মৃত্যুর আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে চাই: বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী ইয়াকুব আলী খাঁন

রাহাত হুসাইন
১৭ জুন ২০১৯, সোমবার
প্রকাশিত: ১১:৩৩ আপডেট: ০৫:৩৪

মৃত্যুর আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে চাই: বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী ইয়াকুব আলী খাঁন

‘আমার বয়স ৯৬ বছর। বাঁচবো আর ক’দিন। একে একে সব বন্ধুরাই চলে গেছে না ফেরার দেশে। যেকোনো মুহূর্তেই আমারও ডাক পড়তে পারে। ডাক পড়লেই চলে যাবো না ফেরার দেশে। মৃত্যুর আগে বন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার সাথে একবার দেখা করতে চাই। এটাই আমার জীবনের শেষ ইচ্ছে। জানি না এ ইচ্ছে পূরণ হবে কী-না। তবে, তাঁর কাছে আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।’ কথাগুলো বলছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের সহপাঠী ইয়াকুব আলী খাঁন।

১৯২৫ সালের ১ মার্চ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার মীর বাজার এলাকায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পারিবারে  জন্মগ্রহণ করেন ইয়াকুব আলী খাঁন।  ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন পাঁচলা আজিম ইনস্টিটিউট থেকে। ইন্টারমিডিয়েট ও গ্র্যাজুয়েশন করেছেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে। ১৯৪৪ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন ইয়াকুব আলী খাঁন। তার বাবা মরহুম ইয়াছিন আলী খান, মাতা-নবহার বিবি। তিনি তার পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান ।

ইয়াকুব আলী খাঁন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পড়ালেখা করেছেন। থেকেছেন বেকার হোস্টেলেও। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তার সম্পর্ক ছিলো খুবই আন্তরিক ও গভীর বন্ধুত্বের। একে অপরের সঙ্গে ‘তুই-তোকারি’ সম্পর্কও ছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সঙ্গে সেইসব স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী ইয়াকুব আলী খাঁন। রাজধানীর মিরপুর-১০’র ৬ নম্বর সেকশনের ডি ব্লকের ২০ নম্বর রোডের ১৯ নম্বর বাসায় মেঝো ছেলের সংসারে নিরবে-নিভৃতে কাটছে তার জীবনের শেষবেলা। ইয়াকুব আলী খাঁনের ৮ সন্তান। ৫ মেয়ে, ৩ ছেলে। ব্রেকিংনিউজের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় এসব তথ্য জানিয়ে বেকার হোস্টেল ও ইসলামিয়া কলেজের স্মৃতিচারণ করেছেন ইয়াকুব আলী খাঁন। সাক্ষাতকার নিয়েছেন ব্রেকিংনিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট রাহাত হুসাইন।

ব্রেকিংনিউজ: বঙ্গবন্ধুর সাথে কোথায়, কখন প্রথম পরিচয় হয় আপনার?

ইয়াকুব আলী খাঁন:  ইসলামিয়া কলেজেই বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার প্রথম দেখা ও পরিচয় হয়। একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি আমরা। আমাদের ক্লাসে  ৭০ থেকে ৮০ জন সহপাঠী ছিলেন। তখন আমরা বঙ্গবন্ধুকে শেখ মুজিবর ভাই, মুজিবর ভাই, বলে ডাকতাম। উনার আমার সাবজেক্ট একই ছিল। আবার ইতিহাসে একই গ্রুপে ছিলাম আমরা ২০ জন। সেখানে বঙ্গবন্ধুও আমাদের সাথে ছিলেন।

হাওড়া থেকে প্রতিদিন কলেজে আসতে আমার কষ্ট হতো। তখন হিস্ট্রির প্রফেসর জহিরুল ইসলাম আমাকে বেকার হোস্টেলে থাকার জন্য ব্যবস্থা করে দেন। তখন হোস্টেল সুপারিন্ডেন্ট ছিলেন প্রফেসর সাইদুর রহমান (সাংবাদিক শফিক রেহমানের বাবা)। এক বছর বেকার হোস্টেলেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলাম। বঙ্গবন্ধু বাড়ি থেকে ভালো খাবার নিয়ে আসলে, আমার সঙ্গে ভাগ করে খেতেন। আমাদের সহপাঠীদের কেউ জীবিত আছে কিনা আমি জানিনা। ওই সময় ইসলামিয়া কলেজের কেউ জীবিত আছে কিনা আমার জানা নেই।

ব্রেকিংনিউজ: ইসলামিয়া কলেজের অনেকেই পরবর্তীতে দেশের শীর্ষ পর্যায়ে ছিলেন, আপনার এমন সহপাঠীর মধ্যে কাদের কথা আপনার মনে আছে?

