রূপপুরে বালিশ-কাণ্ড: ‘গোটা মন্ত্রণালয় যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়’

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৮ জুলাই ২০১৯, বৃহস্পতিবার
প্রকাশিত: ০২:৫৪ আপডেট: ০৪:২৯

রূপপুরে বালিশ-কাণ্ড: ‘গোটা মন্ত্রণালয় যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়’
ফাইল ফটো

গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সততা, স্বচ্ছতা, নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, ‘পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঘটনা (প্রকল্পের আওতায় ভবনের আসবাবপত্র ও বালিশ কেনাসহ অন্যান্য কাজের অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ) আমাদের ইমেজকে ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আমি সবখানেই বলি রূপপুর প্রকল্পের একটি ঘটনা দিয়ে গোটা অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না। অনেক সময় কেউ কেউ অতিলোভী হয়ে গোটা ডিপার্টমেন্টের ভাবমূর্তি ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন।’
 
বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় গণপূর্ত অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে গণপূর্ত অধিদফতরের ৩ দিনব্যাপী বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির তিনি এসব কথা বলেন। 

শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদফতরের প্রকৌশলীদের বিশেষায়িত পদ এবং শিক্ষা যাতে কোনভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে বিষয়টি সতর্কতার সাথে মনে রাখতে হবে। আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে আপনাদের সুখ-দুঃখকে ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি।’

প্রকৌশলীদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘কোনও কোনও জেলায় আমাদের প্রকৌশলীরা বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পড়েন। যতদিন আমি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে আছি, আমাদের একজন কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক বা অন্য কোনও ক্ষমতা দেখিয়ে প্রভাবান্বিত বা হয়রানি করতে চাইলে আমাকে জানাবেন, আমি আপনাদের পাশে দাঁড়াবো। টেন্ডার এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডে কাজ শেষ না করে দ্রুত বিল দিতে হবে, জোরপূর্বক তার লোককে টেন্ডার দিতে বাধ্য করা হবে- এই প্রবণতা কোনভাবেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নীতিমালার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং আমি নিজে এটাকে কোনভাবেই অনুমোদন করবো না। আপনাদের ভীত-সন্ত্রস্ত্র হওয়ার কোনও কারণ নেই।’

তিনি বলেন, ‘আমি অতীতে এমপি-মন্ত্রী ছিলাম না। কিন্তু আমার জীবনে আন্দোলন, সংগ্রাম ও লড়াইয়ের কারণে মার্শাল ল সরকারের আমলে জেল খাটতে হয়েছে। আমি কিন্তু কোনদিন মুচলেকা দিয়ে বের হইনি। শক্ত অবস্থানে থাকা আত্মবিশ্বাসী মানুষ আমি। টিম ওয়ার্কে আপনারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উইং। আপনাদের এটাকে ধারণ করতে হবে।’

শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘এ দেশটা ৩০ লক্ষ মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। এ দেশের জন্য অনেক মানুষ জীবন দিয়েছেন। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের জন্য আমাদের জাতির জনক পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতা করেননি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তত ১৯ বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন, কিন্তু একবারের জন্যও তিনি শঙ্কিত হয়ে আমাদের অধিকার প্রশ্নে ছাড় দেননি। কর্তব্য পালনে আমি চাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।’ 

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, ‘অনিয়মের পরিসর থেকে সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে। আপনারা মর্যাদাপূর্ণ পদ পান, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পান, বেতন-ভাতা পান। কোনভাবেই যেন চিহ্নিত না হন যে, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সাথে আপনারা সম্পৃক্ত। দু-একজনের জন্য কেনও বদনামের বোঝা আমাদের সবার কাঁধে আসবে। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, আসুন আমরা আত্মশুদ্ধি করি, আত্মসমালোচনা করি। আমরা ভুল-ত্রুটিকে শুধরে নেই। তাহলে এই ডিপার্টমেন্টের ভাবমূর্তি অনেক উজ্জ্বল হবে।’ 

মন্ত্রী বলেন, ‘দেশটা আমাদের সকলের। এ দেশ গড়ায় আপনাদের সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ দরকার। উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় গণপূর্ত অধিদফতরের প্রকৌশলীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত। তাই উন্নয়নে আপনারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। আপনাদের সুখ-দুঃখ, মাঠ পর্যায়ের সমস্যা, প্রতিকূলতা, দাবি-দাওয়া আমাদের সামনে পেশ করুন। আইনের পরিসরের মধ্যে আমরা সমাধানের চেষ্টা করবো। প্রয়োজনে বিধি-বিধান পরিবর্তনের চেষ্টা করবো। আশা করি সাধ্যের মধ্যে পর্যায়ক্রমে আপনাদের সকল প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবো।’

গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী মো.সাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো.শহীদ উল্লা খন্দকার। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে গণপূর্ত অধিদফতরের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। 

উল্লেখ্য, এর আগে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীর ভবনের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা ও তা ভবনে তোলায় অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে গত ১৬ মে গণমাধ্যমেক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। 

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের থাকার জন্য গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীতে ২০ তলা ১১টি ও ১৬ তলা ৮টি ভবন হচ্ছে। এরই মধ্যে ২০ তলা আটটি ও ১৬ তলা একটি ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ২০ তলা ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য প্রতিটি বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর ভবনে বালিশ ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। 

প্রতিটি রেফ্রিজারেটর কেনার খরচ দেখানো হয়েছে ৯৪ হাজার ২৫০ টাকা। রেফ্রিজারেটর ভবনে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৫২১ টাকা। একেকটি খাট কেনা দেখানো হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৫৭ টাকা। আর খাট উপরে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ হাজার ৭৭৩ টাকা।

প্রতিটি টেলিভিশন কেনায় খরচ দেখানো হয়েছে ৮৬ হাজার ৯৭০ টাকা। আর টেলিভিশন ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭ হাজার ৬৩৮ টাকা। বিছানার খরচ ৫ হাজার ৯৮৬ টাকা দেখানো হয়েছে। তা ভবনে তুলতে খরচ দেখানো হয়েছে ৯৩১ টাকা। প্রতিটি ওয়ারড্রোব কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে ৫৯ হাজার ৮৫৮ টাকা। আর তা ওঠাতে দেখানো হয়েছে ১৭ হাজার ৪৯৯ টাকার খরচ। এ রকম বৈদ্যুতিক চুলা, বৈদ্যুতিক কেটলি, রুম পরিষ্কারের মেশিন, ইলেকট্রিক আয়রন, মাইক্রোওয়েভ ইত্যাদি কেনাকাটা ও ভবনে তুলতে অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়েছে।

ব্রেকিংনিউজ/আরএইচ/এমআর