শিরোনাম:

আমার প্যারিস জীবন

শাহাবুদ্দিন আহমেদ
১২ জুন ২০১৮, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: 9:29 আপডেট: 9:30
আমার প্যারিস জীবন

বিশ শতকের শেষভাগে আবির্ভূত একজন বিখ্যাত বাঙালী চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ। আধুনিক ঘরানার প্যারিস-প্রবাসী ফরাসি-বাঙালী এই শিল্পীর খ্যাতি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে বহু আগেই। ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে মাস্টার পেইন্টার্স অব কনটেম্পোরারী আর্টসের পঞ্চাশজনের একজন হিসেবে বার্সেলোনায় অলিম্পিয়াড অব আর্টস পদকে ভূষিত হন। ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। এছাড়া চিত্রকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা নাইট উপাধি পেয়েছেন।

শাহাবুদ্দিন, যিনি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন, তাঁর চিত্রকলায় সংগ্রামী মানুষের প্রতিকৃতিতে দুর্দমনীয় শক্তি ও অপ্রতিরোধ্য গতির ইংগিতময় অভিব্যাক্তির জন্য সুপরিচিত। তিনি মনে করেন, মানুষের মুক্তিযুদ্ধ অদ্যাবধি চলমান, এবং রং ও তুলির দ্বৈত অস্ত্র সহযোগে তিনি এ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে চলেছেন। 

সত্তরের দশকের শুরুতে বাংলাদেশে বিমূর্ত চিত্রকলার যে দুবোর্ধ্য পর্বের সূচনা হয়েছিল, তার সঙ্গে গাঁটছড়া না-বেঁধে তিনি নির্মাণ করেন স্বকীয় শৈলী যার ভিত্তিতে রয়েছে শারীরী প্রকাশভঙ্গী। তাঁর এই চিত্রশৈলী বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবান্বিত করে। নিজের প্যারিস জীবন নিয়ে শিল্পীর বিশেষ রচনাটি তুলে ধরা হলো।

এক.
আজকের জগতে কোনো আর্কিটেক্ট, কোনো সিনেমা পরিচালক কিংবা ফটোগ্রাফার; যাই বলি- তারা যদি চিত্রকর্ম না বোঝেন, তারা যত বড় প্রতিভাই হোক ওপরে যেতে পারবে না। সোজা কথা অসম্ভব।

ঢাকায় যেমন অনেক ক্ষেত্রেই দেখি যে হইছে ভাই, দিয়া দেন, চলবে-এমন একটা মনোভাব। কিন্তু বর্তমান দুনিয়ায় কোয়ালিটি অন্যরকম একটা জিনিস। আজকের বাংলাদেশে যেমন প্রকৌশলেই ধরা যাক মাজহার ভাই মানে স্থপতি মাজহারুল ইসলামের পর সেই জায়গা পর্যন্ত কেউ যেতে পারছে না কেন! এই যে আধুনিক আর্কিটেকচার ব্যাপারটাই তো আসছে বাইরে থেকে। তেমনি অয়েল পেইন্টিং আমরা জানতাম না। এগুলো ইউরোপ থেকে। আমাদের পটচিত্র ছিল, মোগল আমলে হয়তো কিছু নানান ধরনের চিত্রকর্ম দেখা যায় কিন্তু অয়েল পেইন্টিং তো আসছে বাইরে থেকেই। আর্কিটেকচারেও তেমনি। আমাদের তো বেশির ভাগই কুঁড়েঘর। ধীরে ধীরে মোগলরা এলো, ব্রিটিশরা এলো; তাদের কাছ থেকে নতুন নতুন কৌশল আমাদের এখানে প্রবেশ করতে থাকল। আসলে নির্মাণকলার উৎকর্ষটা ওদেরই আগে হয়েছে। কিন্তু কৌশল আর এসব ম্যাটেরিয়ালের কথা বাদ দিলে চিত্রকর্মে আমাদের মৌলিক দিক হলো আমাদের ‘লাইট’। বর্ষা, শরৎ, হেমন্তের একেক সময় একেক রকম আলো। প্রকৃতিরই কতগুলো নিয়মকানুন আছে। আমাদের প্রকৃতির ভেতরের দিকটা খেয়াল করতে হবে। তবে আমাদের সাহিত্য এসব ব্যাপারে এগিয়ে গেছে অনেক আগে থেকেই। কিন্তু ছবি আঁকায় তেমনটা নয়। এসব আমি হয়তো বুঝতাম না ওইখানে, মানে প্যারিসে না গেলে।

যখন গেলাম ল্যুভর, প্যারিস, বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম দেখতে দেখতে আমি তো বিমোহিত। ল্যুভরে অনেক সময় ক্লাসও করেছি। মিউজিয়ামে রাখা বিখ্যাত ছবিগুলোকে দেখে দেখে কপি করার ক্লাস। রোম, আমস্টারডাম, এথেন্স, স্পেন- এ কোন জগতে এলাম! এতসব কিছু দেখতে দেখতে আমার ভেতর থেকে কী যেন একটা ধসে যেতে লাগল। বাংলাদেশ থেকে যে ভিত্তিটা আমার মধ্যে তৈরি হয়েছে, সেটা যেন মুহূর্তেই ক্ষুদ্র হয়ে গেল। মনে হচ্ছে যে স্বপ্ন নিয়ে এখানে এসেছি তা আর সফল হবে না। আশাহত মন নিয়ে ঘুরে বেড়াই এখানে-সেখানে। কোনো ছবি আঁকতেই আর ভালো লাগে না। দেশে থাকতে, এমনকি মুক্তিযুদ্ধে থাকতেও যেই আমি প্রতিনিয়ত এত ছবি আঁকতাম সেই আমার কোনো ছবিই আর ভালো লাগছিল না। ছবি আঁকার মনটাই নষ্ট হয়ে গেল। অসুস্থ-পাগলপ্রায় অবস্থা যাকে বলে ‘লস্ট’। সমুদ্রে পড়ে গেলে যেমন হয়, হাবুডুবু খেতে খেতে মরে যাওয়ার মতো অবস্থা। প্রায়ই আমাকে ওষুধ খেতে হতো।
স্কলারশিপের প্রথম এক বছর তো ছিল ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স। বাংলাদেশ থেকে প্যারিসের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার সময় আমার সে কি উৎসাহ-উত্তেজনা! প্লেনে ওঠার পর সবকিছুই কেমন কেমন হয়ে যায়। মনে আছে, যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম আমরা। সকালে নামলাম প্লেন থেকে; এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আমাদের চোখে-মুখে একটাই প্রশ্ন কোথায় ঘুমাব?

কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলল, আপাতত এখানে লাঞ্চ করো। একটু পর বাসে করে শহরটা ঘুরিয়ে দেখাল। সন্ধ্যায় ডিনার শেষে বলে, আমাদের ট্রেন ধরতে হবে। আমরা তো অবাক! মনে মনে ভাবছি, ট্রেনে কোথায় নিয়ে যাবে? প্যারিসেই তো! ভাষাও বুঝি না। কী সব বলছে। শেষমেশ যা বুঝলাম, ট্রেনে আমাদের অন্য শহরে পাঠিয়ে দেবে ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স করার জন্য। কিন্তু আমরা সবাই ভেবেছিলাম, হয়তো শহরটা বড় এক মাথা থেকে অন্য মাথায় যেতে ট্রেন ধরতে হয়। কিন্তু সেই ট্রেন যদি হয় সারারাত!

সে রাতে ট্রেনে আর কেউ নেই খালি আমরা চৌদ্দজন বাঙালি। কী আজব ব্যাপার। আমাদের চৌদ্দজন স্কলারশিপে গিয়েছিলাম বাংলাদেশ থেকে। সেখানে চিত্রকলা ছাড়াও স্থাপত্য, প্রকৌশল বিভাগের মতো নানারকম শিক্ষার্থী। তার মধ্যে আমরা দুজন মাত্র তরুণ। ২৪ বছর হবে বয়স। আরেকজন বুয়েটের তপন। সাংঘাতিক মেধাবী। বাকি সবাই বিভিন্ন বিশ্ব বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক। সবাই ছিল একটু মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারণার মানুষ। তাদের সঙ্গে ঠিক মেলে না। সারারাত ভয়ানক ঠান্ডায় আমাদের প্রায় জীবন বের হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। হঠাৎ রাত দুইটার সময় ট্রেনের কন্ট্রোলার এসে হিটার চালু করে দিল। আমরা  যেমন প্রাণ ফিরে পেলাম। এরপর দেখি উল্টো অবস্থা, কিছুক্ষণের মধ্যে কানটান সব গরম হয়ে গেল। সে কী এক বিব্রতকর অবস্থা!

৯ অক্টোবর গিয়ে পৌঁছালাম এক গ্রামের মতো একটা জায়গায়। স্টেশনে তেমন কেউ নেই, বিরান স্টেশন। কিছুক্ষণ পর দেখি, একলা একটা মহিলা আমাদের নিতে এসেছে। তার সঙ্গে যেতে যেতে আমাদের তো কান্নাকাটির মতো অবস্থা। আর কিছুদূর যাওয়ার পর শুনি সমুদ্রের গর্জন। সমুদ্রের ধারে পৌঁছে আবার যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। সমুদ্রের সে জায়গাটা অনেকগুলো সিনেমায় দেখা যায়। লঙ্গেস্ট ডে, সেভিং প্রাইভেট রায়ান এমন আরও বেশ কিছু ছবির শুটিং হয়েছে, পরে দেখেছি।

সমুদ্র, বাতাস এমন একটা জায়গায় ঠান্ডা মাথায় ভাষা শিক্ষার জন্য পাঠিয়েছে। কিন্তু মনে হচ্ছে এটা আমাদের জন্য প্রথম শাস্তি। এক মাস ক্লাস। ফ্রেঞ্চ শেখা শুরু হলো। কিন্তু আমার ভেতরে ঢুকল শালার, আসলাম ছবি আঁকতে, এইসব ফালতু জিনিস দিয়ে আমার কী হবে? আমার না, ভেতরে কেমন ভয় ঢুকে গেল। এক মাস গেল, দেড় মাস গেল টুকটাক ছবি আঁকি। মনে মনে ভাবি, মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে মেলাঘরে বসেও ছবি আঁকলাম, আর এইখানে আমারে পাঠাইছে ভাষা শিখতে। দূরে থাকলে দেশের কথা বেশিই মনে পড়ে। দেশ থেকে চিঠি আসতেও সময় লাগে। আস্তে আস্তে আমি কেমন নিরুৎসাহিত হতে লাগলাম। দুর্বল হয়ে যেতে লাগলাম। তবে অন্যদের দেখছি, তারা দিব্যি আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমার ছবি আঁকতে না পারার অস্বস্তি দিন দিন বাড়তেই থাকল। আর ছোট শহর, ছবি আঁকার রং-টংও পাওয়া যায় না তেমন। প্যারিস এখান থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরে। মাথাই নষ্ট হওয়ার জোগাড়।
আমাদের ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে দু-তিনশ স্টুডেন্ট  সেখানে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল নানান দেশের ছেলেমেয়ে। আর শহরটায় জওয়ান-বুড়ো মিলে সর্বসাকল্যে ২০০ জনের মতো মানুষ। কিন্তু গ্রীষ্মকালে এই শহরটাই ভরে ওঠে আশি-নব্বই হাজার মানুষে। সি-বিচ শহর, সব বাড়িগুলো বন্ধ। গ্রীষ্মে এর সবগুলো খুলে যায়।

একদিন সমুদ্রের পাড় দিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ অনেক দূরে দেখি, একটা জটলা মতন। সেই জটলার ফাঁক দিয়ে একটা ইজেল দেখা যাচ্ছে, একটা মহিলা ছবি আঁকছে। আমার চোখেমুখে যেন খুশি খুশি। এত দিন পরে ছবি আঁকার কিছু পেলাম। কাছে গিয়ে দেখি মহিলাটি ঢেউ, পাথর-টাথর কী কী যেন আঁকছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাই দেখতে লাগলাম। অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, চারপাশে মহিলাটা বিব্রত হচ্ছে। আর কী কী বলছে, আমি তো বুঝি না। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এলো। মহিলা তো ঠিকঠাক আঁকতেও পারছে না আমার ইচ্ছা করছে বলি, কিন্তু ভয়ে আর ফ্রেঞ্চ না পারায় বলতেও পারছি না। হঠাৎ ইন্ডিয়ান একটা ছেলে গি। গি এখানে এসেছে চার মাস হলো। সেই ছেলেটাকে দেখি পাশ দিয়ে দৌড়াচ্ছে। গিকে ডাক দিয়ে বললাম, গি দেখ তো মহিলা কী বলে? মহিলা ইজেল প্রায় গুটিয়ে নেবে সেই সময় হঠাৎ আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল কী? আমি বললাম, আমি আর্টিস্ট। মহিলা তো দেখি খুশি কী! আর্টিস্ট! ব্রাশ, প্যালেট আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি দশ মিনিটের মধ্যে একটা ছবি এঁকে ফেললাম। মহিলা তো এটা দেখে মাটিতে বসে পড়ল। মুগ্ধ হয়ে গিকে বলছে, ইউ আর ফ্রেন্ড, প্লিজ কাম ফর এম্পারিটিভ। আমি তো বুঝি না এম্পারিটিভ কী? গি বলল, চল চল। দুই মিনিটের রাস্তা হেঁটে আমরা গেলাম মহিলার বাড়িতে। বাড়িতে ঢুকতেই মহিলার কুকুরটা ডাকাডাকি শুরু করল। পিচ্চি একটা কুত্তা। মহিলার সব জিনিসপত্র আমার হাতে। মহিলা কী বলে গি বোঝে না ঠিকঠাক। আমরা বাড়িতে ঢুকলাম। ঢুকে তো দেখি হায় হায়, এ কোন জগতে এলাম! দরজা থেকে শুরু করে ওপরে-নিচে, চারদিকে কুকুরের, ফুলের, গাছের, আরও বিচিত্র সব জিনিসের ছোট ছোট ছবি। এর সবগুলো এই মহিলার আঁকা। অ্যামেচার ছবি। কিন্তু এগুলো সবই সে নিজে এঁকেছে। আমি তো ভাবছি, যাক বাবা এতদিনে আসল জায়গায় এলাম।

ঘরে বসলাম। মহিলা আমাদের সেই এম্পারেটিভ দিল খেলাম। আমি প্রথম জীবনে এমন জিনিস খেলাম। সর্বনাশ খেয়ে তো শরীর গরম হয়ে গেল। কেমন কেমন জানি লাগে! ওদিকে মহিলা গি কে বোঝাল  আমি যদি সপ্তাহে একবার তাকে ছবি আঁকা শেখাই, তাহলে কত টাকা দিতে হবে। আমি তো শুনে বলি নো, নো, নো মানি। লাগবে না, প্রত্যেক দিনই আসব। মহিলা তো অবাক। ফ্রান্সের মতো দেশে টাকা ছাড়া কাজ করা তো অসম্ভব ব্যাপার। মহিলা তো খুশি। আমিও প্রতিদিন যাই তার বাসায়। যেতে যেতে পারিবারিক একটা সম্পর্ক হয়ে গেল তার সঙ্গে। তার নাম ‘ইবন’। আমি তাকে তন্ত ইবন বলে ডাকি। তন্ত মানে চাচি। সেই তন্ত ইবনের হাত ধরেই যেন ফ্রান্সের মাটিতে ঘুরে গেল আমার ইতিহাস।

দুই.
ওই যে প্রতিদিন তন্ত ইবনের বাসায় যাই ধীরে ধীরে আমি তার পরিবারের একজনে পরিণত হলাম। আমি আর কোথাও যাই না। ওই বাসায় গিয়ে প্রতিদিন ছবি আঁকি। তন্ত ইবনকে শেখাই। সেও কোত্থেকে কোত্থেকে টেলিফোন করে আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে রং আনায়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনিয়ে রাখে আমার জন্য। অনেকটা মায়ের মতো হয়ে গেল সে আমার। বৃদ্ধ ইবনের জীবনে যেন একটা ফুল ফুটল।

ওনার বয়স তখন পঞ্চান্ন হবে। তার স্বামী একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিল। এখান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে তাদের একটা জুতার দোকান ছিল। ইবন তখন অন্তঃসত্ত্বা। একদিন গাড়িতে করে দোকানে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তার স্বামী মারা যায়। আর পেটের সন্তানটাও নষ্ট হয়ে যায়। তারপর থেকেই সে সম্পূর্ণ একা। হাসপাতাল থেকে তাকে বলা হয়েছিল সে যাতে নাচ, গান বা ছবি আঁকার মতো কিছু একটাতে ব্যস্ত থাকে। সে ছবি আঁকাটাকেই বেছে নিয়েছিল।

এখন তার জীবনে নতুন আরেকজনের আবির্ভাব হলো। সন্তানের মতো। আবার ছবি আঁকা থেকে শুরু করে সবকিছুই আমি করতে পারি। আমার তরুণ বয়স দারুণ উদ্দাম। অনেক সময় রান্নাবান্নাও করি সে বাড়িতে। আর আমি ছবি আঁকতে পারছি এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। আর উনি পেয়েছেন তার নিঃসঙ্গ জীবনের একজন সঙ্গী।

কিন্তু ঝামেলাটা শুরু হলো ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সের ক্লাসে। আমি ক্লাসে যাই না ঠিকমতো। আমার নামে রিপোর্ট এসেছে। একদিন কোর্সের ডাইরেক্টর আমাকে ভেরিফাই করতে এলেন। সে তো দেখে অবাক! দেখে আমি ছবি আঁকি। আবার ভাষাটাও পারি। কিন্তু তারা যে কোর্স করায় বেশির ভাগই তার বাইরের কথাবার্তা! কারণ আমি তো ইবনের বাড়িতে থাকতে থাকতে গৃহস্থালি জিনিসপত্র থেকে শুরু করে এই রকম কত কিছুর নাম শিখে বসে আছি। ডাইরেক্টর তো থতমত। এই ছেলে স্কুলে যায় না কিন্তু শিখল কোত্থেকে! আমি তাকে ইবনের বাড়িতে নিয়ে গেলাম। গিয়ে বললাম দিস ইজ মাই মাদার। ভদ্রলোক কী বলবে বুঝে উঠতে পারছেন না। আমার আঁকা ছবিগুলো দেখে তিনি তো আরও অবাক। তিনি উল্টো আমাকে আরও উৎসাহ দিলেন। আমি তো ফ্রেঞ্চ একজন মহিলার ঘরের লোক হয়ে গেলাম। ফ্রান্সের মতো একটা দেশে ছবি আঁকার স্কলারশিপ করতে গিয়ে আর কী চাই। কোর্স ডিরেক্টর আমাকে বললেন, তোমার কী লাগবে আমাকে বলো। আমি তোমার এক্সিবিশন আয়োজন করে দিচ্ছি। করলাম এক্সিবিশন। সব ছবি বিক্রি হয়ে গেল। বিস্ময়ের পর বিস্ময়।

এক্সিবিশনের ছবি বিক্রির সব টাকা উনি রেখে দিলেন। বললেন, ‘আমার কাছে থাক, তোর কাছে থাকলে তুই সব নষ্ট করে ফেলবি।’ এমনকি তিনি আমাকে দিয়ে দেশে আমার মায়ের কাছে চিঠিও লিখিয়ে দিলেন। আজব এক লোক। মাকে লিখলাম। এমনকি সেই লোককে আমি ক-খও শিখিয়েছিলাম।

কিন্তু এরপর এলো আগস্ট মাস। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। সেদিন সমুদ্রের ধারে বসে আছি। হঠাৎ দেখি তন্ত ইবন হন্নদন্ত হয়ে আমার দিকে দৌড়ে আসছে। কাছে এসে বলল, শাহাবুদ্দিন, শাহাবুদ্দিন বাসায় চলো। টিভিতে দেখলাম তোমাদের দেশে কী যেন হয়েছে। খুব ভয়াবহ কিছু। অমি তো বুঝতে পারছি না। বাংলাদেশে আবার কী হবে! বাসায় এসে চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ চোখে পড়ল ঢাকার রাস্তায় ট্যাঙ্ক। খবরে বলছে, দ্য টাইগার অব বাংলাদেশ ওয়াজ কিলড। আমি মুহূর্তেই বোবা হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম সেদিন। ফ্রান্সে প্যারিস থেকে ৭০০ কিলোমিটার দূরের এক সমুদ্রসৈকতে বসে দেখলাম, বাংলাদেশের ইতিহাস উল্টো দিকে ঘুরে গেল। আমার এত কাছের, এত পছন্দের একটা মানুষ যে আমাকে এখানে পাঠাল, সেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে মেরে ফেলা   হয়েছে। এ অবস্থা থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সময় লেগেছে অনেক। আমি কোর্স শেষ করে প্যারিসে চলে এলাম।এখানে আরেকটা মর্মান্তিক ঘটনা বলি তন্ত ইবন জীবনে কোনো দিন প্যারিসে যায়নি। আমি প্যারিসে চলে যাচ্ছি সে কী কান্না। আমি চলে গেলে সে আবার একলা হয়ে যাবে। তাকে বুঝিয়ে বললাম, কত মানুষ আসা-যাওয়া করবে, আমিও কয়েক মাস পরপর আসব। তবু তার কান্না থামে না। ভীষণ মন খারাপ অবস্থায় রেখে তার বাড়ি থেকে আমি প্যারিসের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। আর আমার মনের অবস্থা আর নাইবা বললাম। কিন্তু যে মহিলা ফ্রান্সে থেকেও তার সারাজীবনে প্যারিসে যায়নি, সে আমাকে দেখতে একদিন প্যারিসে চলে এসেছিল। এবং সবচেয়ে অদ্ভুত যে বিষয়টি, আমার সেই তন্ত ইবন মারা যাওয়ার সময় তার সব সম্পত্তি আমার নামে উইল করে গেছে। কিন্তু আমি তো সম্পত্তির জন্য তাকে সময় দিইনি! তন্ত ইবন ছিল আমার জীবনের এক বিরাট আশীর্বাদ।

তিন.
প্যারিসে এসে ফাইন আর্টসে ভর্তি হলাম। যে কোনো শিল্পীরই প্রিয় শিল্পী থাকে। কারও দ্বারা শিল্পী বেশি অনুপ্রাণিত হন। প্রত্যেকটা নতুন সৃষ্টির পেছনেই পরম্পরা থাকে। আমি প্যারিসে ঘুরে ঘুরে অনেক বিখ্যাত ছবি দেখতে লাগলাম। মনের মতো কোনো শিল্পীকে খুঁজে পাচ্ছি না। কেমন ছবি আঁকব? আমার ভালো লাগাটা কেমন? এসব ভাবতে ভাবতে দিন কাটে। অনেকের ছবি ভালো লাগে কিন্তু আমার অন্তরে ধরে না।

কত কী করেছি! এক সময় অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংও করেছি। সেই অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করেছি। বিক্রিও হয়েছে, কিন্তু পরে এইসব ফালতু জিনিস আমার নিজের কাছে ভালো লাগেনি।

প্যারিসে এসে প্রথম দিন থেকেই আমি আমার সেই প্রেরণাকে খুঁজতে থাকলাম। যেমন ধরা যাক গয়া- স্পেনে গেলাম গয়ার কাজ দেখতে। তেমনি রেম্ব্রান্ত, ডেবিড হকনে, ড্যালাকুয়া এমন অনেক শিল্পীর কাজ দেখছি ভালো লাগছে। বিস্মিত হচ্ছি কিন্তু মনের মতন হচ্ছে না। ১৯৭৭-এর অক্টোবরের দিকে আমার ছবি আঁকায় মূল পরিবর্তনটা ঘটে যায়।

প্যারিসে ফাইন আর্টস স্কুল যেটা ইকল দ্য বুজ আর্ট; ফ্রেঞ্চ ইকল অর্থ স্কুল আর বুজ আর্ট মানে ফাইন আর্ট যেটাকে বলে। বিশ সেরা ফাইন আর্টের স্কুল। ইকল দ্য বুজ আর্ট এলাকাটিই শিল্পীদের এলাকা। আমাদের যে রকম শাহবাগ। বিশ^বিদ্যালয়, জাদুঘর সব মিলিয়ে শিল্প-সাহিত্যের একটা পরিবেশ। যেখানে জন পল সার্ত্রের সিক্সটি এইট মুভমেন্ট শুরু হয়েছিল, ওই এলাকাটায়। এলাকাটায় প্রায় দুইশ আর্ট গ্যালারি আছে। শিল্পকলা নিয়েই ওখানকার যতসব কাজকারবার। ওখানকার যে মূল গ্যালারি সেটাতে মাতিস, পিকাসো, জ্যাক মেতির মতো পৃথিবী বিখ্যাত সব পেইন্টারের কাজ ঝোলানো আছে। শুরু থেকেই আমার মনে একটা স্বপ্ন ছিল আমি এই গ্যালারিতে একদিন এক্সিবিশন করব। সহপাঠী অনেককেই দেখতাম তারা কীসব ফাইলপত্র নিয়ে, ড্রয়িং নিয়ে বিভিন্ন গ্যালারিতে ছোটাছুটি করে। আমি কখনোই তেমন করিনি। যেতামও না সেই গ্যালারিগুলোতে। আমার একটাই কাজ ক্লাস শেষ করে এই গ্যালারিতে এসে ঘুরি। কাছাকাছি গ্যালারিগুলোতে এক্সিবিশন হলে মাঝেমধ্যে গেছি কিন্তু কোনো দিন ভাবিওনি যে, সেগুলোতে কোনো দিন আমার ছবির প্রদর্শনী করব। প্রতিদিন যাই বলে গ্যালারির সবাই চেনে আমাকে। বারবার যাই, বারবার ছবিগুলো দেখি। একদিন আর্ট স্কুল থেকে বেরিয়ে দেখি, গ্যালারিতে প্রচুর ভিড়ভাট্টা। সামনে যেতে পারছি না। কিন্তু পেইন্টিং দেখে তো আমি আকাশ থেকে পড়ে গেলাম। মনে হলো, একেই তো খুঁজছিলাম। ছবির পাশে একজন লোক বসা। সবাই হাত মেলাচ্ছে। আমিও হাত মেলালাম। পরে শুনি এর নামই ফ্রান্সিস বেকন।

