রমজান মাস ও তরুণ সম্প্রদায়

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক
৮ মে ২০১৯, বুধবার
প্রকাশিত: ১১:১৮

রমজান মাস ও তরুণ সম্প্রদায়

স্বাগত রমজানুল মোবারক
সম্মানিত পাঠক, তিন সপ্তাহ আগে এই কলামে বলে রেখেছিলাম, দু-একটি সপ্তাহ লিখতে পারব না। গত দু’টি বুধবার লিখতে পারিনি বলে দুঃখিত। সবাইকে মাহে রমজানের মোবারকবাদ জানিয়ে আজকের কলামটি উপস্থাপন করছি। আগামী সপ্তাহের কলামটি নিখাদ রাজনৈতিক বিষয়ে হবে বলেই নিবেদন করছি যে, আজকের কলামটি একান্তভাবেই রমজানুল মোবারক নিয়ে; রমজানুল মোবারকের সম্মানে এই কলামটি লেখা। নিজে কোনো ধর্মীয় জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ নই; আমি অভ্যাসে চেষ্টারত সাধারণ মুসলমান। তাই সাধারণ ভাবনাগুলোই প্রকাশ করছি আজকের কলামে। কলামটিতে প্রথম অংশ হচ্ছে রমজান মাসের গুরুত্ব কী এবং আমাদের আচরণ কী রকম হওয়া উচিত। দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে রমজান মাসে বাংলাদেশে যা হয় তার একটি চিত্র; পাঠক মেহেরবানি করে কষ্ট করুন এবং মিলিয়ে নিন কোনটি সঠিক এবং কোনটি বেঠিক। তৃতীয় অংশটি হচ্ছে ক্ষুদ্রতম অংশ : ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধের আলোচনা। সর্বশেষ অংশ হচ্ছে তরুণদের প্রতি আবেদন। রমজান মাস যদি একটি ফলদায়ক বৃক্ষ হয়, আমরা যেন সেই বৃক্ষ থেকে সর্বাধিক ফল আহরণ করতে পারি, সে চেষ্টাই হওয়া উচিত।

আলোচনার প্রয়োজন
সারা বছর রাজনৈতিক, সাংবিধানিক, আর্থসামাজিক, নিরাপত্তা, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লিখে থাকি; কিন্তু রমজান মাসে, একজন সাধারণ অভ্যাসরত মুসলমান হিসেবে আমাদের চিন্তাভাবনা কী- সেটি প্রকাশ করার জন্য অনেকেই অনুরোধ করেন। কলামের কথাগুলো আমার ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি। আলোচনা করাই সময়োপযোগী কাজ। কারণ আমাদের দেশে বর্তমানে লেখাপড়ার পদ্ধতি, সিলেবাস ইত্যাদি এমন হয়েছে যে, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে আসা ছাত্ররা দ্বীনের মূল্য, রমজানের গুরুত্ব ইত্যাদি বিশেষায়িত বা স্পেশালাইজড সাবজেক্ট ব্যতীত, কোনো জায়গায় কোনো বইয়ের পৃষ্ঠায় পড়ার জন্য পায় না। না পেলে ছাত্ররা জানবে কিভাবে? অতএব, টেলিভিশনের যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা, পত্রিকার কলামের যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা, মফস্বল এলাকার ওয়াজ-মাহফিল ইত্যাদিই হলো সাধারণ মানুষের জন্য জানার, একমাত্র না হলেও অন্যতম মাধ্যম। আরেকটি বড় মাধ্যম হলো, জুমার নামাজের সময় প্রদত্ত খুতবা।

