দুর্ভোগ সোহরাওয়ার্দীতে, টেস্টের ৪ দিন পর ডেঙ্গুর রিপোর্ট!

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
৩ আগস্ট ২০১৯, শনিবার
প্রকাশিত: ০৬:৩৭ আপডেট: ০৮:০৯

দুর্ভোগ সোহরাওয়ার্দীতে, টেস্টের ৪ দিন পর ডেঙ্গুর রিপোর্ট!

সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ডেঙ্গু রোগী ও তার স্বজনরা। ডেঙ্গুর প্রকোপের চেয়ে যেন আতঙ্কই বেশি। স্বাভাবিক জ্বরেও সবাই ছুটছেন হাসপাতালে। ফলে রাজধানীর সব হাসপাতালে ভিড় বেড়েই চলেছে। ব্যতিক্রম নয় রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও।

হাসপাতালের আউটডোরে অর্ধ-শতাংশ রোগীই আসছেন জ্বর নিয়ে। এসব রোগীদের ডেঙ্গু পরীক্ষার রিপোর্ট চার দিন পর দেয়ার কথা জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতে করে রোগী ও রোগীর স্বজনেরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে চারদিন পর যদি রিপোর্ট পায় তাহলে কিভাবে ডেঙ্গুর চিকিৎসা করাবো। এমনিতেই আতঙ্কে রয়েছি।    

সোহরাওয়ার্দীতে রক্ত পরীক্ষা করতে এসে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন রোগীরা। কোনও কোনও টেস্ট বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকেও করানোর অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। রোগীদের জায়গা না হওয়ায় সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ডের ভেতরে ও বারান্দায় বেড পাওয়া অতিরিক্ত রোগীদের সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গত বৃহস্পতিবার (১ আগস্ট) সোহরাওয়ার্দীতে জ্বর নিয়ে আসেন সারোয়ার আলম নামের এক রোগী। ডাক্তার তাকে ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে বলে। কিন্তু পরীক্ষা শেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় রোগীর চাপ বেশি তাই রিপোর্ট দেয়া হবে চার দিন পরে। এই কথা শুনে সারোয়ার আলমসহ আরও কয়েকজন ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে আসা রোগীরা বিক্ষোভ করেন। 

শনিবার (৩ আগস্ট) জিনিয়া ইয়াসমিন নামের একজন জানান, ‘আমি বৃহস্পতিবার ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে দিয়েছিলাম কিন্তু আজ শনিবার এসেও রিপোর্ট পেলাম না। এমন অবস্থা হলে সরকারি হাসপাতালে কিভাবে চিকিৎসা নেবো?’

রফিকুল ইসলাম নামের আরেক রোগী জানান, চারদিকে মৃত্যুর খবর, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। পরিবারও আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায়। এমন অবস্থার মধ্যে শুক্রবার রাতে জ্বর আসল। শনিবার সকালেও না কমায় ছুটে আসলাম হাসপাতালে। কিন্তু চিকিৎসক আমার চোখ, মুখ, খাওয়ার রুচি, মাথা, হাত-পা ব্যথা করছে কি না- এসব শুনে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেতে পরামর্শ দিলেন। রক্তটা পরীক্ষা করাতেও বললেন। কিন্তু রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে নাকি দেরি হবে।’

কন্যাশিশু কোলে নিয়ে আকলিমা বেগম বসে ছিলেন বারান্দার এক পাশে। এসেছেন কড়াইল বস্তি থেকে। নিজে মানুষের বাসায় কাজ করেন। জ্বর না কমায় মেয়েটিকে তারা এখানে নিয়ে আসেন। পরীক্ষায় ধরা পড়ে ডেঙ্গু। কিন্তু বেড না থাকায় ভর্তি করছে না। স্বামী রিকশাচালক দুলাল মিয়া স্ত্রী-কন্যাকে বসিয়ে রেখে গেছেন বেডের জন্য তদবির করতে।



