আবুল হাসানের একগুচ্ছ বাছাই কবিতা

শিল্প-সাহিত্য ডেস্ক
১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, বুধবার
প্রকাশিত: ০২:১১ আপডেট: ০২:১৩

আবুল হাসানের একগুচ্ছ বাছাই কবিতা

১.
পাখি হয়ে যায় প্রাণ

অবশেষে জেনেছি মানুষ একা!

জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!
দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনোদিন।

ফাতিমা ফুফুর প্রভাতকালীন কোরানের
মর্মায়িত গানের স্মরণে তাই কেন যেন আমি

চলে যাই আজও সেই বর্নির বাওড়ের বৈকালিক ভ্রমণের পথে,
যেখানে নদীর ভরা কান্না শোনা যেত মাঝে মাঝে
জনপদবালাদের স্ফুরিত সিনানের অন্তর্লীন শব্দে মেদুর!

মনে পড়ে সরজু দিদির কপালের লক্ষ্মী চাঁদ তারা
নরম যুঁইয়ের গন্ধ মেলার মতো চোখের মাথুর ভাষা আর
হরিকীর্তনের নদীভূত বোল!
বড় ভাই আসতেন মাঝরাতে মহকুমা শহরের যাত্রাগান শুনে,
সাইকেল বেজে উঠত ফেলে আসা শব্দে যখন,
নিদ্রার নেশায় উবু হয়ে শুনতাম, যেন শব্দে কান পেতে রেখে :
কেউ বলে যাচ্ছে যেন,
বাবলু তোমার নীল চোখের ভিতর এক সামুদ্রিক ঝড় কেন?
পিঠে অই সারসের মতো কী বেঁধে রেখেছ?

আসতেন পাখি শিকারের সূক্ষ্ম চোখ নিয়ে দুলাভাই!
ছোটবোন ঘরে বসে কেন যেন তখন কেমন
পানের পাতার মতো নমনীয় হতো ক্রমে ক্রমে!

আর অন্ধ লোকটাও সন্ধ্যায়, পাখিহীন দৃশ্য চোখে ভরে!
দিঘিতে ভাসত ঘনমেঘ, জল নিতে এসে
মেঘ হয়ে যেত লীলা বৌদি সেই গোধূলিবেলায়,
পাতা ঝরবার মতো শব্দ হতো জলে, ভাবতুম
এমন দিনে কি ওরে বলা যায়—?

স্মরণপ্রদেশ থেকে এক একটি নিবাস উঠে গেছে
সরজু দিদিরা ঐ বাংলায়, বড়ভাই নিরুদ্দিষ্ট,
সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি সাথে করে নিয়ে গেছে গাঁয়ের হালট!

একে একে নদীর ধারার মতো তারা বহুদূরে গত!
বদলপ্রয়াসী এই জীবনের জোয়ারে কেবল অন্তঃশীল একটি দ্বীপের মতো

সবার গোচরহীন আছি আজও সুদূরসন্ধানী!

দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি,
সেখানেও বসে আছে বৃক্ষের মতন একা একজন লোক,
যাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে কেবলি
শতজীবনের শত কুহেলি ও কুয়াশার গান!

পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলি মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!

২.
নিঃসঙ্গতা

অতটুকু চায় নি বালিকা!
অত শোভা, অত স্বাধীনতা!
চেয়েছিল আরো কিছু কম,

আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে
বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল
মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!

অতটুকু চায় নি বালিকা!
অত হৈ রৈ লোক, অত ভিড়, অত সমাগম!
চেয়েছিল আরো কিছু কম!

একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল

একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!

৩.
তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
তোমার ওখানে যাব, তোমার ভিতরে এক অসম্পূর্ণ যাতনা আছেন,
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই শুদ্ধ হ’, শুদ্ধ হব
                                                              কালিমা রাখব না!

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
তোমার ওখানে যাব; তোমার পায়ের নিচে পাহাড় আছেন
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই স্নান কর
পাথর সরিয়ে আমি ঝর্নার প্রথম জলে স্নান করব
                                                              কালিমা রাখব না!

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
এখন তোমার কাছে যাব
তোমার ভিতরে এক সাবলীল শুশ্রূষা আছেন
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই ক্ষত মোছ আকাশে তাকা—
আমি ক্ষত মুছে ফেলব আকাশে তাকাব
                                                              আমি আঁধার রাখব না!

এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া
যে সকল মৌমাছি, নেবুফুল গাভির দুধের সাদা হেলেঞ্চা শাকের ক্ষেতে
যে রাখাল আমি আজ কোথাও দেখি না—তোমার চিবুকে
                                                              তাঁরা নিশ্চয়ই আছেন!

তোমার চিবুকে সেই গাভির দুধের শাদা, সুবর্ণ রাখাল
তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই কাছে আয় তৃণভূমি
কাছে আয় পুরনো রাখাল!
আমি কাছে যাব আমি তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না!

৪.
ধরিত্রী

পাতাকুড়োনির মেয়ে তুমি কী কুড়োচ্ছ? ছায়া, আমি ছায়া কুড়োই!
পাখির ডানার সিক্ত সবুজ গাছের ছায়া, গভীর ছায়া, একলা মেঘে
কুড়োই, হাঁটি মেঘের পাশে মেঘের ছায়া—ছায়া কুড়োই।

পাতাকুড়োনির মেয়ে তুমি কী কুড়োচ্ছ? পাতা, আমি পাতা কুড়োই!
কয়টি মেয়ে ঝরাপাতা : ঝরছে কবে শহরতলায়,
শিরায় তাঁদের সূক্ষ্ম বালু,
পদদলিত হৃদয় ক’টি, বৃক্ষবিহীন ঝরাপাতা—
কুড়োই আমি তাদের কুড়োই!

পাতাকুড়োনির মেয়ে তুমি কী কুড়োচ্ছ? মানুষ, আমি মানুষ কুড়োই।
আহত আর নিহত সব মানুষ কারা বাক্‌স খুলে ঝরায় তাদের রাস্তাঘাটে।
পঙ্গু—তবু পুণ্যে ভরা পুষ্প : তাদের কুড়োই আমি, দুঃখ কুড়োই!

আর কিছু না? বটেই—আরো আছে অনেক রঙ-বেরঙের ঝরাপাতা,
আমার ঝাঁপি উল্টে পড়ে মন্বন্তরের মৃত্যুবীজে
লক্ষ্যবিহীন লাল খনিজে!

সবাই আমার স্বার্থে ভিজে সবটুকু হয় স্বার্থবিষয়
সবটুকু হয় শুদ্ধ ব্যথা
তাদের অন্য কুলোয়, তাদের ঝাড়ব আমি অন্য হাওয়ায়
যেমন করে শস্যভিটায় শস্য ঝাড়ার সময় এলে, শস্যে কুড়োই সচ্ছলতা,

এবার আমার ঝরাপাতার শস্য হবার দিন এসেছে
শস্য কুড়োই, শস্যমাতা!

৫.
কালো কৃষকের গান

দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদি রাখব না আর আমার ভেতর!

সেখানে বুনব আমি তিন সারি শুভ্র হাসি, ধৃতপঞ্চইন্দ্রিয়ের
সাক্ষাৎ আনন্দময়ী একগুচ্ছ নারী তারা কুয়াশার মতো ফের একপলক
তাকাবে এবং বলবে, তুমি না হোমার? অন্ধ কবি ছিলে? তবে কেন হলে
চক্ষুষ্মান এমন কৃষক আজ? বলি কী সংবাদ হে মর্মাহত রাজা?
এখানে আঁধার পাওয়া যায়? এখানে কি শিশু নারী কোলাহল আছে?
রূপশালী ধানের ধারণা আছে? এখানে কি মানুষেরা সমিতিতে মালা পেয়ে খুশি?

গ্রিসের নারীরা খুব সুন্দরের সর্বনাশ ছিল। তারা কত যে উল্লুক!
উরুভুরুশরীর দেখিয়ে এক অস্থির কুমারী কত সুপুরুষ যোদ্ধাকে তো খেলো!

আমার বুকের কাছে তাদেরও দুঃখ আছে, পূর্বজন্ম পরাজয় আছে
কিন্তু কবি তোমার কিসের দুঃখ? কিসের এ হিরন্ময় কৃষকতা আছে?
মাটির ভিতরে তুমি সুগোপন একটি স্বদেশ রেখে কেন কাঁদো
বৃক্ষ রেখে কেন কাঁদো? বীজ রেখে কেন কাঁদো? কেন তুমি কাঁদো?
নাকি এক অদেখা শিকড় যার শিকড়ত্ব নেই তাকে দেখে তুমি ভীত আজ?
ভীত আজ তোমার মানুষ বৃক্ষশিশু প্রেম নারী আর নগরের নাগরিক ভূমা?

বুঝি তাই দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও তুমি অনাবাদি রাখবে না আর
এম্ফিথিয়েটার থেকে ফিরে এসে উষ্ণ চাষে হারাবে নিজেকে, বলবে
ও জল, ও বৃক্ষ, ও রক্তপাত, রাজনীতি ও নিভৃতি, হরিৎ নিভৃতি
পুনর্বার আমাকে হোমার করো, সুনীতিমূলক এক থরোথরো
                        দুঃখের জমিন আমি চাষ করি এদেশের অকর্ষিত অমা!

ব্রেকিংনিউজ/এমআর