লোকসান পিছু ছাড়ছে না রাজশাহীর মরিচ চাষিদের

সরকার দুলাল মাহবুব, রাজশাহী
১ জুলাই ২০১৯, সোমবার
প্রকাশিত: ১০:২৮

লোকসান পিছু ছাড়ছে না রাজশাহীর মরিচ চাষিদের

‘সবজির দাম বাড়লে বড় বড় করে লেখা হয় বাজারে আগুন লেগেছে। প্রশাসন দিয়ে কৃষকদের হয়রানি করা হয়। দাম কমানোর জন্য বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা টিভিতে চিৎকার শুরু করেন। আর কমলে এসবের বালাই থাকে না। কোন কোন ফসলে লোকসান হচ্ছে সেদিকে কেহ তাকায়ে দেখে না’। কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর পবার দুয়ারী গ্রামের মরিচ চাষি মাসুদ রানা।  
 
রাজশাহীর মরিচ চাষিদের এবারও মাথায় হাত পড়েছে। মরিচের দাম কমেছে অস্বাভাবিকভাবে। হতাশা নয়, উৎপাদন খরচ না ওঠায় দিশেহারা হয়ে পড়ছে চাষিরা। প্রতি কেজি মরিচ বিক্রি করে চাষিরা কোনো টাকাই পাচ্ছে না। অনেকে মরিচের আবাদ ভেঙে অন্য আবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে। 

এবারে প্রথম থেকেই মরিচের দামে ধ্স নেমেছে। এ অবস্থা থাকলে চাষিরা মরিচের আবাদ নষ্ট করে ফেলবে। দাম না থাকায় উৎপাদন খরচ উঠছে না। পাইকারি বাজারে ক্রয়কৃত মরিচ খুচরা বাজারে দ্বিগুন তিনগুন দামে বিক্রি হলেও প্রান্তিক চাষিদের উৎপাদন খরচ উঠছে না। রবিবার (৩০ জুন) খড়খড়ি বাইপাস হাটে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হয় ৮-১৫ টাকায়। 

গতবার দাম ভাল পাওয়া যায়নি। গতবারের লোকসান পুষিয়ে নিতে এবারও ব্যাপক জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গত মৌসুমের অর্জনের চেয়ে বেশী জমিতে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এবারে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৬৫ হেক্টর। গত মৌসুমে মরিচের আবাদ হয়েছিল ১ হাজার ৭৩৭ হেক্টর। 

এরপরেও মরিচ ক্ষেতের যত্নে ব্যস্ত সময় পার করেছেন চাষিরা। কিন্তু অনেকে দাম না পাওয়ায় চাষিরা ক্ষেতের যত্ন নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। মোহনপুর উপজেলার নুড়িয়াক্ষেত্র গ্রামের মরিচচাষি মোবারক হোসেন বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতেই কাঁচা মরিচের দামে ধস নেমেছে। এখনই শ্রমিকদের ঘর থেকে মজুরি পরিশোধ করতে হচ্ছে। ভরা মৌসুমে মরিচের দাম আরও কমে যাবে। তখন গতবারের মত চাষিরা মরিচের ক্ষেত ভেঙে অন্য আবাদে চলে যাবে।’

জেলার পবা উপজেলার একাধিক মরিচ চাষি ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর কাঁচা মরিচের দাম ভাল পায়নি। লোকসান পুষিয়ে নিতে চাষিরা এবারও অনেক জমিতে মরিচ রোপন করেছেন। দুই বছর আগে মৌসুমের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মরিচের দাম ভাল ছিল। শুরুতে ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছে একপর্যায়ে তা ৯০ থেকে ৯৫ টাকায় ওঠে। এরপর উঠে ১২০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত। সেবার দামের পাশাপাশি ফলনও ভালো হয়। কিন্তু এবারে মৌসুমের শুরুতেই হোচট খেয়েছে চাষিরা। দাম কমে যাওয়ায় চাষিদের দুঃস্বপ্ন এখন বাস্তবে রুপ নিয়েছে। অনেকে ক্ষেতেও যাচ্ছেন না।

রবিবার রাজশাহীর বিদিরপুর পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মরিচের দাম ১২-১৬ টাকা। সোমবার (১ জুলাই) নওহাটা পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৮-১৫ টাকায় বিক্রি হয়। অথচ প্রতি কেজি মরিচ ক্ষেত থেকে উঠাতে খরচ হচ্ছে ১০-১২ টাকা। প্রতি কেজির ভাড়া ২ টাকা এবং খাজনা ১ টাকা। এতে প্রতি কেজি মরিচ বিক্রি করে ক্ষেত মালিকের কিছুই থাকছে না। তবে শ্রমিকরা ক্ষেতের মালিককে কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। চাষিদের লাভ না হওয়ায় শ্রমিকরা খাওয়ার খরচ নিচ্ছেন না। এতে মালিকরা কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। 

পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা জানান, কৃষি বিভাগ দেখে থাকে আবাদের দিকটা। দামের বিষয়টি দেখভাল করে থাকে বাজার মনিটরিং কর্মকর্তারা। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শামছুল হকও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির ওপর নির্ভর করেই কৃষি আবাদ হয়ে থাকে। ঝুঁকির মধ্যে থেকেই চাষিরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। দাম না পেলে চাষের আগ্রহ হারাবে। দামের বিষয়টি বাজার মনিটরিং সংশ্লিষ্টরা দেখভাল করে থাকেন।’

ব্রেকিংনিউজ/জেআই