বাসায় ফেরার পরও দেখি চোখের মধ্যে ভাসছে। মনে হচ্ছে কী আঁকি এসব! আজ থেকে সব বাদ। আমার ছবি আঁকার জগতে একটা বিপ্লব ঘটে গেল। সে সময়টায় সবকিছু মিলিয়ে আমার মানসিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। দেশের অবস্থাও ভালো নয়। বঙ্গবন্ধুকে মেরে চক্রান্তকারীরা দেশ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি তিনিও বললেন আসিস না এই দেশে, ওখানেই থাক। মানে সবকিছুই কেমন নেগেটিভ।

যাই হোক, পরের দিন আবার গেলাম গ্যালারিতে। খোঁজ নিলাম, আমি যেভাবে আঁকি সেইভাবে এ রকম ছবি আঁকা যাবে না। এই প্রক্রিয়াটা আরও বিশাল। রঙের গুদামে চলে গেলাম, যেখান থেকে রং সস্তায় কেনা যায়। কারণ, আমার অনেক রং লাগবে। বড় বড় ব্রাশ কিনলাম, রং কিনলাম। প্যালেট-টেলেটসহ ছবি আঁকার ব্যবস্থাটাই পাল্টে ফেললাম। এখন যেভাবে আঁকি। আগে তো সেই ক্ল্যাসিক পদ্ধতিতেই আঁকতাম। সেগুলো ফেলে দিলাম।
স্কুলে ক্লাস সকালে। মডেল দেখে দেখে ছবি আঁকি। কিন্তু দেখা গেছে, পনেরো দিনের কাজ আমি তিন দিনেই শেষ করে ফেললাম। তারপর আবার করলাম। যে জন্য আমার ফিগার ড্রয়িংটা তখন থেকেই মজবুত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে গেছি, সে জন্য অনেক জায়গায় আমার ব্যাপারটা ওরা মেনে নিতে পারত না। কিন্তু আমার কাজের গতি আর পরিশ্রম আমার জন্য প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে। যুদ্ধটা সহজ হয়ে গেছে।

স্কুলের মূল ক্লাস সকালবেলা। বিকেলে লিথো, হিস্ট্রি অব আর্ট, মোজাইক থিওরির এমন আরও অনেক ক্লাস যার যার যেটা দরকার করতে চলে যায়। দু-একজন আছে ছবি আঁকে। বিকেলটায় তাই আর্ট স্কুল ফাঁকাই পড়ে থাকে। ওই সময়টাতেই আরম্ভ হলো আমার ছবি আঁকার নতুন জীবন। ওই যে ফ্রান্সিস বেকনের ছবি দেখে এলাম, সেই ছবিগুলোই একেবারে সরাসরি নকল করা শুরু করে দিলাম। ছবি এঁকে সেগুলো আবার লুকিয়েও রাখি নকল ছবি তো, মানুষজন দেখলে কী বলবে! প্রত্যেক দিন ছবি আঁকি। ছবি আঁকতে আঁকতে দরকার পড়লে, কাছেই গ্যালারি, দৌড় দিয়ে গিয়ে দেখে আসি।

এক দিন, দুই দিন, তিন দিন বন্ধুরা জেনে ফেলেছে যে আমি বেকনের ছবি নকল করা শুরু করেছি। কিন্তু প্রফেসর এখনো দেখেননি। বন্ধুরা অনেকেই দেখা হলে দূর থেকে আমাকে ‘পিতিত’ বলে ডাক দিত এই, পিতিত। পিতিত মানে হলো ছোট্ট। ডাকত এই পিতিত বেকেন, গুড গুড। আমি এইসবে কিছু বলতাম না। ধীরে ধীরে আমি প্র্যাকটিস বাড়াতে থাকলাম। একদিন বিকেল চারটার সময় সিগারেট ধরিয়ে আমি ছবি আঁকছি। যদিও এখানে সিগারেট ধরানো নিষেধ। রুমের মধ্যে কেউ নেই। আর বিকেলে আরেকটা সুবিধা হলো, সহপাঠীদের রেখে যাওয়া রংও আমি সুযোগমতো ব্যবহার করতে পারি। অনেক ধনী ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়ত সঙ্গে। তাদের তো রঙের অভাব নেই। আর আমারও ওগুলো কেনার মতো অত ক্ষমতা নেই। তাই বলে কি ছবি না এঁকে বসে থাকব? অনেক সময় দেখা গেছে, কেউ ক্যানভাসে অর্ধেক ছবি এঁকে রেখে গেছে আমি ঠাসঠাস করে কয়েকটা ব্রাশ মেরে সেটাকে আমার ছবি বানিয়ে ফেললাম, আর পেছনে লিখে দিলাম শাহাবুদ্দিন। ওরা অত কিছু খেয়ালও রাখে না।
তো, সেই দিন বিকেল চারটায় আমার হাতে সিগারেট। হঠাৎ দেখি যে আমাদের প্রফেসর বসে আছেন ঘরের মধ্যে। আমি তো লজ্জায় শেষ। সিগারেট নিচে ফেলে দিতে দিতে মুখ কাচুমাচু করে বললাম, সরি স্যার। আমি তো খেয়াল করিনি। কিন্তু, স্যার দেখি বলে, নো নো, শাহাবুদ্দিন, কন্টিনিউ কন্টিনিউ। কিন্তু আমার তো আর কন্টিনিউ হয় না। পেছনে স্যার বসে আছেন, কেমনে ছবি আঁকি! স্যার তখন উঠে দাঁড়ালেন, বললেন আমি প্রথম দিন থেকেই খেয়াল করছিলাম তোর কোথায় যেন কী একটা মিসিং হচ্ছিল। স্যাররা তো দেখলেই বুঝে ফেলেন। স্যার বলেন কাম, কন্টিনিউ। ব্রাভো ব্রাভো। আর বললেন, এই ছবিগুলো তোর কেন ভালো লাগল সেটা খুঁজে বের কর। স্যারের এসব কথায় আমি তো একটু সাহস পেয়ে গেলাম। এখন আর ছবি লুকিয়ে রাখি না। আরও স্বাধীনভাবে, আরও গতিতে ক্যানভাসে ব্রাশ চালাতে থাকি।

ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে গেলাম। আস্তে আস্তে ছবির মধ্যে ডায়নামিজম শুরু হলো। স্বাধীনভাবে ক্যানভাসে স্ট্রোক দেওয়ার কাজে আরও বৈচিত্র্য এলো আমার হাতে। আত্মবিশ্বাসও  বেড়ে গেল আগের চেয়ে। তখন আমি সেই প্রিয় গ্যালারিতে আবার গেলাম। সেই যে আমার স্বপ্ন। যেখান থেকে এতসব। গ্যালারিতে গিয়ে দেখি, সেখানে তখন একটা ইতালিয়ান শিল্পীর কাজ ঝোলানো হচ্ছে। প্রদর্শনী হবে। আমিও গিয়ে কাজে কিছুটা সাহায্য করলাম। গ্যালারিতে ছোট ছোট মই  থাকে। সেই মইয়ের ওপর উঠে বলল, একটা পিন দাও তো। আমি ইংরেজিতে বললাম, ক্যান আই হ্যাভ ইউ ওয়ান কোশ্চেন প্লিজ?
ইউ ডোন্ট টেক ইয়ং পেইন্টার? সে বলল, ও নো। নো।

বিখ্যাত গ্যালারি। সেই গ্যালারিতে পিকাসো, মাতিস, জিয়াকোমেত্তির মতো শিল্পীদের পরে অপেক্ষাকৃত তরুণ শিল্পীদের বয়স কম করে হলেও ৬০ থেকে ৭০ বছর। আমি তাই নিরাশ হয়ে গেলাম। নো চান্স। কিন্তু ফিরে আসব, সেই সময়ে গ্যালারির লোকটা মই থেকে নামতে নামতে বলল, হোয়াই? ইউ আর অ্যা পেইন্টার?
এ কথা শুনে আমি তো রেগে আগুন এতদিন লাগল এটা বুঝতে! এতবার এলাম! এ কথা ক্যান বলল? ইচ্ছা কইরাই কইল কি-না!
বললাম, ইয়া।
ফ্রম হুইচ কান্ট্রি?
আমি বললাম বাংলাদেশ।
সে অনেকটা বিস্মিত হয়ে বলল, বাংলাদেশ! সো হোয়াই ডোন্ট ইউ ব্রিং অ্যা স্লাইট?
নিরাশার মধ্যেও আবার আশা ফুটে উঠল। আমি বললাম, স্লাইট? ওকে, টুমরো।

বাসায় এসে স্লাইট বানালাম। সব ছবি মিলিয়ে একটা মিক্স করে ফেললাম। দেশে থাকতেই ওয়াটার কালারে আমি ভালো ছিলাম। জলরং করে আমি দুবার গোল্ড মেডেলও পেয়েছিলাম। সেই জলরং আর সাম্প্রতিক কিছু কাজ মিলিয়ে পরদিন স্লাইট নিয়ে গেলাম। ওরা সেগুলো দেখে বলল, ও ইন্টারেস্টিং। আচ্ছা রেখে যাও। পরশু দিন এসে নিয়ে যাবা।
আমি তো ভাবি অদ্ভুত! ওরা রাখল!

আমি আবার ঠিক পরশু দিন গেলাম। দুজন লোক আছে। একজন হলো বার্নার্ড। যার নামে গ্যালারির নাম ‘গ্যালারি ক্লদ বার্নার্ড’। সেই বার্নার্ডের সেক্রেটারি ইয়ং পাজে। পাজে বলল, আমি বার্নার্ডের সঙ্গে কথা বলে দেখি। কথা শুনে আমার মনে হলো তারা ইন্টারেস্টেড। তিন দিন পর আবার গেলাম। তখন ওরা নানা রকম কথা বলছে, দেখো আমাদের গ্যালারিটার মানটা অন্য রকম। এই সেমিস্টাইল ছবি দিয়ে হবে না। তবু দেখি, তুমি পরে আসো।
আমি তো পড়ে গেলাম মহাধান্দায়। কিছু বলেও না আবার কাজগুলো ফেরতও দেয় না। ঘোরাচ্ছে। আমার সহপাঠী কেউ তো এই গ্যালারিতে ছবি দেওয়ার কথা চিন্তাও করে না। আর করার কথাও না। এখানে নতুন কোনো শিল্পীর কাজ তো দূরে থাক, বিখ্যাত পেইন্টার ছাড়া নেয়-ই না।

যাই হোক, আমি তবু যেতে লাগলাম। কিছুদিন পর একদিন তারা কাগজে লিখে আমাকে দিল যে, শাহাবুদ্দিন, উই আর সরি। বাট ইট ইজ ইন্টারেস্টিং। এই ঠিকানাটায় যাও, ওখানে একটা গ্যালারি আছে, ওরা তোমার এক্সিবিশন করবে।

এ কথা শুনে আমার একদমই পছন্দ হলো না। গ্যালারি থেকে বের হয়ে আমি সেই কাগজটা ছিঁড়ে ফেলে দিলাম। কিন্তু মনে থাকল কোন গ্যালারিটার নাম দিয়েছে ওরা। একদিন মনে হলো, আচ্ছা যাই, গিয়ে দেখি ওখানে কী অবস্থা। তবে ক্লদ বার্নার্ডের আশা আমি ছাড়িনি। তারা আমাকে বলেছে, তোর সবই ভালো, কিন্তু তোর ছবিটা আরেকটু টাইট করতে হবে। সেই টাইট শব্দটাই আমাকে পাল্টে দিল। আমি আমার ছবিকে পাল্টাতে থাকলাম। টাইট করতে গিয়েই ছবির বিষয় আরও সেন্ট্রালাইজড হতে থাকল। ফিগারগুলোকে টেনে এনে টাইট করতে লাগলাম। স্পেসের ব্যবহার, ক্যানভাসে জায়গা ছেড়ে দেওয়া। এই বিষয়টাই আমাকে দার্শনিকভাবে একটা গভীরতায় নিয়ে গেল। ততদিনে ছয় মাস পার হয়ে গেছে।

আমি আবার গেলাম গ্যালারিতে। ওরা আমাকে বলল, তুমি কোথায় আঁকো। বললাম, স্কুলে। ওরা তো অবাক! আর ওই সময়ে স্কুল থেকে ঝামেলা করা শুরু হয়ে গেছে। আমি এত ছবি আঁকছি, যে ছবিতে রুম ভরে গেছে। অন্যদের ছবি রাখার জায়গা নেই। ফেলেও দিতে পারে না। আবার রাখতেও পারে না। অন্যসব ছাত্ররা আমার বিরুদ্ধে চলে গেছে। ডিরেক্টর আমাকে নোটিশ দিয়ে দিল, ছবি না সরালে এগুলো সব জানালা দিয়ে ফেলে দেবেন। কী আর করব, এত ছবি আঁকছি যে, সব জায়গা দখল হয়ে গেছে। ডিরেক্টর ডাকলেন আমাকে। কালকে সব ছবি সরাতে হবে, না হলে পুলিশ দিয়ে সরাবেন। আমি পরের দিন ডিরেক্টরের কাছে গেলাম। তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছি, আর মনের ভেতরে ভয়। তাকে গ্যালারি ক্লদ বার্নার্ডের কথা জিজ্ঞেস করলাম।

