শিরোনাম:

গড়িমসিতে যত গণ্ডগোল

জিয়াউদ্দিন সাইমুম
১১ জুন ২০১৮, সোমবার
প্রকাশিত: 12:27 আপডেট: 12:28
গড়িমসিতে যত গণ্ডগোল<br />

 সংস্কৃত গড়িমসি শব্দের মূলে রয়েছে ‘পশুর আলস্য ভাব’। পশুর এ আলস্য ভাব এখন মানুষের প্রতিও পুরোপুরি প্রযুক্ত হচ্ছে (বিস্তর গড়িমসি করতে করতে সেই ডায়রিটা লিখছিলুম- ছিন্নপত্রাবলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; ঘোড়াগুলো আস্তে আস্তে যাচ্ছে, মানুষগুলোর তেমন ভারি ব্যস্ত ভাব নেই, গড়িমসি করে চলেছে- য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; আরও গড়িমসি করবি ত বিয়ে দিবি কবে?- বামুনের মেয়ে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; যাচ্ছি যাব, যাচ্ছি যাব এই গড়িমসি করে চূড়ো ভাঙা চাকা ভাঙা রথ যে রকম ঘাড় গুঁজে ধুলোয় কাতর, সে রকমই শুয়ে বসে আছে- হে সময় অশ্বারোহী হও, পূর্ণেন্দু পত্রী)।
 
সংস্কৃত ‘গড়ি’ মানে অলস গবাদি। ‘গড়ি’ শব্দের সঙ্গে ‘মইষি’ যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে ‘গড়িমইষি’। আর ‘গড়িমইষি’ থেকে হয়েছে ‘গড়িমষি’। পরে ‘মষি’ বানানটি ‘মসি’ হয়ে যাওয়ায় গড়িমসিতে দুষ্ট মহিষের আলস্যভাবটিও চোখের আড়ালে চলে গেছে।
 
অবশ্য গড়িয়া (সংস্কৃত গড় + বাংলা ইয়া) মানে ‘দুষ্ট বৃষের ন্যায় অলস’। ওড়িয়া ভাষায় গড়িমসির সমমানের শব্দ হচ্ছে গড়-মষন। আবার ‘গতর-গড়িয়া’ বলতে এক সময় ‘শারীরিক শ্রমকাতর বোঝাত।’
 
বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক অভিধানে গড়িমসি শব্দের দুটি গঠন নির্দেশ করা হয়েছে। সংস্কৃত গড় + ই + মসি অথবা সংস্কৃত গো > গর + ই + সংস্কৃত মহিষ > মসি। আরবিতে গড়িমসির সমতুল শব্দ হীলা হওয়ালাহ।
 
অন্যদিকে সাধারণ অর্থে ‘গণ্ড’ বলতে গাল বা কপোল বোঝায়। তবে গণ্ড শব্দের আরেকটি অর্থ ‘বড়’। গণ্ডগোলের গণ্ড অর্থও বড়। তাই গণ্ডগোল শব্দের মূলানুগ অর্থ ‘বড় ধরনের গোল বা ঝামেলা’।
 
অভিধানে গণ্ডগোল শব্দের অর্থে বলা হয়েছে গোলমাল, অতিশয় কোলাহল, শোরগোল, বহুলোকের কলরব, ওলটপালট, বিশৃঙ্খলা (পাইয়া শিবের বর দৈত্য হল দুরন্তও কোন দিন পাড়ে গণ্ডগোল- কবিকঙ্কণ চণ্ডী; এই গণ্ডগোলের মধ্যে নীরবে এখান থেকে সরে পড়েছে সে- হাজার বছর ধরে, জহির রায়হান)।
 
সাধারণ অর্থে গণ্ডগোল মানে চিৎকার, চেঁচামেচি, বিশৃঙ্খলা (আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘এত গণ্ডগোল কিসের?’- ইন্দিরা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; ধর্ম্ম কখন রিলিজনের প্রতি, কখন নীতির প্রতি, কখনও অভ্যস্ত ধর্ম্মাবতার এবং কখন পুণ্যকর্ম্মের প্রতি প্রযুক্ত হওয়াতে নীতির প্রকৃতি রিলিজনে, রিলিজনের প্রকৃতি নীতিতে, অভ্যস্ত গুণের লক্ষণ কর্ম্মে, কর্ম্মের লক্ষণ অভ্যাসে ন্যস্ত হওয়াতে একটা ঘোরতর গণ্ডগোল হইয়াছে- ধর্ম্মতত্ত্ব, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; ইহাতে সংগীত ছিন্নবিচ্ছিন্ন হইয়া কেবল একটা সুরের গণ্ডগোল হইতে থাকে- ততঃ কিম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; এ পরীক্ষার পড়া তৈরি করিতে কলিকাতার গণ্ডগোল ছাড়িয়া পিতার কাছে আসিয়াছিল- সতী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।
 
একইভাবে গণ্ডমূর্খ মানে বড় মূর্খ (দেখো এ লোকটা কতবড় গণ্ডমূর্খ; কবিগুরুর সংস্পর্শে এসেও এর কিছু হল না- রবিপুরাণ, সৈয়দ মুজতবা আলী)।
 
কিন্তু গণ্ডগ্রাম শব্দটির কপাল খারাপ। কারণ মূলানুগ অর্থে গণ্ডগ্রাম বলতে বড় গ্রাম বোঝালেও প্রায়োগিক অর্থে গণ্ডগ্রাম মানে ছোট গ্রাম।
 
হিন্দিতে গণ্ড শব্দের সমতুল শব্দ হচ্ছে ‘উধম’। আর ‘উধমা মচানা’ অর্থ গণ্ডগোল। ফারসিতে গণ্ডগোলের সমতুল শব্দ ‘গুল’।
 
ব্রেকিংনিউজ/জিসা
 

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2