রবীন্দ্রনাথ বরাবরের প্রেরণা

কামাল লোহানী
১১ মে ২০১৯, শনিবার
প্রকাশিত: ০৭:৩৪ আপডেট: ০৭:৩৬

রবীন্দ্রনাথ বরাবরের প্রেরণা

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সব অনুপ্রেরণার উৎস। বিশ্বকবি হিসেবে খ্যাতির শিখরে যখন, তখনও আমাদের জীবন-সংগ্রামে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, পরে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে লড়তে ছিলেন মোক্ষম অস্ত্র। স্বাধীনতার সংগ্রামে সমগ্র ভারতবাসী রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করেছে; দেশ বিভক্তির চরম যন্ত্রণার কুৎসিত সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কবিগুরু ছিলেন আমাদের সাহস ও শক্তি। 

বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশে কবিগুরু আমাদের সামনে যে পথের দিশা নির্দেশ করেছেন তার কাব্য, সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিতে, তাই আজও বৈরী পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের লড়াই অব্যাহত রাখতে প্রবল জাতিত্ববোধকে জাগ্রত করেছেন আমাদের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথকে আজও আমরা লালন করে চলেছি, বাঙালির ঐক্যের সচেতনতায়। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক দুঃশাসনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে 'আমাদের নয়' বলে যে চক্রান্তের জাল পাতা হয়েছিল, তাকে ভাঙতে আমরা রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, নাটককেই শানিত তরবারি করেছি। 

আজ সেদিনের কথা মনে পড়ছে। কী প্রবল আত্মশক্তিতে বিশ্বাসী হয়ে আমরা জনগণ আর সাংস্কৃতিক কর্মীরা একত্রিত হয়েছিলাম কবিগুরুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনে! শুধু ঢাকায় নয়; মফস্বল এলাকাতেও আপন সাহসে ভর করে জন্মজয়ন্তী পালনে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য গোষ্ঠী। সামরিক জান্তা সেদিন পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক উদ্যোগকে নানা কৌশল ও নিষেধাজ্ঞার জালে বেঁধে ফেলার অপচেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। ঢাকায় বড় তিনটি কমিটি গঠিত হয়েছিল। একটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে, অন্যটি ঢাকা প্রেস ক্লাবে; তৃতীয়টি দেশের বরেণ্য প্রবীণ ব্যক্তিদের নিয়ে। এ ছাড়া পাড়া-মহল্লায় যে উচ্ছ্বাস আর উৎসাহ পরিলক্ষিত হয়েছিল, তা কেবল 'বাধা দিলে বাধবে লড়াই'- এই অমর বাণীকেই যেন সোচ্চার করেছিল। 

এ সময়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে নিষিদ্ধ করা এমনকি শিল্পীদের পোশাক-পরিচ্ছদেও পাকিস্তানি ঢঙ প্রবর্তনের ব্যর্থ উদ্যোগ আমরা লক্ষ্য করেছি। ১৯৬১ সালের পর থেকে রবীন্দ্রচর্চা যে প্রবল গতি নিয়ে সারা পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা সামরিক জান্তার কাছে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হচ্ছিল না। তাই ১৯৬৭ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তান পার্লামেন্টে তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন আকস্মিকভাবে বলে বসলেন, 'টেগোর ইজ নট এ পার্ট অ্যান্ড পার্সেল অব আওয়ার আর্ট অ্যান্ড লিটারেচার।' 

এই অবমাননাকর উক্তি প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল। সে সময়ের জনপ্রিয় গণসঙ্গীত দল 'ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী' তাদের এক জরুরি বৈঠকে শাহাবুদ্দিনের এই দম্ভোক্তির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়। দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার বার্তা সম্পাদক এবিএম মূসার কাছে ক্রান্তির প্রতিবাদলিপি নিয়ে গেলে তিনি 'রেজিমেন্টেশন অব কালচার' শিরোনামে সংবাদটি প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপলেন। ক্রান্তি শহরের অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা কামনা করল। তাদের ধারণা ছিল, বিষয়টি সার্বজনীন। তাই এর প্রতিবাদ সম্মিলিতভাবে করা উচিত। সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিষদ নামে সর্বদলীয় প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হলো। ছায়ানটের অন্যতম পুরোধা প্রবীণ সাংবাদিক ওয়াহিদুল হক ও ক্রান্তির কামাল লোহানী যুগ্ম আহ্বায়ক হলেন। সৃজনীর আবু নাহিদ কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পেলেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদ, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, সৃজনী শিল্প সাহিত্য গোষ্ঠী ও উত্তরণ এই প্রতিবাদী উদ্যোগে অংশগ্রহণ করল। সিদ্ধান্ত হলো, এ পরিষদের পক্ষ থেকে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে তিন দিনব্যাপী প্রতিবাদী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত, নাটক, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্যনাট্য পরিবেশন করা হবে। 

