মানিকের পর আখতারুজামান বড় লেখক: শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
১০ এপ্রিল ২০১৯, বুধবার
প্রকাশিত: ০৯:০৭ আপডেট: ০৯:০৮

মানিকের পর আখতারুজামান বড় লেখক: শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

আখতারুজামান ইলিয়াস-এর সৃজন ও অঙ্গীকার প্রসঙ্গে আমি নির্দ্বিধায় দাবি করতে পারি যে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর বাংলা কথাসাহিত্যের প্রাঙ্গনে তাঁর চেয়ে বড় লেখকের প্রবেশ ঘটেনি। শুধু আমার মতো অকিঞ্চিতকর বিশ্লেষক এই দাবি করছে না। মহাশ্বেতা (দেবী)দি এবং হাসান আজিজুল হক ভাইও সম্ভবত আমার মূল্যায়নের প্রতি ওঁদের সমর্থন জ্ঞাপন করবেন। ইলিয়াস-এর মৃত্যু সংবাদ শুনে শোকগ্রস্ত মহাশ্বেতা দিদি বলেন, “আমাকে এই মুহূর্তে বলতেই হবে যে দুই বাংলায় তাঁর চেয়েও অধিক প্রতিভাবান কথাসাহিত্যিক বর্তমানে নেই আমি বারংবার এই মূল্যায়ন ব্যক্ত করেছি এবং আবার কোরবো।” 

অন্যদিকে এপারের শ্রেষ্ঠ গল্প লেখক হাসান আজিজুল হক বলেন, “বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দিকপালদের অবদান স্মরণে রেখেও বলব, ইলিয়াস ছিলেন তাঁদের সমগোত্রীয়। আমি এক নিঃশ্বাসে ইলিয়াস, মারকুয়েজ ও গুন্টার গ্রাস-এর নাম উচ্চারণ করব।” উনিশ বছর আগে, ঢাকায় শীতের রাত্রে আমার হাসান ভাই-এর সঙ্গে কথা হয় টেলিফোনের মাধ্যমে। তখনই তিনি এই মূল্যায়ন করেছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, “Within a very very brief period he created a variegated, startlingly, unfamiliar world of literature and then departed.” ইলিয়াস আর মহাশ্বেতা দিদির সম্পর্ক ছিল দিদি আর-ভাই-এর মতো। ইলিয়াস-এর সহধর্মিনী সুরাইয়া আমাকে বলেন, “ওদের আন্তরিক ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক অপু-দুর্গার কথা মনে করিয়ে দেয়। ওরা এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল”।

ক্ষয়কারী সাহিত্যের এই ক্লিন্ন প্রাচুর্যের যুগে, ব্যতিক্রমী ইলিয়াস লিখেছিলেন মাত্র দুটি উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই আর খোয়াবনামা। এই দুটি অবিস্মরণীয় রচনার বিষয়বস্তু, নির্মানশৈলী আর শৈল্পিকতা নিয়ে আমি অযথা বাক্যব্যয় করতে চাই না এই বিদ্বত পরিবেশে, আপনারা ও বিষয় যথেষ্ট অবহিত। আমি শুধু কয়েকটি বৈশিষ্ট্যর প্রতি পুনরায় আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। প্রথমেই, আমি জোর দেব ইলিয়াস-এর পঠন পাঠনের উপর। চিলেকোঠার সেপাই আর খোয়াবনামা লেখার সময় ইলিয়াস বিস্তর পড়াশুনা করেছিলেন এবং এই প্রস্তুতিমূলক জ্ঞান-অন্বেষনের নিবিষ্ট পরিচয় আমরা পাই উপন্যাস দুটির পৃষ্ঠায়-পৃষ্ঠায়। তাঁর এই দুটি সৃষ্টিই এত ঘন ও জমাট কেন? 

এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত আছে তাঁর, যাকে বল যায়, Academic প্রস্তুতিতে। আজকের বাজারি সাহিত্যের জগতে এই বিদ্যার্জন এবং এই নিষ্ঠা প্রকৃতঅর্থেই বিরল। খোয়াবনামা-র প্রস্তুতি বিষয়ে সুরাইয়া আমাকে এক একান্ত সাক্ষাৎকার বলেছিলেন, “দেশভাগের ইতিহাস, তেভাগার ইতিহাস, ফকির সন্ন্যাসী অভ্যুত্থানের ইতিহাস, কৃষিসম্পর্কিত পড়াশুনা বিশেষ করে ধানচাষ তিনি আত্মস্থ করেছিলেন এক নিবিষ্ট ছাত্রের মতো”। এই Academic ঝলকগুলিকেই তিনি জারিত করেছিলেন সৃজনে সত্তায়। চিলেকোঠার সেপাই বিষয়েও এই একই সত্য প্রযোজ্য। উনসত্তরের আন্দোলন ও প্রতিরোধ তিনি ছেনে ছেনে দেখেছিলেন। খুব কাছ থেকে এবং এই নৈকট্যই বারংবার প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর সৃজনে। শুধু অক্লান্ত পড়াশুনা নয়, অতীত ও ইতিহাসকে নিবিড় করে নেবার উদ্দেশ্যে তিনি এখানে সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন। তাঁর তৃতীয় অলিখিত প্রয়াস, মুক্তিযুদ্ধের বিষয় উপন্যাসের রসদ সংগ্রহের জন্য তিনি বারবার ছুটে গিয়েছিলেন বগুরা আর মহাস্থানে। ১৯৬৬ সালের আগষ্ট মাসে মহাশ্বেতাদিকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, “আরও একটি সমস্যা আছে। আমাকে সেই জায়গায় বারবার যেতে হবে আসল লেখার সময়। কিন্তু এই অবস্থায় কি তা সম্ভব। সেই ওঠানামা কি আমি করতে পারবো এই Crutch নিয়ে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি ক্রাচের সাহায্যে হাঁটতে চলতে। দু মাস পরে আমি বগুরা যাবো, তখনই বুঝতে পারবো মহাস্থানে আমি কতটা হাঁটতে সক্ষম হব”। অর্থাৎ নিছক বিদ্যার্জন নয়, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যও তিনি উন্মুখ, উদগ্রীব ছিলেন।

দ্বিতীয়ত, আমাদের যেটা গভীরভাবে নাড়া দেয় তা হল ওরঁ উপন্যাসের নিখাদ কাব্যগুণ এবং কাব্যময়তা। সমালোচক ফরহাদ মজহার এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “তিনি স্বভাবতই, অন্তর থেকে কবি ছিলেন, কবিতাই ছিল তাঁর সড়ক” এবং আর এক সমালোচক আবু কায়সার, লিখেছিলেন “অনেকেই হয়তো জানেন না যে এই প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন। তাঁর একটি কবিতার দুটি পঙক্তি আমাকে Haunt করে। অন্যভাবে বললে, তিনি যদি কবিতা রচনার প্রতি অখন্ড মনোযোগ দিতেন, তিনি হয়ে উঠতেন এক অগ্রণী কবি।” চিলেকোঠার সেপাই-এ দমকে দমকে গদ্য কবিতা বেরিয়ে আসে দুটি সুনির্দিষ্ট স্থানে: এক, যখন তিনি উনসত্তরের আন্দোলনকে যুক্ত করেন সুদীর্ঘ বিদ্রোহের ইতিহাসের সঙ্গে এবং দুই উপন্যাসের শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠায় যেখানে অধিষ্ঠান করছে এক দরদী বিচিত্র বর্ণময়তা। খোয়াবনামায় বিশুদ্ধ লিরিক উচ্চারিত হয় সেই অংশে যেখানে তিনি ফকির সন্নাসী বিদ্রোহ স্মরণ করছেন ভাবাপ্লুত হয়ে। প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা, একটি কঠিন শৈল্পিক সংযম তাঁর ভাবাপ্লুতাকে নন্দনের বন্ধনে আবদ্ধ রেখেছে। শুধুমাত্র মূল বাংলায় নয়, স্বতঃস্ফূর্ত ইংরেজি তর্জমায়ও সেই কাব্যজ্ঞান প্রতিফলিত- Majnu shouts Bhabani Sanyasi/Catch the whites and hang them straight/Bhabani roars and the Giris flash swords/ They send the whites to Yama’s door. এক কথায়, ইলিয়াস আদ্যন্ত, কবি ছিলেন, যে কবিত্ব শুধুমাত্র তাঁর লেখা কয়েকটি কবিতায় নয়, বরঞ্চ তাঁর দুটি উপন্যাসেও প্রতিফলিত স্পন্দিত।