ইয়াকুব আলী খাঁন: আমাদের সঙ্গে ইসলামিয়া কলেজে পড়তেন ফরিদপুরের শামসুদ্দিন মোল্লা। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করার পরে শামসুদ্দিন মোল্লাকে ফরিদপুরের গভর্নর নির্বাচিত করেন। শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেন (দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক ছিলেন) এদের সাথে নিয়মিত ঢাকায় দেখা হতো।  ইত্তেফাকের প্রেসে নিয়মিত সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের সঙ্গে দেখা হতো। তার কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর খোঁজ-খবর নিতাম। আমাদের সাথে আরও পড়তেন পাবনার খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, যিনি ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ বই লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।  মহিউদ্দিন আহমেদ, ১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বাকশাল চেয়ারম্যান হন। ঢাকায় ছিলেন সালাউদ্দিন আহমেদ। এদের সবার সঙ্গে আমার ‘তুই-তোকারি’ সম্পর্ক ছিল।

ব্রেকিংনিউজ: বেকার হোস্টেল ছাড়ার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কখনো দেখা হয়েছে কিনা?

ইয়াকুব আলী খাঁন: বেকার হোস্টেল ছাড়ার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দুই বার দেখা হয়। তখন তিনি  সেগুনবাগিচার খাল পেরিয়ে একতলা একটি বাড়িতে থাকতেন।  যাকে ইস্পাহানির বাড়ি বলা হতো। আমার অফিসে মাদারীপুরের এক ভদ্রলোক চাকরি করতো, আমার সেকশনে। তার নাম আব্দুল মান্নান শিকদার। আমাদের অফিসে ফনী মজুমদারসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতারা আসতো। আমি অফিসে প্রায়ই বলতাম বঙ্গবন্ধু আমার ক্লাসমেট। মান্নান সিকদার একদিন আমাকে বলল খান সাহেব একটা কাজ করেন। আজ সন্ধ্যায় আমাদের লোকাল ইস্যু নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাবো। আপনি আমাদের সাথে যাবেন। আমি মহা চিন্তায় পয়ে গেলাম, যদি চিনতে না পারে, বেইজ্জতি হবো।  জোরাজুরি করে আমাকে সেখানে নিয়ে গেলেন। সেখানে অনেকগুলো বেঞ্চ ছিল, মাঝখানে ৩০-৪০ জন লোক বসা ছিল। আমি পেছনে বসলাম। শেখ সাহেব প্রবেশ করেই বললেন ‘এই ইয়াকুব, তুই এখানে বসে কি করিস?’  আমি অবাক হয়ে গেলাম। ৮-১০ বছর পর দেখা।  আমি বললাম, ‘ভাই আমার কোনও কাজ নেই। তোর দেশের লোকেরা আসছে, ওদের কি কাজ আছে। আমি আসছি তোকে দেখতে। আমার কোনও কাজ নেই ভাই।’ তখন আমার শরীর দিয়ে ঘাম ছুটছে, যদি না চিনতে পারতো।

আরেকবার তিন নেতার মাজারে দেখা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কবরে শ্রদ্ধা জানতে গিয়েছিলেন। আমরা রেলিং এর বাহিরে, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শ্রদ্ধা জানাচ্ছিলাম। ৩০-৪০ হাত দূর থেকে দেখে বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন ‘ঐ ইয়াকুব এখানে কেন?  ভিতরে আয়।’

ব্রেকিংনিউজ: এতদিন পর আপনি বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী বলে দাবি করছেন, বিষয়টি নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন। কীভাবে বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করবেন?

ইয়াকুর আলী খাঁন: সেই অর্থে প্রমাণ নেই যে বঙ্গবন্ধু আমার ক্লাসমেট। আমাদের সময় সার্টিফিকেটে কলেজের নাম থাকতো না। আমার সার্টিফিকেটেও নেই।  তবে ওই সময় যারা ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র ছিল, তা কলেজে রেকর্ডে পাওয়া যাবে। সেটা খুঁজলেই প্রামাণ হবে বঙ্গবন্ধু আমার ক্লাসমেট ছিলেন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ বেঙ্গল স্টুডেন্টদের রাজনৈতিক সেন্টার ছিল।  কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে শেখ মুজিব দেশের নেতা ছিলেন।

ব্রেকিংনিউজ: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এক সঙ্গে পড়েছেন, কোনো রাজনৈতিক স্মৃতি রয়েছে কিনা?

ইয়াকুর আলী খাঁন: ১৯৪৬ সালের বাংলা প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় শেখ মুজিব শেরে বাংলার ( শেরে বাংলা একে ফজলুল হক) বিরুদ্ধে একটা লিস্ট তৈরি করতে বললেন, কে কে যাবে ক্যাম্পেইন করতে বরিশালে। আমার নামও লিখে দিলেন। আমি বললাম বরিশাল নদীমাতৃক দেশ।  আমি সাঁতার পারি না। ইদ্রীস নামে একজনকে বললাম তুমি মুজিবকে বল আমার নামটা কেটে দিতে। ( ইদ্রীস হাওড়ার এমএলএ হয়েছিলেন)। মুজিব বললেন, ‘বুঝছি ব্যাটা তুই ইন্ডিয়ান লোক।  পানি দেখে ভয় পাও, তাই না?  আমি বললাম, ‘পানি দেখে ভয় পাই ভাই।’ এরপর ঐ সময়ে ক্যাম্পেইন করতে যাওয়া হয়নি আমার। তারপর সোহরাওয়ার্দী সাহেব কলকাতা থেকে বিরাট একটা স্টিমার রির্জাভ নিয়ে ১০-১২ দিনের জন্য বরিশাল গিয়ে প্রচারণা চালালেন, ক্যাম্পেইন করলেন। নির্বাচনী ক্যাম্পেইন থেকে ফিরে আসার পর বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, কি খবর ওখানকার। তিনি বললেন, ‘আর বলো না ভাই। ওখানে যেখানে যাই সবাই বলে, জিন্নাহ লীগ বলো বা মুসলিম লীগ বলো, যাই বলো মোরা হককেই ভোট দিমু। বন্ধু এখানে শেরে বাংলার বিরুদ্ধে কিছু করা যাবে না।  ওকে (শেরেবাংলা একে ফজলুল হক)  হারানো যাবে না।’

ব্রেকিংনিউজ: বঙ্গবন্ধু কাছে কখনো কোনো কিছু দাবি করেছেন কিনা?

ইয়াকুব আলী খাঁন: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কখনো বঙ্গবন্ধু কাছে যাইনি, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে অনেক সমস্যা। আমি গিয়ে আমার ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলে কি তার সমস্যার বাড়িয়ে দেব। এই চিন্তা করেই কখনো আমি তার কাছে ব্যক্তিগত কোন বিষয় দাবি করিনি।  ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার খবর রেডিওতে শুনেছি।  শোনার পর প্রচুর কান্না করেছি। তাঁর মনটা অনেক বড় ছিল। তিনি সকলকে ক্ষমা করে দিতেন।

ব্রেকিংনিউজ: ইসলামিয়া কলেজ পড়াশোনা শেষ করে আপনার অনেক সহপাঠী রাজনীতি করেছেন, আপনি কী করেছিলেন?  

ইয়াকুব আলী খাঁন: ইসলামিয়া কলেজ থেকে ডিগ্রি কমপ্লিট করে ১৯৫০ সালে আমি সরকারি চাকরিতে যোগদান করি। মিনিস্ট্রি অফ প্ল্যানিং এর আওতায় পূর্ব পাকিস্তানের পরিসংখ্যান ব্যুরোতে কাজ শুরু করি। পাকিস্তান শাসনের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবির হোসেন নামে একজনকে আমাদের ব্যুরোতে চাকরি দিয়েছিলেন। মেশিন সেকশনে তিনি কাজ করতেন, তার সাথে আমার তেমন কথাবার্তা হয়নি। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খানের আমলে মিরপুরে এই জায়গাটুকু অ্যালটমেন্ট দেয়। সেই সময় থেকেই এখানে বসবাস করছি। এর বাইরে দেশের কোথাও আমার আর কোনো সম্পত্তি নেই।

ব্রেকিংনিউজ: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আপনার কোনো ভূমিকা ছিলো কিনা?

ইয়াকুব আলী খাঁন: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে-পলিয়ে থেকেছি। বঙ্গবন্ধুর ক্লাসমেট হিসেবে ভয়ে ভয়ে থাকতাম, কেউ যদি পাকিস্তানিদের কাছে বলে দেয় ইনি বঙ্গবন্ধুর ক্লাসমেট। আমার বড় ছেলে ফজলে এলাহি খাঁন দুলাল হারিয়ে গিয়েছিলেন, ১৯৭২ সালে কলাকোপা বান্দুরার এক খ্রিষ্টান পাদ্রীর কাছ থেকে তাকে উদ্ধার করি।

ব্রেকিংনিউজ: বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনার শেষ ইচ্ছা কী? 

ইয়াকুব আলী খাঁন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের টুঙ্গিপাড়ার কবর জিয়ারত করতে চাই। তবে আমি শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। বর্তমানে আমারি হার্নিয়ার সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যা রায়েছে। 

ব্রেকিংনিউজ/আরএইচ/জেআই

bnbd-ads
bnbd-ads