আমরা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সফলভাবে প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানসূচি শেষ করলাম। মিলনায়তনের পাশে সবুজ চত্বরে বসে জনপ্রিয় উর্দু কবি ও সংগঠক নওশাদ নুরী, ফতেহ্‌ ফারুক ও আমি যখন গল্প করছিলাম, অর্থাৎ তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠান শুরুর বেশ খানিকটা আগে লক্ষ্য করলাম, দু'জন হ্যাংলা-পাতলা শরীরের ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রনো পাঁজাকোলা করে বেশকিছু হকিস্টিক নিয়ে মিলনায়তনে প্রবেশ করছেন। ওদের জিজ্ঞেস করলাম, 'কী ব্যাপার, এগুলো কেন?' মেনন জবাব দিলেন, 'রেখে দিন, কাজে লাগতে পারে।' আমরা তিনজন অবাক বিস্ময়ে একে অপরকে নীরবে প্রশ্ন করছিলাম। যা হোক অনুষ্ঠান শুরু করার সময় এলে জগন্নাথ কলেজের ছাত্রনেতা বাবুল মঞ্চে এসে আমাকে বললেন, 'সরকারের এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।' নেহাতই বিস্ময়ে তাকে বললাম, 'নিয়ে এসো।' সুদর্শন এক ভদ্রলোক এলেন। উর্দুভাষী কিন্তু বাংলায় আমার সঙ্গে আলাপচারিতা শুরু করলেন। আমরা কী করছি-না করছি জেনে তিনি বললেন, 'দেরি করছেন কেন? অনুষ্ঠান শুরু করে দিন।' আমরাও প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলাম; কিন্তু ওই ভদ্রলোক আসায় খানিকটা দেরি হয়ে গেল। তবু বললাম, 'এই তো এখুনি শুরু হবে।'

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের প্রধান মিলনায়তনে উপচেপড়া লোক। এদিনের বিশেষ আকর্ষণ নৃত্যনাট্য 'চিত্রাঙ্গদা'। অবস্থাদৃষ্টে আমরা মঞ্চের সামনে গিয়ে বিপুল দর্শকের উপস্থিতিকে স্বাগত জানিয়ে বললাম, 'আপনাদের ঔৎসুক্য দেখে আমরা আজই চিত্রাঙ্গদার দ্বিতীয় প্রদর্শনীর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সুতরাং কষ্ট করে না দেখে পরে এলে আপনারা ভালোভাবে দেখতে পাবেন।' এর পর আমাদের চিত্রাঙ্গদার মঞ্চায়ন শুরু হবে, এমন সময় বাবুল এসে বললেন, 'লোহানী ভাই, মোনায়েম খাঁ আজকের এ অনুষ্ঠানটি ভাঙার জন্য মিরপুর ও মোহাম্মদপুর থেকে দুই ট্রাকভর্তি দাগি গুণ্ডা পাঠিয়েছে। তবে তারা হলভর্তি মানুষের উপস্থিতি দেখে রমনা পার্কের রেস্তোরাঁয় চলে গেছে এবং ওখানেই অপেক্ষা করছে দ্বিতীয় শোতে হামলা করবে বলে।' 

কথাটা শুনে আমার মধ্যেই রাখলাম। কাউকে জানতে দিলাম না। কারণ এতে ভীতির সঞ্চার হবে। যা হোক শো শুরু হলো। বিপুল করতালি ও প্রশংসার মধ্যে নৃত্যনাট্য শেষ হলো। এ সময়ে আমি বুলবুল একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ নুরুল হুদা, ছায়ানটের ওয়াহিদুল হক ও হাজেরা মাহমুদকে বিষয়টি জানালাম এবং দ্বিতীয় প্রদর্শনী না করার অনুরোধ জানালাম। সিদ্ধান্ত হলো, আমরা দ্বিতীয় শো করব না। তবে দর্শকদের পরবর্তীকালে কোনো এক সময়ে চিত্রাঙ্গদা মঞ্চায়নের সিদ্ধান্ত জানিয়ে আশ্বস্ত করলাম। এবার মোনায়েম খাঁর গুণ্ডাবাহিনীর হাত থেকে ছেলেমেয়েদের বাঁচাতে দ্বিতীয় শো বন্ধ করে দিলাম চিত্রাঙ্গদার নামভূমিকায় নৃত্যশিল্পী লায়লা হাসানের অসুস্থতার অজুহাতে।

