রাস্তা সংস্কারের দাবিতে ৮ কিলোমিটার লম্বা মানববন্ধন!

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, রাজশাহী
১৮ জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০৮:৩১

রাস্তা সংস্কারের দাবিতে ৮ কিলোমিটার লম্বা মানববন্ধন!

রাজশাহী-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়ক সম্প্রসপারণ কাজে নিম্নমানের উপকরণ সামগ্রী ব্যবহার, বিলম্বিত কাজের প্রতিবাদে ৮ কিলোমিটার লম্বা মানববন্ধন করেছে মোহনপুর উপজেলাবাসী। মানববন্ধন কর্মসূচিতে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাধারণ মানুষ ও পেশাজীবীরা অংশ নেন। মানববন্ধন থেকে দ্রুত এ সড়কটি নির্মাণ কাজ শেষ করা না করলে আগামীতে আঞ্চলিক এ মহাসড়ক বন্ধ করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।

মানববন্ধনে মানুষের বাধভাঙা অংশগ্রহণে বন্ধ হয়ে যায় এ রুটে চলাচলকারী সব ধরনের যানবাহন। কেশরহাট ডিগ্রি কলেজ থেকে শুরু করে বাকশিমইল উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত  টানা প্রায় ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ হয় এবং বাকশিমইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে খাড়ইল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ হয় এ মানববন্ধনটি।  

বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯ টা থেকে পৌনে ১১ পর্যন্ত মানববন্ধনটি অবস্থান করে। মহিষকুন্ডি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মজিবর রহমানের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন- মোহনপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এ্যাড. আব্দুস সালাম, বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষনা পরিষদের রাজশাহী আঞ্চলিক সদস্য সচিব অধ্যাপক আশরাফুল ইসলাম সুলতান, মোহনপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মফিজ উদ্দিন কবিরাজ, মোহনপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মেহেবুব হাসান রাসেল, কেশরহাট ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ আনোয়ারুল হক হেনা, কেশরহাট মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ তাজরুল ইসলাম, কেশরহাট টিবিএম কলেজের অধ্যক্ষ আশরাফুল ইসলাম, মোহনপুর মহিলা কলেজের সহকারি অধ্যাপক আবদুল মান্নান,  কেশরহাট উচবিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক সহিদুজ্জামান শহিদ প্রমুখ। 

এলাকাবাসী জানান, ২০১৮ সালের শুরুর দিকে উত্তরাঞ্চলের ব্যস্ততম রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের নির্মাণ কাজ করা হয়। শুরু থেকেই নওগাঁ সীমানার কাজ দ্রুত শেষ করা হলেও রাজশাহীর অংশে কাজ চলতে থাকে ঠিকাদারের ইচ্ছেমত। রাস্তাটি খুঁড়ে রাখলেও শুষ্ক মৌসুমে দেয়া হয়নি পানি। ফলে ধূলা-বালিতে চরম ঝুঁকিতে যানবাহন চলাচল করেছে। প্রায় পৌনে দুই বছর ধরে চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন এলাকার মানুষ।

চলতি বর্ষা মৌসুমে এখন কেটে রাখা ফুটপাত ভেঙে ওই ভরাট হচ্ছে। মূল সড়ক নিচু আর ফুটপাত উঁচুর কারণে পানি নিস্কাশন হচ্ছে না। ফলে অনেক স্থানে জমে থাকে হাটুপানি। বেশকিছু স্থানে দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা টাঙিয়ে দিয়েছে লাল কাপড়ের বিপদ সংকেত। এ রাস্তার সর্বোচ্চ বিপদজনক স্থানে পরিণত হয়ে পড়েছে শিক্ষা কেন্দ্রীক কেশরহাটের বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। 

কেশরহাট পৌর মেয়র শহিদুজ্জামান শহিদ বলেন, মহাসড়কটির কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি। দীর্ঘদিন রাস্তাটির কার্পেটিং তুলে রেখে ঠিকাদার লাপাত্তা রয়ছে। রাস্তার উপরে কোথাও কোথাও হাঁটু পানি জমে থাকছে। রাস্তার কাজের এ ধরনের চরম অবস্থার জন্য জনসাধারণের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি বলে দাবি করেন তিনি। জানা গেছে, সড়কটির কাজ মাঝপথে পেলে রেখে লাপাত্তা রয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার।

মৌগাছি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহবুবুর রহমান দুলাল বলেন, ‘বর্তমানে জন-দুর্ভোগের নাম হচ্ছে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক। কোথাও কার্পেটিং হয়েছে তো ধরেছে ফাটল। কোথাও খোয়া ফেলে রেখে মাসের পর মাস কালক্ষেপণ, কোথাও নিম্নমাণের সামগ্রী দিয়ে হচ্ছে নির্মাণকাজ। কাজের গতি ও উপকরণের মান দেখে মনে হচ্ছে এই বর্ধিতকরণ কাজ দেখভালের কোনও কর্তৃপক্ষ নেই’। 

