সেলফি ম্যানিয়া

আশিক মুক্তাদির
১৭ জুন ২০১৯, সোমবার
প্রকাশিত: ০৮:৩৭

সেলফি ম্যানিয়া

সময়ের সাথে সাথে আধুনিক হচ্ছে বিশ্ব। যা কিছু লোভনীয়, সুন্দর বা সহজলভ্য তা পৃথিবী জুড়ে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। আর স্যাটেলাইট সংস্কৃতির অজানা প্রভাবে মানুষের মধ্যে একাকিত্ব বাড়ছে। আর একাকিত্ব কাটানোর প্রধান ও প্রয়োজনীয় মাধ্যম হয়ে উঠছে সেলফি।

সেল্ফি শব্দটা এসেছে ইংরেজি self থেকে যার অর্থ নিজ বা আত্মা। সেখান থেকেই নিজেকে ধারণ করে নেয়ার সহজ মাধ্যম হিসেবে জন্ম হয় সেলফির। বর্তমানে স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে সেলফি আশক্তি। সেলফি তোলার অভ্যাস আট থেকে ৮০ বছর বয়সী সবার মধ্যেই কমবেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে তরুণরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে।

স্যামসাংয়ের একটি জরিপে পাওয়া গেছে, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী মানুষের তোলা ছবির ৩০ শতাংশই সেলফি। সেলফি তোলা এবং তা জনসম্মুখে প্রকাশের এ প্রবণতা কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে ফিল্মস্টার, এমনকি ধর্মীয় গুরু বা নেতার ভেতরেও এ প্রবণতা রয়েছে। উল্ল্যেখ্য যে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বৃদ্ধির সাথে সাথে সেলফি আসক্তি বাড়তে থাকে তবে ফেসবুকের আগে ‘মাইস্পেস’ বেশ জনপ্রিয় ছিল এবং সেলফি প্রথম জনপ্রিয়তা পায় সেখানেই। বিশেষ করে ফেসবুকে সেলফি শব্দটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, ২০১৩ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির অনলাইন ভার্সনে শব্দটি সংযোজিত হয়। আর ২০১২ সালের শেষ দিকে টাইম ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে শব্দটি বছরের আলোচিত সেরা ১০ শব্দের অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইতিহাসের প্রথম সেলফিটি নেন মার্কিন আলোকচিত্রকার রবার্ট কর্ণিলিয়াস যিনি ১৮৩৯ সালে নিজের একটি আত্ম-প্রতিকৃতি ক্যামেরায় ধারণ করেন। এবং ১৯০০ সালের দিকে পোর্টেবল কোডাক ব্রাউনি বক্স ক্যামেরা বাজারে আসার পর ফোটোগ্রাফিক আত্ম-প্রতিকৃতি তোলা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ২০১৪ সালের দিকে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট সেন্টার এ সেলফির ভয়াবহতা দেখে সেলফি তোলার আসক্তি মানসিক রোগ ‘সেলফিটিস’ বলে ঘোষণা দেয়। তারা জানায়, সেলফিটিস ব্যাধির তিনটি স্তর হতে পারে। বর্ডার লাইন সেলফিটিস হচ্ছে প্রথম ধাপ। এতে যারা আসক্ত তারা দিনে তিনবার নিজের ছবি তোলে, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা পোস্ট করে না। অ্যাকিউট সেলফিটিস দ্বিতীয় ধাপ। এটা তুলনামূলক ভয়াবহ। এতে যারা আসক্ত তারা দিনে কমপক্ষে তিনটি নিজের সেলফি তোলে। এবং তিনটি ছবিই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে। এরপর আসে ক্রনিক সেলফিটিস হচ্ছে চূড়ান্ত বা ভয়াবহ ধাপ।

এরা দিনে সর্বনিম্ন এরা ছয়বার সেলফি তুলে এবং সব ছবিই তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে। এই রোগের কারণ হিসাবে তারা জানায়, একাকিত্ব দূর করতে আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। সামাজিকভাবে নিজেকে সংযুক্ত রাখা বা নিজের পরিপার্শ্বের রেকর্ড রাখার তাগিদেই সেলফিটিস রোগীরা এ কাজটি করে। অনেকে আবার মুড ভালো রাখার উপায় হিসেবে এটিকেও দেখে। বহু মানুষের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে গবেষকরা এর প্রধান কারণ হিসাবে দেখেন ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’। 

আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট সেন্টার আরও জানায়, সেলফিটিস রোগীদের মধ্যে ৫৭.৫০% হচ্ছেন পুরুষ এবং ৪২.৫০% হচ্ছেন মহিলা। তবে কেউ কেউ এই সেলফির মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ব্যবসা সফল হয়েছেন। তাদের মধ্যে ‘সেলফি কিং’ নামে খ্যাত বেনি উইনফিল্ড এর নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে প্রতিদিনই তিনি হাসিমুখ নিয়ে একই রকম সেলফি আপলোড করে আসছেন। নিজেকে আধুনিক যুগের মোনালিসা মনে করেন ৩৮ বছর বয়সী বেনি। সেলফির মাধ্যমে প্রাপ্ত জনপ্রিয়তাকে ব্যবসায়িক কাজে লাগিয়েছেন তিনি। নিজের মুখের ছবির লোগো সম্বলিত ৩ হাজার টি-শার্ট তৈরি করে বিক্রি করেছেন এই পর্যন্ত। তিনি বলেন, নিজের অবয়ব বিক্রি করে আমি ব্যবসা করতে চাই। আর তাই নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি ছেড়ে দিয়ে এখন ব্যবসা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছেন তিনি।

অন্যান্য দেশের মতো সেলফিতে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশিরাও। টাইম ম্যাগাজিনের একটি পরিসংখ্যান মতে, সেলফি তোলায় ঢাকা বিশ্বের ৪৫৯টি শহরের মধ্যে ৪৩৪তম স্থান দখল করেছে। সবকিছুর মত সেলফির ও রয়েছে বেশ কিছু খারাপ এবং ভালো দিক। আমাদের দরকার অনেক বেশী জন সচেতনতা আর নৈতিক জ্ঞান বাড়ানো যাতে করে আমাদের মধ্যে সেলফির ঋণাত্মক কোন প্রভাব না পড়ে। কিন্তু তারপরও স্যাটেলাইট মিডিয়ার প্রভাবে আমরা সেলফিটিস নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।

লেখক: শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ব্রেকিংনিউজ/ এসএ