ওয়াহিদুল হক, হাজেরা মাহমুদ ও আমি মঞ্চে তখনও দাঁড়িয়ে আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ও নৃত্যনাট্যের পোশাক-পরিচ্ছদ কী করব ভাবছিলাম। ইতিমধ্যে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা রেজা আলী ছুটতে ছুটতে মিলনায়তনে প্রবেশ করে আমাদের তখনি সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। রেজা আলি বললেন, 'আমার সঙ্গে গাড়ি আছে; আপনারা তাড়াতাড়ি চলুন। না হলে এখনি মোনায়েম খাঁর গুণ্ডাবাহিনী এসে পড়বে।' রেজা আলী মুসলিম লীগ নেতা মোয়াজ্জেম আলীর ছেলে। তবে ছাত্র ইউনিয়ন করায় বাবার রাজনীতির সঙ্গে তার মিল ছিল না। রেজা ধানমণ্ডিতে হাজেরা আপার বাসায় তাকে পৌঁছে দিয়ে প্রেস ক্লাবের দিকে রওনা হলেন ওয়াহিদ ভাইয়ের অনুরোধে। ওয়াহিদ ভাই প্রস্তাব করলেন, 'চলো না ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে গিয়ে দেখি কী অবস্থা হয়েছে।'

রমনা পার্কের রেস্তোরাঁয় বসে যে গুণ্ডাবাহিনী রবীন্দ্র অনুষ্ঠানের ওপর আক্রমণের অপেক্ষায় ভাঁড়ে ভাঁড়ে 'তাড়ি' খাচ্ছিল, তাদের হঠাৎ চৈতন্যোদয় ঘটায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে গিয়ে দেখল মিলনায়তন জনশূন্য; এমনকি অনুষ্ঠান সংগঠকদেরও কেউ নেই। শতাধিক গুণ্ডা কাউকে না পেয়ে তাদের হিংস্র অভিলাষ চরিতার্থ করল সঙ্গীতের যন্ত্রানুষঙ্গ ভেঙে টুকরো টুকরো করে এবং মিলনায়তনের সামনে সোফার আসনগুলো তছনছ করে দিয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁর সংস্কৃতিবিরোধী এই সন্ত্রাস খবরের কাগজে প্রচারিত হয়েছিল। সৃষ্টি হয়েছিল প্রতিক্রিয়া। পরম শ্রদ্ধার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চর্চা যেন অনেক গুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। 

আজ আমরা যারা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে 'বড়াই' করি, তাদের অতীতের এই সংগ্রামী ইতিহাসের কথা মনে রাখার অনুরোধ জানাই। কবিগুরু শত চক্রান্ত সত্ত্বেও ক্রমশ শিক্ষিত শ্রেণির কাছ থেকে স্বল্পশিক্ষিত মানুষের কাছে পর্যন্ত এসব অতীতের লড়াইয়ের মাধ্যমে পৌঁছে গিয়েছিল বলে আজও আমরা আমাদের অহঙ্কার ও পরম শ্রদ্ধাভাজন অভিভাবক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নির্বিঘ্নে চর্চা করে আসছি। পাকিস্তানি শাসকচক্রের নানা ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও কবিগুরুকে আমাদের শিল্প-সাহিত্য এমনকি সংস্কৃতি ও রাজনীতি থেকে সরিয়ে তো নিতেই পারেনি, বরং তিনি আরও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছেন। 

আমরা যারা সচেতন বলে দাবি করি, তারা লেজুড়বৃত্তি করেই ক্ষান্ত হচ্ছি না, এমন সব আগ্রাসী চক্রান্তের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত। কেমন যেন সংকোচ আমাদের 'বিহ্বল' করে ফেলেছে। এ অবস্থা থেকে আমাদের উঠে দাঁড়িয়ে বাংলার লড়াই-সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে অবলম্বন করে গোপন চক্রান্তের বিরুদ্ধে নতুন সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। না হলে রাজনৈতিক বন্ধ্যত্ব কিংবা স্বার্থান্ধ মানসিকতার অবসান ঘটবে না। তাই আবার রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করেই আমাদের আঘাত হানতে হবে। 

লেখক: সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

ব্রেকিংনিউজ/এমআর