অথই নীড়ের একগুচ্ছ কবিতা

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
২২ আগস্ট ২০২০, শনিবার
প্রকাশিত: ০৫:৫৪ আপডেট: ০৬:১৩

অথই নীড়ের একগুচ্ছ কবিতা

বেঁচে থাকো জীবন

*******

বিষের কৌটো ঢেলে দিচ্ছে উপচে পড়া রাত।
রশিতে ঝুলছে মায়ার ফুল।
স্লিপিং পিলে বরফ জমেছে, ছুরির শরীরে সবুজ শৈশব।
বহুবার মরে যাওয়া মানুষ তবু নিমফুলের গন্ধ নিতে নিতে
নিমের ডালে রেখে যায় জীবন।

নদীপাড়ে সঙ্গীহীন গাছে লিখা থাকে মৃত্যু।
ঝোপ-জঙ্গলে ঝরে পড়ে অভিমান। অস্ত বিকেল।
মায়ের চোখে একজোড়া নদী। দশ মাসের বৃষ্টি।
স্নেহ ও আদর।

স্থলপদ্মে সূর্য নামে, আষাঢ়ের স্বাদ, প্রথম যৌবন।
শরীর ভর্তি ব্যথা নিয়ে ফুলের জন্মে প্রতিজ্ঞা থাকে ক্যাকটাসে।
মানুষ কিছু না পারো- বৃক্ষের শীতলতা পড়ো,
পড়ো পাখি আর নদীর সংসার
ক্লান্ত নক্ষত্রের ভ্রমণ।

পায়ের ভিড়েও বেঁচে থাকো ঘাসফুল
আগলে রাখো পথ ও পথিক।

রোদে ক্ষত শুকিয়ে  
বন্ধুদের আড্ডায় তুমুল কাঁপাও মগড়ার জল
পাতায় পাতায় ঢেলে দাও বুকের লাল।

বিষের কৌটোয় মৃত্যু লুকিয়ে ডালিমের বিচিতে 
বেঁচে থাকো জীবন।


ভোর ও মানুষের অসুখ

*******

চায়ের কাপে শেষ হয় আমাদের বাউল রাত।
রাতের গল্প বলে তিনজোড়া ভোরের চোখ।

ছাদের বাগানে চারাগাছেদের ফিসফাস, টমেটো রোদ পোহায় শীতল বাতাসে।
একজীবন স্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেখি আমার কোনো ব্যথা নেই।
ঘুঘু পাখির মতো অলস দুপুরের গল্প বলি।
কুর্চি গাছের ছাতায় হিজল গাছ মুখ ঢাকে, জল ঝিঁ-ঝির শূন্য ঘর।
বৃষ্টি আর মেঘের সন্ন্যাস মুখস্ত করে মুছে দেই পৃথিবীর সব ব্যথা।
তোমার কৃষক জন্ম, ফসলের অসুখ।

কালো চামড়াতে ব্যথা আছে, সে খোঁজ ভোরের দোয়েল ও রাখে।
অশ্বত্থ গাছ অবলীলায় শুষে নিচ্ছে পথিকের নিঃশ্বাস। মানুষের সহজ হাসি।
ফাঁকা রাস্তাগুলো সব নিয়ে হা করে গিলে খাচ্ছে।
চুপচাপ যন্ত্রণা লুকিয়ে ভুলে যাচ্ছি রক্তমাখা বুক।

বৈসাবী উৎসবের উন্মত্ত যুবতী আমি।
পায়েল ছুঁড়ে দিয়ে নদী হয়ে যাই। কচুরিপানার দীঘিতে অন্ধকারের ঢল।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শোনাই জনপদের গল্প, বল্লাল সেনের শাসন।

আমার ব্যবচ্ছেদে তোমাদের জন্ম, 
হারিয়ে যাওয়া আঙুল।


ফুলকুমারীর দল

*******

কদম ফুলের শরীরে ঝুম হয়ে আষাঢ় নেমেছে।
পুকুরের জলে মানুষের সংসার, দৈনিক কোলাহল।
পরাশর গোত্রের যুবতী আমি, 
ডুমুরের আয়নায় তুলে রাখি ঝরা বকুল।
হাতের তালুতে জীবন রেখে দেখি, 
আয়নায় আমার মুখ ছাড়া আর কিছু নেই।
তুমি আমি খুব একা।

