bnbd-ads
bnbd-ads

ভাগ নিয়ে দ্বন্দ

ফুলছড়িতে পাঁচ মাসেও ভিজিডি’র চাল পায়নি দুস্থ নারীরা!

মিলন খন্দকার, গাইবান্ধা প্রতিনিধি
১৫ মে ২০১৯, বুধবার
প্রকাশিত: ০৭:১৯

ফুলছড়িতে পাঁচ মাসেও ভিজিডি’র চাল  পায়নি দুস্থ নারীরা!
ফাইল ছবি

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিজের দফতরের নামে শতকরা পাঁচ ভাগ ভিজিডি চক্রের চালের কার্ড দাবি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

 এনিয়ে উপজেলার সাতটি ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সাথে ওই কর্মকর্তার দ্বন্দ এখন চরমে। ফলে উপজেলার দুই হাজার ৮৯১ জন দুস্থ নারী পাঁচ মাসেও তাদের ভিজিডির চাল পাননি।

এদিকে চলমান রমজান মাস ও ঈদকে সামনে রেখে দ্রুত চাল বিতরণের দাবি জানিয়েছেন দুস্থ নারীরা। 

দুস্থ মহিলারা অভিযোগ করে বলেন, ‘তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে এ বছর অনলাইনে আবেদন গ্রহন করার পরও, প্রধানমন্ত্রীর যুগান্তকারী উদ্যোগ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর খাদ্য সহায়তার কর্মসূচির আওতায় ভিজিডি কার্ড ভাগবাটোয়ায় মেতে উঠেছেন চেয়ারম্যান-মেম্বারসহ দলীয় নেতা-কর্মীরা।

 ইউনিয়নগুলোতে ভিজিডি কর্মসূচির তালিকা নিয়ে চলছে লুকোচুরি খেলা। টাকার বিনিময়ে অনলাইনে আবেদনকারীদের নাম বাদ দিয়ে নতুন করে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা দুস্থরা টাকা দিতে পারছি না বলেই তো সরকারের এই সহায়তা থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। স্বচ্ছল পরিবারের নারীরাও টাকার বিনিময়ে দুস্থদের চাল পাচ্ছে।’ 

উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ফুলছড়ি উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে ২০১৯-২০২০ ভিজিডি চক্রের দুই বছর মেয়াদি দুই হাজার ৮৯১ জন দুস্থ নারী প্রতি মাসে  ৩০ কেজি করে চাল খাদ্য সহায়তা পাবেন। 

দুস্থ নারীদের তালিকা প্রণয়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে মহিলা বিষয়ক অধিদফতর থেকে অনলাইনে আবেদন আহ্বান করা হয়। আবেদন জমা পড়ে প্রায় ছয় হাজার। এ সুযোগে অনেক সচ্ছল পরিবারের নারীরাও ভিজিডি কার্ডের জন্য আবেদন করেন।

 আবেদনের পরপরেই ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বচ্ছতার মাধ্যমে দুস্থদের বাছাই করে তালিকা প্রণয়নের কথা থাকলেও পরবর্তীতে ফুলছড়ি উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিসের খামখেয়ালিপনায় তালিকা তৈরিতে দীর্ঘসূত্রীতা দেখা দেয়।

এক পর্যায়ে এই তালিকা প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের ভাগবাটোয়ারায় বিষয়টি প্রাধান্য দেয়া হয়। পরে তা প্রকাশ্যে রুপ নেয়।

অভিযোগ আছে, প্রত্যেক ইউনিয়নে দুস্থদের তালিকায় নিজেরদের লোকের জন্য শতকরা পাঁচ ভাগ কার্ড দাবি করেন উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকতা।

 এছাড়া দলীয়ভাবে ভিজিডি কার্ড দাবি করা হলে ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের সাথে বিরোধ দেখা দেয়। এসব কারণে দীর্ঘ ৫ মাসেও ভিজিডি কার্ডের তালিকা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। 

এদিকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করণের জন্য প্রকাশ্যে লটারীর মাধ্যমে ভিজিডি তালিকা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে দুস্থ নারীরা।

উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের অনেক দুস্থ নারীই অভিযোগ করে বলেন, ‘স্বচ্ছতার কথা শুনে ৫০ টাকা খরচ করে ভিজিডি কার্ডের জন্য অনলাইনে আবেদন করেছি। কিন্তু এখন দেখছি, যে টাকা দিতে পারছে তার নামই তালিকায় যাচ্ছে, এ কেমন স্বচ্ছতা।’ 

ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলাম সোমবার (১৩ মে) মুঠোফোনে বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে  ৫০৩ জন দুস্থ নারীর ভিজিডি চক্রের কার্ড বরাদ্ধ পাওয়া যায়। সেখান থেকে দলীয় নেতা-কর্মীরা নেয় ১৩৩ টি নাম, পরিষদের জন্য দেয়া হয় ৩০৫, উপজেলা চেয়ারম্যান ৪০, দুই উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ২০, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা দুই ও কমিউনিটি ক্লিনিক নেয় তিন জন দুস্থ নারীর নাম।’

 তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি এরেন্ডাবাড়ীসহ আরও দুইটি ইউনিয়ন পরিষদ সংশ্লিষ্ট দফতরে ভিজিডি চক্রের চূড়ান্ত তালিকা জমা দিয়েছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক  কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, ‘ভিজিডি চক্রের তালিকায় উপজেলা চেয়ারম্যান, দুই ভাইস চেয়ারম্যান, মহিলা বিষয়ক অফিস, সংশ্লিষ্ট কমিউনিটি ক্লিনিকসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমান কার্ড বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। এ অবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আমাদের পক্ষে কষ্টকর।’

তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি মহিলা বিষয়ক অফিসের অযৌক্তিক দাবি কোনো চেয়ারম্যান-মেম্বার মানছেন না। তাই ভাগ দ্বন্দে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’ 

ফুলছড়ি উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা মুঠোফোনে বলেন, ‘শতকরা পাঁচ ভাগ কার্ড দাবির বিষয়টি সঠিক নয়।’ তবে তিনি দাবি করেন, ‘প্রতিনিয়ত অফিসে অনেক দুস্থ নারীরা এসে কার্ডের জন্য আবদার করে। সেসময় সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে তাদের নাম তালিকাভুক্তির জন্য অনুরোধ করা হয়। এই বিষয়টিকেই কেন্দ্র করে আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘দুস্থ নারীদের জন্য জানুয়ারি থেকে ২৪ মাস মেয়াদি ৭টি ইউনিয়নে দুই হাজার ৮৯১ জন সুবিধাভোগীর নাম বরাদ্দ পাওয়া যায়। যা গত বছর ডিসেম্বর মাসে তালিকা প্রণয়ন কার্যক্রম শেষ করার কথা। কিন্তু ভিজিডি কার্ড বণ্টনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সাথে দলীয় নেতা-কর্মীদের দ্বন্দ থাকায় তালিকা প্রণয়নে বিলম্ব হচ্ছে। ইতিমধ্যে তিনটি ইউনিয়নের তালিকা উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিসে জমা হয়েছে।’

 লটারির মাধ্যমে দুস্থ তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যান মেম্বাররা এতে রাজি নয়, তাই তাদের তালিকা বাধ্য হয়ে জমা নিতে হচ্ছে।’

ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিএম সেলিম পারভেজ বলেন, ‘দলীয়ভাবে ভিজিডির তালিকা প্রণয়নের বিষয়ে এখনও আওয়ামী লীগের উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটিকে জানানো হয়নি। ভিজিডি কার্ডের বিষয়ে সরকারি নীতিমালার বাইরে যদি রাজনৈতিকভাবে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের নামের তালিকা দেয়ার নিয়ম থাকে, তাহলে অবশ্যই আওয়ামী লীগের ৭টি ইউনিয়নের নির্বাচিত নেতাকর্মীরাই তালিকা দিবে। এর বাইরে কেউ তালিকা দেয়ার বা নেয়ার চেষ্টা করলে নেতাকর্মীরা তাদের কঠোরভাবে দমন করবে।’

ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা ভিজিডি কমিটির সভাপতি মো. আব্দুল হালিম টলষ্টয় বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান মেম্বাররা তালিকা প্রণয়নের কাজ করে থাকে। গত বছরের ডিসেম্বরে তালিকা চেয়ে তাদের কাছে চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও তালিকা সংশ্লিষ্ট দফতরে জমা না দেয়ায় তাদের কয়েক দফায় তাগাদাপত্র দেয়া হয়। মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার শতকরা পাঁচ ভাগ কার্ড দাবি করাটা অযৌক্তিক। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জানতে চাইলে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোছা. নারগিছ জাহান মুঠোফোনে বলেন, ‘মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আমি এখনও পাইনি। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তিনি দাবি করেন, ‘সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটির সাথে আলোচনা করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন করে দ্রুত চাল বিতরণের ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’

ব্রেকিংনিউজ/জেআই