ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাসপাতালে দালাল রাজত্ব

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
প্রকাশিত: ১২:৩১

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাসপাতালে দালাল রাজত্ব

২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে চলছে দালালদের রাজত্ব। পুরুষ দালালদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমানতালে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহিলা দালালরা। এতে রোগীসহ সাধারণ মানুষ প্রতিদিন প্রতারিত হলেও কর্তৃপক্ষ উদাসীন। মাঝে মাঝে লোক দেখানো দালাল বিরোধী অভিযান চললেও দালালরা রয়েছে বহাল তবিয়তে। বিভিন্ন বয়সী প্রায় ৩০-৩৫জন দালালের অবাধ বিচরণ এই হাসপাতাল ক্যাম্পাসে। রোগীদেরকে হাসপাতালে চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া, ভর্তি, বিভিন্ন ক্লিনিকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো সবই করে দালালরা। বিনিময়ে হাতিয়ে নেয় মোটা অঙ্কের টাকা।

জানা গেছে, বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকের তালিকাভুক্ত এই দালালরা প্রাইভেট ক্লিনিক থেকে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে রোগীদেরকে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিদিন জেলা সদর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে রোগীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে আসেন চিকিৎসা সেবা নিতে। হাসপাতাল ক্যাম্পাসে এসেই তারা পড়েন দালালদের খপ্পরে। ভদ্রবেশী দালালরা রোগী ও তাদের আত্মীয় স্বজনের সাথে ভাব জমিয়ে ভালো ডাক্তার ও উন্নতমানের চিকিৎসার কথা বলে নিয়ে যায় বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর বেশ কিছু টেস্ট করিয়ে রোগীর কাছ থেকে আদায় করেন মোটা অঙ্কের টাকা। বিনিময়ে ওইসব ক্লিনিক থেকে তারা পায় কমিশন।

এদিকে দালালদের দৌরাত্ম প্রতিরোধের জন্য হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা লাগানো হলেও দালালদের এতে কোনো ভাবলেশ নেই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভদ্রবেশী দালালেরা পুলিশি ঝামেলা এড়াতে প্রতিদিনই সকালে হাসপাতালে এসে কাউন্টার থেকে নিজেদের নামে টিকেট কাটে। পুলিশ চ্যালেঞ্জ করলে তারা জানায়, তারা নিজেদের চিকিৎসা করাতে হাসপাতালে এসেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বাইরের এই দালালদেরকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন হাসপাতালের অসাধু কয়েকজন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে দালালরা সখ্যতা রাখেন বলেও অভিযোগ আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালে দাপিয়ে বেড়ানো দালালদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মোবারক, জালাল, জাকির, মুসলিম, রোকেয়া বেগম, সালমা বেগম, শিল্পী বেগম, মুক্তা বেগম-১, মুক্তা বেগম-২, স্বর্ণা বেগম, নার্গিস বেগম, জাবেদ মিয়া, আলম, জুয়েল, দুদ মিয়া, আছিয়া বেগম, শাকিল, মামুন, মাসুম, হুমায়ূন, ফয়সাল, আরশ, বশির, সাথি, মায়ারানী, যুথি, জেনী।

হাসপাতালের ভেতরে বহিঃবিভাগের দুইটি কাউন্টারের সামনে ও জরুরী বিভাগের ভেতরে থাকে তাদের অবস্থান। সম্প্রতিই হাসপাতালের সিসি ক্যামেরায় দেখা যায় কিছু দালালের কর্মকাণ্ড। প্রতিদিনই তারা সিসি ক্যামেরার সামনে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কর্মকাণ্ড।

হাসপাতাল সূত্র জানা যায়, দালালদের বিরুদ্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু এসব অভিযান নিয়ে দালালদের কোনো মাথা ব্যাথা নেই।