এ কলাম কাদের জন্য?
নয়া দিগন্ত একটি বহুল প্রচারিত পত্রিকা। বিভিন্ন বয়সী, বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার ও বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা এটি পড়েন। তবে কলামের লেখক হিসেবে আমার আবেদন তরুণ প্রজন্মের প্রতি। এ কলামের মূল আবেদন তারুণ্যের চিন্তাচেতনার প্রতি। এর কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার ৬০ ভাগই হলো তরুণ; আমি তরুণ বলতে ২০ বছর থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত বুঝাচ্ছি। আমার নিজের বয়স যেহেতু ৭০ বছর চলছে, নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই কিছু কথা বলব তারুণ্য ও তাদের ইবাদত প্রসঙ্গে। তবে প্রথমে রমজানের গুরুত্ব প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করে নিই। আশা করব, তরুণ পাঠক নিজের তরুণ বন্ধুদের সাথে এই কলামের বক্তব্য শেয়ার করবেন।

গুরুত্বের প্রথম কারণ : কুরআন নাজিল
রমজান গুরুত্বপূর্ণ মাস হওয়ার প্রথম কারণ হচ্ছে, পবিত্র রমজান মাসে কুরআনুল কারিম নাজিল হয়েছে। কুরআনুল কারিমের ভাষা হলো (দুনিয়ার দৃষ্টিতে) আরবি; কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে স্বীকৃত হবে যে, এই ভাষাতেই মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির সাথে কথা বলেছেন। কুরআনুল কারিম হলো মানবজাতির জন্য জীবনবিধান। কুরআনুল কারিম হলো, মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া গ্রন্থগুলো তথা ঐশী কিতাবগুলোর মধ্যে সর্বশেষ। এই কিতাব প্রথম নাজিল হয়েছে রমজান মাসে। এতে রমজানের সম্মান-মর্যাদা এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে, এটি সর্বশ্রেষ্ঠ মাস হিসেবে গণ্য।

গুরুত্বের দ্বিতীয় কারণ : লাইলাতুল কদর
রমজান মাস গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, রমজানুল মোবারকের ২০ তারিখের পর বেজোড় রজনীগুলোতে, লাইলাতুল কদর তথা ‘সম্মানিত রজনী’ আছে। এই রাতের মর্যাদা বা মান বা মূল্য এক হাজার মাসের চেয়েও বেশি। আরবি ভাষায় লাইলুন বা লাইল মানে রাত এবং কদর মানে সম্মান; ফারসি ভাষায় শব মানে রাত। অতএব, লাইলাতুল কদর বা শবেকদর মানে : সম্মানিত রাত্রি। এ রকম একটি রাতকে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র রমজান মাসে অন্তর্ভুক্ত করে, রমজানকে মহিমান্বিত এবং বিশ্বাসী মানুষকে কৃতার্থ করেছেন। মানুষকে তাগাদা দেয়া হয়েছে এই রাত্রির সন্ধানে সতর্ক থাকতে ও পরিশ্রম করতে। মানুষকে তাগাদা দেয়া হয়েছে এই রাত্রি থেকে উপকার আদায় করে নিতে।

গুরুত্বের তৃতীয় কারণ : রোজা ও তাকওয়া
এই মাসে রোজা রাখা ফরজ করা হয়েছে। রোজা এমন একটি ইবাদত যার বিনিময়-পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা সফল বা মকবুল রোজাদারকে নিজ হাতে তথা নিজ বিবেচনায় প্রদান করবেন। রমজানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো, মানুষকে অন্তরের পবিত্রতা বা অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জনে সহায়তা করা। অন্তরের পবিত্রতা বা অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জনের যে পদ্ধতি, সেটিকে পবিত্র কুরআনে একটি শব্দের দ্বারা বোঝানো হয়। সেই শব্দটি হলো তাকওয়া। অনেকে বাংলায় তাকওয়াকে ‘পরহেজগারি’ বলেও অনুবাদ করে থাকেন। তাকওয়া অর্জনের জন্য তথা পবিত্রতা অর্জনের জন্য, পবিত্র কুরআনে অনেকবার তাগাদা এসেছে। ‘তাকওয়া’ শব্দের কিঞ্চিৎ ব্যাখ্যা বা আলোচনা এখানে প্রাসঙ্গিক। রমজানুল মোবারকে মানুষ যদি সতর্কতার সাথে জীবন যাপন করা হয়, তাহলে তাকওয়া অর্জনের পথে মানুষ অনেক দূর অগ্রসর হয়। তাকওয়া শব্দের সাথে আমরা পরিচিত; অধিক পরিচিত পবিত্রতা বা পরহেজগারি বা খোদাভীতি শব্দের সাথে। তাহলে তাকওয়া শব্দের অতিরিক্ত ব্যাখ্যা কী আছে?

