‘আমাদের সমাজ খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে’

স্টাফ ক‌রেসপ‌ন্ডেন্ট
৫ অক্টোবর ২০১৯, শনিবার
প্রকাশিত: ০৬:০১ আপডেট: ০৬:০২

‘আমাদের সমাজ খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে’

দে‌শে যেভা‌বে গুম খুন হ‌চ্ছে এতে অপরাধ কম‌বে না মন্তব্য ক‌রে বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক ব‌লে‌ছেন, “যেভা‌বে চল‌ছে এভা‌বে চল‌তে থাক‌লে সমাজ খা‌দে প‌রে যা‌বে, এম‌নিতেই খা‌দের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে”।

‌তি‌নি ব‌লেন, “উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে আমরা টোটাললি ‘ল’লেস স্যোসাইটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। যেখানে কোনো আইন নেই, আমাদের নিরাপত্তাবোধ থাকবে না, অন্যায়-অপরাধ হলে আইন অনুযায়ী কোনো বিচার হবে না। আমরা কিন্তু প্রত্যেক দিন সেদিকে এগোচ্ছি।”

শনিবার (৫ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবে জহুর হো‌সেন চৌধুরী হ‌লে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত জোরপূর্বক গুম বিষয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতা ও জাতিসংঘের সুপারিশ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। 

যারা সরকার চালান তারা কী সব চোখ বুজে থাকেন এমন প্রশ্ন রেখে শাহদীন মালিক বলেন, “যেসব দেশে ৮০’র দশকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুম শুরু হয়েছিল সেসব দেশগুলোতে কী হয়েছিলে সেগুলো তারা দেখেন না কেন? ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হচ্ছে সেন্ট্রাল আমেরিকা থেকে জনগণ আমেরিকায় চলে আসা। হন্ডুরাস, গুয়েতেমালা, নিকারাগুয়ে এসব দেশ থেকে হাজার হাজার, লাখ লাখ লোক আমেরিকায় আসতে চাইছে, আর ট্রাম্প তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করছে। ৮০’র দশকে এসব দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুধু হয়েছিল এরই ফল হচ্ছে এগুলো।”

তিনি বলেন, “এ লোকগুলো আমেরিকাতে আসছে কেন? তাদের সবারই এক কথা অনেকটা আমাদের রোহিঙ্গাদের মতো। তাদের দেশে তাদের কোনো নিরাপত্তা নেই, তারা সম্পূর্ণ অসহায়, সাংঘাতিক ধরনের অপরাধ হচ্ছে, তারপরও সরকার তাদের কোনো সাহায্য করে না। জানে বাঁচতে তারা আমেরিকায় যাচ্ছে। এ সমস্যাটা ৭০’র দশকে চিলিতে দেখা দিয়েছিল। কোনো দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুম শুরু হয় এর পরিণতি যে কি হয়, তার বড় উদাহরণ হচ্ছে সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশগুলো।”

এই আইনজীবী বলেন, “৮০’র দশকে সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশগুলোর লোকজনও বলেছিল, সেসব দেশের বিচার ব্যবস্থা কিছু হয় না, কিছু তড়িৎ বিচার হলে তথা অপরাধীকে সরিয়ে দিলে অপরাধ দূর হয়ে যাবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে কোনো সমাজ এ পথে গিয়ে অপরাধ দূর করতে পারেনি। বরং সেক্ষেত্রে পুরো সমাজটাই অপরাধপ্রবণ হয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “ক্যাসিনো ব্যবসা পুলিশের নাকের ডগায় হচ্ছে, অথচ পুলিশ বলছে তারা জানে না! চারদিকে দুর্নীতি হচ্ছে। এসব পচন শুরু হয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুম দিয়ে। এক্ষেত্রে বড় উদ্বেগ হচ্ছে এর আগে যেসব দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুম তাদের থেকে আমরাও আমাদের ভবিষ্যতে চিত্র দেখতে পাই। সে সমাজ আমাদের কারো কাম্য নয়।”

শাহদীন মালিক বলেন, সমাজে অবশ্যই অপরাধ আছে, অনিয়ম আছে, বিশৃঙ্খলা রয়েছে। তবে কোনো সমাজই আইনের বাইরে গিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। অনেক দেশই মূর্খের মতো এটা ভেবেছে কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আমাদের দেশেও একটা ভাবনা এসেছে যে, দু’চারশো মানুষকে গুলি করে হত্যা করলেই মাদক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এটা মোটেও সম্ভব নয়। কারণ এর আগে কোনো দেশ এ পথে অপরাধ দমন করতে পারেনি। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ।”

তিনি আরো বলেন, “আমাদের উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে আমরা টোটালি ল’লেস স্যোসাইটির দিকে এগোচ্ছি। যেখানে কোনো আইন নেই, আমাদের নিরাপত্তাবোধ থাকবে না, অন্যায়-অপরাধ হলে যেখানে আইন অনুযায়ী কোনো বিচার হবে না। আমরা কিন্তু প্রত্যেক দিন সে দিকে এগোচ্ছি। প্রতিফলন কি সেটা যারা সরকার চালাচ্ছে তারা দেখে কি-না জানি না, তবে আমি তো দেখি।”

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “গত কয়েক বছরে কোনো দেশের সরকার প্রধান কি বাংলাদেশে এসেছে? ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়তেন তাই তিনি ২০১৯ সালে এসেছিলেন। আমাদের সরকার প্রধানরা কি কোথাও যায়? সম্মেলনে যায়, ওয়ান টু ওয়ান ভিজিট আজকাল আর হয় না। হ্যাঁ, মালদ্বীপে গেলে হয়তো হবে। আন্তর্জাতিক সম্মেলন ছাড়া আমরা কোথাও দাওয়াত পাই না। দিল্লিতে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন এটাও কিন্তু একটা সম্মেলন।”

“বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কী অবস্থা? বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যরা কেউ বাংলায় কথা বলতে পারেন না! ছাত্রলীগের কি অবস্থা? যে সমাজ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুমের মাধ্যমে অপরাধ দমন করতে চায় সে সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়তে বাধ্য। এখন আমরা ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি। এরপর আর দুই পা দিলেই কিন্তু গভীর খাদ। এটা আমাদের বুঝতে হবে।”

নারী পক্ষের আহ্বায়ক শিরিন হকের সভাপতিত্বে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সি আর আবরার, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল প্রমুখ।

‌ব্রে‌কিং‌নিউজ/ এএইচএস/ এমজি