bnbd-ads
bnbd-ads

কেমন ছিলো রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক?

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
২৫ মে ২০১৯, শনিবার
প্রকাশিত: ১২:২৭ আপডেট: ০১:০৬

কেমন ছিলো রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম- বাংলা সাহিত্যের আকাশে দুই নক্ষত্রের নাম। একজন বিশ্বকবি, আরেকজন বিদ্রোহী কবি। দুইজনই তাদের প্রতিভা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। 

তাদের মধ্যে ছিল গভীর সখ্য; গুরু-শিষ্য সম্পর্ক ছিল দৃঢ়। কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারণে আমাদের এই অঞ্চলে অনেক মানুষের মনে এই দুইজনকে অনেকটা নায়ক-শত্রু ভূমিকায় চিত্রিত করা হয়েছে। 

তবে শুরুটা এখন না বরং তারা জীবিত থাকা অবস্থাতেই- মৌলবাদী হিন্দু এবং মৌলবাদী মুসলিমের দল কেউই তাদের দুইজনের মধ্যে যে অসাধারণ সখ্যতা ও সুসম্পর্ক ছিল, সেটা মেনে নিতে পারে। নানাভাবে চেষ্টা করে গেছে, তাদের মধ্যে সম্পর্কে তিক্ততা আনার জন্য। হয়েছিল নানা ষড়যন্ত্র ও আক্রমণ। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়।

জানা যায়, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাজী নজরুল যেমন পরম ভক্তি করে গেছেন রবীন্দ্রনাথকে, রবীন্দ্রনাথও সেভাবেই উজাড় করে স্নেহ করে গেছেন ৩৮ বছরের ছোট নজরুলকে।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সরাসরি দেখা হয়েছিল ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে শান্তিনিকেতনে। তখন নজরুলের বয়স ২২ বছর। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর নজরুল অনেকবারই শান্তিনিকেতনে যেতেন এবং খুবই কোলাহল মুখর ছিলেন। হৈচৈ করে মাতিয়ে রাখতেন বলে তাকে “হৈহৈ কাজী” নামে ডাকতেন রবীন্দ্রনাথ।

১৯২১-এর ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহী কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হলে হাতে পত্রিকা নিয়ে নজরুল সরাসরি চলে যান জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। উচ্চকণ্ঠে ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’ গাইতে গাইতে নজরুল ঠাকুর বাড়িতে প্রবেশ করে ডাকতে শুরু করলেন, গুরুদেব তুমি কোথায়, আমি এসেছি। রবীন্দ্রনাথ দোতালা থেকে বললেন কি হয়েছে, এত হৈচৈ কিসের। তিনি রবীন্দ্রনাথকে বলেন, গুরুদেব আমি আপনাকে খুন করবো। নিচে এসো। তারপর রবীন্দ্রনাথের সামনে উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে থাকেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথ ‘বিদ্রোহী’ কবিতা শুনে কবিতার প্রশংসা করেন এবং নজরুলকে জড়িয়ে ধরে বলেন ‘সত্যিই তুই আমাকে খুন করেছিস’। এরকমই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো তাদের মধ্যে!

নজরুল ইসলাম যৌবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। এ ছাড়া গীতাঞ্জলির সবগুলো কবিতা ও গান তার মুখস্থ ছিল। কমরেড মোজাফফর আহমেদ তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “নজরুল ইসলাম বহু রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। তিনি কি করে যে রবীন্দ্র সঙ্গীতগুলো মুখস্ত করেছিলেন, তা ভেবে অবাক হই।” এ কথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবহিত হওয়ার পর খুবই খুশি হয়ে বলেছিলেন, “আমারই তো মুখস্থ নেই।”

১৯২২-এর ২৫ জুন কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরিতে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঐ স্মরণসভায় সভাপতি হয়ে গিয়েছিলেন। আর সদ্য দুটি বই বের হওয়া নজরুল বসেছিলেন একদম পিছনে। রবীন্দ্রনাথ তা লক্ষ্য করে নজরুলকে ডেকে পাশে বসিয়েছিলেন। নজরুল সেখানে আবৃত্তি করেছিলেন ‘সত্যকবি’ কবিতাটি। রবীন্দ্রনাথ এভাবে নজরুলকে স্নেহ বন্ধনে আবদ্ধ করায় তখনও কবি-সাহিত্যিকরা ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন।

নজরুলের সম্পাদনায় ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৯২২-এর ১১ আগস্ট। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকার জন্য আশীর্বাদবানী লিখে দেন- “আয় চলে আয় রে ধূমকেতু/আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু…” ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই আশীর্বাণীটি প্রকাশিত হতো। 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখা ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেন। সেটি ছিল রবীন্দ্র পরিবারের বাইরে প্রথম কাউকে একটি বই উৎসর্গ করার ঘটনা।

১৯২৮ সালে নজরুল নিজেও তার শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন ‘সঞ্চিতা’ রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন। বিভিন্ন রচনায় রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নানাবিধ উল্লেখ থাকলেও সম্পূর্ণ তাঁকে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো হলো ‘নতুন চাঁদ’ গ্রন্থের ‘অশ্রুপুষ্পাঞ্জলি’ ও ‘কিশোর রবি’ এবং ‘শেষ সওগাত’ গ্রন্থের ‘রবিজন্মতিথি’।

রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে যে কী স্নেহ করতেন তার আরেকটি উদাহরণ- রবীন্দ্রনাথ রচিত ‘গোরা’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ছায়াছবিতে নজরুল ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ এতে বাধ সাধলে রবীন্দ্রনাথ তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং নজরুলকে সঙ্গীত পরিচালনার স্বীকৃতি প্রদান করেন।

এত সুন্দর শ্রদ্ধা ও স্নেহমন্ডিত দুই মহামানবের সম্পর্কতে যুগে যুগে কত কালিমাই না লেপনের চেষ্টা হয়েছে। অথচ স্বয়ং তাদের লেখনীতে, জীবনীতে, কর্ম-কান্ডে একে অপরের জন্য গভীর ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না!

ব্রেকিংনিউজ/অমৃ

bnbd-ads
MA-in-English
bnbd-ads