শনিবার (৩ আগস্ট) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সরেজমিন হাসপাতালটির আউটডোর ও জরুরি বিভাগে ঘুরে দেখা গেছে, রোগীদের প্রচন্ড ভিড়। চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন। জুনিয়র ডাক্তার ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ব্যস্ত রোগীদের নিয়ে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের আউটডোরে গত মাস থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত এক মাসে এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন দুই হাজার ৮৭৩ জন রোগী। এর মধ্যে এক হাজার ৪৩৮ জনই আসেন জ্বর নিয়ে, যা মোট রোগীর ৪৬ শতাংশ।

হাসপাতালের ভেতরে দেখা যায়, সবগুলো ওয়ার্ডই রোগীতে ভর্তি। জায়গা না হওয়ায় প্রত্যেকটি ওয়ার্ডের ভেতরে ও বাইরের বারান্দায় বেড পেতে অতিরিক্ত রোগীদের সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কিংবা জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়ে ওয়ার্ডের বাইরে জায়গা পেয়েছেন অনেকে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘সরকার ডেঙ্গু জ্বরের টেস্ট ফ্রি ঘোষণার পর নরমাল জ্বর নিয়েও হাসপাতালে আসছে মানুষ। আমাদের প্যাথলজি বিভাগে প্রচুর চাপ তৈরি হয়েছে। নরমাল তো দূরে, জরুরি ভিত্তিতে যেসব রোগীর প্যাথলজির রিপোর্ট দরকার, সেসব পেতেই বেগ পেতে হচ্ছে। অতিরিক্ত চাপে কখনও কখনও আউট অব অর্ডার হয়ে যাচ্ছে মেশিন।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ের জন্য যেসব পরীক্ষার সরকার নির্ধারিত মূল্য হবে- ক) NS1- ৫০০ টাকা (সর্বোচ্চ), আগের মূল্য ছিল ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা। খ) IgM + IgE অথবা IgM/ IgE, ৫০০ টাকা (সর্বোচ্চ), আগের মূল্য ছিল ৮০০ টাকা থেকে ১৬০০ টাকা। গ) CBC (RBC + WBC + Platelet + Hematocrit)- ৪০০ টাকা (সর্বোচ্চ), আগের মূল্য ছিল এক হাজার টাকা।

কিন্তু সরকারি হাসপাতালে ক) NS1- করতে খরচ হচ্ছে ১৫০ টাকা, খ) IgM + IgE অথবা IgM/ IgE খরচ হচ্ছে ২৫০ টাকা এবং গ) CBC (RBC + WBC + Platelet + Hematocrit)- এ খরচ হচ্ছে ২৫০ টাকা। ১০ টাকার টিকিটে সরকারী হাসপাতালে খরচ হচ্ছে সর্বমোট ৬৫০ টাকার মতো। 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৯৯৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে অন্যান্য বিভাগীয় শহরে রোগী ভর্তি হয়েছেন ৬৯১ জন। সবমিলে সারা দেশে ১ হাজার ৬৮৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে।

শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই ১৫৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে। মিটফোর্ডে ৩৫ জন, শিশু হাসপাতালে ৩৩ জন, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ৩১ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দীতে ১১৮ জন, বারডেমে ১৭ জন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ জন, পুলিশ হাসপাতালে ১৯ জন, মুগদা হাসপাতালে ৬৪ জন, বিজিবি হাসপাতালে পাঁচজন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৫৬ জন, কুর্মিটোলা হাসপাতালে ৯২ জন অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে ৩৭০ জন। উপরে উল্লিখিত সবাই ডেঙ্গু সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত। এর বাইরে তিনজন রয়েছে ডেঙ্গু হেমোরেজিকে আক্রান্ত। বেসরকারি হাসপাতালের ৩৮৭ জনের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২১, ইবনে সিনা হাসপাতালে ১৯, স্কয়ার হাসপাতালে ১১, শমরিতায় ২১, ল্যাবএইডে ৪, সেন্ট্রাল হাসপাতালে ২৮, গ্রিন লাইফে ২৬, সেন্ট্রাল হাসপাতালে ২২ জন ভর্তি হয়েছে। 

ব্রেকিংনিউজ/ টিটি/ এসএ