ডিরেক্টর প্রফেসর বললেন, ‘হ্যাঁ ওদের ওখানে আমি পরশু দিন গিয়েছিলাম তিনটা ছবি জমা দিতে। কিন্তু ওরা আমাকে রিফিউজ করে দিয়েছে।’ আমি বললাম, আপনি কয়টায় গিয়েছিলেন? স্যার বললেন, সকাল ৯টায়। কারণ ওই দিন আমিও ওখানে ছবি জমা দিয়েছি। আমি গিয়েছিলাম সকাল ১০টায়। আমি স্যারকে বললাম, স্যার, কিন্তু ওরা তো আমার ছবি রেখে দিয়েছে। স্যার তো চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী বলো শাহাবুদ্দিন! তাই! তারপর আমি অতীতের সব কাহিনি বলা শুরু করলাম। সব শুনে স্যার তো বলেন ‘ইউ আর সো লাকি। হ্যাঁ তোর কাজ অনেক ডেভেলপ করেছে।’ আমি তখন সেই সুযোগে তাকে ধরে বসলাম স্যার, প্লিজ আমাকে আর দুইটা মাস সময় দেন। আপনার পায়ে পড়ি। স্যার বলেন, কী বল! দুই মাস না, এক বছর রাখো। নো প্রবলেম।

প্যারিসে গ্যালারি ক্লদ বার্নার্ডের এমনই সম্মান। গতকালকে যে আমাকে নোটিশ দিল তোমার সব ছবি নিয়ে যাও, নতুবা পুলিশ দিয়ে সব সরিয়ে ফেলব। আর আজকে সেই প্রফেসরই বলছেন, কোনো সমস্যা নেই, তোমার যত দিন ইচ্ছা রাখো। স্যার বললেন, তোর নার্ভাস হওয়ার কারণ নেই। আঁকতে থাক। আমি তো মহা খুশি বাহ্ প্রবলেম সলভ্ড।

১৯৮০ সালেই আমার স্কলারশিপের মেয়াদ শেষ। কিন্তু স্যার নিজে উদ্যোগ নিয়ে আমার পুলিশ পারমিশন করে দিলেন। আর কী লাগে? আমি আবার গ্যালারি ক্লদ বার্নার্ডে গেলাম। এখন তো পরিচয় আরও বেশি ঘন হয়েছে। গ্যালারির সেক্রেটারি নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে নিয়ে গেলেন। নতুন গ্যালারি তত্ত্বাবধায়ক একজন তরুণ শিল্পী। সেক্রেটারি আমার সাথে তার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এখন থেকে ইনি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। আমরা তোমার ড্রয়িং দেখতে চাই। ও তোমার ড্রয়িং দেখবে। তোমার নিশ্চয়ই ড্রয়িং আছে?’। আমি বললাম, হ্যাঁ অবশ্যই। কিন্তু মনে মনে বলি, কিসের ড্রয়িং, নেই বললে তো আবার ঝামেলা। এত কষ্ট করে চান্স পাইছি।

যেহেতু স্কলারশিপ শেষ। তবু আমাকে ডাইরেক্টর বিনা খরচে এক হোস্টেলে থাকতে দিয়েছেন। সেই প্রথম আমার জীবনে আমি হোস্টেলে থাকি। পকেটে কোনো পয়সা নেই। খুব খারাপ অবস্থা। কিন্তু গ্যালারির সেক্রেটারি তো বলেছেন, কবে তোমার ড্রয়িং দেখতে যাব? আমি তো বলছি মিথ্যা কথা। কোনো ড্রয়িংই তো করা নেই আমার। আমি বলেছিলাম, এই তো আমার এক আন্টি আছেন, তার বাড়িতে যাব। এসে দেখাব। আমার আন্টির বাড়ি কথাটা শুনে ভেবেছিল, কোনো বাঙালি বোধ হয়, কিন্তু যখন তন্ত ইবনের কথা শুনল, অবাক হলো। ইবন আন্টির বিষয়টাও একটা প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে। একটু অবাক হলেও পরে বলল, ওকে, নো প্রবলেম। তাহলে শিগগিরই তোমার ড্রয়িং দেখছি আমরা।

ইচ্ছা করেই আমি তিন সপ্তাহ পেছালাম। ২১ তারিখে ড্রয়িং দেখানোর তারিখ। এখন তো আমার মাথা খারাপ। ড্রয়িং করতে হবে। আর্ট স্কুলের আশপাশের রঙের দোকানে গেলাম। ছয় বছর ধরে এ এলাকায় আছি। মোটামুটি সবাই চেনে। সরাসরি দোকানের মালিকের কাছে গিয়ে বললাম, কিছু রোল আর চারকোল দরকার। আমার কাছে পয়সাপাতি কিছু নেই। এক সপ্তাহ পরে দেব। মখি ব্যাপারটা বুঝল। একটা রোল দিল আর বলল চারকোলের পয়সা দিতে হবে না। এখন সরঞ্জাম তো হলো আঁকব কোথায়? হোস্টেলের রুমে একটা দরজা আর একটা জানালা আছে। চারটা দেয়াল। দরজা-জানালার ওপর দিয়ে রোলের কাগজ সব কেটে কেটে লাগালাম। ঘরের সবগুলো দেয়ালে কাগজ লাগানো। দরজাও বন্ধ। ওই দিন সন্ধ্যায় এক বন্ধুর বাসায় ডিনারের দাওয়াত ছিল। শীতকাল, সেখানে আগুন জ্বালানোর পর অনেক কয়লা ছিল। এক কিলোর মতো কয়লা নিয়ে আসছিলাম সেখান থেকে। এখন কয়লা তো আনলাম, চারকোলও আছে, কিন্তু কী আঁকব! তিন সপ্তাহের একদিন এরই মধ্যে চলে গেছে। ঘরটা প্রায় অন্ধকার। কৃত্রিম কিছু আলোর ব্যবস্থা করলাম। ঘরে একটা ছোট্ট আয়না ছিল। সেই আয়নায় নিজেই নিজের মডেল হবো। জামাকাপড় সব খুলে উলঙ্গ হয়ে গেলাম। আয়নায় নিজেকে দেখে দেখে ড্রয়িং করব। এখন আমি তো হলো ল্যাদা, মানে দুর্বল সিং। কী আঁকব মাসল! তাই অনুমান করে করে আঁকা শুরু করলাম। শুরু হলো ইমাজিনেশনের খেলা। এই যে মাইকেল এঞ্জেলো, এই যে গয়া নানা রকমভাবে আঁকতে লাগলাম। শুরু করলাম হাতি দিয়ে। আঁকব যখন মজবুত জিনিসই আঁকি। হাতিটাতি আঁকলাম। সন্ধ্যা হলে নিচে ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু খেয়ে আসব পয়সা লাগবে তো! অনেক ছাত্রছাত্রীর ভিড়ের মধ্য দিয়ে গিয়ে, এখনো খেয়াল আছে, আপেল সালাদ চুরি করে খেয়েছি। ধরা পড়লে বলে দেব বাকি। কিন্তু কেউ তেমন খেয়াল করেনি বলে রক্ষা।

এর মধ্যে একদিন রাস্তায় একটা বড় আয়না পেলাম। ইউরোপে ব্যবহারের পর যেসব জিনিসপত্র মানুষ ফেলে দেয় গরিব দেশগুলো সেগুলো দিয়ে দিব্যি চলতে পারে। তো রাস্তায় ফেলে রাখা আসবাবপত্রের স্ল্যাপ থেকে আমি সেই আয়নাটা নিয়ে এলাম। সেই আয়নাই আমাকে দারুণভাবে সাহায্য করল। সেই আয়নাতে ইমাজিন করে আমার শরীর দেখে দেখে তার ডাবল শরীর, মাংসপেশি আর তাদের অ্যাকশন আঁকা শুরু করলাম। বাংলাদেশ জাদুঘরে সেই চারকোলে আঁকা ফিগারগুলো আছে এখনো। প্রায় ৩৫টার মতো আঁকলাম। আবার কাগজ কেটে কেটে লাগালাম দেয়ালে।

রুমে একটা ইলেকট্রিক স্টোভ ছিল। ওইটার মধ্যে চা-কফি কিংবা ডাল বাগার দিতাম খাবারদাবার বলতে ওইটাই। এসব করতে করতে দিন চলে এলো। আমি গ্যালারিতে ফোন করলাম। ওরা বলল, ওকে আসছি। ১০টার সময় এলো। আমি তো নার্ভাস। যদি পছন্দ না হয়, আমার সব স্বপ্ন তো মাটি হয়ে যাবে। পিকাসো-মাতিসদের সঙ্গে একই গ্যালারিতে আমার ছবি ঝুলবে না।

কিন্তু আমার পরিশ্রম বৃথা যায়নি। ঘরে ঢুকেই ওয়াও, ওয়াও করতে করতে চুমাটুমা দিয়ে পাগল হয়ে গেল ওরা। বলল, অবশেষে পেলাম। ঘর থেকে বের হয়েই নিচে গিয়ে ওরা বসকে টেলিফোন করে বলতে লাগল প্লিজ কাম, ইনক্রেডিবল, ইনক্রেডিবল ওয়ার্ক। বস বোধ হয় বলছে, ওরে শুদ্ধ নিয়ে আসো, দেখি।

ঘরে স্টোভে ডাল বাগার দিতে দিতে ডাল আর হলুদের ছিটা পড়ছিল দেয়ালের একটা ছবিতে। আমি খেয়াল করিনি। তা ছাড়া ছবিগুলোতে স্প্রেও করা হয়নি। বললাম, স্প্রে করে নেই। তখন ওরা বলল, স্প্রে করে কালকে নিয়ে আসো। তখন আমি ছবিগুলোতে স্প্রে করতে গিয়ে দেখি একটা ছবিতে হলুদ আর ডাল লেগে এমন অবস্থা! আবার চারকোল দিয়ে ঘসে ঘসে কোনোরকম ছবিটারে ঠিক করতে গিয়ে দেখি ছবিটা অন্যগুলোর চেয়ে একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, সেই ছবিটাই বাজিমাত। আমি মনে মনে বলি, শালা, হলুদের দাম কত হয়ে গেল! ওই দিক দিয়ে পুলিশের ভ্যারিফিকেশন আরও এক সপ্তাহ মেয়াদ বেড়ে গেল। আমার টিকিট ক্যান্সেল হয়ে গেছে; দেশে যাচ্ছি না এখনো।

গ্যালারি ক্লদ বার্নার্ড যতই ছবি দেখুক, ওয়াও ওয়াও করুক, আমি জানি ওরা সিনিয়র আর বিখ্যাত আর্টিস্ট ছাড়া ছবি হ্যাং করে না। তাই ছবিগুলো দেখাতে গিয়ে আমি সেই নতুন গ্যালারি তত্ত্বাবধায়ককে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা তোমরা তো নতুন শিল্পীদের ছবি নাও না, কিন্তু এক্সট্রা অর্ডিনারি ট্যালেন্ট হলেও নাও না? এরপর ওরা একটা বুদ্ধি করল, প্যারিসে ছয়জন তরুণ শিল্পী খুঁজে বের করো, যে কোনো দেশেরই হোক। সেই ছয়জন শিল্পীকে নিয়ে এই প্রথম ‘সিক্স কন্টেম্পরারি ইয়াং আর্টিস্ট’ শিরোনামে একটা এক্সিবিশন হবে। সেই ছয়জনের মধ্যে আমি নাম্বার ওয়ান। আরেকজন ছিল আলজেরিয়ান। বাকি চারজনই ফ্রেঞ্চ। আমার তিনটা ছবি ঝোলানো হয়েছিল। বাকিদের একটা একটা করে ছবি।

সেই দিনটাই আমার শিল্পী জীবনের ইতিহাসকে ঘুরিয়ে দেওয়ার একটা দিন। একটা দিনেই আমার স্বপ্ন সত্যি হয়ে গেল। তার পরের কাহিনি যদিও নানা চড়াই-উতরাই পেরোনোর ঘটনা, বাংলাদেশ থেকে একটা ছেলে শিল্পের শহরে গিয়ে হাজির হওয়া, আর ঘুরতে ঘুরতে বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীদের সারিতে গিয়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন সত্যি হওয়ার আনন্দে ভরপুর। লিখা: সংগৃহিত

(অনুলিখন : সঞ্জয় ঘোষ)
ব্রেকিংনিউজ/এমআর

Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Sidebar-1
Ads-Bottom-1
Ads-Bottom-2