এদিকে কচ্ছপ গতিতে চলছে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক বর্ধিতকরণ নির্মাণ কাজ। দীর্ঘদিন ধরে কাজ শেষ না হওয়ায় এই রাস্তার প্রায় সাড়ে ২১ কিলোমিটার অংশ এখন যেন দুর্ভোগের অপর নামে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে ঠিকাদারদের প্রায় ২৩৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। জন-দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাঝেও।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তাটির রাজশাহীর অংশেই সবচেয়ে অনিয়মের ছোঁয়া লক্ষ্য করা গেছে। নওহাটার পর থেকে ত্রিমোহনী পর্যন্ত রাস্তাটি কোনো রকমে কার্পেটিং করা হয়েছে। রাস্তায় ফিনিসিং’র ‘ফ’ পর্যন্ত নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে বলছেন, দলীয় নেতা ও কর্মকর্তারা ঘুষ খেয়ে রাস্তাটির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। 

রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র মতে, প্রায় ৪৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কটির ৭৮ কিলোমিটার বর্ধিতকরণ কাজ চলছে। ১২টি প্যাকেজে ভাগ করে এই কাজটির টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে চারটি কাজই পেয়েছেন আমিনুল হক এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আর দুটি করে কাজ পেয়েছে রাজশাহীর ওয়াহেদ কন্সট্রাকশন, ডন কন্সট্রাকশন, ঢাকার কামাল এসোসিয়েট কন্সট্রাকশন এবং একটি করে কাজ পেয়েছে র্তূণা কন্সট্রাকশন ও প্যারাডাইস কন্সট্রাকশন। গত দেড় বছর ধরে এই কাজটি চলছে। রাজশাহী ও নওগাঁ সড়ক এবং জনপথ বিভাগের যৌথ তত্বাবোধায়নে এই কাজটি হচ্ছে। কিন্তু কাজ পেয়েও সামান্য কিছু অংশ করে কোনো কোনো ঠিকাদার হয়ে আছেন লাপাত্তা।

জানা গেছে, রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কটি ৭ দশমিক ৩ মিটার চওড়া থেকে ১০ দশমিক ৩ মিটার চওড়াকরণ কাজটি শুরু হয় প্রায় দেড় বছর আগে। এর মধ্যে দুটি প্যাকেজে কাজ করছেন ওয়াহেদ কন্সট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। যার স্বত্তাধিকারি হলেন রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা ও বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুঞ্জুর রহমান পিটার। তিনি সর্বমোট দুটি প্যাকেজ প্রায় ৫০ কোটি টাকার কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা তিনি উত্তোলন করেছেন। 

তার দুটি কাজের মেয়াদের শেষ সময় ছিল ৩০ এপ্রিল। কিন্তু জুলাই পেরিয়ে গেলেও কাজ সম্পন্ন হয়নি। আবার যতটুকু সম্পন্ন হয়েছে তাও নিম্নমানের। অভিজ্ঞজনেরা বলছেন যেভাবে রাস্তা হচ্ছে একবছরও টিকবে না। অনেকে বলেছেন মীর আক্তারুজ্জামান কনস্ট্রাকশন এর আগে এই রাস্তাটি করেছিল। ১০ বছরের মধ্যে ফাটা তো দূরের কথা পাথরও উঠেনি। 

রাজশাহী সড়ক ও জনপথ বিভাগের একাধিক সূত্র মতে, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মুঞ্জুর রহমান পিটার কাজ পেলেও কাজটি শেষ করতে গড়িমসি করছেন। সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির প্রভাব খাটিয়ে এবং যানবাহন বন্ধের হুমকি দিয়ে কাজটি খুবই ধীরে চলছে। একটু বৃষ্টি হলেই কাদা পানিতে লেপ্টে যাচ্ছে গোটা রাস্তা। তখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। আবার শুষ্ক আবহওয়ায় ধূলা-বালিতে পথচারিদের নাক-মুখ ও চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে করে এই অংশে যেমন চলাচল দায় হয়ে পড়েছে, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠার কারণে দেখা দিচ্ছে দুর্ঘটনা। 

এর আগে রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুজ্জোহা বলেছেন, ‘একজন ঠিকাদারকে নিয়ে আমরা চরম বিপদে আছি। তার কাজ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েকদিন বাকি আছে। কিন্তু তিনি রাস্তাটি কার্পেটিং করার কোনো উদ্যোগ নেননি। এতে করে জনদুর্ভোগ চরমে আকার ধারণ করেছে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা চিঠি তৈরি করেছি। দ্রুতই উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে দেয়া হবে ওই চিঠি। অনুমোদন পেলেই ওই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের এমপি আয়েন উদ্দিন অনেকটা দুঃখ ও ক্ষোভ নিয়ে এলাকাবাসীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বলেন, ‘রাস্তাটির কাজ শেষ না হওয়ায় আমাদেরকেও সাধারণ মানুষে নানা কথা বলছেন। এতে করে আমরাও চরম বিপাকে আছি। দ্রুত কাজ শেষ না হওয়ায় মানুষ কৃত্রিম দুর্যোগ ও চরম দুর্ভোগে আছেন। আমি বিষয়টি প্রশাসন ও প্রকৌশলীকে জানিয়েছি এবং বলেছি, প্রয়োজনবোধে ঠিকাদার পরিবর্তন করে হলেও রাস্তাটির নির্মাণ কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা উচিৎ।’

ব্রেকিংনিউজ/জেআই