বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের স্মৃ‌তি বিজ‌ড়িত পাঠাগা‌রে পাঠকের হাহাকার

আরমান হাসান, জবি করেসপন্ডেন্ট
১০ জুলাই ২০১৯, বুধবার
প্রকাশিত: ০৪:০০ আপডেট: ০৫:০৬

বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের স্মৃ‌তি বিজ‌ড়িত পাঠাগা‌রে পাঠকের হাহাকার

পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলি। অডিও ইন্ডাস্ট্রির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত পাটুয়াটুলিতে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে ‘রাজা রামমোহন রায় পাঠাগার’। বাংলার নব-জাগরণের অন্যতম কারিগর রাজা রামমোহন রায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত এ লাইব্রেরিতে পদচিহ্ন পড়েছে বিশ্বকবি রবিীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। তবে ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ লাইব্রেরিটি হারিয়েছে তার যৌবন, পাঠক খরায় প্রতিদিন হাহাকার করতে হয় তাকে। 

ঢাকার প্রথম এ পাঠাগারে ১৯২৬ সালে এসেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার আগে ১৮৯৮ সালে ঢাকা এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে তিনটি দর্শনীয় স্থানের কথা বলেছিলেন, এর মধ্যে ঢাকার প্রথম পাঠাগারটিও একটি।

কিন্তু সাধারণ মানুষ তো বটেই এমনকি অনেক শিক্ষিতজনই খুব কমই জানেন ঢাকার প্রথম পাঠাগারটির কথা। দু‌ঃ‌খের বিষয় হলো যে, কালের পরিক্রমায় পাঠক সংকটে পড়েছে পুরান ঢাকায় পাটুয়াটুলির ব্রাহ্ম সমাজে অবস্থিত দেশের প্রথম পাঠাগার ‘রাজা রামমোহন রায় পাঠাগার’। এক সময়ের জন-কলরবে পূর্ণ পাঠাগারটিতে এখন বেকার পড়ে আছে হাজার খানেক বই। নেই তেমন আসবাব পত্র। কেউই ভুলেও পড়তে পাঠাগারে পা মাড়ান না। একটু দেখতে কিংবা পড়তে যান, এমন সাধারণ পাঠকের দেখা মেলাও ভার। 

সরেজমিনে দেখা যায়, ব্রাহ্ম সমাজের গেট দিয়ে ঢুকতেই একটি জরাজীর্ণ ভবনের সামনে লেখা আছে ‘রাজা রাম মোহন রায় পাঠাগার’। পাঠাগারটির ভাঙা চৌকাঠে লাগানো হয়েছে তালা। পরিবেশও তেমন পরিচ্ছন্ন নয়। ভিতরে ঢুকে দেখা গেল, যে কয়েকটি আসবাবপত্র আছে তার উপর পড়েছে ধূলাবালির স্তুপ। দেখেই বুঝা যায় অনেক দিন কেউ এ রুমে প্রবেশ করে না কিংবা ধূলাবালি পরিস্কার করা হয় না।

সেখানকার কর্মচা‌রীর সা‌থ কথা ব‌লে জানা যায়, এখা‌নে বিকেল ৪ টা থে‌কে রাত আট টার কথা লেখা থাক‌লেও কেউ পড়ার জন্য আ‌সেনা। আর পাঠাগা‌রের দরজা‌টিও খোলা হয়না। ত‌বে মা‌ঝে মা‌ঝে ঝাঁড়ু দেওয়ার জন্য দরজা খোলা হয়।

ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলা অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যে তিনটি ধর্মমত বিকশিত হয়েছিল তার মধ্যে নবীনতমটি হলো ‘ব্রহ্মধর্ম’। বাংলায় উদ্ভুত নবীনতম ধর্মমত ব্রহ্মধর্মের আদিপুরুষ ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। নিজ সমাজকে যাবতীয় কুসংস্কার থেকে মুক্তি দেয়ার লক্ষ্যে ১৮১৫ সালে রামমোহন গঠন করেছিলেন ‘আত্মীয় সভা’ নামের একটি সমিতি। ১৮২৮ সালে এই সমিতিকে কেন্দ্র করে গঠন করেন ‘ব্রাহ্ম সমাজ’। ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনা, ধর্মালোচনা ও সমাজ সংস্কার মূলক কাজের পাশাপাশি একটি পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এর ফলে ১৮৭১ সালে একটি পাঠাগার স্থাপন করা হয়েছিল।

এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ঢাকার নাট্য আন্দোলনের অন্যতম সূচনাকারী অভয় চন্দ্র দাস। ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমোহন এর নামানুসারে পাঠাগারটি ‘রামমোহন গণ-পাঠাগার’ নামকরণ করা হয়।

১৯১০ সালে প্রায় দশ হাজার টাকা ব্যয়ে সমাজ গৃহের চত্বরে পাঠাগারের জন্য নির্মিত হয়েছিল আলাদা ভবন, যার উদ্বোধন করেছিলেন প্রথম ভরতীয় প্রিভি কাউন্সিলর স্যার কৃষ্ণ গোবিন্দ দত্ত। পাঠাগার ভবনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী। প্রতিষ্ঠা থেকেই বিভিন্ন জনের দানে দুর্লভ-দুষ্প্রাপ্র গ্রন্থের অসাধারণ সংগ্রহশালা ছিল এটি। কিন্তু পরম পরিতাপের বিষয় প্রতিষ্ঠার ঠিক একশ বছর পরে ১৯৭১ সালে এই পাঠাগারটি হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে ধ্বংস হয়ে যায়। তবে এর আগে এমন পাঠাগার একটিও ছিল না।

বাংলাদেশের প্রথম পাঠাগারের বিষয়ে জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবা‌দিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী জাহাঙ্গীর আলম জানান, বই পড়ে জানতে পেরেছেন রামমোহন লাইব্রেরি বাংলাদেশে প্রথম পাঠাগার। সেখানে যাওয়া হয়েছে কিনা বা  চেনেন কিনা জানতে চাইলে তিনি জানালেন, তিনি সেখানে যাননি কিংবা তেমন ঠিক চেনেন না।

পাঠাগারটি সম্পর্কে জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হাসান জানেন না বলে জানালেন।

পাঠাগরটির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয়ের শ্রাব‌ন্তি ইসলাম জানান, এটা পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলিতে অবস্থিত, তবে তিনি সেখানো কোনো দিন যান নি।

ব্রাহ্মসমাজের পাঠাগার সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আজিম বকশ বলেন, ‘একসময় ছিল যখন ঢাকা শহরে তেমন বই পাওয়া যেত না। বই ছিল খুবই কম। তখন আমরা দলবেঁধে ব্রাহ্ম সমাজের পাঠাগারে পড়তে যেতাম। তখন ঢাকা শহর বলতে সূত্রাপুর থেকে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত ছিল। এখনকার মতো তেমন লোকজনও ছিল না। তাই আমরা অনেককেই চিনতাম। বিকেলটা সেই পাঠাগারেই কাটিয়ে আসতাম। তবে এখন মনে হয় পাঠাগারটিতে কেউ যায় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্রাহ্ম সমাজের গৃহ একসময় ছিল কলরবমুখর এখন তা পরিণত হয়েছে নির্জন এক মন্দিরে।’

ব্রেকিংনিউজ/এএইচ/জেআই

bnbd-ads
breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি