এতোদিন সে মানুষ ছিল না!

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০৯:২৫ আপডেট: ০৯:৩০

এতোদিন সে মানুষ ছিল না!

অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরী হয়েছিল অবনীর। মাঝে মাঝে এমন একটু আধটু দেরী হয়েই থাকে। তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। বাড়ির লোকজনও জানে মাঝে মধ্যে অফিস থেকে ফিরতে তার একটু দেরী হয়েই থাকে। তবে আজকের মতো এতাটা দেরী কখনো হয়নি অবনীর। শিবানী তাই একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। কেন জানি অজানা ভয়ে তার মনটা শিউরে উঠছিল বারবার। আজকাল পত্র/পত্রিকায় যে সব সংবাদ বের হচ্ছে, তা পড়ে সে আতংকিত হয়ে পড়ে।

এছাড়া অন্য একটি ভয় তাকে যেন অবনীর কাছ থেকে আরো দূরে ঠেলে দিচ্ছে। শিবানী ভালো করেই জানে অবনী ছাড়া এই পৃথিবীতে তার আপন বলতে আর কেউ নেই। মা-বাবা কবেই মারা গেছেন। একমাত্র ভাই রঞ্জন থেকেও নেই। এখন অবনীই তার একমাত্র আশ্রয়স্থল। অবনীর সাথে বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় দশ বছর হতে চলল। এখনো তাদের ঘর আলো করে কোনো সোনামণি আসেনি। তা নিয়ে শিবানীর দুঃখের শেষ নেই। তার ধারণা, ছেলে-মেয়ে না হবার জন্যে সে নিজেই দায়ী। 

বিয়ের প্রথম বছরই অবনী চেয়েছিল সন্তান নিতে। কিন্তু তাতে শিবানী রাজী হয়নি। বলেছিল এতো তাড়া কিসের। সময় তো আর ফুরিয়ে যাচ্ছে না। আজকাল কতো কিছু বেরিয়েছে। নিজেদের ইচ্ছে মতো যখন খুশী সন্তান নেয়া যাবে। অবনী সেদিন শিবানীর কথার কোন প্রতিবাদ করেনি। সে তার কথা নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছিল। ভেবেছিল শিবানীর কথাই থাক। যখন তার ইচ্ছে হবে, তখন না হয় ছেলেমেয়ে নেয়া যাবে।

অবনী মানুষটা সহজ সরল ধরনের। কখনো মিথ্যা কথা বলে না। অফিসের সহকর্মীরা তাকে বোকা বলে। একটা সৎ বিশ্বাস নিয়ে সব সময় চলতে চায়। শিবানীর ইচ্ছে মতোই সংসারের একান্ত  ব্যক্তিগত বিষয়গুলো চলতে দিচ্ছে। সে জানে শিবানীর আপন বলতে সে ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই। তাই তাকে  তার মতো করেই চলতে দেয়া উচিত। শিবানীর আজকাল মনে হয় সময় মতো যদি সে মা হতো, তাহলে আজ তাকে এতোটা কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হতো না। প্রথম এক দুই বছর সে পিল খেতো। তাতে কোনো সমস্যা হতো না। অবনীও কোনোদিন তার স্বাধীন ইচ্ছার ওপর বাধা দিত না। এক সময় যখন তার চোখের ওপর কোমল শিশুর মুখ দোল খেয়ে উঠতো কচি ধানের পাতার মত, শিবানী তখন ভাবতোএবার সে মা হবে। অবনীর কাছে কথাটা বলতে প্রথম খুবই লজ্জা পেয়েছিল। প্রথম কয়েকদিন বলি বলি করেও বলতে পারেনি। শেষে যখন অবনীর কাছে কথাটা খুলে বলল, তখন অবনী যেন অচেনা অজানা আনন্দের শিহরণে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল। যদিও তার প্রকাশ ভঙ্গিমা এতটা উচ্ছল ছিল না। 

অবনী শিবানীর কথা শুনে প্রথমে হেসেছিল। এক সময় তার মুখটি তার দুই হাতের তালু মধ্যে নিয়ে বলেছিল, তোমার যখন ইচ্ছা তখন তাই হবে। কথা শুনে শিবানী যেন থমকে যায়। সে অবনীর দুই হাতের তালু থেকে নিজেকে মুক্ত করে তখন বলেছিল, আমার ইচ্ছা তাই হবে। তবে কি তোমার পিতা হবার ইচ্ছে নেই। তুমি কি আমাকে কোনো কিছুর জন্যে দায়ী করতে চাও। অবনী বলে আমার ইচ্ছে থাকবে না কেন। আমর তো বিয়ের পর প্রথম বছরে জনক হবার ইচ্ছে হয়েছিল। আর এখানে দায়ের কথা উঠছে কেন। আমি কি তোমাকে কোনোদিন কিছু বলেছি।
-না, তোমার কথার ধরন দেখে মনে হয় সবকিছুর জন্যে আমিই দায়ী। 
-তুমিই কিন্তু প্রথম বছর বাধা দিয়েছিলে। আমি তখন প্রতিবাদ করতে চাইনি।
-আমি বাধা দেইনি। আমি চেয়েছিলাম একটু সময় নিতে। যাতে করে আমরা সবকিছু গুছিয়ে নিতে পারি।
-এখন অযথা তর্ক করে কি লাভ?
-তুমিই তো তর্ক করার সুযোগ করে দিচ্ছো। তোমার ভাবখানা এমন, যেন সব কিছুর জন্যে আমিই দায়ী।
-হয়েছে এখন মুখ বন্ধ কর। কেউ এখানে আদালত বসাচ্ছে না। 

অবনী আর কথা বাড়ায়নি। কি কাজে যেন রান্না ঘরে গিয়েছিল। শিবানী যখন মা হবার জন্য তৃঞ্চার্ত চাতকের মতো ছটফট করছিল, তখন দেখা গেল সন্তান হবার মতো কোন লক্ষণ তার মধ্যে ফুটে উঠছে না। অবনী প্রথম প্রথম এতটা চিন্তিত ছিল না। সে ভাবতো একদিন শিবানীর মধ্যে মা হবার লক্ষণ ঠিকই ফুটে উঠবে। তারপরও অনেকদিন অনেক মাস চলে যাবার পরও যখন শিবানীর মধ্যে সন্তান আসার লক্ষণ দেখা গেলো না, তখন সব কিছু মেনে নিয়ে অবনী তার ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিল। শিবানী যে দিন হেমন্তের রাত্রির মিলন শেষে অবনীকে জড়িয়ে  ধরে বলল, কইগো আমার মধ্যে তো কোনো লক্ষণই দেখা দিচ্ছে না। আমি এজন্মে আর মা হতে পারবো না। 

অবনী শিবানীর কথা  শুনে ভিতরে ভিতরে আতংকিত হয়ে পড়েছিল। তবু সে এক ঝলক হাসির ঠেলায় শিবানীর হতাশা মিশ্রিত করুণ আর্তনাদকে উড়িয়ে দিয়েছিল। যেন সে শিবানীর কথা শুনতেই পায়নি কিংবা শিবানী কি বলেছে বুঝতেই পারেনি। অবনীকে এমনভাবে হাসতে দেখে শিবানী রেগে উঠে বলেছিল, তুমি কি সব ব্যাপারেই উদাসীন থাকবে। অবনী তখন তার কথাকে আরো হালকাভাবে নিয়ে বলল, দাঁড়াও সিগারেট ধরিয়ে নেই। তারপর তোমার কথার জবাব দেব। এই কথাটুকু বলেই অবনী এক লাফে বিছানা থেকে উঠে মশারির স্ট্যান্ডে ঝুলানো শার্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট হতে একশলা সিগারেট হাতে নেয়।তারপর আবার সিগারেটের প্যাকেটটা শার্টের পকেটে রেখে দেয়। সে সিগারেটে আগুন ধরানোর জন্যে শিবানীকে বলে ম্যাচটা কোথায় রেখেছো। এক সময় সে ম্যাচটা বালিশের নিচে পেয়ে যায়। অবনী সিগারেট ধরিয়ে মুখ থেকে একরাশ ধূয়া শূন্যতায় ছড়িয়ে দিয়ে বলে, এতো বাজে চিন্তা কেন করো। শিবানী অন্ধকারের মধ্যে জ্বলন্ত সিগারেটের নীরব আলোয় অবনীর মুখটা দেখতে পায়। সে দেখে অবনীর মুখের মধ্যে এক রাশ নীরব অভিমান লেপ্টে আছে। যেন বলছেএখন এসব বলে লাভ কি। তুমিইতো প্রথম প্রথম মা হতে চাওনি। এতোদিন পিল খেয়েছ। তাতে যদি ক্ষতি হয়ে থাকে, তবে আর কাকে দোষ দেবে। অবনী এসব কথা কোনদিন বলবে না সে জানে। কিন্তু তার কাছে মনে হয়েছে অবনী যেন এসব কথাই তাকে বলতে চাইছে। নিজেকে কিছুটা স্থির করে শিবানী অবনীকে বলে, এসব কি বাজে চিন্তা হল। 

-বাজে চিন্তা নয়তো কি। আমাদের ভাগো যদি সন্তান থাকে তাহলে অবশ্যই হবে। 
-সব কিছু কি ভাগ্যে হাতে ছেড়ে দিলে চলে। 
-তুমিতো জানো আমি অদৃষ্টবাদী। জোর করে কিছু হয় না। 
- চল না আমরা ডাক্তারের কাছে যাই।তোমাকে দেখলে তো মনে হয় না তুমি এসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছো। 
-আমার কোন কিছুর বিশাল প্রকাশ নেই। তুমি তো ভাল করেই জানো। 

অবনী শিবানীকে অনেক বড় বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। নিজেকেও ডাক্তার দেখিয়েছে। প্রত্যেক ডাক্তারই বলেছে তার কোনো সমস্যা নেই। তবে শিবানী কোনোদিন মা হতে পারবে না। ডাক্তারের কথা তার বিশ্বাস হয়নি। এক ডাক্তারের কাছ থেকে আরেক ডাক্তারের কাছে শিবানীকে নিয়ে গেছে। অবনী বড় বড় ডাক্তার দেখানোর পরও যখন কোনো আশাই পেলো না, তখন  শেষে আর কি করে। সে শিবানীকে গ্রাম্য কবিরাজের কাছে পর্যন্ত নিয়ে গেছে। তারপরও শিবানী মা হতে পারেনি। তখন তাকে যে যা করতে বলেছে, সে তা-ই করেছে। কোনো কিছুতেই বিন্দুমাত্র কৃপণতা দেখায়নি। 

আজকাল অবনী প্রায়ই লক্ষ্য করে শিবানী কেমন যেন তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। আগে এমন ছিল না। যখন সে জানলো কোনো দিন মা হতে পারবে না, তখন থেকেই তার মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। 
আগে কথা বলতো কম। এখন কথা বলে বেশি। আগে তার সাথে ঝগড়া বিবাদ কম হতো। এখন প্রায়ই কথায় কথায় সে ঝগড়া করে অবনীর সাথে। এক কথা বার বার বলে। অফিস থেকে ফিরতে অবনীর যদি একটু বেশি দেরী হয়ে যায়,তখন কেমন গম্ভীর ভাব নিয়ে বসে থাকে। অবনী শিবানীর এমনতর আচরণে অনেক সময় রেগে উঠে। যদিওতা প্রকাশ করে না। শিবানী কষ্ট পেলে তার মন যেন কেমন করে উঠে। তাকে কিছু বলতে গেলে সে আরো কষ্ট পাবে।

 অবনী ভালো করেই জানে শিবানীর কষ্ট বাড়লে সে ভাল থাকতে পারবে না। আজো অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরী হয়েছে অবনীর। তা নিয়ে শিবানী কোন কথা বলেনি। বাড়ির সবাই তাকে অনেক কথা বলেছে। অবনী কিছুই বলেনি।মনে হয়েছে এমন দেরীতে বাড়ি ফেরা প্রায়ই হয়ে থাকে। তা নতুন কিছু নয়। নিত্যদিনের ব্যাপার। তার আজকের দেরী হওয়া নিয়ে সবাই মাথা ঘামাচ্ছে কেন। ওর সাথে শিবানীও কথা বলছে না। সে এমন কি অপরাধ করেছে ভেবে পায় না। হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসেও অবনী লক্ষ্য করেছে শিবানী তার সাথে কথা বলছে না। কোনো ধরনের শব্দ নাকরেখাবার পরিবেশন করে যাচ্ছে। 

অবনী ঠাণ্ডা মানুষ। মন গরম হলেও কখনো তা প্রকাশ পায় না। সে খেতে বসেও মন মতো খেতে পারেনি। এখন অফিসে ঝামেলা খুবই বেশি। অফিসের সব দায়দায়িত্ব এখন তার ওপর। একটা বেসরকারি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় সে কাজ করে। সময়মতো সব কিছু করতে হয়। অফিস সহকারী নিভা তাকে বলে, অবনীদা আপনি পারেনও। আমি না হয় মেয়ে মানুষ। আমাকে সবকিছু মেনে চলতে হয়। আপনি তো পুরুষ মানুষ। ইচ্ছে করলেই একটা ছেড়ে আরেকটা কাজ পেয়ে যাবেন। অবনী নিভার কথা শুনে হাসে। বলে, বয়স তোমার কচি। এখনো চাকরির বাজারের হালচাল বুঝতে পাারছো না। একদিন সময় হলে ঠিকই বুঝতে পারবে। এভাবেই নিভার সাথে ওর কথা হয়। মেয়েদের সাথে কথা বলতে এমনিতেই তার মনের মধ্যে একটা দ্বিধা খেলা করে। অফিসের কে কি মনে করে। তার মধ্যে সে আবার নিঃসন্তান। অলস লোকেরা ভাবতে পারে, অবনী ঘরে বউ রেখেও অন্যদিকে হাত বাড়াচ্ছে। অথচ এই নিভাকে নিয়ে বাড়ির সবাই তাকে সন্দেহ করবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি। 

রাতে ঘুমাবার আগে হাতের কাছে কোনো পত্রিকা পেলে অবনী তাতে একটু চোখ বুলিয়ে নেয় । আবার কখনো ছোটদের ঠাকুরমার ঝুলির মতো রূপকথার গল্পের বইওপড়তে ভালোবাসে। সে রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পত্রিকা পড়ছিল মন দিয়ে। শিবানী তখনো রান্না ঘরে। রাতের সব টুকটাক কাজ শেষ করে ঘুমাতে আসতে তার একটু দেরী হয়। শিবানী অনেকদিন এসে দেখে অবনী ঘুমিয়ে পড়েছে। আজো অবনী ঘুুমিয়ে পড়েছিল। শিবানী এক ধাক্কায় তাকে জাগায়। বলে তোমার চোখে এত তাড়াতাড়ি ঘুম আসে কি করে।

অবনী কিছু বলে না।ঘুমের ঘোর নিয়েই শিবানীর দিকে চেয়ে থাকে। বুঝতে পারে তার স্ত্রী রেগে আছে। শিবানী আবারো জোরে ধাক্কা দেয়। বলে উঠো তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে। অবনী চোখ কচলাতে কচলাতে বলে, রাত দুপুরে কি শুরুকরলে। তোমার তেমন কিছু বলার থাকলে কাল সকালে বলো। আমার খুব ঘুম পেয়েছে।
 
-না, এখনই শুনতে হবে। 
-এমন কি কথা যে এখনই শুনতে হবে। 
-আগে শোন। তারপর বুঝবে কি এমন জরুরি কথা। 
-তাহলে বলো, 
-নিভা নামের মেয়েটি কে? 
-সে আমাদের অফিসে কাজ করে। অফিস সহকারী। 
-সে দেখতে কি আমার চেয়েও সুন্দরী। 
-কেন, কারো সাথে কি বিয়ের আলাপ করবে। 
-এমনভাবে কথা বলবে না। তার সাথে কি তোমার কোনো সম্পর্ক আছে। 
-এসব নোংরা আলাপ করার জন্যেই কি আমার কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়েছো। 
- তাকে নিয়ে আজ কোথায় গিয়েছিল। 
-আজ নয়। গতকাল আমরা ডিসি অফিসে গিয়েছিলাম। ঢাকা থেকে আমাদের এক বস আসছেন। তার জন্য রেস্ট হাউসে একটা রুমের ব্যবস্থা করতে। তাতে কি হয়েছে। 
-এক রিকশায় গিয়েছিলে নিভাকে নিয়ে।
-হ্যাঁ, অফিস তো আর আলাদা করে রিকশা ভাড়া দেবে না। 
-তুমি একা গেলে হতো না। 
-আমি একা গেলে যদি চলতো, তা হলে আর নিভাকে নিলাম কেন। 
-তুমি নাকি আজকাল প্রায়ই তাকে নিয়ে ঘুরাফেরা কর। 
-তোমাকে তা কে বলেছে। 
-কে বলবে আবার। সবাইতো এখন তাই বলে। 
-তুমি কি সবার কথা বিশ্বাস করবে, না আমার কথা বিশ্বাস করবে। 
-আমি তোমার কথাই বিশ্বাস করতে চাই। 
-তাহলে শোন, নিভা আমাদের অফিস সহকারী। চাকরির খাতিরে তার সাথে যতটা কথা বলতে হয় আমি ততটাই বলি।এর বাইরে আর কিছু নয়। এতোটা সন্দেহ করা কি ভালো। 
-তাহলে লোকে এত কথা বলে কেন। 
-প্রশ্নের উত্তরটা তুমি তাদের কাছ থেকে জেনে নিও। যারা তোমার কান ভারী করে। বাজে কথা বলার লোকের কি অভাব আছে জগৎ সংসারে। 

অবনী আর শিবানীর সম্পর্কটা যেন দিন দিন অদ্ভুত ভাবে আলগা হয়ে যাচ্ছে। সে ভাবতেই পারে না তার স্ত্রী তাকে এমনভাবে সন্দেহ করবে। এমনিতেই তো সে সহজ সরল মানুষ। কারো সাতে পাঁচে থাকে না। সেই কলেজ জীবন থেকেই অবনী সব ঝুট ঝামেলা এড়িয়ে চলত। তার সঙ্গের ছাত্রর যখন মিছিল মিটিং নিয়ে মেতে থাকতো, তখন সে লাইব্রেরীর মধ্যে শরৎ চন্দ্রের উপন্যাসের মধ্যে ডুবে থাকতো। কোনোদিন কোন মেয়ের সাথে কথা বলতেও ইচ্ছে হতো না। অথচ সে দেখতেও যেমন খারাপ ছিল না, তেমনি লেখাপড়ায়ও ভালো ছিল। তার পরিবারের লোকজন এতোটা অভাবীও ছিল না। শহরের সবাই তাদের চিনতো মোটামুটি ভালো লোক বলে।

