সাইবার ক্রাইম মোকাবিলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ: আলিমুজ্জামান

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়

৩ অক্টোবর ২০১৮, বুধবার
প্রকাশিত: ০৫:২৪ আপডেট: ১২:৪৫

সাইবার ক্রাইম মোকাবিলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ: আলিমুজ্জামান

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে হয়রানি, প্রতারণা, মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ছবি তোলা, ভিডিও করা, নগ্ন ছবি এমএমএস করা, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া- প্রতিনিয়তই এ ধরনের বিব্রতকর ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন অনেকেই। বিশ্বে ৭০০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা, যার অর্ধেকই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। আর দিন দিনই এই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধও।
 
বাংলাদেশে অনলাইন বা ফেসবুকের মাধ্যমে হয়রানি বন্ধ করতে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দক্ষতার পরিচয় ইতোমধ্যেই দিয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের জীবনমান উন্নত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই ঘটেনি মনস্তাত্বিক উন্নয়ন। এ কারণেই বেড়েছে সাইবার অপরাধ।
 
সম্প্রতি সাইবার ক্রাইমের নানা বিষয় নিয়ে ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর মুখোমুখি হয়েছেন সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. আলিমুজ্জামান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি-এর স্টাফ করেসপন্ডেন্ট তৌহিদুজ্জামান তন্ময়।
 
ব্রেকিংনিউজ: সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে আপনাদের ভূমিকা কি কি?
 
আলিমুজ্জামান: সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশন ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভাগের অধীনে কাজ করছে আমাদের কাউন্টার টেরোজিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম টিম। এই বিভাগ চালু করার পর থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের অধীন যেসব সাইবার অপরাধ সংগঠিত হয় সেসব অপরাধের ক্ষেত্রে আমরা অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত করে থাকি। পাশিপাশি কিছু টেকনিক্যাল সাপোর্টও দিয়ে থাকি। যেটা থানা পুলিশ এবং ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ (ডিবি)কে দিয়ে থাকি। সাইবার ক্রাইম মোকাবিলা করার জন্য বা এই অপরাধে যারা ভিক্টিম তাদেরকে কত দ্রুত সেবা দেয়া যায় সেক্ষেত্রে আমাদের হেল্পডেস্ক চালু আছে।
 
হেল্প ডেস্কের আন্ডারে স্যোসাল মিডিয়া পেজ 'সাইবার সিকিউরিটি ক্রাইম' এই পেজের মাধ্যমে আমরা অভিযোগ পেয়ে থাকি। সেখানে আমাদের একটি মোবাইল নম্বর ও একটি ইমেইল আইডি দেয়া আছে। পাশাপাশি আমাদের 'হ্যালো সিটি' নামে একটি অ্যাপস আছে। এই অ্যাপস দিয়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। আমরা চেষ্টা করি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দ্রুততম উপায়ে তার সমস্যাটি সমাধান করা কিংবা পরামর্শ দেয়া।
 
ব্রেকিংনিউজ: মোবাইল ব্যাংকিংয়েরর মাধ্যমে অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়। এ ব্যাপারে আপনাদের কোনও সেবা আছে কিনা?
 
আলিমুজ্জামান: আমাদের এখানে একটি টিম আছে যারা মোবাইল ফিন্যান্স অ্যান্ড সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করে। যেকোনও মোবাইল ফিন্যান্স প্রতারণায় আমরা অভিযোগ গ্রহণ করে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি।
 
ব্রেকিংনিউজ: জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে স্যোশাল মিডিয়ায় সাইবার ক্রাইমের কোনও হুমকি বা চ্যালেঞ্জ আছে কিনা?
 
আলিমুজ্জামান: প্রোপাগান্ডা তো চলছেই। আপনি দেশে কিংবা দেশের বাইরে থেকে একটি ভুয়া আইডি দিয়ে মুহূর্তেই প্রোপাগান্ডা ছড়াতে পারেন। যেহেতু আপনার কোনও দায়বদ্ধতা এখানে নাই। প্রোপাগান্ডা মোকাবিলা করা সবসময় বড় চ্যালেঞ্জ। ভুয়া বা গুজবের পোস্টাকে ফিল্টারিং করে ডিলিট করে দেয়া একটা চ্যালেঞ্জ। সেক্ষেত্রে আরও একটি চ্যালেঞ্জ হলো ফেসবুকের কনটেন্ট ইচ্ছা করলেই ফিল্টারিং করা সম্ভব না। আর দ্বিতীয় চেল্যাঞ্জটি হল অপরাধীকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা। আইনের আওতায় আনার পরেও দেখা যায় অপরাধী আমাদের আয়ত্বে নেই। সেক্ষেত্রে এটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
 
ব্রেকিংনিউজ: দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক কোনও চ্যালেঞ্জ আছে কিনা?
 
আলিমুজ্জামান: ধর্মীয় কিংবা সাম্প্রদায়িক উস্কানির ক্ষেত্রে আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে আমরা বদ্ধপরিকর। যেকোনও জাতীয় দিবস অথবা ধর্মীয় উৎসবের আগে আমরা মনিটরিং করে থাকি। পাশাপাশি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা চলছে। এটিও আমাদের মনিটরিংয়ের আওতায় আছে। যদি আমরা এমন কিছু দেখি তাহলে অপরাধীকে যতটুকু নিবৃত্ত করা যায় অথবা আইনের আওতায় আনা যায় সেজন্য আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি।
 
ব্রেকিংনিউজ: গুজব প্রতিরোধে আপনারা কি কি কাজ করছেন?
 
আলিমুজ্জামান: বিভিন্ন পোর্টাল, ব্লগ, ফেসবুক বা স্যোসাল মিডিয়ায় যে গুজব বা প্রোপাগান্ডা সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশনে একটি মনিটরিং টিম আছে তারা কাজ করে যাচ্ছে। ফেসবুক চলে আমেরিকার আইনে এবং ফেসবুক আমাদের আয়ত্বে নেই। আমি-আপনি যেটাকে গুজব বলছি আশ্চর্য হলেও সত্য সেটাকে ফেসবুক গুজব বলছে না।
 
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে নওশাবার যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছিল বা মুখ ঢেকে, ঘোমটা দিয়ে অন্যান্য যে মিথ্যা ভিডিওগুলো ছেড়ে দিলো এগুলো ছিলো একটা বিগ প্রোপাগান্ডা। এই ভিডিওর ব্যাপারে আমি যদি ফেসবুকের কাছে বলি তাহলে ফেসবুক বলবে এটা কোনো অপরাধ না, এগুলো ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডের সাথে যায়। এক্ষেত্রে কিছু কিছু যায়গায় আমাদের কাছে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সব থেকে বড় ব্যাপার হল আমাদের সাথে ফেসবুকের 'MLATs' নেই, যেটা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্র্যাটিস। এটা থাকলে ফেসবুকের অনেক কিছুই আমরা সহজে করতে পারতাম। তবে এখন আমরা যেটা পাচ্ছি সেটা শুধুমাত্র একটি মোবাইল নাম্বার বা ইন্টারনেট আইপি।
 
ব্রেকিংনিউজ: সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে মানুষ কিভাবে সচেতন হতে পারে?
 
আলিমুজ্জামান: আমরা ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ইমেইল ইত্যাদি সার্ভিস ব্যবহার করে থাকি। যে ব্যক্তি এই সেবাগুলো ব্যবহার করবে তাকে আগে সচেতন হতে হবে। তারপর ব্যবহার করতে হবে। আপনারা জানেন, এখন ফেসবুক একটি বড় যোগাযোগমাধ্যম। যারা অপরাধ করে তারা বিভিন্নভাবে আপনাকে টার্গেট করতে পারে। যেমন আপনি হয়তো সমাজের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি বা আপনার ফেসবুকে যে আইডি বা পেজ আছে সেটা অনেক প্রতিষ্ঠিত। হয়তো কোনও হ্যাকার সেই চেষ্টা করতে পারে। আপনার ওই পেজ বা আইডি তার কন্ট্রোলে নেয়ার জন্য। এক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে কঠিন পাসওয়ার্ড, প্রাইভেসি এবং টু-স্টেপ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে ফেসবুক আইডিটি সুরক্ষা করা যেতে পারে।
 
বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে কাকে বন্ধু করবেন আর কাকে করবেন না সেটা ব্যবহারকারীর ব্যাপার। প্রোফাইল দেখেশুনে বন্ধুত্ব করা ভালো। এছাড়া আমরা অনেক সময় ফিশিং গেম খেলে থাকি। ফিশিং গেম হল হ্যাকিংয়ের একটি বড় যায়গা। এই গেম খেলতে যেয়ে যদি অন্য কোনো লিংকে ক্লিক পড়ে যায় তাহলে আপনার আইডি খোয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে সচেতন থাকা খুব জরুরি।
 
ব্রেকিংনিউজ: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
 
আলিমুজ্জামান: আপনাকে ও ব্রেকিংনিউজ.কম.বিডি’কেও ধন্যবাদ।
 
ব্রেকিংনিউজ/টিটি/এমআর

bnbd-ads