়েবসাইট

কৃষিপ্রধান নওগাঁ অঞ্চলের মানুষের দিনের শুরুই হয় মাঠের কাজ দিয়ে। ফসলি জমি চষে আবাদ-বুনন কাজে পুরুষের পাশাপাশি এখন নারীদেরও অবাধ অংশগ্রহণ। প্রাথমিক থেকে শুরুম্ন করে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের সরব উপস্থিতিও সেই সকাল থেকে শুরু হয়। উপজেলা পর্যায়ের অফিসগুলোতেও কাজের শুরু সকালেই। সকালের দিকে রুটি-রুজির কাজে ব্যস্ত থাকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কাজেই শারীরিক অসুস্থতায় এরা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারে না। আর যেতে হলে নানা কাজের ব্যাঘাত ঘটিয়ে। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়ে বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়া হয়।

৩৩তম বিসিএসে চাকরি পাওয়া তরুণ চিকিৎসকদের নিয়ে ২০১৫ সালের ২৫ মার্চ জেলার মান্দা উপজেলায় এ কার্যক্রম প্রথম শুরু হয়। এতে সবাই স্বতঃস্ম্ফূর্ত সাড়া দেন। শুরু হয় বিকেলে রোগী দেখার কাজ। প্রথমে শুধু আউটডোর সার্ভিস দেয়া হয়। পরে এ কার্যক্রমে জনগণের ব্যাপক সাড়া দেখে এর সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার অন্যান্য বিষয়- এক্স-রে, প্যাথলজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম যুক্ত হয়। চিকিৎসকদের পাশাপাশি অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীও বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবায় মনোযোগী হন। দিন দিন বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের উপস্থিতির হার অনেক বেড়ে যায়। দুই বছরে জেলার চারটি উপজেলায় রোগী দেখা হয় লক্ষাধিক। কিন্তু কমতে থাকে ডাক্তারের সংখ্যা। কর্মসূচির শুরুতে চিকিৎসকের যে সংখ্যা ছিল, তা এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে। এর পরও কার্যক্রম ম্রিয়মাণ নয়। বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম নারী-শিশু-বৃদ্ধ সবার জন্যই ছিল নিরুপদ্রব ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। সকালে অজস্র রোগীর ভিড়ে আউটডোরে অস্বস্তিকর পরিবেশ হয়। এতে ভোগান্তি বাড়ে রোগীদের। পেরেশান হতে হয় চিকিৎসকদেরও।

মান্দার এ সাফল্যের পর বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু হয় বদলগাছি উপজেলায়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি নিজে উপস্থিত থেকে ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত জেলার পত্মম্নীতলা উপজেলায় এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ২০১৬ সালের ১ অক্টোবর। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহাদেবপুর উপজেলায় সেখানকার সাংসদ ছলিম উদ্দিন তরফদারের সঙ্গে টেলি-কনফারেন্সের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।

সেদিন ছিল ২০১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর। জেলার সিভিল সার্জন হিসেবে সেই দিনটি ছিল আমার শেষ কর্মদিবস। এখন জনমুখি ও অত্যন্ত ফলপ্রসূ কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে গেছে। হৃদয়ে এখন আমার রক্তক্ষরণ। যে স্বপ্ন দেখে আর অদম্য উদ্যোগ নিয়ে এই ব্যতিক্রমী কাজ শুরু করলাম, তার এ কী হাল! চিকিৎসকদের মধ্যেও কেউ কেউ শুরু থেকেই এ কর্মসূচিকে আড়-চোখে দেখেছেন। আমি সব বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে গিয়ে সফলও হয়েছিলাম। আমাকে দৃঢ় ও সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। কী আশা নিয়েই না বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করেছিলাম! কী হওয়ার কথা ছিল আর এখন কী হচ্ছে! দেখার কেউ নেই। কেউ এটিকে নিজের কর্মসূচি বলে ভাবেন না। বলতে দ্বিধা নেই, শুনলে অবাক হতে হয়, কার্যত বৈকালিক আউটডোর সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়া নওগাঁর ওই চার উপজেলায় ডাক্তারদের জেলা স্বাস্থ্য প্রশাসন থেকে বলে দেয়া হয়েছে- ওপর থেকে কেউ ফোনে খোঁজ-খবর নিলে যেন বলা হয়, কার্যক্রম চালু আছে! উল্লেখ করা যেতে পারে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পর নওগাঁর মান্দা উপজেলায় প্রথম বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু হয়। এতে সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ জোগান মান্দা এলাকার সাংসদ বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক।

পরিতাপের বিষয়, নওগাঁ জেলার চারটি উপজেলায় চালু কর্মসূচি বন্ধ হলো কেন? এই 'কেন'র উত্তর- কর্মসূচির প্রতি অনাগ্রহ, উদাসীনতা; সর্বোপরি সংশ্নিষ্টদের গা-ছাড়া ভাব। নওগাঁ সিভিল সার্জন অফিস কি বন্ধ ছিল? সেখানে সিভিল সার্জনসহ অন্য কর্মকর্তারা কি ছিলেন না? অবশ্যই ছিলেন; কিন্তু কাজটা এগোয়নি। মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের এই অনির্ধারিত কর্মসূচিকে যদি বাড়তি ঝামেলা বলে মনে করা হয়, তবে পরিণতি তো এমনই হবে। কাউকে না কাউকে সাহস করে এগিয়ে এসে বলতে হবে- 'এসো, পরিবর্তন আনি।' জুনিয়র ডাক্তার, প্যারামেডিকস্‌, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী- এদের সঙ্গে সমন্বয় করে নেতত্ব দিতে হবে। সর্বোপরি কর্মসূচিকে নিজের বলে ভাবতে হবে, অন্যদেরও তা ভাবাতে হবে। তা হলেই পরিবর্তন সম্ভব; নচেৎ নয়। পত্মম্নীতলা উপজেলার বৈকালিক আউটডোর সার্ভিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেছিলেন, নওগাঁর বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সেবা খাতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। আমি আজকে পত্মম্নীতলা উপজেলায় বৈকালিক আউটডোর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম উদ্বোধন করতে পেরে গর্ববোধ করছি।

একটি সুস্থ-সবল জাতি গঠনে জনগণের স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্ব অপরিসীম। চিকিৎসা সেবাপ্রাপ্তি জনগণের একটি মৌলিক অধিকার। বর্তমানে গণতান্ত্র্পিক সরকার জনগণের সরকার, গণমানুষের সরকার। তাই রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্র্পণে বর্তমান সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ সরকারের এ উদ্যোগকে আরও গতিশীল ও সার্থক করে তুলতে পারে। চিকিৎসকদের আর্ত-মানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করার অনেক সুযোগ রয়েছে। বৈকালিক কার্যক্রম জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে তাদের।

লেখক: সাবেক সিভিল সার্জন, নওগাঁ

ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি/ এমএইচ