 অথচ আজ নিভাকে জড়িয়ে অবনীকে নিয়ে এতোটা কথা উঠছে। শিবানী পর্যন্ত তাকে বিশ্বাস করতে চায় না। কেমন সন্দেহর চোখে তাকায়। সে অনেক কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। তার ভিতরে যেন একটা ক্রোধের জন্ম হচ্ছে। মনে হয় ভিতরে ভিতরে জন্ম নেয়া ক্রোধের আগুন সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে। সে ইচ্ছে করলে নিজেকে আরো গুটিয়ে নিতে পারে। আবার নিভাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে যত্রতত্র। নিঃসঙ্গ মানুষ সে। তার কি আছে। এতোদিন ওর স্ত্রী শিবানী ছিল। এখন সে-ও তাকে বিশ্বাস করে না। অবনী মানুষের চরিত্রটাই বুঝতে পারে না। কি অপরাধ ছিল তার। সে তো কোনো দিন কারো সাথে অশোভন আচরণ করেনি কিংবা সে তো কোনোদিন মেয়েদের সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেমও করেনি। তবে কেন কাছের মানুষরা তাকে বিশ্বাস করবে না। তার নামে কেউ কোনোদিন খারাপ কথাও বলতে পারেনি। সে এমনই ভাল মানুষ ছিল। বন্ধুরা বলে অবনী এ সংসারের মানুষ নয়। তাতে তার কিছু যায়-আসে না।

অবনী শুনেছে মেয়েদের শরীরে এক ধরনের গন্ধ আছে। বিবাহিত পুরষরা যদি স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের সাথে চলাফেরা করে, তাহলে নাকি গন্ধটা আরো বেশি করে টের পায়। নিভার সাথে এক রিকশায় বসে তো অবনী টের পায়নি, সে একটা কম বয়সী আধো উষ্ণ নারীকে নিয়ে ঘুরাফেরা করছে। নিভার শরীরে গোলাপের হালকা মাদকতা নিশ্চয়ই আছে। যে তাকে বিয়ে করবে সে অবশ্যই তা টের পাবে। এমনও হতে পারে নিভার শরীরের কাঁচা চা পাতার গন্ধ তার খুবই কাছের মানুষকে দূর থেকে ওর কাছে টেনে আনবে। যেমন সে শিবানীর শরীরের গোলাপের হালকা মাদকতা এবং কাঁচা চা পাতার আধো উষ্ণ ঘ্রাণ টের পেয়ে থাকে। 

অবনীর অনেক দিন পর মনে হল সে মানুষ হবে। এতোদিন সে মানুষ ছিল না। এই জগৎ সংসারকে ভালো করে দেখবে। পৃথিবীর তাবৎ নষ্টামিকেও ঘেঁটে দেখবে। তাতে এমন কি আছে। তার মতো সহজ সরল মানুষের জগৎ সংসারে কোন মূল্যায়ন নেই। শিবানী তাকে তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। যদিও সে বলেছে অবনীর কথাই বিশ্বাস করতে চায়। তারপরও অবনী জানে শিবানী কোনোদিন ওকে আগের মতো আর বিশ্বাস করবে না। নিজের স্বামীকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করলেও শিবানী তা পারবে না। ওর মনের গভীর গোপনে সন্দেহের কাঁটা তাকে প্রতিদিনই খোঁচাবে। সব সময়ই তার মনে হবে নিভার মতো একটা সুন্দরী মেয়ে তার পাশে বসে কাজ করে। অবনী জানে পৃথিবীতে এমন কোনো মেয়ে নেই, যে নিজের স্বামীর পাশে অন্য কোনো মেয়েকে সহ্য করতে পারে। অবনীর শিবানীর জন্য কষ্ট হলো। সেই কষ্টটা নিজের ভিতর থেকে এক সময় একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে গেলো। 

লেখক: কবি, গল্পকার ও আইনজীবী

ব্রেকিংনিউজ/এমএইচ

breakingnews.com.bd
প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি