‘হায় হোসেন’ মাতমে তাজিয়া মিছিলে মানুষের ঢল

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ১১:৩৪ আপডেট: ০১:৫১

‘হায় হোসেন’ মাতমে তাজিয়া মিছিলে মানুষের ঢল

‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ ধ্বনি তুলে শোকের মাতমে রাজধানীতে বের হওয়া তাজিয়া মিছিলে হাজারো মানুষের ঢল নেমেছে। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করে নবীজীর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর কারবালার প্রান্তরে শহীদ হওয়ার বিয়োগাত্মক ঘটনা স্মরণে তাজিয়া মিছিলে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিমরা শোক আর আহাজারির রোল তুলেছেন। 

পবিত্র আশুরা উপলক্ষে মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকার হোসেনি দালান থেকে মিছিলটি শুরু হয়। শিয়া সম্প্রদায় এই ঐতিহ্যবাহী মিছিল আয়োজন করেছে। 

কালো-লাল-সবুজের নিশান উড়িয়ে, কারবালার শোকের মাতম উঠেছে হাজার হাজার মানুষের মিছিলে। বুক চাপড়ে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ মাতম ধ্বনি তুলে এগিয়ে যাচ্ছে মিছিল, সবার পা খালি। ঘোড়া, কবুতর ও নিশানসহ বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে তারা হাজির হয়েছেন মিছিলে।

ঢাকায় হোসেনি দালান ঘিরে শিয়াদের তাজিয়া মিছিলের ঐতিহ্য কয়েকশ’ বছরের।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) তাজিয়া মিছিলে পাইক (শরীর রক্তাক্ত করা) দলভুক্ত ব্যক্তিদের দা, ছোরা, কাঁচি, বর্শা, বল্লম, তরবারি, লাঠি ইত্যাদি নিয়ে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে।

মিছিলের সামনে রয়েছে কালো কাপড়ের ইমাম হোসেনের (র.) তাজিয়া (প্রতীকী কবর)। নারী-পুরুষ শিশুদের হাতে অসংখ্য কালো, লাল ও সবুজ নিশান। তরুণদের (ভেস্তা) হাতে হাতে বিচিত্র আলাম (দীর্ঘ লাঠির মাথায় পতাকা)।

মিছিলে অংশগ্রহণকারী শিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারী নিজাম উদ্দীন ইউসুফ ব্রেকিংনিউজকে বলেন, মিছিলে তাজিয়া, আলম, ঝুলা, তাবত নিয়ে সমবেত হয়েছেন বিভিন্ন বয়সের মানুষ। মিছিলের সামনে থাকবে দুইটি ঘোড়া, যাকে দুলদুল হিসেবেই চেনে সবাই।

হোসনি দালান ইমামবাড়ার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মির্জা মোহাম্মদ নাকি আসলাম ব্রেকিংনিউজকে জানান, ৪০০ বছর ধরে পুরান ঢাকায় শোকের মাতম অর্থাৎ তাজিয়া মিছিল বের করা হয়। কারবালায় ইমাম হোসেনসহ তার পরিবারকে হত্যার মধ্যদিয়ে যে বিষাদময় ঘটনা ঘটেছে ইতিহাসে তার পুনরাবৃত্তি হবে না। মিছিলে বিভিন্ন ধর্ম ও গোষ্ঠীর মানুষ অংশ নিয়েছে।

আয়োজকদের একজন জালালী মোহাম্মদ আবদুল নাসিম ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘অন্যান্য বছর মিছিলে পাইকরা অংশ নিতো। দিনটি উপলক্ষে তারা শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি করত। দিনটির শোক স্মরণ করে নিজেদের নিজেরাই আঘাত করে জর্জরিত করতো। কিন্তু এবার সেটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেই সঙ্গে এবার পাঞ্জাও করা যাবে না। যেটি মিছিলের একটা মূল উপাদান ছিল।’

এদিকে, তাজিয়া মিছিল উপলক্ষে ইমামবাড়া এবং আশেপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা সদা তৎপর রয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায় বলেন, ‘তাজিয়া মিছিল উপলক্ষে নিরাপত্তার স্বার্থে মিছিলে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে তল্লাশি করে তবেই ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে। মিছিলের মাঝ পথ থেকে কেউ ঢুকতে পারবে না। সে কারণে অনেকেরই ভেতরে ঢুকতে দেরি হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা সবাই সর্বোচ্চ শতর্ক অবস্থানে রয়েছি।’

তাজিয়া মিছিলটি বকশিবাজার, উর্দুরোড, লালবাগ চৌরাস্তা, ঘোড়া শহীদের মাজার, আজিমপুর, নিউমার্কেট হয়ে জিগাতলা (ধানমন্ডি লেকের কাছে) গিয়ে শেষ হবে। পথের দুপাশে রয়েছে উৎসুক জনতার ভিড়। মানুষ ছাদে দাঁড়িয়ে, জানালা দিয়ে মিছিল উপভোগ করছে। পুরো মিছিল ঘিরে রয়েছে পুলিশ, র‍্যাবসহ বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ব্রেকিংনিউজ/টিটি/এমআর