কে এই কাউন্সিলর ‘পাগলা মিজান’

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
১৩ অক্টোবর ২০১৯, রবিবার
প্রকাশিত: ০৪:৫৩ আপডেট: ০৪:৫৪

কে এই কাউন্সিলর ‘পাগলা মিজান’

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান। ভারতের পালিয়ে যাওয়ার আগে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এই কাউন্সিলরের মূল নাম হাবিবুর রহমান। আর ডাক নাম মিজান। তবে এই দুটি নাম ছাপিয়ে তাকে ‘পাগলা মিজান’ হিসেবেই সবাই চেনে। পাগলা মিজানের আসল নাম ছিল মিজানুর রহমান মিজান। ফ্রিডম পার্টির ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুর থানার কো-অর্ডিনেটর মিজান পরে নাম পাল্টে হয়ে যান হাবিবুর রহমান মিজান। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সুযোগে আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়েন। তবে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা তাকে ‘পাগলা মিজান’ নামেই চেনেন।

টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পে মাদক ও চোরাই গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবসার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এই প্রভাবশালী নেতাকে গ্রেফাতার করে র‌্যাব।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথ্যমতে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার বাসায় হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন পাগলা মিজান। সময়ের স্রোতে ভোল পাল্টেছেন তিনি। পাল্টেছেন নামও। এরপরেই আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা বনে গেছেন।

পাগলা মিজানকে একজন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হিসেবে উল্লেখ করে র‌্যাব জানায়, সিটি করপোরেশনের ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি থেকে শুরু করে মানুষ হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি মোহাম্মদপুরে গড়ে তুলেছিলেন অপরাধ সাম্রাজ্য।

গ্রেফতারের পর শুক্রবার (১১ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোডে মিজানের বাসায় অভিযান চালিয়ে ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ব্যাংক চেক, ১ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও ২ লাখ নগদ টাকা উদ্ধার করা হয় বলে সাংবাদিকদের জানান র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম।

তিনি জানান, ক্যাসিনোবিরোধী চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে র‌্যাব-৯ এর একটি দল শুক্রবার সকালে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অভিযান চালিয়ে ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মিজানকে গ্রেফতার করে র‍্যাব।

এসময় র‌্যাব মিজানের কাছ থেকে চার রাউন্ড গুলিসহ একটি অবৈধ অস্ত্র এবং বৃহস্পতিবার ব্যাংক থেকে ৬৮ লাখ টাকা উত্তোলনের প্রমাণ থাকা কাগজও উদ্ধার করেছে বলেও জানান ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম।

তিনি বলেন, মিজানকে শ্রীমঙ্গল থেকে ঢাকায় এনে বিকালে প্রথমে তার মোহাম্মদপুরের অফিসে অভিযান চালানো হয়। তবে সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে বিশাল অংকের টাকার চেক ও এফডিআর উদ্ধার করা হয়।

কাউন্সিলর মিজানের কাছ থেকে ব্যাংক চেক ও এফডিআরের নথি উদ্ধার করা গেলেও বৃহস্পতিবার ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা টাকা সম্পর্কে কোনো তথ্য তিনি র‌্যাবকে দেননি। তবে, দেশ থেকে পালানোর উদ্দেশেই তিনি এই টাকা তুলেছিলেন বলে ধারণা করছেন র‍্যাব কর্মকর্তারা।

ব্রেকিংনিউজকে র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান, এই বিপুল অংকের টাকার কোনো উৎস দেখাতে পারেননি মিজান। র‍্যাবকে মিজান জানিয়েছেন সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হিসেবে প্রাপ্ত ভাতা বাদের আয়ের তেমন উৎস নেই তার। এছাড়া ভাড়া দেওয়া তিনটি বাড়ি থেকে ৯০ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। তবে, টাকার উৎস না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বাড়ি রয়েছে তার। সেখানে তার বিলাসবহুল কয়েকটি গাড়িও রয়েছে।

র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, এই আয় দিয়ে কখনই এতো বিলাসবহুল বাড়ি ও গাড়ি কেনা সম্ভব নয়।