অভিযোগ রয়েছে এই দালালদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য হারুন মিয়া নামক এক দালাল গেইটে সব সময় পাহারা দেয়। হাসপাতালে অভিযানের বিষয়ে জানতে পারলেই সে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দালালদেরকে সর্তক করে দেয়।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, সম্প্রতি হাসপাতালে গেইটে সামনে সিসি ক্যামেরায় ধরাপড়া দালালদের দেখভাল করেন কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিক ও ক্লিনিকের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন চিকিৎসক। সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া একজন মহিলার নাম নার্গিস ও স্বর্ণা। পুরুষ দালালের নাম মামুন। অভিযোগ রয়েছে, এসব দালালদের প্রতিদিন হাত খরচের টাকা দেয় বেশ কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিকের মালিক। ভ্রাম্যমাণ আদালতে কোনো দালালের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হলেও ওইসব ক্লিনিক এসবের ব্যয় ভার বহন করে। দালালরা কারাগারে গেলে তাদের পরিবারকে ভরণপোষনের জন্য টাকা দেয়া হয় তারা। এমনিক চিকিৎসক যখন কোনো রোগীকে টেস্ট করানোর কথা বলেন, তখন দালালরা সেই টেস্টগুলো করানোর জন্য ক্লিনিকগুলো থেকে কমিশন পেয়ে থাকে। পরীক্ষার টেস্ট অনুযায়ী শতকরা ৪৫-৫০ ভাগ পেয়ে থাকেন দালালরা। কিন্তু আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও ডিজিটাল এক্স-রে থেকে তাদের কমিশনের ভাগ কম। তাই তারা চিকিৎসকদেরকে বেশী করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তাদের অনুরোধে চিকিৎসকরা অনেক সময় অপ্রয়োজনী কিছু টেস্ট করার জন্যও বলেন রোগীকে এমন অভিযোগ রয়েছে।

নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর আসা রফিক উদ্দিন জানান, হঠাৎ একদিন আমার স্ত্রী পেটে প্রচণ্ড ব্যাথা হলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে উদ্দেশ্যে শহরের আসি। সদর হাসপাতালের জরুরী বিভাগের টিকেট কাটতে গেলেই এক মহিলা আমাকে বলে আজকে আপনার স্ত্রীর রোগে ভাল কোনো চিকিৎসক নেই। তখন তিনি ওই মহিলাকে ভাল চিকিৎসক কোথায় পাওয়া যাবে বললে মহিলা রফিক উদ্দিনকে বলেন একজন ভাল চিকিৎসকের সাথে আমার ভাল পরিচয় একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে ডাক্তারটি বসেন। পরে যেমন কথা তেমন কাজ। স্ত্রীকে নিয়ে রফিক উদ্দিন মহিলার পরিচিত ক্লিনিকের ডাক্তারের কাছে গেলে সেই ডাক্তার কিছু পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষাগুলো করার পর বিল আসে প্রায় চার হাজার তিনশত টাকা। কিন্তু পরীক্ষার বিলের পরিমাণ টাকা না থাকলে রফিক উদ্দিনের ভাইয়ে কাছ থেকে বিকাশে টাকা এসে পরীক্ষা বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। পরে পরীক্ষা শেষে ডাক্তারের কাছে গেলে কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে আবার ১০ দিন পর আসতে বললেন। কিন্তু ডাক্তারের লিখে দেওয়া ওষুধ কোনো ভাবেই প্রভাব না পড়ায় স্ত্রীকে নিয়ে আবার সেই প্রাইভেট ক্লিনিকে আসলাম। এভাবেই দিনের পর দিন রফিক উদ্দিনের মত সহজ-সরল গ্রাম থেকে আসা মানুষরা দালালদে খপ্পড়ে পড়ে প্রতারিত হয়েই চলছে। দীঘদিন পর পর প্রশাসন থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও কাজ হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্বাবধায়ক শওকত হোসেন জানান, দালালদের দৌরাত্ম্য  কমাতে প্রতিনিয়ত মোবাইল কোর্ট হচ্ছে এবং এমনিক আমি নিজেও রাউন্ডে বের হই তখনই তারা থাকে না।  সাধারণ মানুষ যেন দালালদের খপ্পরে না পড়ে সেই কারণে হাসপাতালে আমরা মাইকে সচেতনামূলক দিক নির্দেশনা দিচ্ছি। এই বিষয়ে প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছি। এখন দালালদের উৎপাত অনেকটাই কমে এসেছে।

ব্রেকিংনিউজ/এমজি