সংবাদ শিরোনামঃ

প্রতিভাবান শিল্পী হয়েও অর্থাভাবে রঞ্জিত মালীর সংসার

প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)
১২ জানুয়ারি ২০১৯, শনিবার
প্রকাশিত: ০৬:০৮ আপডেট: ০৬:২০

প্রতিভাবান শিল্পী হয়েও অর্থাভাবে রঞ্জিত মালীর সংসার

শিল্পীরা হতে চায় শিল্পের মতো। কিন্তু প্রতিভাবান শিল্পী হয়েও সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি রঞ্জিত মালী নামের এক শিল্পী। অঁজো পাড়া গাঁয়ের প্রত্যন্ত পল্লীতে তার জন্ম হওয়ায় তাকে হার মানতে হয়েছে। ফলে অবহেলার পাত্র হয়ে সমাজে পরিবার-পরিজন নিয়ে দিনাতিপাত করছেন তিনি। অথচ বাদ্যযন্ত্রে তার দেশজুড়ে সুনাম রয়েছে। বেশকিছু বাদ্যকার শিষ্য তৈরি করে বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী করে তুলেছেন।

কিন্তু তিনি নিজেই হয়ে গেলেন অবহেলার পাত্র। বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী হয়ে দেশজুড়ে সুনাম অর্জন করে এখন তিনি দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড়ের জন্য এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছেন। বিয়ে, অন্নপ্রাশন, সরকারী বিভিন্ন জাতীয় দিবসের র‌্যালীতে ব্যান্ড বাজিয়ে যৎসামান্য টাকা পান তা দিয়ে দিয়ে পুরো পরিবার নিয়ে দিন কাঁটিয়ে দিচ্ছেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী যাত্রা শিল্প থেকে শুরু করে এমন কোনো অনুষ্ঠানে বাঁশের বাঁশিসহ প্রায় অর্ধশত বাদ্যযন্ত্র বাজানো তার পক্ষে অসম্ভব নয়।

অথচ এতো প্রতিভা থাকার পরও তার জীবনে নেমে এসেছে বিভিষিকাময় অন্ধকার। এখন ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্প হারিয়েছে নান্দনিকতা। নষ্ট হয়ে গেছে এর গুণগতমান। গ্রহণ যোগ্যতার বাঁশিতে আর এখানে শিল্পীত সুরের ঢেউ খেলে না। নীরব, নিস্প্রভ, ম্লান, রুক্ষ বালুচরে আটকে যাওয়া নৌকার মতো অবস্থা হয়েছে। এ শিল্পের সাথে  সংশ্লিষ্ট কলাকুশলী ও শিল্পীদের। প্রতিভা থাকলেও প্রয়োগের অভাবে জীবনযাত্রার তরী তাদের অচল।

এমনই প্রতিভাবান যন্ত্রশিল্পী রঞ্জিতমালী অঁজোপাড়া গাঁ কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চাকিরপশার ইউনিয়নের ফুলখাঁর চাকলা অর্জূন মিশ্র গ্রামের একজন বাসিন্দা। পিতা মৃত ভুল্ল্যা মালীও একজন বাদ্যকার ছিলেন। মাত্র সাড়ে ৩ শতক জমির উপর রঞ্জিতমালীর বসতবাড়ী ছাড়া আর কোনো জমি নেই। ২ স্ত্রীসহ মেয়ে দুলালী রানী(৪০), শেফালী(৩৮) এবং ছেলে রনবীর (৩২) ও মহাবীর (২৮)। ছোট বেলা থেকে তার ছেলেরাও বাদ্যযন্ত্র চালিয়ে সংসার চালান।

শনিবার (১২ জানুয়ারি) রঞ্জিতমালীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পড়াশুনা তেমন না থাকলেও বাদ্যকার বংশে জন্ম হওয়ায় রঞ্জিতমালীর কর্নেট, ফুলেট, হারমনিয়াম, ক্যাসিও, ঢোল, খোল, তবলা, জিপসি, করতাল, সানাই, মন্দিরা, একতারা, দোতরা, ঢাক, কড়কা, আরবাঁশি, খমক, সেভেনসেট, খুঞ্জুরী, ব্যানা, বেহালা, কাঁসর, শঙ্খ, বমবাঁশিসহ (মনাসা মঙ্গলে ব্যহৃত হয়) মোট অর্ধশত বাদ্যযন্ত্র বাঁজানোতে দক্ষ শিল্পী হিসেবে সুনাম রয়েছে দেশ জুড়ে।

ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্প ভাগ্যলক্ষী অপেরা (১৯৬৫), জয়শ্রী অপেরা (১৯৬৬), জয়বাংলা অপেরা (১৯৭৩), বলাকা অপেরা (১৯৭৫), স্বর্ণশ্রী অপেরা (১৯৭৬), বঙ্গলক্ষী অপেরা (১৯৭৭), সাধনা অপেরা (১৯৮০), মা অপেরা (১৯৮২), শাপলা, রুপশ্রী, জলিল, আফজাল ও সেলিম অপেরায় (১৯৮৪-৯০) যশ ও সম্মানের সাথে কাজ করেছেন। শিবরঞ্জন, ভৈরব, প্রভাতী, বসন্ত, কাল ভৈরব, বংশী রাগ-রাগিনী ও ঝাঁপতাল, কাহারবা, খেমটা, ঝুমুর, ত্রিতাল, কেওড়া, তাল বাজিয়ে দর্শকদের মাতিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, ২০০০ সালে উলিপুর কর্নেট প্রতিযোগিতায় সোনার মেডেল পেয়েছেন। ১৯৯৫ সালে তিস্তায় ঢাকশিল্পী প্রতিযোগীতায় ২৮০ প্রতিযোগীর মধ্যে ১ম স্থান অর্জন করেন। এছাড়া বাচ্চু অপেরার অধীনে মিউজিক পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময় ১৯৭৯ সালে পাটগ্রামে দর্শকরা খুশি হয়ে ৫ হাজার টাকার মালা বানিয়ে তাকে উপহার দিয়েছিল। বাদ্য শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই গিয়েছেন। এখন যাত্রাশিল্প ধ্বংস। এরপরও তিনি সঙ্গি-সাথীদের নিয়ে গঠন  করেছেন ‘ফুলখার চাকলা রূপা ব্যান্ড’ ও ‘সাংষ্কৃতিক সংঘ’ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনের অধিকাংশ বাদ্যযন্ত্র নষ্ট ও অকেজো। অর্থের অভাবে এগুলোর সংষ্কার সম্ভব না হওয়ায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতেও পারেন না সব সময়।

অভাব-অনটনের মধ্যে থেকে ও পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার খুব কষ্টে চালাচ্ছেন তিনি। শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও এর চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে। তাই তিনি প্রধানমন্ত্রী ও সংস্কৃতি মন্ত্রীর কাছে প্রতিভাবান শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছেন।

ব্রেকিংনিউজ/এনএসএন