এরশাদের ‘বর্ণিল’ জীবনের সাতকাহন

নিউজ ডেস্ক
১৪ জুলাই ২০১৯, রবিবার
প্রকাশিত: ১২:৪৬ আপডেট: ১১:৪৭

এরশাদের ‘বর্ণিল’ জীবনের সাতকাহন

ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন হুসেইন মুহম্মাদ এরশাদ। জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে অবসান ঘটলো একটি অধ্যায়ের। ৮৯ বছর বয়সি সাবেক এই সফল রাষ্ট্রপতি দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দক্ষ ও সফল রাষ্ট্রনায়কের সম্মানে অভিহিত করা হয়। আধুনিক বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবেও তাকে বোঝানো হয়।

এইচ এম এরশাদের খুবই জনপ্রিয় উক্তি ছিল- ‘৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’। গ্রামমুখী উন্নয়নমূলক ভূমিকার কারণে এরশাদ ‘পল্লীবন্ধু’ উপাধীতে ভূষিত হন।



প্রাথমিক জীবন ও সামরিক জীবন

রংপুর জেলার দিনহাটায় ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হুসেইন মুহম্মাদ এরশাদ জন্মগ্রহণ করেন। রংপুরেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৫১ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে (কোহাটে অবস্থিত) যোগ দেন এবং ১৯৫২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হন। মুহম্মদ এরশাদ ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কেন্দ্রে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৭ সালে তিনি কোয়েটার স্টাফ কলেজ থেকে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৬৮ সালে শিয়ালকোটে ৫৪ ব্রিগেডের মেজর ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি লাভের পর ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ৩য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর অধিনায়ক ও ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে ৭ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও এরশাদ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় এরশাদ ছুটিতে রংপুর ছিলেন। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে তিনি পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তান থেকে আটকে পড়া বাঙালিরা যখন ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে আসে তখন তিনিও প্রত্যাবর্তন করেন।

পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৭৩ সালে এরশাদকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল পদে নিয়োগ দেন তৎকালীন সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর মেজর জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে এলে এরশাদকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীর উপপ্রধান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ চিফ অব আর্মি স্টাফ নিযুক্ত হন এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এরশাদ একই বছরের ডিসেম্বরে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব বুঝে নেন।

সামরিক অভ্যু্ত্থান ও রাষ্ট্রপতিত্ব



১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হবার পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক অভিলাষ প্রকাশ হয়ে পড়ে। 

২৪ মার্চ ১৯৮২ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সাল নাগাদ তিনি প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। 

এরশাদ দেশে উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন এবং ১৯৮৫ সালে প্রথম উপজেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই দলের মনোনয়ন নিয়ে ১৯৮৬ সালে পাঁচ বছরের জন্য দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জামায়াত এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে যদিও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এই নির্বাচন বয়কট করে। সাধারণ নির্বাচনে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন

বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে ১৯৮৭ সলের ৭ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি সংসদ বাতিল করেন। ১৯৮৮ সালের সাধারণ নির্বাচন সকল দল বয়কট করে। এরশাদের স্বৈরাচারের বিরূদ্ধে দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সকল বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে।

পতন ও গ্রেফতার 

এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর অবিরাম আন্দোলন চলতে থাকে। প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৯১ সালে জেনারেল এরশাদ গ্রেফতার হন এবং তাঁকে কারাবন্দি করে রাখা হয়। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে জেলে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় এরশাদ রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন। বিএনপি সরকার তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতি মামলা দায়ের করে এবং কোনো কোনোটিতে দোষী প্রমাণিত হয়ে তিনি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ১৯৯৬-এর সাধারণ নির্বাচনেও এরশাদ সংসদে পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন। ছয় বছর জেলে থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্ত হন। তবে আদালতের রায়ে দণ্ডিত হওয়ার কারণে সংসদে তাঁর আসন বাতিল হয়ে যায়।


পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন



১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না-আসা পর্যন্ত কারারূদ্ধ থাকেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। ছয় বছর আবরুদ্ধ থাকার পর ৯ জানুয়ারি ১৯৯৭ সালে তিনি জামিনে মুক্তি পান। তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি ২০০০ সালে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যার মধ্যে মূল ধারার তিনি চেয়ারম্যান।

২০০১ সালের অক্টোবরে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৪টি আসনে জয়ী হয়। এরপর তিনি ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে মহাজোট গঠন করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এরশাদের দল ২৭টি আসনে বিজয়ী হয়। 

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে প্রায় সব নির্বাচনেই এরশাদ আগ্রহের কেন্দ্রে ছিলেন। বিশেষ করে জোট গঠন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া না নেওয়ার প্রশ্নে, এমনকি জাতীয় পার্টির শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনে এরশাদের বক্তব্য ও অবস্থান বরাবরই সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে।

এরপর অনুষ্ঠিত দশম এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বাইরে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেয়ে বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকেছে এরশাদের দলই। 

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তার সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তার স্ত্রী রওশন এরশাদ প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হন।

ব্রেকিংনিউজ/এসএসআর