সংবাদ শিরোনামঃ

নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধ, উন্নয়ন ও তারুণ্যের নিরঙ্কুশ বিজয়

ড. মো. হুমায়ুন কবীর
৫ জানুয়ারি ২০১৯, শনিবার
প্রকাশিত: ১১:৩৬

নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধ, উন্নয়ন ও তারুণ্যের নিরঙ্কুশ বিজয়

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখ সারাদিন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে সকল জল্পনা-কল্পনা, জরিপ, হিসেব-নিকেশ, গণনা, ভবিষ্যদ্বাণী ইত্যাদি সকল কিছুকে ছাড়িয়ে বিপুল বিজয় অর্জন করল মুক্তিযুদ্ধের ধারক-বাহক এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। নির্বাচনে মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে গাইবান্ধার একটি আসনের একজন প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে সে নির্বাচনটি স্থগিত করা হয়। অপরদিকে নির্বাচনে সহিংসতার কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আরেকটি আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। এখন আমি এখানে এক নজরে অভাবনীয় সে নির্বাচনের ফলাফলের চুম্বক অংশ তুলে ধরছি। মোট ২৯৮ আসনের ফলাফলে দেখা যায়- শুধু আওয়ামী লীগ এককভাবে পেয়েছে ২৫৯টি, জাতীয় পার্টি এককভাবে ২০টি, বিএনপি এককভাবে ৫টি, গণফোরাম এককভাবে ২টি, অন্যান্য ১২টি আসন।

অঙ্কের হিসাবে একক সংখ্যাগরিষ্টতা অর্জনের জন্য আসন প্রয়োজন ছিল ১৫১টি এবং দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতার জন্য প্রয়োজন ছিল ২২১টি আসন। কিন্তু আওয়ামী লীগ এককভাবেই সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। পর্যবেক্ষক, বিশ্লেষকসহ বিভিন্নমহল থেকে এটিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, চলমান উন্নয়নের পক্ষে, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনের পক্ষে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে সর্বোপরি তারুণ্যের পক্ষে এক বিরাট বিজয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিজয়ের পরে আমাদের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে টেলিফোন করছেন। দেশি-বিদেশি নির্বাচনী পর্যবেক্ষকগণ নির্বাচনকে অতীতের যেকোনো নির্বাচন থকে নিরপেক্ষ, নির্ভেজাল, সুষ্ঠু নির্বাচন বলে আখ্যা দিয়েছেন।

শুধু তাই নয় নির্বাচনের আগেও বিভিন্ন দেশি বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম ইতোমধ্যে তাদের আশাপ্রদ ভবিষ্যদ্বানী শুরু করে দিয়েছিলেন। রেকর্ড চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। গত দুই মেয়াদে তার সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে এবারও জনগণ আওয়ামী লীগকেই বেছে নেবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)’র এক বিশ্লেষণে এমনই আভাস দেওয়া হয়েছে। এপির প্রতিবেদনটি মার্কিন প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘টাইম’ যুক্তরাজ্যের ‘গার্ডিয়ান’, ভারতের ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’সহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যদি তা সত্য হয় তবে এটি হবে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য একটি রেকর্ড। কারণ শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত প্রথম মেয়াদ এবং ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত পরপর দ্বিতীয় মেয়াদসহ মোট তিন মেয়াদ এবং এবার সরকার গঠন করতে পারলে তা হবে চতুর্থবারের মতো শেখ হাসিনার সরকার গঠন করা। 

তাছাড়া এমনও জরিপের ফলাফল বেরিয়েছে যেখানে দেখানো হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট আসন পাবে ২৪৮টি। এ পর্যন্ত কোন জরিপের ফলাফলই সরকার বিরোধী পক্ষে আসেনি। এতে যে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিরোধী জোট নির্বাচনের মাঠে সরব ছিল। যতই সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ততই তাদের নির্বাচন থেকে কৌশলে সরে যাওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল বলে নির্বাচনের পূর্বেই বিশ্লেষকগণ মন্তব্য করেছিলেন। তাছাড়া তাদের জোটের অতীতেও এভাবে নির্বাচনের দিনের মাঝামাঝি সময়ে এসে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার রেকর্ড রয়েছে। বিগত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জন এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যদিও তাদের পক্ষ থেকে শেষ মিনিট পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবেন বলে যে কথা বলে আসছিলেন। সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞগণের মতামত হলো বারবার এ কথা বলা মানেই হচ্ছে এখানেও কোনো ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। এসব বিষয়ে তাদের ভিতরে একাধিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক অডিও-ভিডিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে পড়ছিল বলে জানা গিয়েছিল। আবার জামায়াত প্রশ্নে ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেনকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। আবার বিদেশি গণমাধ্যমকে একই বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি আগে জানতেন না বলে জানিয়েছেন। আসলে সব মিলে এসব একটি লেজেগোবরে অবস্থার মতো ছিল বিরোধীপক্ষের নির্বাচন। সেজন্যই নির্বাচনী বিশ্লেষকরা এসব বিষয়কে আগে থেকেই অস্বাভাবিকভাবে দেখছিলেন নির্বাচনে তাদের এমন ভরাডুবি হয়েছে। 

এসব আচার-আচরণ সরকার পক্ষ থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। আর বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এসব বিষয়ে সবসময়ই খুবই সতর্ক অবস্থানে থাকেন। তাইতো তিনি নির্বাচনের একদিন আগেও সকলকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শমূলক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নির্বাচনে যেকারো অংশগ্রহণ যেমন তার গণতান্ত্রিক অধিকার, আবার নির্বাচন বর্জন করাও তেমনি যেকারো গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যেই পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। সে বিষয়ে কারো কোনো কথা থাকতে পারে না। কিন্তু কথা সেখানেই যদি কোনো ষড়যন্ত্র থাকে। তাইতো শেখ হাসিনা বলেছেন নির্বাচন চলাকালে যা কিছুই ঘটুক না কেন সবাইকে কেন্দ্র থেকে ফলাফল নিয়েই বেরোনোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। 

কারণ, বুঝতে হবে যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে তা দেশের সংবিধান অনুযায়ীই হয়েছে। সেখানে তা মেনেই সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি উৎসবমূখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা জানি মৃত্যুর হিসাব কোনো উদাহরণ হতে পারে না। কিন্তু তারপরও এবছর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রাণহানি সবচেয়ে কম হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইতিহাসে সকল দল ও পক্ষের অংশগ্রহণে যতবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রতিবারই তা হয়েছে উৎসবমূখর। কারণ বাঙালি জাতিগতভাবেই উৎসবপ্রিয়। শীত মৌসুমে এটাকে আরো বেশি আনন্দ উল্লাসে গ্রহণ করে সকলে মিলে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। 

কাজেই নির্বাচনকে ভুল বলার সকল ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেছে। বিজয় হয়েছে গণতন্ত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির। ভরাডুবি হয়েছে বিরোধীদের। এমন নিরঙ্কুশ বিজয় এর আগে দেখা গিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে। নিকট অতীতে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরেও শেখ হাসনার নেতৃত্বে নবম জাতীয় সংসদ এমন নিরঙ্কুশ বিজয় সূচিত হয়েছিল। কাজেই এ বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখাতে হবে। কারণ এবারের নির্বাচনে নতুন প্রায় দেড়কোটি ভোটারসহ মোট ভোটারের প্রায় চল্লিশ শতাংশ নবীণ ও তরুণ ভোটার এখানে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকগণের ধারণা। আর সেজন্যই আগামীতে তারুণ্যের উপযোগী স্বপ্নের একটি বাংলাদেশ পাওয়া যাবে যা স্বাধীনতা আনয়নকারী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেখেছিলেন এবং তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা তা বাস্তবায়ন করে চলেছেন। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে স্বাধীনতার স্বপক্ষশক্তির এমন একটি বিজয় যেন সকলের মঙ্গল বয়ে আনে এটাই দৃঢ প্রত্যাশা।  

লেখক : ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

ব্রেকিংনিউজ/এমজি