ডুমুরের আয়না নিজের শরীরে দেখায় জলপোকাদের ফসিল।
বহুযুগ আগে ক্ষত্রিয় এক যুবক তালের পাতায় লুকিয়ে ছিলো উষ্ণতা। লাল চোখ। 
একা মাঠে বসে কার্তিক ঠাকুর সেদিন মুচকি হেসেছিলেন। 

খড়ের আগুনে পুড়ে গেছে কত রাত। খেজুরের থোকার রং বদল। 
পরাশর গোত্রের যুবতী আমি, ডুমুরের আয়নায় ফুলকুমারীদের দীর্ঘশ্বাস তুলে রাখি। 
মেঠোপথে শরীর বদলের ছায়া, ওড়নায় লুকানো রোদ। 
কাগজের নৌকায় পুতুল বৌ ঘর ছাড়ে। গোত্র বদল হয়, রক্তকে কী করে ভাসায় জলে। 
নিজের ছায়া কাঁপায় নিজেকেই। স্বপ্ন এতো পোড়ায় কেনো।

ঘরছাড়া যুবক ভোরের গান গেয়ে যায়। বটগাছের শোক, ক্লান্ত অরুন্ধুতী। 
পাতার বাঁশির সম্মোহনে নির্ঘুম রাত। অপরাজিতার ঘ্রাণে শত শত বিষণ্নতা। 
ফুলকুমারীদের বয়স বাড়ে। 

মুছে যায় চেনা পথ, বৃষ্টি মেখে ঘরে ফেরা উড়ন্ত বিকেল।
ক্ষত্রিয় যুবক, তবু তোমার চোখেই আমার শেষ আশ্রয়। 

*******
ঘুঘু পাখি ও নদী বৃত্তান্ত

ঘুঘু পাখিটারও একটা সাথি আছে। 
উড়তে উড়তে ক্লান্তি এলে সাথিটা পালকে তাকে জড়িয়ে নেয়।
তোমারও তো ঘর আছে, আছে ফুল পাতা রঙের পৃথিবী।
উঠোন আছে, ধানের গন্ধ আছে, প্রেমিকা আছে।
আমার আর কিছু নেই, বন্ধু নেই শত্রুও নেই, পালকে লুকিয়ে যাওয়া নেই।

ঘুঘু পাখিটাও জানে-
গোপনে ভালোবাসা এলে তাকে ডানায় করে ভাসিয়ে দিতে হয়।
অজস্র স্বপ্নে যে কুমার পুত্র একদিন হারিয়েছিল, 
সে-ও জানে কিছু পাখি একাই বাঁচে; 
সাঁতার কাটে নিজের অস্তিত্বে।

কংসের পাড় ছুঁয়ে একদিন কাশফুলের বুকে চর জমেছিলো।
ঘুঘু পাখিটা চিঠি হয়ে উড়ে ছিলো রাতের পর রাত।
দু’পায়ে জল ভেঙে মগড়া হয়েছিলো ষোল বছরের বালিকা, জ্যোৎস্নায় বৃষ্টিতে।
ব্রহ্মপুত্র তখন পাঠ নিচ্ছিলো কারো না থাকার শূন্যতায়
কুয়াশায় ভিজে কেমন একা থাকতে পারে, 
ল্যাম্পপোস্টের ছায়ায় কেমন লুকাতে পারে বুকের ক্ষত।

সোমেশ্বরীর জলে লাল রঙ চোখ ধুঁয়ে দেখি জোনাকির জলসা, নামহীন অসুখ।
রাতের কোলাহলে আজলা ভরে জল দেয় সে, উবু পিঠে লুকায় জীবন।
ধুলোর চরে ঝরাপাতার চুম্বন, সোমেশ্বরীর আঙুলে আঙুল রেখে
ঘুঘু পাখি দেয় উড়াল। 

