তুখোড় ছাত্রনেতা থেকে উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
৭ মার্চ ২০১৯, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০৯:১০ আপডেট: ১০:২৮

তুখোড় ছাত্রনেতা থেকে উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম
ফাইল ছবি

এক সময়ের তুখোর ছাত্রনেতা ছিলেন এ কে এম এনামুল হক শামীম। ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতিও। সমকালীন রাজনীতিতে খুবই সক্রিয় শামীম বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। শরীয়তপুর-২ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সাংসদ হয়ে উপমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। 

এ কে এম এনামুল হক শামীমের জন্ম ১৯৬৫ সালে শরিয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার পাইকবাড়িতে। বাবা আলহাজ্ব মোহাম্মদ আবুল হাশেম মিয়া ও মা বেগম আশরাফুন্নেসা (রত্নগর্ভা)।

পেশাগত জীবনে তার বাবা ছিলেন একজন প্রকৌশলী। এনামুল হক শামীমের দাদা আলহাজ্ব রওশন আলী ছিলেন একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং নানা আব্দুল জলিল মুন্সী ছিলেন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। বলা যায় ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক আবহে বড় হয়েছেন তিনি। তার ছোট ভাই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম আমিনুল হক। আরেক ভাই এ কে এম আশরাফুল হক। বোন শামীম আরা হক কাকলী ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার দুই মেয়ে ইস্পিতা আশরাফি হক চতুর্থ ও ইসরা আশরাফি হক অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। তার স্ত্রী একটি টেলিফোন কোম্পানীতে কর্মরত।

স্কুলজীবনেই ছাত্র-রাজনীতির হাতেখড়ি হয় এনামুল হক শামীমের। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে জাতির পিতার আদর্শ বুকে নিয়ে যোগ দেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগে। ১৯৭৯ সালে নোয়াখালীর এমএ উচ্চবিদ্যালয়ে পাঠরত অবস্থায় স্কুল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করার পর উচ্চ শিক্ষা লাভের ব্রত নিয়ে উনি ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির আরো বেশি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের বিপুল ভোটে ১৯৮৯ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির পাশাপাশি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও তার ছিলো সদর্প বিচরণ। ১৯৯০ সালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়। সততা, আন্তরিকতা, কঠোর পরিশ্রম ও আওয়মী লীগ সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি বিশ্বস্ততার প্রমাণ দেখিয়ে তিনি ধীরে ধীরে উঠে আসেন ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে।

১৯৯২ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সহ-সভাপতি এবং ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়। শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির বার্তা নিয়ে তিনি ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

তার নেতৃত্বের গুণেই ৭৫ পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মত সারাদেশে ছড়িয়ে পরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জয় জয়কার। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইতিহাসে এনামুল হক শামীম অনন্য।

’৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং ’৯৬ এর বিএনপি-জামায়াত বিরোধী ‘জনতার মঞ্চ’ এর অন্যতম সংগঠক ছিলেন এনামুল হক শামীম।

প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক বাহক এনামুল হক শামীম বারবার প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০০১-২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামে সারাদেশের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যার ফলে তার উপর নেমে আসে অত্যাচারের খড়গহস্ত।

শতাধিক মামলার আসামি করা হয়ে তাকে, একাধিক বার কারাবরণ করেন তিনি। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে মৃত্যুর লড়াই থেকে ফিরে আসেন তিনি। এখনো শরীরে গ্রেনেডের আঘাতের চিহ্ন ও স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

১/১১ এর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থিরা যখন জননেত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা ও বিরোধিতা করা শুরু করেন এবং ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়ন করে দলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় মত্ত হন তখন তাদের এই হীন অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন একেএম এনামুল হক শামীম।

জননেত্রী শেখ হাসিনাকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখন আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা নিশ্চুপ থাকলেও এ কে এম এনামুল হক শামীম সমমনাদের সাথে নিয়ে সারাদেশের ছাত্রসমাজ ও আওয়ামী অন্তঃপ্রাণ মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে নেত্রীর মুক্তির জন্য রাজপথে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলেন।

একেএম এনামুল হক শামীম ২০০২ থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অবজারভার মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবারের মতো এবং ২০১২ সালের ডিসেম্বরের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্য মনোনীত হন।

২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলন অধিবেশনে এনামুল হক শামীমকে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবে নির্বাচিত করা হয়। সাংগঠনিক দায়িত্ব পাওয়ার পর তাকে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক বিভাগ চট্টগ্রামের সাংগঠনিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

চট্টগ্রামে ১৫টি সাংগঠনিক জেলা রয়েছে। রয়েছে দলটির প্রভাবশালী ও প্রবীণ অনেক নেতা। তাদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতিও করেছেন। এ জটিল এলাকায় দায়িত্বকে সমস্যা হিসেবে না দেখে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার দেয়া দায়িত্বকে সাদরে গ্রহণ করেছেন। নিজ ভূমি থেকে বিতারিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ঐ এলাকায় দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি।

চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে দলীয় নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। তিনি এলাকার নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সহায়তা করছেন।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণে ব্যস্ত  থাকেন দলের এই সাংগঠনিক সম্পাদক।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরীয়তপুর-২ আসন থেকে (দুই লাখ ৭৩ হাজার ৩৭০ পেয়ে) বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম। সংসদ সদস্যের স্বাদ গ্রহণ করতে না করতেই হয়ে গেলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী।

একনজরে একেএম এনামুল হক শামীমের রাজনৈতিক জীবনঃ

১৯৭৯: এ এম উচ্চ বিদ্যালয় স্কুল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। 

১৯৮৪: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

১৯৮৬: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।

১৯৮৮: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি।

১৯৮৯: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)’র ভিপি।

১৯৯০: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

১৯৯২: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি।

১৯৯৪: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি।

১৯৯৮: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য।

২০০২: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির অবজারভার মেম্বার।

২০১২: ফেব্রুয়ারি- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য (১ম বার)

২০১২: ডিসেম্বর- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য (২য় বার)।

২০১৬: অক্টোবর- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক।

এ কে এম এনামুল হক শামীম ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর।

ব্রেকিংনিউজ/টিটি/জেআই