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে, শারীরিক বা বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জনের জন্যই আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে চেষ্টা করি; সে চেষ্টার নাম অজু। কিন্তু শারীরিক পবিত্রতা থেকেও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো মনের বা চিন্তার পবিত্রতা। কারণ, মন বা চিন্তাই মানুষের শরীরের কর্মকাণ্ডকে নির্দেশ করে। মন বা চিন্তার জগতের সিদ্ধান্ত মোতাবেকই চক্ষু বিভিন্ন দিকে দেখে, কান বিভিন্ন জিনিস শোনে, হাত বিভিন্ন জিনিস ধরে, পা বিভিন্ন দিকে অগ্রসর হয় ইত্যাদি। তাহলে নিয়ন্ত্রণকারী বা নিয়ন্ত্রণস্থল বা আদেশ প্রদান স্থল বা কমান্ড সেন্টার হলো মন। সেই মনকে পবিত্র করার প্রক্রিয়ার অংশ হলো, রোজা রাখা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোজার অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মানুষ শুধু দু’টি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। একটি হলো নির্দিষ্ট সময়ে পানাহার নিয়ন্ত্রণ, অপরটি হলো নির্দিষ্ট সময়ে পুরুষ ও স্ত্রীর বৈধ মিলন নিয়ন্ত্রণ। উভয় কাজ শারীরিক কাজ হলেও, এই কাজগুলো কিন্তু তাকওয়া অর্জনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তাকওয়া বোঝার জন্য একটি উদাহরণ
তাকওয়ার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে একটি সুপরিচিত উদাহরণ হচ্ছে- আপনি সুতির কাপড় পরে একটি ফুলের বাগান দিয়ে হাঁটছেন। ফুলের বাগানের গাছগুলো ঘন ঘন লাগানো; বেশির ভাগ গাছ ও ফুল কাঁটাযুক্ত; মৃদুমন্দ বাতাস বইছে, যে বাতাসের কারণে আপনার কাপড় যেমন হালকাভাবে উড়ছে তেমনি ফুলগাছের কাঁটাওয়ালা ডালগুলোও মৃদুভাবে হেলছে ও দুলছে; বাগানের এক পাশ থেকে অপর পাশে যাওয়ার জন্য চিহ্নিত যে পথ, সেটি অতি সরু; ওই সরু পথটির উভয় পাশ থেকে কাঁটাওয়ালা ফুলগাছের ডালাপালা এসে সরু পথটিকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে; এই সরু পথটিকে অনুসরণ করেই আপনাকে বাগানের অপর পাশে যেতে হবে; আপনি এমনভাবে বাগান পার হবেন যে, ফুলগাছের কাঁটা যেন আপনার কাপড়ে না লাগে। এর নামই তাকওয়া।

