ঘাটাইলে কালোমেঘ চাষে কৃষকের মুখে হাসি

খাদেমুল ইসলাম মামুন, ঘাটাইল প্রতিনিধি
১০ অক্টোবর ২০১৯, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০৪:৫৩ আপডেট: ০৪:৫৫

ঘাটাইলে কালোমেঘ চাষে কৃষকের মুখে হাসি
মাঠজুড়ে কালোমেঘ বা চিরতা

ঘাটাইলের পাহাড়িয়া অঞ্চলে বানিজ্যিকভাবে কালোমেঘ বা চিরতা চাষের উজ্জ্বল সম্ভবনা রয়েছে। লাভজনক হওয়ায় অনেকে স্থানীয়ভাবে চিরতা নামে পরিচিত কালোমেঘ চাষ করছে। ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধের কাঁচামাল হিসেবেও এখন ঘাটাইলের কালোমোঘ ব্যবহার হচ্ছে। ফলে উপজেলার পাহাড়িয়া সহ বিভিন্ন এলাকায় কালোমেঘের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে। 

বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই কালোমেঘ জন্মে। কালোমেঘের পাকা বীজের রং হালকা খয়েরি। বর্ষার পর থেকে শীতকাল পর্যন্ত ফুল ও ফল হয়। সাধারণত জুন-জুলাই মাস কালোমেঘের চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়। তবে পরিপক্ব বীজ মাটিতে পড়ে আপনা আপনি কালোমেঘ গাছ জন্মে। তুলনামূলকভাবে এটি ছায়া জায়গাতে বেশি জন্মায় বলে অন্য গাছের নিচে এবং সাথী ফসল হিসেবেও এর চাষ করা যায়। সামান্য মাটি খুঁড়ে বীজ বপন করলেই চলে। কালোমেঘ অঞ্চলভেদে কল্পনাথ হিসেবেও পরিচিত। অনেকে অত্যধিক তেতো স্বাদের এ গাছ শুকিয়ে চিরতা বলে বিক্রি করে থাকে।

জানা যায়, এই এলাকায় কালোমেঘ চাষের অগ্রপথিক ছিলেন গৌরিশ্বর গ্রামের ক্ষুদ্র ভেষজ ব্যবসায়ী ওয়াহেদ আলী। আশির দশকে তিনি সর্বপ্রথম যশোর থেকে সামান্য পরিমাণে বীজ এনে বাড়ির পাশে ছিটিয়ে রাখেন। ভালো ফলন হলে বিষয়টি অন্যদের নজরে আসে। তার কাছ থেকে বীজ নিয়ে অন্যরাও এর চাষ শুরু করেন।  
কালোমেঘ চাষে আলাদা কোন যত্ন নেয়ার প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আঙিনা ও পতিত জমিতে বীজ ছিটিয়ে রাখলেই চলে। তেমন কোন রোগ বালাইও হয় না। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টিতে কোন সমস্যা হয় না। সাথী ফসল হিসেবে কোন রকম খরচ ছাড়াই প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২০ মণ কালোমেঘ হয়। বাজারমূল্যও ভাল, মণপ্রতি চার হাজার টাকা। ভরা মওসুমে এ মূল্য দাঁড়ায় মণপ্রতি ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকা পর্যন্ত। 

কৃষকরা জানান, সাধারণত বৈশাখ মাসে এ বীজ বপন করা হয়। পরিপক্ব হয় কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে। গৌরিশ্বর গ্রামের চাষী হুরমুজ আলী জানান, ঘাটাইলের গৌরিশ্বর ও কুশারিয়া, নলমা, গারোবাজার, ফটিয়ামারী, সাগরদিঘী সহ বিভিন্ন গ্রামে কালোমেঘের চাষ বেশী হয়। গৌরিশ্বর গ্রামের হায়দার আলী, মজিবর রহমান, কুশারিয়া গ্রামের আব্দুল মজিদ, নলমা গ্রামের রুস্তম আলী, মুসলিম উদ্দিন ও শাহেদ আলী কালোমেঘের আবাদ করে লাভবান হয়েছেন বলে জানান।

উপজেলার সাগরদিঘী ইউনিয়নের ফটিয়ামারী গ্রামের কৃষক আহম্মদ আলী জানান, তিনি এ বছর ২.২০ একর জমিতে কালোমেঘের চাষ করেছেন। এতে খরচ হয়েছে দেড় লাখ টাকার মতো। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন ভালো পাওয়ার আশা তার। তিনি প্রায় ৫/৬ লাখ টাকার কালোমেঘ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। নতুন চাষী গোলাপ হোসেন জানান, তিনি এবার বেগুন ও কলা চাষ বাদ দিয়ে কালো মেঘ চাষ শুরু করেছেন। ৩.৩০ একর জমিতে কালোমেঘের চাষ করেছেন। ফলনও হয়েছে বেশ ভালো। খরচ হয়েছে ২ লাখ টাকা। আর বিক্রির সম্ভাবনা দেখছেন প্রায় ৮/১০ লাখ টাকা।

কালোমেঘের পাইকারী ব্যবসায়ী গৌরিশ্বর গ্রামের মিন্টু শিকদার জানান, তিনি চাষীদের কাছ থেকে কালোমেঘ সংগ্রহ করে মহাজনদের কাছে বিক্রি করেন। ঢাকা, চট্রগ্রাম, বগুড়া থেকে মহাজনরা ঘাটাইল এসে এগুলো ক্রয় করে নিয়ে যায়। কালোমেঘ ভেষজ ওষুধ তৈরির কাচামাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। তিনি গত বছর ১৭ টন কালোমেঘ বিক্রি করেছেন। লাভও পেয়েছেন ভালো। 

কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের সহকারী অতিরিক্ত উপ-পরিচলক কৃষিবিদ হাসান ইমাম জানান, কালোমেঘ বা চিরতার মধ্যে বহু মূল্যবান ক্যাফেইন রয়েছে। প্যারাসিটামলসহ অর্ধশতাধিক এলোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক ও হারবাল ওষুধ তৈরিতে ক্যাফেইন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। 
 
ঘাটাইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মতিন বিশ্বাস জানান, কালোমেঘ ওষুধি গুণে ভরা ভেষজ গাছ। উপজেলার পাহাড়িয়া এলাকার চাষীরা কিছু কিছু জমিতে কালোমেঘ চাষ করে থাকেন। এবার আনুমানিক ১৫/২০ হেক্টর জমিতে কালোমেঘ চাষ হয়েছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কালোমেঘ চাষ একটি ভাল উদ্যোগ। এ ব্যাপারে চাষীরা উৎসাহী হলে তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

ব্রেকিংনিউজ/এম

 

bnbd-ads