তাঁর তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হল মার্কসীয় বিশ্বদৃষ্টির প্রতি তাঁর আজীবন, গভীর আনুগত্য। ইলিয়াস-এর বন্ধু সৈয়দ আবুল মকসুদ জানিয়েছেন, “আমি তাঁকে যতটুকু জানি, তার ভিত্তিতেই বলব যে মার্কসবাদ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, ষাটের দশকে। সেই প্রভাবে কখনও ভাঙ্গন ধরেনি, আমৃত্যু তিনি মার্কসীয় বিশ্বাসের প্রতি অনুগত ছিলেন।” তা বলে তিনি পার্টি নির্দেশিত শৃঙ্খলনামা মেনে নেননি। প্রত্যক্ষ মার্কসীয় রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করে তিনি নির্মাণ করেছিলেন আলি বক্স, চেংটু, খিজির ও তমিজের মতো বিপ্লবীদের যারা শোষনকে মেনে নিতে পারেনি। মার্কসবাদকে তিনি গ্রথিত করেছিলেন এক ধরনের পরিব্যাপ্ত সাধারণ বোধ বা Common sense-এর সঙ্গে। এই বোধ-এর প্রভাবেই তিনি বলেছিলেন, “পাঁচতারা হোটেল আর বস্তির সহাবস্থান সম্ভব নয়, “This defies logic and reason.” ইলিয়াসের এই স্বভাব-আনুগত্য স্মরণে আনে কার্ল মার্কসের লেখা “Paris Manuscripts 1844” যেখানে মার্কস দেখিয়েছেন মানুষ শ্রম, পরিবেশ, অন্য মানুষ থেকে বিযুক্ত, যে বিযুক্তি অন্তর্হিত হবে শ্রেণীহীন সমাজে। ইলিয়াসের লেখা দারুন কবিতা ‘ডিসেম্বরের বেলা” কবিতাটিতে এই বিযুক্তি বিশ্লেষিত ও বিবরিত।

আক্ষেপ শুধু একটাই। কাজ শুরু করলেও ইলিয়াস মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপন্যাসটি লিখে যেতে পারেননি। তিনি তাঁর বন্ধুদের বলেছিলেন, “আরও কয়েকটা বছর আমাকে বেঁচে থাকতে হবে এই কাজটি সম্পূর্ণ করার জন্য।” তাঁর এই সুতীব্র আশার কোনও সুফল পরিণতি তিনি দেখে যেতে পারেননি, তাঁর পাঠকেরাও বিঞ্চিত থেকে গেছেন। এ বেদনা উপশমের কোনও উপায় নেই। তা সত্ত্বেও, বারংবার বলব, তিনি যা দিয়ে গেছেন তা অমূল্য এবং সার্থক। এই ক্লিন্ন প্রাচুর্যের যুগে আমরা তাঁর কাছে গভীরভাবে ঋণী।

[শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত। গবেষক ও প্রাবন্ধিক। জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল কোলকাতা। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলিকাতা ব্শ্বিবিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য পাঠের পর তিনি পিএইচডি করেন জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার সম্পাদিত ও লিখিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে- ডায়লেক্টিক্স এন্ড ড্রিম, ড্রিম এন্ড এলিজি এবং দ্যা ট্রাওমা এন্ড দ্যা ট্রায়মফ। তার অধিত বিদ্যার্জনের বৃত্তগুলি হচ্ছে নব্য মার্কসীয় নন্দনতত্ত্ব, দেশভাগ, বিষ্ণু দে ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্য। বাংলা ভাষায় তার প্রকাশিত গ্রন্থ: বিচ্ছিন্ন প্রতিভাস (অনুক্ত প্রকাশনী), সংলাপ (প্রমা প্রকাশনী)।]

(সংগৃহিত)

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

bnbd-ads
bnbd-ads