অর্থাৎ পৃথিবীতে এমনভাবে জীবন যাপন করতে হবে, পৃথিবীর কাদামাটি পানি বাতাস আগুন জীবজন্তু বৃক্ষলতা সব কিছুর মধ্য দিয়েই এমনভাবে জীবন যাপন করতে হবে যে, এগুলোর সুগন্ধিযুক্ত অংশ বা বৈধ বা পবিত্র অংশ আপনার জীবনকে ধন্য করতে পারে, কিন্তু এগুলোর মন্দ বা দুর্গন্ধযুক্ত অংশ যেন আপনার জীবনকে কলুষিত করতে না পারে। অর্থাৎ সমাজে বসবাস করতে হবে : চোর-ডাকাত, ঘুষখোর-সুদখোর, সাধু-সন্ন্যাসী, নামাজি-বেনামাজি, ক্রেতা-বিক্রেতা, মহাজন-ঋণগ্রহীতা, শিল্পপতি-শ্রমিক, মনোযোগী-অমনোযোগী ছাত্র, অধিনায়ক-সৈনিক, মন্ত্রী ও তার তোষামোদকারীসহ সবার মধ্যে থেকেও যেন নিজের চিন্তা ও আচরণকে কলুষমুক্ত রাখা যায়। এটার নাম তাকওয়া। তাকওয়া বা পবিত্রতা অর্জন শুধু রমজানুল মোবারকের জন্য প্রযোজ্য নয়; সারা বছরের জন্যই প্রযোজ্য; কিন্তু এর প্রশিক্ষণের জন্য সর্বোত্তম সময় হিসেবে গণ্য বা নির্ধারিত হয়েছে পবিত্র রমজান মাস।

আমাদের দেশে রমজানের চিত্র-১
রমজানুল মোবারকের একটি পরিচিত চিত্র দিচ্ছি। জুমার নামাজে স্বাভাবিক সময় থেকে ২০-৩০ শতাংশ মানুষ বেশি হবে। পাঁচ ওয়াক্তের নামাজের জামাতে মসজিদে নামাজির সংখ্যা স্বাভাবিক সময় থেকে ২০-৩০ শতাংশ বেশি হবে। এশার নামাজে ২০-৩০ শতাংশ নয়, প্রায় দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি হবে। এশার নামাজের সাথে তারাবির নামাজ থাকে; ওই নামাজের সময় মুসল্লিরা মসজিদ ভরে ফেলেন।

তারাবির নামাজের উপস্থিতি রমজানের প্রথম সাত-আট দিন পর একটু একটু কমতে থাকে; ১০-১২ রোজার সময় এসে স্থিতিশীল হয় এবং কমা বন্ধ হয়। আবার ২৩-২৪ রোজা থেকে বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মসজিদে ২৭টি তারাবির মাধ্যমে পবিত্র কুরআন খতম করা হয়, যাকে বলা হয় খতম তারাবি। রমজান মাসব্যাপী সাহরির আগে-পরে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা এবং ইফতারের আগে আগে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট বিভিন্ন ধরনের ইসলামী অনুষ্ঠান বিভিন্ন টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হবে। রমজান মাসব্যাপী বাড়িতে বাড়িতে, মহল্লায় মহল্লায়, আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব পরিচিতজনদের নিয়ে ইফতারির দাওয়াত আয়োজন করা হবে। গরিব মানুষকে ইফতার খাওয়ানো হয়। মসজিদে মসজিদে বিনা মূল্যে মুসল্লিদের এবং গরিব মানুষকে ইফতার খাওয়ানো হয়। রাজনৈতিক দলগুলো প্রচুর টাকা খরচ করে, চাকচিক্যময়ভাবে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে।

এ দেশে রমজানের চিত্র-২
মাসব্যাপী দিনে ও রাতে মানুষ বাজারে থাকবে, বিপণি বিতানে থাকবে ঈদের বাজার করার জন্য। ‘ঈদের বাজার’ মানে খাওয়া-দাওয়া আর পোশাক-আশাকের বাজার। বাজারে বা বিপণি বিতানে থাকার কারণে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নামাজ কাজা হবে এবং ওই নামাজ আর পড়া হবে না। গরমের দিনে দিনের বেলা বাজারে থাকার কারণে শরীরটা ক্লান্ত হয়ে যাবে। অতএব, রাতে অতিরিক্ত কোনো ইবাদত করা হয়ে উঠবে না। বাজারে জিনিসপত্রের মূল্য বাড়তে থাকবে। ব্যবসায়ীরা চালাক; ঘোষণা দিয়ে রমজানের ১ তারিখ থেকে কোনো জিনিসের দাম বাড়ান না। যেমন এই বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে রমজান আসার ২০-২৫, অন্তত ১০-১২ দিন আগে থেকেই খাদ্যদ্রব্যের বিভিন্ন আইটেমের দাম বাড়ানো শুরু হয়েছে; জ্ঞানী বিশ্লেষকের বিশ্লেষণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। মূল্যবৃদ্ধির কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ কেউ খুঁজে পাচ্ছে না।

পবিত্রতা অর্জনের মাসে ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের পকেট থেকে বেশি টাকা আদায় করা হবে এবং যারা আদায় করবেন, তারা দেখতে শুনতে অত্যন্ত ভদ্র এবং সবার কাছে সুপরিচিত ‘পরহেজগার’ ব্যক্তি। মানুষকে কষ্ট না দেয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত পদক্ষেপ হবে নামকাওয়াস্তে। তারাবির নামাজ পড়ার পর মোবাইল ফোনে একজন ব্যবসায়ী তার আড়তে বা গুদামে সংবাদ দেবেন আগামীকাল কতটুকু মূল্য বাড়াবেন কিংবা কী নিয়মে দ্রব্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবেন। রমজানুল মোবারকে ঘুষ খাওয়া কোনোমতেই কমবে না; ‘অভিনব পদ্ধতিতে’ ঘুষ খাওয়া হবে। একজন আরেকজনের বাড়িতে প্রচুর ইফতারি পৌঁছাবেন। রমজান মাসের ১৫ তারিখের পর থেকে জাকাত বিতরণ শুরু হবে।

বদরের যুদ্ধের প্রসঙ্গ
ইসলামের ইতিহাসে অনেকগুলো যুদ্ধ আছে। প্রথম যুদ্ধটি আমাদের কাছে ‘বদরের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। বাংলা ভাষায় ইসলামের প্রাথমিক যুগে সংঘটিত যুদ্ধগুলো সম্পর্কে অনেক পুস্তক নেই। একটি পুস্তকের নাম ‘ব্যাটেলস অব ইসলাম’। নামের শব্দগুলো ইংরেজি হলেও বইটি বাংলায়; বইয়ের নামের বাংলা মানে হলো ‘ইসলামের যুদ্ধগুলো’। লেখক : মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। পুস্তকটিতে ইসলামের ইতিহাসের ১৩টি যুদ্ধ বা অভিযান যথা বদরের যুদ্ধ থেকে শুরু করে স্পেন বিজয় পর্যন্ত আলোচিত হয়েছে।

এই পুস্তকে আলোচনার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- লেখকের সমসাময়িক সামরিক জ্ঞান ও যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার সময়ের সামরিক জ্ঞানের সাথে ওই যুদ্ধগুলোর প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের উল্লেখের সমন্বয়। এখন ১৪৪০ হিজরি সালের রমজান মাস চলছে; কয়েক দিন পর রমজান মাসের ১৭ তারিখ হবে ‘বদর দিবস’ তথা বদরের যুদ্ধের বার্ষিকী। রাসূলুল্লাহ সা:-এর হিজরতের কয়েক মাস পরই রমজান মাসের ১৭ তারিখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আজকে এই কলাম যারা পড়ছেন তারা মেহেরবানি করে বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে চিন্তা করবেন; বদরের যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছিলেন, তাদের কথা চিন্তা করবেন এবং বদরের যুদ্ধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে ভাববেন; আলোচনা করবেন। যেদিন বদর প্রান্তরে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তার আগের রাত্রিতে পাহাড়ের ওপর স্থাপিত নিজের অস্থায়ী আশ্রয়স্থলে রাসূলুল্লাহ সা: সিজদা ও ক্রন্দনরত অবস্থায় মহান আল্লাহর কাছে নিবেদন করেছিলেন অনেকটা এ রকম : ‘হে আল্লাহ, আপনি জয়-পরাজয় দেয়ার মালিক।

আগামীকাল যদি আমরা পরাজিত হই, তাহলে দ্বীন ইসলামের কী হবে, মুসলমানদের কী হবে, সেটি আপনিই ভালো জানেন। আপনার নাম নেয়ার জন্য, আপনার দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই আপনি মুসলমানদেরকে জয় দিন। আপনার সাহায্য ব্যতীত আমরা জয়ী হতে পারব না; আপনার সাহায্য কামনা করছি।’ মহান আল্লাহ সাহায্য করেছিলেন; মুসলমানরা জয়ী হয়েছিলেন। তাই আমার মন্তব্য : বদরের যুদ্ধের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম এবং সেই যুদ্ধটি ছিল একটি মহামূল্যবান ইবাদত।

একটি ছোট গল্প : ইচ্ছা পূরণ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত ছোট গল্পের নাম ‘ইচ্ছা পূরণ’। অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী এই গল্পের সারমর্ম : কিশোর ছেলে তার বাবার তদারকিতে বা শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে মনে মনে বলে যে, আমি যদি বাবার মতো হতে পারতাম তাহলে এ রকম এ রকম করতাম এবং ওই রকম ওই রকম করতাম না; যেমন গম্ভীর হয়ে চলতাম, ছেলেকে শাসন করতাম না ইত্যাদি। অপর দিকে বাবা তো অবশ্যই বয়সে প্রবীণ; নিজের ছেলেকে দেখে যে, দুরন্তপনা করছে, মুক্ত হাওয়ায় মাঠে-প্রান্তরে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, স্কুল ফাঁকি দিয়ে বেড়াচ্ছে; অথচ নিজে কিছুই করতে পারছে না। বাবার মনের ইচ্ছা, তিনি যদি ছেলের মতো পুনরায় কিশোর হতে পারতেন, তাহলে কতই না মজা হতো।

‘ইচ্ছাদেবী’ ছেলে এবং বাবার মনের ইচ্ছা পূরণ করে দিলেন। একদিন সকালে ছেলে হয়ে গেল বাবার মতো এবং বাবা হয়ে গেলেন ছেলের মতো। গ্রামের লোকেরা দেখল পুঁচকি ছেলে মুরব্বিদের মতো চলছে, সবাই বলা শুরু করল ‘ইঁচড়ে পাকা।’ পাড়ার লোকেরা দেখল- প্রবীণ একটা লোক কিশোর বালকের মতো গাছে উঠছে, পুকুরে ঝাঁপ দিচ্ছে। সবাই বলা শুরু করল, লোকটার মাথায় ছিট আছে। গল্পের উপসংহার, সব কাজ সব বয়সে মানায় না। এখানে একটি কথা যোগ করছি। কিছু কাজ নির্দিষ্ট বয়সে করা সহজ, অর্থাৎ সব কাজ সব বয়সে করা সহজ নয়। তাই কোন কাজটি কোন বয়সের জন্য সহজ, কোন কাজটি কোন বয়সে করলে লাভজনক, সেটি আমাদের জানা প্রয়োজন।

অন্য একটি উদাহরণ
একজন ব্যক্তির মাসিক বৈধ ইনকাম পাঁচ হাজার টাকা, দ্বিতীয় ব্যক্তির মাসিক বৈধ ইনকাম এক লাখ টাকা; উভয়েই কোনো অবৈধ ইনকাম করেন না। প্রথম ব্যক্তি বৈধ ইনকাম থেকে প্রতি মাসে পাঁচ শ’ টাকা গোপনে দান-খয়রাত করেন; দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা দান-খয়রাত করেন। অর্থাৎ প্রথম ব্যক্তি তার ইনকামের ১০ ভাগের ১ ভাগ এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি তার ইনকামের ৫০ ভাগের ১ ভাগ দান-খয়রাত করছেন। উভয়েই বাকি টাকা দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে হোক বা আরাম-আয়েশে হোক সংসার চালান। জ্ঞানী বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম ব্যক্তির দান-খয়রাতের মূল্য এবং প্রথম ব্যক্তির পক্ষ থেকে ত্যাগের মূল্য দ্বিতীয় ব্যক্তির তুলনায় অনেক বেশি।

তরুণ বয়সের সময়ের ব্যবহার
তরুণ বয়সে অনেক কিছু করা যায়। যেমন পাঠ্যসূচির লেখাপড়া, টিউশনি করে নিজের খরচ জোগাড়ের চেষ্টা, পিতামাতার খেদমত, শিশুসন্তান, স্ত্রী ও পরিবারের অন্যদের যত্ন- করা, হাটবাজার করা, আত্মীয়স্বজনের খবরাখবর রাখা, স্টেডিয়ামে অথবা টিভির পর্দায় খেলাধুলা দেখা, ফেসবুকের মাধ্যমে অথবা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারা অথবা বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডা মারা ইত্যাদি। আবার এসবও করা যায়, সময়মতো মসজিদে যাওয়া ও নামাজ-কালাম পড়া; একটু সময় করে কুরআন শরিফ পড়া এবং এর অর্থ বোঝার চেষ্টা করা; রাতে টেলিভিশনে সময় ব্যয় না করে একটু ইবাদত-বন্দেগি করা। রাতে ঘুমের এবং সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার জন্য তিনটি উপায় আছে। প্রথমটি হলো দেরিতে ঘুমানো এবং দেরিতে ওঠা, নামাজ কাজা করা। দ্বিতীয় পন্থা হলো, দেরিতে না ঘুমানো, ফজরের নামাজের সময় উঠে যাওয়া, তারপর দিনের কাজ শুরু করা। তৃতীয় উপায় হলো অধিকতর কষ্টকর। রাতে সাংসারিক সব কাজ শেষ করতে সময় লাগে বিধায় বিলম্বে ঘুমাতে যাওয়া; কিন্তু ভোর রাতে ওঠা, ইবাদত-বন্দেগি করা, সকালের নামাজ পড়া এবং একটু কুরআন তিলাওয়াত করা অতঃপর প্রস্তুত হওয়া এবং অফিসে যাওয়া বা দিনের কাজ শুরু করা। তৃতীয় ব্যক্তি আরাম করলেন কম।

বয়সভেদে ইবাদতের তুলনা
অনেক তরুণকে বলতে শুনি- ‘বয়স হলে, পেনশনে গেলে, তখন তো সংসারের কাজ বেশি থাকবে না, তখন ইবাদত-বন্দেগি বেশি করব।’ এরূপ কথা ভ্রান্ত কল্পনা। যখন বয়স হবে তখন শরীরে ক্লান্তি দ্রুত আসবে, মনের ক্লান্তি দ্রুত আসবে। আরো একটি ‘মজার কথা’ আছে। টেলিভিশনে প্রোগ্রাম ভালো লাগে না, মোবাইল ফোনে বন্ধুর সাথে আড্ডা মারা যাচ্ছে না, সে জন্যই প্রবীণ ব্যক্তি ইবাদতে সময় দেবে, এটি ইবাদতের প্রতি সম্মান করা নয়। তরুণদের আহ্বান জানাচ্ছি : অনেক কিছু আরামদায়ক এবং আনন্দদায়ক করার সুযোগ আপনার সামনে আছে; সেখান থেকে কিছু অংশ বাদ দিন; তাহলেই আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হবেন।

ভবিষ্যতে যখন প্রবীণ হবেন, তখন শরীরের অবস্থা কেমন হবে বা সংসার ও জগতের পরিবেশ কেমন হবে সেটি আপনি জানেন না। সবচেয়ে বড় কথা আপনি যে প্রবীণ হবেনই তথা আপনার হায়াত তত দিন থাকবে এই নিশ্চয়তা কে দেবে? তাই তরুণদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি- এই রমজানকে ব্যবহার করুন; পুঁজি সঞ্চয় করুন। আসুন, আমরা তরুণেরা অসততা থেকে দূরে থাকি, জঙ্গিবাদ থেকে দূরে থাকি, নারী নির্যাতন থেকে দূরে থাকি, প্রকৃতিকে বিনাশ করা থেকে দূরে থাকি।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি 

ব্রেকিংনিউজ/ এসএ