শিরোনাম:

​সেক্যুলার ভারতের উগ্ররূপ

আলমগীর কবির
প্রকাশিত : শনিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৯:৩০
অ-অ+
​সেক্যুলার ভারতের উগ্ররূপ

মুক্তিপ্রতিক্ষীত একটি বলিউড সিনেমার নাম ‘পদ্মাবতী’। ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ এনে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার এর মুক্তি অনিশ্চিত করে দিয়েছে। সিনেমাটি নিয়ে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে যেভাবে ঢিল ছোড়াছুড়ি হচ্ছে, তা আর সিনেমা অঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই। ‘ঘরওয়াপসি’, ‘লাভ জিহাদ’, ‘গো-রক্ষা’ ইত্যাদি নামে দলিত এবং মুসলিমদের ওপর বিজেপি যে সাম্প্রদায়িক অত্যাচার চালাচ্ছে তারই রেশ পদ্মাবতীর ওপর এসে পড়েছে। উগ্র জাতীয়তাবাদের কারণেই এমনটা হচ্ছে।
 
রানী পদ্মিনীর জীবন নিয়ে তৈরি ‘পদ্মাবতী’কে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তুমুল প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। ১ ডিসেম্বর সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার কথা থাকলেও রাজস্থান, গুজরাট, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন রাজ্যে রাজপুত সংগঠনগুলো এই ছবির বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। বহু জায়গাতেই বিজেপি নেতারাও এই দাবিতে গলা মিলিয়েছেন। কিন্তু এত প্রতিবাদের পরও অনেকে মনে করছেন আদৌ কি পদ্মাবতীর কোনো শারীরিক অস্তিত্ব আছে নাকি পুরোটা কাল্পনিক? ইতিহাস বলে, ‘পদ্মাবতী’ মধ্যযুগে বাঙালি কবি আলাওলের একটি কাব্য। এর আগে ১৫৪০ শতকে মালিক মুহাম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ অনুবাদে ‘পদ্মাবতী’কে খুঁজে পাওয়া যায় এবং এই বিষয়ে ইতিহাসে বলা হয়ে থাকে পদ্মাবতীকে খুঁজতে হলে ১৬ শতকের কবি মালিক মুহম্মদ জাইসের পদ্মভূষণ মহাকবিতার একটি কাল্পনিক রানী চরিত্রকে সামনে আনতে হবে। এবং সেখানেই পাওয়া যাবে রানী পদ্মিনীর রূপে পদ্মাবতীকে। কিন্তু বলিউডের বিখ্যাত পরিচালক সঞ্জয় লীলা বানসালি তাঁর ‘পদ্মাবতী’ সিনেমায় ১৪ শতকের একটি কাল্পনিক পদ্মাবতীর চরিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে দীপিকা পাড়ুকোন এবং রণবীর সিং প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
 
তবে এই সিনেমা নিয়ে ভারতের কিছু হিন্দু গোষ্ঠী এবং একটি রাজপুত জাতি সংগঠন অভিযোগ করেছেন, এখানে আলাউদ্দিন খিলজি চরিত্রে অভিনয় করা রণবীর সিংয়ের সাথে পদ্মাবতী দীপিকা পাডুকোনের স্বপ্ন দৃশ্য রয়েছে। তারা দাবি করেছে দিল্লির শাসক আলাউদ্দিন খিলজির কবল থেকে রক্ষা পেতে রানী পদ্মিনী ১৬ হাজার নারীকে নিয়ে চিতায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন। কিন্তু পদ্মাবতী সিনেমায় তাঁর সেই মর্যাদা ও আত্মত্যাগকে খাটো করা হয়েছে।
 
এই বিতর্কের মধ্যেই মুক্তি পেয়েছে, পদ্মাবতী সিনেমার প্রথম ‘ঘুমর’ গানটি। হিন্দু গোষ্ঠী দাবি করেছে এখানে রানী পদ্মিনীকে দেখা গেছে স্বল্প কাপড় পরা। অনেকে আবার রানীর ঘোমটা ছিল কিনা তা দেখে আপত্তি তোলে। এসব বিতর্ক নিয়ে পরিচালক বানশালি ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘ভুল বোঝাবুঝির প্রধান কারণটাই হলো এই তথাকথিত স্বপ্নদৃশ্য, অথচ আমি বারবার বলেছি, লিখিত প্রমাণও দিয়েছি যে এমন কোনো দৃশ্য ছবিতেই নেই। বিশ্বাস করুন, ছবিটা আমি খুব দায়িত্ববোধ নিয়ে বানিয়েছি, রাজপুতদের মান-মর্যাদার দিকে দৃষ্টিও দিয়েছি।’
 
কিন্তু এসব কথা কর্ণপাত করার সময় নেই ভারতের ক্ষমতাসীনদের। তাদের এক নেতা ঘোষাণা করেছেন এই ছবির পরিচালক অথবা নায়িকার মাথা কেটে দিতে পারলে দশ কোটি টাকা পুরস্কার দেয়া হবে।
 
হরিয়ানায় বিজেপির মুখ্য মিডিয়া কোঅর্ডিনেটর সুরজপাল আমু প্রকাশ্য জনসভায় তার শ্রোতাবর্গকে এ অসামান্য প্রলোভনের সামনে ফেলেছেন। বলেছেন, দীপিকা পাডুকোন ও সঞ্জয় লীলা বানসালীর মাথা কাটলে ‘মাথা’পিছু যে পাঁচ কোটি টাকার পুরস্কার বিজেপির সহযোগী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ হতে ঘোষিত হয়েছে, এটাকে স্বাগত জানাই, তবে তিনি আরো বড় বাজি রাখতে প্রস্তুত দশ কোটি নগদ এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধার নিশ্চয়তা তিনি নিজ দায়িত্বে দিবেন।
 
ভারতের রাজনীতিতে এই ঘটনা অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক। মাথা কাটার ঘোষণা বা মাথা কাটলে পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা আগে শোনা যায়নি, তা নয়। তবে এত দিন এসব কথা শোনা যেত করণী সেনা জাতীয় ভারতের বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত চরমভাবাপন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মুখে। এখন কিন্তু চরমতা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা ধারণ করেছে। খোদ শাসক দলের অন্যতম অফিস কর্মকর্তা মাথা কাটলে পুরস্কার দেয়ার প্রস্তাব করেছেন। ক্ষমতাশীন দলের অন্য কেউ আপত্তি করা দূরে থাক, মুখও খুলছেন না।
 
বিজেপির শাসনে ভারতের সমাজ ও রাজনীতি কী পরিমাণ দুর্বিষহ সঙ্কীর্ণতা ও অসহিষ্ণুতার মধ্যে আছে পদ্মাবতী নিয়ে মাথা কাটার ঘোষণা তার প্রমাণ। বিজেপি প্রধানমন্ত্রী হতে শুরু করে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী, বিজেপি দলের সব নেতা কর্মী বিষাক্ত চক্রের একই রকম উৎসাহী প্রচারক। ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশের তিন মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, ‘পদ্মাবতী’ সিনেমা তাদের রাজ্যে মুক্তি পাবে না।
 
পদ্মাবতী বিতর্ক নিয়ে কথা বলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যয়। তিনি লিখেছেন, ‘পদ্মাবতী নিয়ে বিতর্ক দুর্ভাগ্যজনক।
 
একটি রাজনৈতিক দল পরিকল্পিতভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য এসব করছে। এই সুপার এমার্জেন্সির নিন্দা করছি। চলচ্চিত্র জগতের সবাই একযোগে প্রতিবাদ করুন।
তবে ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ছবি নিয়ে বিতর্কের কারণ দেখছেন অন্যভাবে, তারা বলেছেন, আগামী ৯ ডিসেম্বর গুজরাত রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার আগে এ ছবি মুক্তি দেয়া হবে না রাজনৈতিকভাবে দম্ভ দেখানোর জন্যই। কারণ কয়েক দশকে এই প্রথম গুজরাট রাজ্যে সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছে বিজেপি। আর এই সুযোগ গ্রহণে ব্যস্ত কংগ্রেস।
 
ব্রেকিংনিউজ/জিয়া

সম্পর্কিত বিষয়ঃ   ভারত