হে বন্ধু, বিদায়

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
৬ আগস্ট ২০১৯, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ০১:১৫ আপডেট: ০১:২১

হে বন্ধু, বিদায়

বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের কাব্যধর্মী ক্ল্যাসিক উপন্যাস বলা হয় ‘শেষের কবিতা’কে। কবিগুরু ৬৭ বছর বয়সে এসে এমনই রোমান্টিক উপন্যাস উপহার দিয়েছিলেন বাংলার প্রেমিক-প্রেমিকাদের। শত বছর পরেও সেই উপন্যাস পাঠক মহলে দারুণ জনপ্রিয়। কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সে অনেকেরই স্বপ্নের চরিত্র লাবণ্য। অমিতের ছেলেমানুষী, শোভনলালের নিখাদ ভালোবাসা এখনো পাঠক হৃদয়ে ঝড় তোলে। প্রেমের উপন্যাস হিসেবে ‘শেষের কবিতা’কে বলা হয় ‘ক্লাসিক’। 

শিলংয়ের পাহাড়ে এক সড়ক দুর্ঘটনায় লাবণ্যের সঙ্গে পরিচয় হয় অমিতের। প্রথম দেখা থেকে বন্ধুত্ব, তারপর অমিতের ছেলেমানুষী আচরণের কাছে ধরা দেয় লাবণ্যের ব্যক্তিত্ব। লাবণ্য আবিষ্কার করে সে-ও ভালোবাসতে পারে। লাবণ্যকে পেয়ে অমিত যেন পেয়ে যায় তার কাঙ্ক্ষিত পাত্রীকে। লাবণ্যকে বিয়ে করতে মরিয়া হয়ে ওঠে অমিত। কিন্তু বিয়েতে সায় দেয় না লাবণ্য।

লাবণ্য মনে করে অমিতের চরিত্রটাই এমন, ‘হয় সে পাবে না, অথবা পেয়ে হারাবে। যাকে পাবে তাকে যে ধরে রাখতে হবে এটা ওর ধাঁতের সঙ্গে যায় না। বিয়ে করলে দুটো মানুষ খুব কাছে চলে আসে তখন আর গড়ে নেবার সুযোগ থাকে না।’

অমিতকে বিয়ে করে দুঃখ দিতে চায় না লাবণ্য। অমিতের জোরাজোরিতে লাবণ্যের সঙ্গে যখন বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক তখন শিলংয়ে হাজির অমিতের ছোট বোন সিসি ও তার বান্ধবী কেতকী। অক্সফোর্ডে পড়ার দিনগুলোতে এই কেতকীর হাতেই আংটি পড়িয়েছিল অমিত। তখন তো জানত না, শিলংয়ে এসে স্বপ্নকন্যা লাবণ্যের দেখা পাবে। কেতকী সব জেনে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে নিজের সেই আংটি খুলে দেয় অমিতের হাতে। এদিকে লাবণ্যও অমিতের দেয়া আংটি ফেরত দেয়। অমিত কি করবে ভেবে পায় না। এর কিছুদিন পর অমিত বিয়ে করে কেতকীকে। অন্যদিকে লাবণ্য বিয়ে করে পুরনো বন্ধু শোভনলালকে। লাবণ্য তখন অমিতের কাছে এক চিঠি লিখে, সেই চিঠির শব্দের মাঝে যেন বহতা দীর্ঘশ্বাস, আছে নতুনকে বরণ করে নেয়ার আমন্ত্রণ। সেই চিঠিই হয়ে উঠে শেষের কবিতা। প্রেমের আধুনিক ব্যাখা রয়েছে এই চিঠির মধ্যে।  আজ ২২ শ্রাবণ। বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ৭৮তম প্রয়াণ দিবসের এই দিনে ব্রেকিংনিউজের পাঠকের জন্য শেষের কবিতা’র সেই চিঠিখানি তুলে ধরা হলো-

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
                   তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
                             ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল--
                             তুলে নিল দ্রুতরথে
                   দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
                             
তোমা হতে বহুদূরে।
                             মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
                             পার হয়ে আসিলাম
          আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়,
          রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
                             আমার পুরানো নাম।

ফিরিবার পথ নাহি;
                             দূর হতে যদি দেখ চাহি
                                      পারিবে না চিনিতে আমায়।
                                                হে বন্ধু, বিদায়।

কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে,
                            বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
                            ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
                            তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতপ্রদোষে
                            হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নামহারা-স্বপ্নের মুরতি।
                            তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
                            সে আমার প্রেম।
                            তারে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
                            পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
                                      কালের যাত্রায়।
                                      হে বন্ধু, বিদায়।

                            তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত-মুরতি
                            যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
                                               হোক তব সন্ধ্যাবেলা।
                                                পূজার সে খেলা
          ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লানস্পর্শ লেগে;
                   তৃষার্ত আবেগবেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
তোমার মানসভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
                   তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
                   আজও তুমি নিজে
                   হয়তো বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।

                   ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
                                      হে বন্ধু, বিদায়।

                   মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
                   মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
                   সেই ধন্য করিবে আমাকে।
                   শুক্লপক্ষ হতে আনি
                   রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
                                      যে পারে সাজাতে
                   অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ-রাতে,
                   যে আমারে দেখিবারে পায়
                                      অসীম ক্ষমায়
                   ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
          এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।

                   তোমারে যা দিয়েছিনু, তার
                   পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
                   হেথা মোর তিলে তিলে দান,
          করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান

                   হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরুপম,
                                      হে ঐশ্বর্যবান,

তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
                             হে বন্ধু, বিদায়।

ব্রেকিংনিউজ/এমআর

breakingnews.com.bd
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা, ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫, ইমেইল : editor. breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: মাইনুল ইসলাম
 শারাকা ম্যাক, ২ এইচ-প্রথম তলা,
  ৩/১-৩/২ বিজয় নগর, ঢাকা-১০০০
 টেলিফোন : ০২-৯৩৪৮৭৭৪-৫,
 ইমেইল : editor. breakingnews.com.bd@gmail.com
 নিউজরুম হটলাইন : ০১৬৭৮-০৪০২৩৮, ০২-৮৩৯১৫২৪
 নিউজরুম ইমেইল : bnbdcountry@gmail.com, bnbdnews.reporter@gmail.com
© ২০১৯ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি