তুমি রবে ধ্রুবতারা হয়ে

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
১৪ মে ২০২০, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০৭:৫২ আপডেট: ১০:৪৯

তুমি রবে ধ্রুবতারা হয়ে

বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার আরও এক অগ্রপথিকের জীবনযাত্রা সমাপ্ত হলো। কর্ম, সৃজন, প্রত্যয়দৃঢ়তা আর দূরকে দেখার বহুমুখি প্রতিভার অধিকারী বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপপ, বরেণ্য লেখক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামানের পরলোকের পথে যাত্রা গোটা বাঙালির হৃদয়কে নাড়িয়ে দিয়েছে। শিক্ষক যদি হন অভিভাবক তবে ড.আনিসুজ্জামানও ছিলেন বাংলা ও বাঙালির প্রথম সারির একজন পথপ্রদর্শক। আজ তাঁর নিথর দেহ এই মুক্ত স্বাধীন বাংলায় চির অবসরে ঘুমিয়ে আছে। পথের ক্লান্তি নিয়ে তার এখন গভীর বিশ্রামের কাল। তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রেরণায় সংগ্রামে রয়ে যাবেন ধ্রুবতারা হয়ে। 

জীবনের ৮৪ বসন্ত পেরিয়ে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ড. আনিসুজ্জামান। দেশবরণ্যে এই শিক্ষাবিদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

দীর্ঘদিন ধরেই ফুসফুসের সংক্রমণসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলেন দেশবরেণ্য এই ব্যক্তিত্ব। মহাখালীর ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতালে (সাবেক আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতাল) গত ২৭ এপ্রিল থেকে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৯ মে পরিবারের ইচ্ছায় তাঁকে সিএমএইচ হাসপাতালে নেয়া হয়। ওই সময় ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী জানিয়েছিলেন, ড. আনিসুজ্জামান হার্ট, কিডনিসহ বেশ কিছু জটিল রোগে ভুগছিলেন। এক পর্যায়ে তার স্মৃতিভ্রষ্টতা দেখা দেয়।

১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কলকাতার পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত এই শিক্ষাবিদ ও লেখক। তার পিতার নাম এ টি এম মোয়াজ্জেম। তিনি ছিলেন বিখ্যাত হোমিও চিকিৎসক। মা সৈয়দা খাতুন গৃহিণী হলেও লেখালেখির অভ্যেস ছিল। পিতামহ শেখ আবদুর রহিম ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। আনিসুজ্জামানরা ছিলেন পাঁচ ভাই-বোন। তিন বোনের ছোট আনিসুজ্জামান, তারপর আরেকটি ভাই। তার বড় বোন নিয়মিত লিখালিখি করতেন। 

আনিসুজ্জামানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে। এখানে তৃতীয় শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। এরপরই ভারত ভাগ হয়। তিনি ছাত্রবস্থাতেই পরিবারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। এরপর বাংলাদেশে এসে তিনি অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন খুলনা জেলা স্কুলে। এর এবছর পরই পরিবারের সঙ্গে চলে আসেন ঢাকায়। ঢাকায় এসেই ভর্তি হন প্রিয়নাথ হাইস্কুলে (বর্তমান নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়)। 

১৯৫১ সালে এ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৫৭ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও শিক্ষক ছিলেন মুনীর চৌধুরী।

১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বাংলা একাডেমির গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি আমলের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারায ১৭৫৭-১৯১৮ বিষয়ে পিএইচডি শুরু করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর পর তিনি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। 

১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস: ইয়ং বেঙ্গল ও সমকাল বিষয়ে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন ড. আনিসুজ্জামান। ১৯৬৯ সালের জুনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের রিডার হিসেবে যোগদান করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেন এবং পরবর্তীতে ভারত গমন করে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ - ৭৫ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষণা করেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্পে অংশ নেন।

১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। ২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পরে সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে আবার যুক্ত হন। তিনি মওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজ (কলকাতা), প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। এছাড়াও তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানে তিনি শিল্পকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা যামিনী এবং বাংলা মাসিকপত্র কালি ও কলম-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। 

ড. আনিসুজ্জামান প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলছিলেন, ‘সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি ভাবনার ক্ষেত্রে চেতনার বাতিঘর ছিলেন তিনি। একজন শিক্ষক, একজন সমাজ-মনস্ক মানুষ, প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী একজন অনন্য সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা সবসময় তাকে বিবেচনা করি।’

১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের শূলচক্ষু উপেক্ষা করে রবীন্দ্র জন্ম-শতবর্ষ অনুষ্ঠানে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল ড. আনিসুজ্জামানের জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ১৯৬৭ সালে একটি খবর ছাপা হয়- রবীন্দ্রনাথের গান পাকিস্তানের জাতীয় ভাবাদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে বেতার ও টেলিভিশনে কর্তৃপক্ষকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচার হ্রাস করতে বলা হয়। এর প্রতিবাদে সেসময় বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে বিবৃতিতে আনিসুজ্জামান স্বাক্ষর করেন এবং সেটা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়। 

এ ঘটনা নিয়ে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘সেই সময় থেকেই ড. আনিসুজ্জামান তাঁর ভূমিকার জন্য মধ্যবিত্ত বাঙালির সংস্কৃতির আন্দোলনের অগ্রগণ্য পথিকৃত হয়ে দাঁড়ান।’

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভূত্থান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তীকালে প্রতিটি জাতীয় গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল এই বিশিষ্ট লেখক ও শিক্ষাবিদের।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে গিয়ে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন ড. আনিসুজ্জামান। বর্তমানে বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান বাংলা ভাষায় অনুবাদের যে কমিটি ছিল সেটারও নেতৃত্বে ছিলেন ড. আনিসুজ্জামান। ১৯৯১ সালে গঠিত গণ আদালতের একজন অভিযোগকারী ছিলেন তিনি। গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া মোটেই সহজ কাজ ছিলো না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে তিনি তাঁর কর্মজীবন শেষ করে অবসরে ছিলেন। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিস্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ে তাঁর গবেষণাগ্রন্থগুলো সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। 

প্রবন্ধ গবেষণায় অবদানের জন্য ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি থেকে প্রদত্ত বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন বিশিষ্ট এই গবেষক ও সাহিত্যিক। শিক্ষা ও সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাকে দেশটির তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ পদকে ভূষিত করে। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন তিনি। 

এছাড়াও ১৯৯৩ ও ২০১৭ সালে দুইবার আনন্দবাজার পত্রিকার ‘আনন্দ পুরস্কার’, ২০০৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট. ডিগ্রি এবং ২০১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদকে ভূষিত হন ড. আনিসুজ্জামান। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার দেশবরণ্যে এই শিক্ষাবিদকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়। 

রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা। আমৃত্যুর দুঃখের তপস্যা এ জীবন, সত্যের দারুণ মূল্য লাখ করিবারে, মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ ক’রে দিতে।’ কবিগুরুর এই চরণগুলোর মতোই আজীবন ‘কঠিনেরে ভালোবেসে’ গেছেন ড. আনিসুজ্জামান। সত্য যতই কঠিন হোক তাকেই করেছেন লালন। গোটা জীবনে এক মুহূর্তের জন্যই মিথ্যার সঙ্গে অসত্যের সঙ্গে করেননি আপস। এই সাত্ত্বিকজন আজ বাংলার আকাশে ধ্রুবতারা।    

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads
breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি