‘জনগণের কবি’ লোরকার একগুচ্ছ কবিতা

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
প্রকাশিত: ০৪:৪১

‘জনগণের কবি’ লোরকার একগুচ্ছ কবিতা

আধুনিক স্প্যানিশ সাহিত্যের অন্যতম কবি ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা। তিনি একাধারে একজন কবি, নাট্যকার ও মঞ্চ পরিচালক ছিলেন। প্রজন্ম ২৭-এর (কবিদের সম্মিলনে গড়ে ওঠা সংগঠন, যারা ইউরোপিয়ান বিপ্লব স্প্যানিশ সাহিত্যে আনার চেষ্টা করে) একজন সদস্য হিসেবেই মূলত বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পান। তাঁর রচিত অসংখ্য রচনা ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের পাঠকদের কাছে এবং ধীরে ধীরে তাঁর কাব্য-সাহিত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে স্বতন্ত্র এক ধারায়। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে জাতীয়বাদী কর্মীরা তাঁকে হত্যা করে, তার লাশ আর কখনও পাওয়া যায়নি। তাঁকে স্প্যানে ‘জনগণের কবি’ বলে ডাকা হয়।

বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান লেখক, কবি, প্রবন্ধকার, অনুবাদক অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ লোককার একগুচ্ছ কবিতা অনুবাদ করেছেন। কাব্যানুরাগী পাঠকের জন্য কবিতাগুলো তুলে ধরা হলো:

১.
অসম্ভব বাহুর ক্বাসিদা

কিছুই চাই না আর, শুধু বাহু ব্যতিরেকে,
সম্ভব হলে এমনকি ক্ষতবিক্ষত হাতও
কিছুই চাই না আর, কেবল একটি হাত,
যদিও সহস্র রজনী কেটেছে আমার শয্যা বিহনে।

তা হতে পারে কলমিদাসের একটি কুসুম,
আমার বুকের ভিতরে রাখা খঞ্জনা পাখি
কিংবা হতে পারে সেই প্রহরী যে আমার মৃত্যুরজনীতে
রুদ্ধ করে দেবে সমস্ত পথ চন্দ্রিমা উঁকি দেওয়ার।

কিছুই চাই না আর শুধু এই বাহু ব্যতিরেকে,
প্রাত্যহিক কীর্তন কিংবা দুঃখের পাঁচালি
কিছুই চাই না আর, শুধু ওই বাহু ব্যতিরেকে
কেননা সে-ই ধরে থাকবে আমার মৃত্যুর এক ডানা।

এর বাইরে যা-কিছু সবই চরে যাবে।
লজ্জারাঙা হয়ে লাভ নেই। আকাশের তারা চিরন্তন জ্বলবেই।
সবকিছুই তো অন্য কিছু : বিষন্ন হাওয়া
উড়ে যায় লতাপাতা
ঘোরে বন্‌বন্‌।

২.
কবি

কবি হলেন মাধ্যম
প্রকৃতির
যিনি ব্যাখ্যা করে চলেন
তার মহিমা শব্দপরম্পরায়।

কবিই বোঝেন
সবকিছু যা অবোধ্য,
এবং হে বন্ধুগণ,
তিনিই আবাহন করেন তাদের
যারা পরস্পরে ঘৃণায় উন্মুখ।

তিনিই জ্ঞাত আছেন
প্রতিটি অসম্ভব পথের ব্যাপারে,
আর শান্ত নৈঃশব্দ্যে
রাত্রির ভিতরে তিনি পথ হাঁটেন।

৩.
নিষ্ফল জীবন

অস্পষ্ট মৃত্যুর চৌমুহুনীতে দাঁড়িয়ে
আমি শান্ত ও মধুর হয়ে থাকবো
গান গাইতে গাইতে।
আর আমার নিষ্ফল জীবনের তরে
সুতীব্র বিরক্তি
হবে যেন হৈমন্তী সূর্যাস্ত।

৪.
শিশু হতে চাই

শিশু হতে চাই আমি
গোলাপ-রঙা ও নিশ্চুপ
যে তার স্নেহাতুরা জননীর
শুভ্র উরুর ওমের
ভিতরে থেকে গুনে চলবে
একটি তারকার কথোপকথন
বিশ্বপতির সঙ্গে।

৫.
নীরবতা

খোকা, শোন্‌, নৈঃশব্দ্যে কান পাত।
তরঙ্গায়িত নৈঃশব্দ্যে
যেখানে উপত্যকা ঘিরে প্রতিধ্বনিরা পিছলে পিছলে যায়
কপাল ছুঁতে ছুঁতে মাটিতে।
শোন্‌, শুনে যা।

৬.
এবং অতঃপর

(কেবল রয়ে যায়
মরুভূ)

বাসনার উৎসমূল
হৃদয়
মিলিয়ে যায় হাওয়ায়।

(কেবল রয়ে যায়
মরুভূ)

প্রত্যূষের মোহমায়া
এবং সমুদয় চুম্বন
উবে যায়।

কেবল মরুভূ,
উচ্চাবচ মরুভূমি তরঙ্গায়িত
রয়ে যায় এখানে।

৭.
মরে যাওয়া কমলা গাছের গান

ওহে কাঠুরিয়া,
আমার ছায়া তুমি কেটে ফেলো।
ফল না ফলাতে পারার
যাতনা থেকে আমাকে মুক্তি দাও।

চারদিকে আরশি ঝুলিয়ে রেখে
আমার জন্ম হলো কেন?
আমার চতুর্দিকে ঘুরতে থাকে দিন
আর রাত্রির অগণন তারকায় আমার প্রতিবিম্ব পড়ে।

আরশি বিহনেই না-হয় বাঁচি।
আমাকে স্বপ্ন দেখতে দাও :
পিঁপড়ে আর ঝিঁঝিপোকা
হয়েছে আমার পত্রপল্লব ও পক্ষিকূল।

কাঠুরিয়া হে,
আমার ছায়া তুমি কেটে ফেলো।
ফলবতী না হওয়ার
যাতনা থেকে মুক্তি দাও আমাকে।

৮.
ক্রন্দনের ক্বাসিদা

ঝুলবারান্দা আমি বন্ধ করে দিয়েছি,
যেহেতু কান্না শুনতে চাই না।
কিন্তু ঐ বাইরে, ময়লাটে দেওয়ালের ওদিকে,
কিছুই আর শোনা যায় না ক্রন্দন ব্যতিরেকে।

খুব কমই দেবদূত আছে যারা গান গায়।
রয়েছে খুব কমই সারমেয় যারা ঘেউঘেউ করে।
আমার হাতের তালুতে ধরা থাকে সহস্র বেহালা।

অথচ ক্রন্দন হলো এক বিশালকায় সারমেয়,
ক্রন্দন হলো এক আজদাঁহা দেবদূত,
ক্রন্দন হলো এক বিশাল বেহালা,
বাতাস দিয়েছে মুছে অশ্রুকলা,
আর কান্না ছাড়া এখন শোনা যায় না কিছুই।

ব্রেকিংনিউজ/এমআর