রাজনীতি বনাম ধর্মীয় ঐক্য

মো. সাইফুল ইসলাম
১৭ জুন ২০১৯, সোমবার
প্রকাশিত: ০৭:০৪

রাজনীতি বনাম ধর্মীয় ঐক্য

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের মধ্যে বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণের কৌতূহল একটু বেশিই ছিল। বাংলাদেশের রাজনীতি বোদ্ধা জনগন ভাল করেই জানেন যে ভারতীয় প্রাচীন দল কংগ্রেসের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও আদর্শের সাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের লক্ষ্য উদ্দেশ্যে ও আদর্শের সাথে জমজ ভাইয়ের মত দারুণ মিল। অপর দিকে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি মূলত হিন্দুত্ববাদী উগ্র সাম্প্রদায়িক দল, যে দলের মূল টার্গেট হল ভারতকে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জন্য অসহিষ্ণু পরিবেশের মধ্য দিয়ে রামরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি বিজেপির আদর্শের বিপরীত মেরুতে অবস্থান করলেও ইসলামের প্রতি অতি সামান্য দুর্বলতার দরুণ মনে করা হয় যে বিজেপি-বিএনপি সম্পর্ক অতি মধুর। কারণ দুটি দলই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধর্মাশ্রয়ী। বাংলাদেশে আওয়ামীপন্থীগণ স্বাভাবিকভাবেই কংগ্রেসের প্রতি মৌন সমর্থন ব্যক্ত করে থাকেন বিপরীতে বিএনপি চায় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসুক। বহু বিতর্কিত বিগত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে কংগ্রেস সরকার নগ্নভাবে সমর্থন করার ফলে বিএনপি সমর্থকগণ রীতিমত নিজেদেরকে বিজেপি সমর্থক বানিয়ে ফেলেছিলেন। তারা ধারণা করেছিলেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপি ক্ষমতায় এলে গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসে সরকারের নীতি পরিবর্তন করে বিএনপিকে ক্ষমতায় আরোহণ করার রাস্তা সুগম করে দিবেন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিএনপির উপলব্ধি হল যে ভারতে সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশের উপর অযাচিত হস্তক্ষেপের নীতির কোনও পরিবর্তন হয় না।

ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক বাজার হল বাংলাদেশ। এই অবাধ বাজার ভারতীয় কোন সরকারই হাত ছাড়া করতে চায় না। ভারতের চতুর্থ রেমিট্যান্স আহরণের দেশ বাংলাদেশ। এটা বাংলাদেশিদের জন্য কত ভয়ংকর সংবাদ হতে পারে, যেখানে উন্নত বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহ বাদ দিয়ে ১৩০ কোটি নাগরিকের বিশাল আয়তনের দেশ ভারত মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের ১৬ কোটি নাগরিকের দেশ বাংলাদেশ হতে এত বিশাল অংকের রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে, যা পৃথিবীর অন্য কোন দেশ হতে অর্জন করতে পারছে না।

পাক-ভারত সীমানার চেয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমানা বেশি অরক্ষিত। বাংলাদেশি নাগরিকদের সীমান্ত এলাকায় পাখির মত হত্যা করলেও কোন প্রতিকার, প্রতিবাদ কোনটিই হয় না। বরং এদেশের দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। হালের একজন মন্ত্রী বলেছেন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মত। যদিও প্রশ্ন থেকে যায় কে স্বামী, কে বা স্ত্রী? বিশ্লেষকদের মতে- বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে সিকিমের ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছ। এই সব বিষয়ে ভারত সরকারকে নিঃশর্তে সহযোগিতা করার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে বিজেপি-কংগ্রেস সরকারের নীতির কোনও পরিবর্তন হয় না। যার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (বিএনপি-জামায়াত জোটের দাবি ২৯ ডিসেম্বর রাতের নির্বাচন) বিজেপি সরকারের নির্লজ্জ সমর্থন অব্যাহত থাকে। মূলত দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত কোনও দলের সাথেই ভারত সরকার উষ্ণ সম্পর্ক রাখে না।

যা হোক, বলছিলাম ভারতের ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ১৫তম জাতীয় লোকসভা নির্বাচন প্রসঙ্গে যে, নির্বাচনের ফলাফল ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। ফলাফলে দেখা যায় সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ব্যাপক ব্যবধানে বিজেপি এগিয়ে রয়েছে। স্বাধীন ভারতে সবচেয়ে বেশি সময় শাসন করা দল কংগ্রেসের ধারণাতীত পতন হয়েছে। এই নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার জনগণকে একটি হিডেন বার্তা পৌঁছে দেয়। তা হল- এই অঞ্চলে পরিবারতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অবসান হতে চলছে। সুদীর্ঘ কাল যাবত ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা পরিবার কেন্দ্রিক যে রাজনৈতিক ধারা গড়ে উঠেছে তার সুফলের তুলনায় কুফল অত্যাধিক বেশি হওয়ায় জনগণ ঘৃণা ভরে প্রত্যাখান করতে শুরু করেছে। পারিবারিক শাসনের দরুণ শাসকশ্রেণির মনে এই উপলব্ধির উদয় হয়েছে যে ক্ষমতার পালাবদল শুধুমাত্র দু-একজন ব্যক্তি বা পরিবারের মধ্যে আবর্তিত হবে যদিও তারা একই দলের নেতা নাও হন। পরিবারতন্ত্র পতনের প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে বেশ পূর্ব হতে, যার ডেলিভারি আরম্ভ হয়েছে পাকিস্তানের গত জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে শুধু মাত্র মুসলিম লীগে ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির মধ্যে। এই দুই দলের নেতাকর্মীদের ধারণা ছিল ক্ষমতায় আজ আমরা কাল ওরা, হয়ত আজ ওরা কাল আমরা। এই জন্য তাদের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা বৃদ্ধি পেয়েছিল পাহাড়সম। জনগণকে তাদের কেনা সস্তা গোলাম মনে করে তেমন মূল্যায়ণ করেনি। জনগণের নিকট জবাবদিহিতার প্রয়োজন মনে করেনি। 

পাকিস্তানের জনগণ যখন সুযোগ পেল তখনই কালবিলম্ব না করে দ্বি-দলীয় শাসন ব্যবস্থাকে উপরে ফেলে নবগঠিত ‘তেহরিক এ ইনসাফ পার্টি’কে ক্ষমতায় বসিয়ে জনগণের অংশগ্রহণমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশও এই ধারাবাহিকতায় খুব পিছিয়ে নেই। আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বী-দলীয় শাসনে অতিষ্ট আপামর জনসাধারণের আস্থা নেই বুঝতে পেরেই হয়ত বা ক্ষমতাসীন দলগুলো সব সময় পাতানো নির্বাচনের কলাকৌশল চর্চা করে। প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোন দলই জনগণের ভোটাধিকারের প্রতি তেমন বিশ্বাসী নয়। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল, যে দলটি জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করে বলে বুলি আওড়ায় সেই দলটিরই ১৫৪ সাংসদ নির্বাচিত হয় পাতানো নির্বাচনের বিনা ভোটে, যেখানে সরকার গঠন করতে লাগে ১৫১ সিট। এর ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে ঐ দলটির দৃষ্টিতে মহা সাফল্য অর্জন করে যদিও, ৫ জানুয়ারির চেয়েও এই নির্বাচন ছিল মহা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল বিনা ভোটের নির্বাচন আর ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল বিয়ের পূর্বে সন্তান জন্ম নেয়ার মত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার তারিখের পূর্বেই এত পরিমাণ ভোট কাস্ট করা হয় যা নির্বাচনে জেতার জন্য যথেষ্ট। এই আত্মস্বীকৃত বিজয়ের ধারা হয়ত বেশি দিন স্থায়ী হবে না।

সর্বশেষ অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ১০০ ভোটেরও কম। বলে রাখি, এই উপজেলা নির্বাচনে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করে। ফলে ভোট কারচুপির তেমন চিন্তা কর্তৃপক্ষের ছিল না। আমি এমন এক কেন্দ্রের তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম যে কেন্দ্রে ভোট পড়েছিল ১৫৮টি। অথচ ঐ কেন্দ্রটি ছিল আওয়ামি লীগ সমর্থিত কেন্দ্র। তা ছাড়া আমার জানা মতে প্রত্যেক ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের অসংখ্য নেতা-কর্মী রয়েছে, যারা প্রত্যেকে ভোট দিলেও প্রাপ্তভোটের পরিসংখ্যান এত দুর্বল হতো না। সুতরাং বুঝা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলেরও বিরাট একটা অংশ এই দলীয় শাসনের অবসান চায়।

যাই হোক, বর্তমান সময়ে সমাজের সিংহভাগ মানুষ রাজনীতি চর্চা করা থেকে বিমুখ, প্রচলিত রাজনৈতিক দল ও অযোগ্য নেতাদের দুর্বল নের্তৃত্বে প্রতি অনীহাই এর মূল কারণ। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে রাজনীতি করার সুযোগ খুব সীমিত। এই ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপি একে অপরের পরিপূরক। ভারতের লোকসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ফলাফল আরও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করে, তা হল ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান। প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের ৩৭.৪ শতাংশ ভোটারের অভিমত হল, নরেন্দ্র মোদিকে ভোট দেয়া তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব, রাষ্ট্রের উন্নয়ন মুখ্য নয়। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের ইশতেহারে বিজেপি রাষ্ট্রের উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্ব দিলেও ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ধর্মীয় প্রণোদনা সৃষ্টি করে ধারণাতীত সফলতা অর্জন করেছে। ধর্মহীন রাজনীতির প্রতি ভারতবাসীর অনীহা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। এই রাজনীতি মেরুকরণের ঢেউ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্রেই আঘাত হানতে শুরু করেছে। গত বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন তেহরিক এ ইনসাফ পার্টি ক্ষমতায় এসেছে মূলত ধর্মীয় ভাবাবেগ তৈরি করার মাধ্যমে। ইমরান খান তার দায়িত্বের সকল দিক ও বিষয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন ধর্মীয় ক্যারিশমেটিক গুণাবলীর দ্বারা অথবা ধর্মীয় প্রণোদনামূলক বক্তব্য দ্বারা জনগণকে তাঁর দিকে আকৃষ্ট করা। এতে তিনি অতি স্বল্প সময়ে যে সফলতা দেখিয়েছেন তা ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন আদর্শ চর্চার দ্বারা সম্ভব নয়।

এবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ধর্মীয় আবেগ তুলনামূলক ভাবে একটু বেশি। ব্যক্তি জীবনে ধর্ম চর্চা না করলেও ধর্মীয় কোন বিষয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য কখনোই বরদাশত করেনি এ দেশের জনগণ। তাইতো নির্বাচনের পূর্বে সকল দলকে এমন কি বাম ঘরানার দলগুলোকে (যে দল গুলো ধর্মকে আফিমের সাথে তুলনা করে) রীতিমতো ধর্ম চর্চা করতে দেখা যায়। এদেশের প্রচলিত বৃহৎ দলগুলো রাজনীতিতে পবিত্র ধর্মের অপব্যবহার করে শুধুমাত্র জনসমর্থন আদায় করার জন্য যদিও দলগুলো ধর্মীয় আদর্শের বিপরীত আদর্শ লালন করে। এখানে যদি কাল টাকা ও পেশিশক্তি মুক্ত নির্বাচন, অবাধ গণতান্ত্রিক ধারা ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় থাকে তবে অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই ধর্মীয় দলগুলো মূল দৃশ্যপটে চলে আসবে। এই বিষয়ে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের চেয়ে প্রচলিত নেতৃবৃন্দ অনেক বেশি দূরদৃষ্টি সম্পূর্ণ। তাই তো তারা অতি সূক্ষ্ম কৌশলে এদেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ভাঙ্গন, অনৈক্য, অনাস্থা ও একে অপরকে দোষারোপের বীজ বপন করে রেখেছে। তবে গভীর ভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ইসলামি দলগুলো তাদের মধ্যকার ভুলগুলো শুধরে নিতে শুরু করেছে। প্রত্যেক দলই এখন ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা গভীর ভাবে অনুভব করছে যা তাদের বক্তব্য, লেখনী ও উদার মনোভাবের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক আদর্শের উপর জরিপ পরিচালনাকারী মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিজলব’ এর ২০১৭ সালের রিপোর্ট এ দেশের রাজনীতিকদের ব্যাপকভাবে আন্দোলিত করেছে। রিপোর্টে প্রকাশ বাংলাদেশের প্রায় ৮০% জনগণ ইসলামী শরিয়া আইন চায়। এই রিপোর্ট এদেশের জনগণের ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাঙ্খার পূর্ণ প্রতিফলন। যদি ইসলামী নেতৃবৃন্দ ও তাদের সমর্থকগণ এক প্লাটফর্মে আসার সুযোগ পায় তাহলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের চির বৈরিতা পরিহার করে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য হয়ত বৃথা প্রচেষ্টা চালাবেন।

প্রভাষক, এনায়েতপুর ফাযিল মাদরাসা, ফুলবাড়িয়া, ময়মনসিংহ।

ব্রেকিংনিউজ/ এসএ