৩২ নম্বরে হামলার আসামি মিজান

১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে ফ্রিডম পার্টির সদস্য কাজল ও কবিরের নেতৃত্বে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হামলা চালায় একটি চক্র। তারা সেখানে গুলি করে এবং বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় শেখ হাসিনা বাড়ির ভেতর অবস্থান করছিলেন। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরা পাল্টা গুলি চালালে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় মামলা হয়।

’৯৭ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১৬ জনকে আসামি করে মামলার অভিযোগপত্র দেয়। অভিযোগপত্রে মিজানুর রহমান ওরফে পাগলা মিজানকে হামলার পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। হামলাকারীদের মধ্যে মিজানের ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমানও ছিলেন। ’৯৫ সালে দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে নিহত হন তিনি।

মিজানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মহাজোট সরকারের আমলে মিজান বাহিনী ৩০০-৪০০ কোটি টাকার শুধু টেন্ডারবাজি করেছে। এ ছাড়া ভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ মোহাম্মদপুর বিহারি ক্যাম্পে মাদক ও চোরাই গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবসার নিয়ন্ত্রক তিনি। বর্তমানে চলমান সন্ত্রাসবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও একাধিক খুনের মামলা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার নামে মোহাম্মদপুর থানায় ১৯৯৬ সালে ইউনূস হত্যা ও ২০১৬ সালে সাভার থানায় জোড়া হত্যার মামলা রয়েছে।

জমি দখলকে কেন্দ্র করে গত বছর একদল সন্ত্রাসী মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানসংলগ্ন তুরাগ নদের ওপারে একটি রিয়েল এস্টেটের ছয় কর্মীকে গুলি এবং আরও ১৪ জনকে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় সন্ত্রাসীরা জুয়েল নামের একজনকে হত্যা করে লাশ তুরাগে ফেলে দেয়। এ হত্যায়ও পাগলা মিজানের নাম উঠে এসেছে।

পাগলা মিজান শ্যামলী মাঠের পশ্চিম পাশের জমির একাংশ দখল করে বানিয়েছেন মার্কেট। সেখানে তিন শতাধিক দোকানঘর তুলে ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে পুলিশের সঙ্গে ক্যাম্পবাসীর সংঘর্ষের নেপথ্যেও তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। মিজান ক্যাম্পের বিদ্যুৎ লাইন থেকে ক্যাম্প-লাগোয়া কাঁচাবাজার ও তিন শতাধিক মাছের দোকানে অবৈধ সংযোগ দিয়ে মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় করতেন। এ কারণেই বিদ্যুৎ অফিসের সঙ্গে ক্যাম্পবাসীর ঝামেলার সূত্রপাত।

১৯৭৪ সালে ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় আসেন মিজানুর রহমান। শুরুতে মিরপুরে হোটেলবয়ের কাজ নেন। এরপর মোহাম্মদপুরে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি শুরু করেন। চুরি করা সেই ঢাকনা আবার বিক্রি করতেন সিটি করপোরেশনের কাছে।

যেভাবে নাম ‘পাগলা মিজান’

’৭৫ সালের শেষ দিকে খামারবাড়ির খেজুরবাগানে ছিনতাই করতে গিয়ে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে লালমাটিয়া মসজিদের পাশের পুকুরে ঝাঁপ দেন মিজান। পুলিশ পুকুর ঘিরে রেখে তাকে উঠে আসার জন্য বারবার নির্দেশ দিলেও তিনি পুকুরে পড়ে থাকেন। কয়েক ঘণ্টা পর কোনো কাপড় ছাড়াই উলঙ্গ অবস্থায় উঠে আসেন মিজান। এ জন্য পুলিশ তাকে ‘পাগল’ আখ্যা দিয়ে ছেড়ে দেয়। তখন থেকেই তার নাম হয় ‘পাগলা মিজান’।

ওই বছরই ফ্রিডম পার্টিতে যোগ দেন তিনি। ফ্রিডম পার্টির সদস্য হিসেবে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিতে লিবিয়া যান।

ব্রেকিংনিউজ/টিটি/এমজি

bnbd-ads