রংপুরে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা: বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১১ জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ১১:৫৬ আপডেট: ১২:০৭

রংপুরে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা: বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা

অব্যাহত টানা বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে রংপুর অঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া, ঘাঘট, দুধকুমরসহ অন্যান্য নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপদ সীমার ২০ সেন্টিমিটার এবং ধরলার পানি কুলাঘাট পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।

এদিকে, রংপুরের গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের পূর্ব ইছলি গ্রামে তিস্তার প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে সংযোগ সড়ক। এছাড়াও বয়াবহ বন্যা দেখাদিলে পানিবন্দি মানুষের সাথে পশু খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে বলে মনে করছে সচেতন মহল। 
অপরদিকে, নীলফামারী জলঢাকার চার ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার পরিবার বাঁধ ভাঙনের আশঙ্কায় আতঙ্কে দিনাতিপাত করছে। 

জানা গেছে, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর ফসলী জমি, বিদ্যালয়সহ নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি পরিবারগুলো রান্না না করতে পেরে শুকনো খাবার খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন বলেও খবর পাওয়া গেছে। 

বৃহস্পতিবার রংপুর জেলা প্রশাসক মো. আসিব আহসান পানিবন্দি গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চর ইচলি ও বাগেরহাট গ্রাম পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি পানিবন্দি লোকজনের সাথে কথা বলে তাদেরকে দ্রুতই প্রয়োজনীয় সহযোগীতার আশ্বাস দেন। পানিবন্দি লোকজনকে সহযোগিতার বিষয়ে গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বলেন শুকনো খাবার পর্যাপ্ত রয়েছে, তালিকা পেলে সরবরাহ করা হবে। 

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম, হাতীবান্ধার সানিয়াজান, গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, সিংগিমারী, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, কাকিনা, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুন্ডা, কুলাঘাট ও মোগলহাট ইউনিয়নের তিস্তা ও ধরলার নদীর চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এসব ইউনিয়ের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা।

পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তার তীরবর্তী এলাকার ব্রিজ কালভার্ট ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। ভেসে যাচ্ছে শত শত পুকুরের মাছ। নষ্ট হয়েছে চাষিদের বাদাম, ভুট্টা ও সবজিসহ নানান ফসল। পানি প্রবাহ ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়ায় ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে তিস্তার তীরবর্তী মানুষ।

মহিষখোচা পাসাইটারী গ্রামের আলম মিয়া, মানিক মিয়া, নুরবক্ত জানান, টানা ৩/৪ দিন ধরে পানিবন্দি থাকলেও সরকারি কোনো সহায়তা বা ত্রাণ তারা পাননি। শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে আরো বড় বন্যার আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তারা। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে চরাঞ্চলের রাস্তাঘাট, হাট বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জেলার নদী তীরবর্তী অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলো বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে। 

গোবর্দ্ধন চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজি শফিকুল ইসলাম বলেন, বন্যার পানিতে ডুবে গেছে শ্রেণিকক্ষ। তাই তিনদিন ধরে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসছে না। পরিবেশ বিঘ্ন ঘটায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

হাতীবান্ধা উপজেলার চর সিন্দুর্না গ্রামের আলতাব উদ্দিন ও আবু তালেব জানান, দু’দিন ধরে পানিবন্দি থাকার পর বুধবার মধ্যরাতে হঠাৎ তিস্তার পানি বাড়তে থাকে। টানা তিনদিন থেকে পানিবন্দি রয়েছেন তারা। তবে তারাও কোনো প্রকার সহায়তা পাননি বলেও অভিযোগ করেন। 

আদিতমারী উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মফিজুল হক বলেন, বন্যার্তদের জন্য ১০ মে. টন জিআর চাল বরাদ্ধ পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তালিকা পেলে বিতরণ করা হবে। 

হাতীবান্ধা উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা ফেরদৌস আলম জানান, তার উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন তিস্তা নদীর অববাহিকায়। তিস্তায় সামান্য পানি বাড়লেই কিছু পরিবার পানিবন্দি হন। বন্যার্তদের জন্য ২৮ মে. টন চাল বরাদ্দ এসেছে। খুব দ্রুত বিতরণ শুরু করা হবে।

লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসার আলী হায়দার জানান, জেলার ৫টি উপজেলার বন্যা কবলিতদের ত্রাণ দিতে জেলা প্রশাসন থেকে ৬৮ মে. টন জিআর চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। 

এদিকে কুড়িগ্রামে সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে করে নদ-নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ২০টি গ্রামের ১০ হাজার মানুষ। গ্রামীন রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় চলাচলে দুর্ভোগে পড়েছে এসব এলাকার মানুষজন।

কুড়িগ্রাম-যাত্রাপুর হাট সড়কের শুলকুর বাজার এলাকায় নির্মাণাধীণ ব্রিজের পাশের বাঁশের সাঁকো তলিয়ে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী হাট যাত্রাপুরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ঐ ব্রিজ এলাকায় লোকজন নৌকায় পাড়াপাড় করছে। নদ-নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলগুলোতে তলিয়ে গেছে বিভিন্ন শাক-সবজি ক্ষেত। 

অন্যদিকে টানা বৃষ্টিতে কুড়িগ্রাম জেলা শহরের চড়ুয়াপাড়া, চর ভেলাকোপা, কলেজপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় জলা বদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এসব এলাকার প্রায় শতাধিক পরিবার পনিবন্দি জীবন যাপন করছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ৩৭ সেন্টিমিটার, তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৪৫ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে ৩৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিকে গাইবান্ধার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, করতোয়া ও ঘাঘটসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে তীব্র আকার ধারণ করেছে নদী ভাঙন। দেখা যায়, জেলার সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা এবং সদর উপজেলার চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী নিচু এলাকায় পানি উঠতে শুরু করেছে। তলিয়ে গেছে বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত ও অস্থায়ী নৌঘাটগুলো। এতে করে প্লাবিত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা বিঘ্নিত হচ্ছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা, তারাপুর, হরিপুর, কাপাসিয়া ও শ্রীপুর, গাইবান্ধা সদরের কামারজানি, মোল্লারচর, ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ি, ফজলুপুর, কঞ্চিপাড়া, গজারিয়া, উড়িয়া, সাঘাটা উপজেলার ভরতখালি, হলদিয়া, ঘুড়িদহ ইউনিয়নের চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

নদ-নদীর পানি বাড়ার কারণে স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী ভাঙন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ফলে গত দু’সপ্তাহে নদী ভাঙনে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর, কাপাসিয়া, তারাপুর, বেলকা, হরিপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের আবাদি জমি, রাস্তাসহ শতাধিক বাড়িঘর এবং দু’শতাধিক একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, ডোমার উপজেলায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় নদী পাড়ের বাসিন্দারা বর্তমানে রাত জেগে নদী ভাঙন রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। 

বৃহস্পতিবার বিকেলে তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার বিপদ সীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে বলে নিশ্চিত হয়ে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড নীলফামারী জোনের এসডি হাফিজুল ইসলাম। 

তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বাঁধ ভাঙনের আশংকায় রয়েছে জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড বানপাড়া, গোঁপালঝাড়, আলশিয়া পাড়া ও বাধেঁর পাড়ের বাসিন্দারা। নির্ঘুম রাত জেগে হতাশার মুখোমুখি হয়ে চাতঁক পাখির ন্যায় চেয়ে আছে নদী ও বাঁধ ভাঙন রক্ষার্থে।

শৌলমারী বানপাড়া বাসিন্দা মনির উদ্দীন জানান, নদীতে যে হারে পানি বাড়ছে তাতে সম্ভাবত বাঁধ ভেঙে আমাদের সবকিছু গুড়িয়ে নিয়ে যাবে। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন এমনিতেই আমাদের সব কিছুই কেড়ে নিয়েছে এই নদী। 

এ বিষয়ে শৌলমারী ইউপি চেয়ারম্যান প্রানজিৎ কুমার পলাশ জানান, বাধঁটির ভাঙন হলে আমার এলাকাসহ কৈমারী, ডাউয়াবাড়ি ও গুলমুন্ডা ইউনিয়নের নিম্ন এলাকা প্লাবিত হবে। যা নিতান্তই হুমকি স্বরূপ।

দেশের বৃহত্তম সেচপ্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, তিস্তার পানিপ্রবাহ বিকেল ৩টায় বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্যারেজ রক্ষার্থে সবগুলো জলকপাট খুলে দিয়ে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।

ব্রেকিংনিউজ/এমজি