জীবনের কোনো নাম নেই। 
মেঘ হতে হতে স্বয়ং জলাঙ্গীও তা জানে।


জলপাহাড় পাখা উড়ায়

*******

সময় ছুটতে ছুটতে একদিন থমকে দাঁড়াবে।
কংসের শরীরে হারানো ঘর খুঁজে পাবে মানুষ।
চরের সবুজে বাদামের গন্ধ নিয়ে দূর পথ পাড়ি দেবে জলযান।
তরমুজের খোলসে লেখা থাকবে মানুষের শ্রম।

সময়েরও অসুখ হয়। সভ্যতা ঘুরে দাঁড়ায়।
মাঝরাতে উড়ে যাওয়া মেঘ কানে কানে বলে যায়-
পাতাবাহার প্রাণিদের ভিড়ে নিজের অস্তিত্ব খুঁজতে যেওনা,
শ্যাওলায় ঢেকে যাবে চোখ; রাতের দীর্ঘশ্বাস।

শ্রাবণ পূর্ণিমায় খসে পড়ে চালতাফুল। 
রাতের প্রহরী বাঁশিতে লুকায় অজস্র ব্যথা,
রমণীর জৌলুস। মুদ্রা ভাঙা বুকের ঘড়িতে রাত বাড়ে।
প্রিয় রাস্তাও একদিন আর মনে রাখবে না। 
জঙ ধরা বাঁশি ক্ষত আঁকবে।
ঘোড়ার পিঠে সোনালি ধান, আমাদের ভুলে যাওয়া দিন।

অঘ্রাণ মাঠের শীতলতা খোয়া গিয়েছিলো রঙিন সকালে।
আমার জন্মের বহু আগে পিতামহ গচ্ছিত রেখেছিলেন বুকের সবুজ।
কংসপুত্রের চোখ জানতো সময়ের অসুখ, বটবৃক্ষের ছায়া হারানোর গল্প।
জানতো ভাঁজহীন সোয়েটার কাঁপিয়ে শীত নামবে একদিন।
মানুষেরা ইতিহাস ভুলে যায়। তুমি-আমি আমাদের ভুলে যাই।
মুসলধারে বৃষ্টি এলে দেখি এক জীবন কোথায় উড়ে গেছে।
মনের অসুখ সেরে যায়। শূন্যতার প্রলেপ জমা রাখি।
বৃষ্টি ভর্তি আঁচল নিয়ে আমিও আর ফিরতে পারি না।

প্রিয় খামে দুঃখ লিখো তুমি।
কংসকন্যা ভোর দেখে, নিঝুম ভোর। 
পাখির চোখে তুলে রাখা জলপাহাড়।


নিশাচর প্রাণি ও প্রেম

*******

বৃষ্টির পুরাণ খুলে মুখস্ত করেছি আদিম জীবন।
ক্যাকটাসের ফুলে আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, প্রিয় যৌবন।

আমরা বহুদিন নিশাচর, প্রহরীর বাঁশিতে পাহাড়া দিয়েছি শূন্য বাগান।
তালপাতায় লেখা গল্পের শহর, বটের বুকের পরগাছা; 
সহস্র বছর কিছুই বেঁচে থাকে না।
মহেঞ্জোদারোর নিচে চাপা পরে আছে কতো প্রেম। 
তুমি কি একবারো আয়না ভেঙে হয়েছো সবুজ! 
আঙুলের রেখায় সখ্যতা গড়েছো লাল কলমের কালিতে!

পালইয়ের স্তুপে ভরে যাওয়া উঠোন রাত নিভিয়ে সূর্যোদয় ডেকে আনে।
আমাদের প্রেম কবেই তো গিলে নিয়েছে মুনিয়ার ঠোঁট।
তবু বারংবার জন্মকে লিখে রাখি বাঁচার তাগিদে।

পড়শির লাউ গাছ ফণা তোলে ভোরের বিরুদ্ধে।
মেঘবিহীন দিনে বেড়ে ওঠে উন্মাদ ঘাসফড়িং।



ব্রেকিংনিউজ/এমআর

breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২০ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি