বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট

জাফরুল্লাহ চৌধুরী
২৫ জুন ২০১৯, মঙ্গলবার
প্রকাশিত: ০৫:৫০

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারকে মনস্থির করতে হবে বঙ্গবন্ধু কি আওয়ামী লীগ চত্বরে বন্দি হয়ে থাকবেন, নাকি ১৭ কোটি বাংলাদেশির হৃদয়ে তাঁর প্রাপ্য আসনে আসীন হবেন। ‘সবার হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু’ যদি লক্ষ্য হয়, তবে স্মরণ করতে হবে তাঁর মহানুভবতা, জীবন দর্শন ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তা কার্যকর করতে হবে ২০১৯-২০ জাতীয় বাজেট বরাদ্দে ও সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে। তাঁর জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটিতে আওয়ামী লীগের সদস্যসংখ্যা ১/৩-এর বেশি হবে না। সব রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবীকে অন্তর্ভুক্ত করে মুজিব ভাইয়ের মৃত্যুর আগের শেষ ঘোষণা কার্যকর করলে তাঁকে যথাযথ সম্মান জানানো হবে।

জনগণের কাছে প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতা প্রত্যর্পণের নিমিত্তে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়েছিলেন মৃত্যুর আগের দিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ৬৫ জন বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণির ব্যক্তিকে গভর্নর নিয়োগের মাধ্যমে। তিনি ‘ফ্লাউড কমিশনের’ প্রতিবেদনকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। ‘সমৃদ্ধ আগামীর পদযাত্রায় বাংলাদেশকে’ এগিয়ে নিতে হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে স্থানীয় শাসনের পূর্ণ অধিকার (সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ ধারা) প্রতিষ্ঠার জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন প্রয়োজন হবে। বাজেট সেশনে এ সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন করতে হবে। সার্বিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে বাংলাদেশকে পূর্বতন ১৭ জেলায় বিভক্ত করে স্টেট (ঝঃধঃব) বা প্রদেশ সৃষ্টি করলে বঙ্গবন্ধুর দর্শন ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঠিক বাস্তবায়ন হবে। তাঁর স্বপ্নানুযায়ী ১৭ জন গভর্নর নিয়োগই হবে যুক্তিসংগত ব্যবস্থাপনা এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে যথাযথ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। লোকসংখ্যার অনুপাতে প্রতিটি প্রদেশ/জেলা/স্টেটকে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে, যা দিয়ে নির্বাচিত প্রদেশ/জেলা/স্টেট/প্রতিনিধিরা স্বশাসিত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণ এবং যৌন নিপীড়ন নিবারণ ও তদারকির লক্ষ্যে উল্লিখিত বিষয়ে প্রদেশ/স্টেট/জেলা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (Authority) প্রতিষ্ঠা করবেন। বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সব নিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করবে। স্টেটের অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ করবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও স্থানীয় বাজারের রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন করবে। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সরাসরি তদারকির মাধ্যমে সব শিক্ষক, চিকিৎসক ও সেবাকর্মীদের নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিতি ও সেবা নিশ্চিত করবে। কর্মচারী-কর্মকর্তাদের প্রদেশ/স্টেটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের অন্যতম শর্ত হবে সব কর্মকর্তা সপরিবারে সংশ্লিষ্ট প্রদেশ/স্টেটে অবস্থান করবেন এবং সন্তানদের স্থানীয় স্কুলে অধ্যয়ন করাবেন এবং তাঁরা স্টেট/জেলার হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেবেন।

২০১৯-২০ অর্থবছরের সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ ৭৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা জনসংখ্যার অনুপাতে ১৭ প্রদেশ/স্টেট/জেলায় ভাগ করে দিন, যাতে তারা সরাসরি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারে। কেন্দ্রের নাক গলানোর কোনো প্রয়োজন নেই। সব প্রদেশ/জেলা/স্টেটে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সমভাবে উন্নত না হওয়া পর্যন্ত ঢাকায় এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট সুপার স্পেশালাইজড ওয়ার্ড/হাসপাতাল নির্মাণ হবে বঙ্গবন্ু্লর রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অবজ্ঞা।

কেন্দ্রীয় সরকার পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, বিমান ও নৌবন্দরসহ সব আন্ত স্টেট (জেলা) যোগাযোগ ব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, তেল, গ্যাস ও  প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান, আন্ত সীমান্ত নদ-নদীর ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কর ব্যবস্থাপনা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করবে। প্রতিটি প্রদেশ/স্টেটে হাইকোর্টের শাখা থাকবে, যা ঢাকাস্থ আপিল কোর্ট কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হবে।

বিকেন্দ্রীকৃত নির্বাচিত স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আইন প্রণয়ন এবং মোট বাজেটের ন্যূনতম ১/৫ অংশ (১০০ হাজার কোটি টাকা) ১৭ স্টেট/প্রদেশ/জেলার উন্নয়ন ও স্বশাসনের জন্য বরাদ্দ হবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকীতে সত্যিকার শ্রদ্ধা নিবেদন।

বিচক্ষণতার জন্য অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এফসিএ এমপি বাজেট বক্তৃতায় কয়েকটি বরাদ্দের বিষয়ে বিচক্ষণতা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন।

ক. সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ক্রমেই গৌণ হয়ে যাচ্ছে। তাই অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০১৯-২০ সালের বাজেটে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের বরাদ্দ কমিয়ে এক হাজার ৯২১ কোটি টাকা স্থির করেছেন। গত বছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল চার হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। নির্বাচন কমিশনের বাজেট বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে দুই হাজার ৪২০ কোটি টাকা অর্থাৎ ৪৪.২৫ শতাংশ কম বরাদ্দ হয়েছে।

খ. দ্বিতীয় উত্তম প্রস্তাব হচ্ছে রিফাইন্ড সুগারের স্পেসিফিক ডিউটি ছয় হাজার টাকা এবং রেগুলেটরি ডিউটি ৩০ শতাংশ নির্ধারণ। মিনারেল পানীয় ও বিয়ারের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। চিনি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিধায় সব প্রকার এনার্জি ড্রিংকসের আমদানি শুল্ক ন্যূনতম ৫০ শতাংশ ধার্য করা উচিত হবে। বিয়ার, ভারমুথ, জিন, হুইস্কি, রামজাতীয় মদ এবং মিনারেল ওয়াটারের একই শুল্কহার দুঃখজনক।

লবণও শরীরের জন্য ক্ষতিকর বিধায় সাধারণ লবণের ওপর ন্যূনতম ৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য যুক্তিসংগত হবে। টেবিল লবণ, রক সল্ট ও বিট লবণের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য সঠিক সিদ্ধান্ত। একই কারণে ডিন্যাচারড রঙিন লবণের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ না করে একই দরে অর্থাৎ ২৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য হলে দুর্নীতি হবে না। ভিটামিন, প্রোভিটামিন এবং বিভিন্ন সাপ্লিমেন্টারি খাদ্যের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ হলে কুকুর, বিড়ালের জন্য আমদানি করা খাদ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক অযৌক্তিক।

গ. বৈধপথে দেশে প্রবাস আয় প্রেরণ উৎসাহিত করার জন্য ২ শতাংশ প্রণোদনা উত্তম প্রস্তাব। একইভাবে যারা বাংলাদেশে পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করে বৈধপথে বিদেশে টাকা নিয়ে যেতে চায়, তাদের ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কর ধার্য করে দিলে দেশ লাভবান হবে, হুন্ডি কমবে।

ঘ. উচ্চবিত্তের বাহন চার্টার্ড বিমান ও হেলিকপ্টারের বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ নয়, ৫০ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়; সঙ্গে ১৫ শতাংশ মূসক। ফ্লুরিন, ক্লোরিন, আয়োডিন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন গ্যাসের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ; অথচ বোরন  (Boron), সিলিকন, ফসফরাস, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড, পারদ, নাইট্রিক এসিডের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ। এতে দুর্নীতির অবকাশ থাকে। ২৮.০১ থেকে ২৮.৩৭ অন্তর্ভুক্ত  HS Codes সব কেমিক্যাল এলিমেন্টস, ইনঅর্গানিক এসিডের একই আমদানি শুল্ক হওয়া উচিত। সব ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ হতে পারে। এতে হয়রানি ও দুর্নীতির ছিদ্রপথ বন্ধ হবে।

ফিনাইলের (হাইড্রোক্সিবেনজিন-২৯.০৭) আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ, মিথানল বেনজিন অ্যালকোহলের শুল্ক ১০ শতাংশ ইকোনমিক জোনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের  PVC/PET রেসিনের (২৯০৫.৩১.২০) শূন্য শতাংশ শুল্ক। পেনিসিলিন, ক্লোরামফেনিকল, টেট্রাসাইক্লিন, প্রোভিটামিন ও ভিটামিনের (২৯.৩৬) আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ; অথচ অপর অ্যান্টিবায়োটিক এরিথ্রোমাইসিন ও এজিথ্রোমাইসিনের শুল্ক ১৫ শতাংশ, ক্যাফেইন, ইফিড্রিন, সিডো ইফিড্রিন, আরগোমেট্রিন, কোকেইন, মিথাইল এম্ফিটামিনের শুল্ক ১০ শতাংশ। ওষুধের কাঁচামালের ওপর ৫ থেকে ১৫ শতাংশ শুল্কের কারণে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি হয় না। বাজারে ওষুধের অহেতুক মূল্যবৃদ্ধি হয় সরকারি নীতিমালা এবং ব্যবসায়ীদের দ্রুত অতিরিক্ত লাভের লালসা থেকে।

২০১৯-২০ সালের বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফে উল্লিখিত সব শুল্ক শূন্য শতাংশ, ১০ শতাংশ ও ২৫ শতাংশ সীমিত হলে দুর্নীতি কমবে এবং আমলাতান্ত্রিক হয়রানি বিলুপ্ত হবে। ওষুধের কাঁচামাল  Active Pharmaceuticals Ingredients (API) তৈরিতে ব্যবহৃত সব ধরনের কাঁচামাল, কেমিক্যালস, এসিডের আমদানি শুল্ক আগামী ১০ বছরের জন্য শূন্য শতাংশ হারে ধার্য হলে দেশে প্রতিযোগিতামূলক  API শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এনার্জি ড্রিংকস ও বিয়ারে ব্যবহৃত  চিনি, কেফিন, লবণের আমদানি শুল্ক ন্যূনতম ৫০ শতাংশ এবং সব ধরনের মদের আমদানি শুল্ক ১০০ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয় জনগণের স্বার্থরক্ষার নিমিত্তে।

কনফেকশনারির জন্য আমদানি করা ফ্রুক্টোজ, ল্যাকটোজ, ম্যাপেল সিরাপ, লিকুইড গ্লুকোজের (১৭.০২ থেকে ১৭.০৪) ওপর ধার্যকৃত ২৫ শতাংশ শুল্ক যুক্তিসংগত পদক্ষেপ। ৯০.১৮ থেকে ৯০.২৬ হেডিং অন্তর্ভুক্ত এইচএস কোড ৯০.১৮.১১ থেকে ৯০২৬.১০.০০ নির্দিষ্ট অন্তর্ভুক্ত সব মেডিক্যাল, ডেন্টাল, অর্থোপেডিক ও ফিজিওথেরাপিতে ব্যবহৃত সব যন্ত্রপাতি, ক্যানুলা, রক্ত পরিসঞ্চালন সেট, ফিডিং টিউব, ফিস্টুলা  সুই, প্লাগ ও সুঁইসমেত প্রিফিল্ড প্লাস্টিক সিরিঞ্জ প্রভৃতির আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়।

ঙ. অর্থমন্ত্রীর অভিনন্দনযোগ্য অপর ভালো প্রস্তাব হচ্ছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তামাকজাত পণ্য বিড়ি, সিগারেট, জর্দা ও গুলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অধিকতর সম্পূরক শুল্ক ধার্যের প্রস্তাব।

এ বছর পাট মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অর্ধেক কমানো হয়েছে। আপনার পাটের প্রতি বিরাগের হেতু কী?

যৌন নিপীড়ন নিবারণ ও নারীদের আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ নিমিত্তে এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নারী খেলোয়াড়দের জন্য আলাদা বরাদ্দ উল্লেখ যুক্তিসংগত হবে। জঙ্গিবাদ প্রতিহতকরণ ও যৌন নিপীড়নবিরোধী মনমানসিকতা গড়ে তুলতে সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

তৈরি পোশাক খাতকে প্রদত্ত দুই হাজার ৮২৫ কোটি টাকা প্রণোদনার পুরোটা মালিকের পকেটস্থ করা হবে দুঃখজনক ঘটনা। শ্রমিকদের রেশন ও স্বাস্থ্য সুবিধায় ন্যূনতম ৫০ শতাংশ (১৪১২ কোটি টাকা) ব্যয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কৃষি ও কর্মসংস্থান
কৃষিতে বিনিয়োগ ও প্রণোদনা ব্যাপকসংখ্যক স্বল্প শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। উৎপাদক সমবায় কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে। এ ক্ষেত্রে অন্যূন ৫০ হাজার শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।

সারা পৃথিবীতে বয়োবৃদ্ধের সংখ্যা বাড়ছে, সঙ্গে একাকিত্বের সমস্যাও বাড়ছে। বাংলাদেশ ৩৫ অনূর্ধ্ব বয়সী তরুণদের ভালো প্রশিক্ষণ এবং কয়েকটি এশিয়ান ও ইউরোপিয়ান ভাষায় কথোপকথন শেখালে ওই সব দেশের বয়োবৃদ্ধদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে বাংলাদেশের ৩০ বিলিয়ন ডলার উপার্জন সম্ভব হবে।

বিদেশে কর্মরত সব শ্রমজীবীর জন্য ন্যূনতম ৫০ লাখ টাকার দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ ও জীবন বীমা সুবিধা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। প্রবাসে মৃত্যু হলে সরকারের খরচে শবদেহ দেশে এনে সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা এবং বিদেশে গমন ইচ্ছুক শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণের নিমিত্তে ৫৯১ কোটির পরিবর্তে ন্যূনতম এক হাজার কোটি টাকা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ দিলে দেশে সুফল আসবে। বর্তমানে প্রবাস থেকে আয় ১৫ বিলিয়ন ডলার।

নিরাপদ সড়ক সৃষ্টির কোনো প্রস্তাব নেই
বাংলাদেশে সড়কে দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ১০ জনের অধিক পথচারীর মৃত্যু ঘটে, কয়েক গুণ বেশি আহত হয়। বেশির ভাগের (৬০ শতাংশ) চালকের সঠিক লাইসেন্স নেই, অনেক গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেটও নেই। ট্রাক, বাস ও আর্টিকুলেটেড যানবাহন চালনা শেখানোর উপযুক্ত কোনো ড্রাইভিং স্কুল বাংলাদেশে নেই। এজাতীয় বড় যানবাহন চালনা শেখানোর জন্য ন্যূনতম ২০ একর জমির ওপর বিস্তৃত প্রশিক্ষণকেন্দ্র আবশ্যক। ক্যান্টনমেন্টে এরূপ প্রশিক্ষণকেন্দ্র না থাকলে সহজে স্থাপন সম্ভব। প্রতিটি জেলায় ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ও গাড়ি নিবন্ধন অফিস স্থাপিত হলে ইচ্ছুক ড্রাইভাররা নিয়মিত দৃষ্টিশক্তির  (Eye sight) পরীক্ষা করিয়ে নিয়মিত ড্রাইভিং পরীক্ষা দিয়ে সঠিক ড্রাইভিং লাইসেন্স অর্জন করতে পারবে।

সব বড় শহরে বাস ও অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য নির্ধারিত লেন থাকবে। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, রাস্তা পারাপারের নিয়মাবলি শেখানোর জন্য বাজেটে অন্যূন ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। ট্রাফিক পুলিশদের অবশ্যই ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে। বাস, ট্রাক, টেম্পোর হেলপারদের রাস্তায় চলাচলের নিয়ম-কানুন শেখানো এবং যাত্রীদের বিশেষত, নারী যাত্রীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ এবং দুর্ঘটনাজনিত আইন সম্পর্কে দুই সপ্তাহ ট্রেনিং দিয়ে ওয়াকিফহাল করাতে হবে।

শূন্য শতাংশ শুল্ক হলেও ওষুধের মূল্য কমবে না
ওষুধের মূল্য কমানোর প্রত্যাশায় ৩৮টি ক্যান্সার ওষুধের আমদানি শুল্ক পুরোপুরি রহিত শূন্য শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ভ্যাকসিন, বহুমূত্রের ওষুধ ইনসুলিনসহ ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, হৃদেরাগ, থ্যালাসেমিয়া প্রভৃতি রোগের ওষুধের কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশ করা আছে। বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিক এবং অন্যান্য ওষুধের কাঁচামালের শুল্ক শূন্য শতাংশ কিংবা ৫ শতাংশ ধরা হয়। (বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফ, ২০১৯-২০, পৃ. ১০৮-১০৯)

শুধু ১১৭টি স্বল্প ব্যবহৃত ওষুধ ছাড়া অন্য সব ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য  (MRP) স্থির করেন উৎপাদক ওষুধ কম্পানিগুলো নিজেদের মর্জি মোতাবেক। এ ব্যাপারে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কিছু করণীয় নেই। ঔষধ প্রশাসন শুধু ১৫ শতাংশ ‘মূসক’ যোগ করে সার্টিফিকেট দেয়।

ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য
(MRP) কমাতে হলে ১৯৮২ সালের ওষুধ অধ্যাদেশের নিয়মমাফিক ওষুধ কম্পানির পর্যাপ্ত লাভ নিশ্চিত করে সরকারকে ওষুধের মূল্য স্থির করে দিতে হবে। এ নিয়ম অনুসরণ করলে ওষুধের  MRP অর্ধেকে নেমে আসবে, সরকারকে মনস্থির করতে হবে তারা কার পক্ষে আছে—জনসাধারণের পক্ষে, না ওষুধ কম্পানির মালিকদের পক্ষে।

মুখে সেব্য সব ওষুধে ব্যবহৃত ল্যাকটোজ এনহাইড্রাস/মনোহাইড্রেট  BP/USP এবং ইঞ্জেকশনে ব্যবহৃত গ্লাস ভায়াল (৭০১০.৯০,০০) প্রভৃতির ওপর আগে ধার্যকৃত শূন্য শতাংশ শুল্কের পরিবর্তে বর্তমান বাজেটে ২০ শতাংশ (১৭০২.৩০.১০) আমদানি শুল্ক ধার্য করা ভুল সিদ্ধান্ত হবে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বাস্তবায়নের জন্য
বাংলাদেশে দরিদ্রতা নিরসনের অন্যতম অন্তরায় দেশের সর্বত্র সুষ্ঠু স্বাস্থ্যব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং স্বাস্থ্য সুবিধা প্রাপ্তির জন্য অত্যধিক পারিবারিক ব্যয় ও কেন্দ্রিকতা। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ও তরুণ চিকিৎকদের অনুপস্থিতির পাশাপাশি বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে পরিবারের ব্যয় (Out of Pocket Expense) পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশের অধিক। 

বাংলাদেশের মূল স্বাস্থ্য সমস্যা হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র, বিকল কিডনি, হৃদেরাগ, মানসিক রোগ, চোখের ছানি রোগ প্রভৃতি অসংক্রামক  (Non-Communicable) রোগের ব্যাপ্তি। অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য বীমা পদ্ধতি প্রচলন করতে চান; জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রকে সচল রাখতে চান। সৎ উদ্দেশ্য। দেশবাসীকে স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করার জন্য ইন্টার্নশিপকে এক বছরের পরিবর্তে দুই বছর করার নির্দেশ দিয়েছেন চার বছর আগে। এই দুই বছরের এক বছর নবীন চিকিৎসকরা প্রশিক্ষণ নেবেন এবং সেবা দেবেন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে  (UHFWC) সার্বক্ষণিকভাবে অবস্থান করে। রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পর সব চিকিৎসক ন্যূনতম দুই বছর ইউনিয়ন পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পর উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন। কারো ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যতিক্রম হবে না।

চিকিৎসাসেবাকে জনগণের সামর্থ্যের মধ্যে আনতে হলে ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ অধ্যাদেশ অনুযায়ী সব প্রয়োজনীয় ওষুধের মূল্য সরকারকে নির্ধারণ করে দিতে হবে। একইভাবে রোগ নির্ণয় পরীক্ষাগুলোর  (Diagnostic Tests) দরও সরকারকে নির্ধারণ করে দিতে হবে। সব প্রাইভেট হাসপাতালের ন্যূনতম যন্ত্রপাতি স্থির করবে সরকার। প্রাইভেট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজে হাসপাতালের জনবল স্থির করবে প্রয়োজনমাফিক। সরকার প্রেসক্রিপশন ও হাসপাতালে মৃত্যুর  (Death Audit) অডিট প্রথা চালু করলে জনগণের স্বার্থরক্ষা পাবে। চিকিৎসকরাও চিকিৎসাসেবায় অধিকতর সচেতন হবেন।

স্থানীয় পর্যায়ে সার্বক্ষণিকভাবে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি ও অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে, প্রদেশ/স্টেট/জেলা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ

(Authority)  স্থাপন করে। সরাসরি নিয়োগ ও তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে জেনারেল প্র্যাকটিশনার (General Practitioner) প্রথার প্রচলন বাঞ্ছনীয়। সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা (Universal Health Insurance) চালুর আগে ইউনিয়ন ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলো চালু করতে হবে। ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের প্রণোদনা ভাতাও বিনা ভাড়ায় বাসস্থান দিলে নবীন চিকিৎসকরা অনুপ্রাণিত হবেন।

প্রতিবছর এক হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে বাসস্থান ও ফ্যাসিলিটিজের নিমিত্তে ১০ হাজার বর্গফুটের ভবন নির্মাণের প্রয়োজন হবে। এতে প্রতিটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ব্যয় হবে আড়াই কোটি টাকা, যন্ত্রপাতির জন্য প্রয়োজন হবে অপর এক কোটি টাকা। এবারের বাজেটে এক হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র সম্প্রসারণের জন্য তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিন, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা এবং মেডিক্যাল ছাত্র-ছাত্রী, প্রশিক্ষণার্থী নার্স ও টেকনিশিয়ানদের উন্নত মানের প্রশিক্ষণ গড়ে ওঠে।

সুষ্ঠু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যৌন নিপীড়নবিহীন নিরাপদ ও সুন্দর সাংস্কৃতিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত হলে গ্রাম হবে শহর।

এটিই হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর যথাযথ উদ্যাপন ও তাঁর প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা নিবেদন। (সংগৃহিত)

লেখক : ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র

ব্রেকিংনিউজ/এমআর