তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এবং একজন মমতা

সুরঞ্জন ঘোষ
১৫ জুলাই ২০১৯, সোমবার
প্রকাশিত: ০২:১৭ আপডেট: ০২:২০

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এবং একজন মমতা

সোভিয়েত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বামদের গায়ে এর আঁচড় লাগল না। তখন মনে হচ্ছিল লাল ঝাণ্ডা পুরো দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেও পশ্চিম বাংলায় বহাল তবিয়তে থাকবে। খুব সম্ভব মমতার তখনকার দল ভারতের কংগ্রেস পার্টিও তাই ধরে নিয়েছিল। তাই বাম বিরোধিতার সুর একটু নরম ছিল। পাল্টা সুবিধা হিসেবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বামদের সাথে পাওয়া যাবে। এ ছিল অঙ্ক। মমতা এমন অঙ্ক মানতে রাজি ছিলেন না। 

এই জেদই তৈরি করে দেয় তার পথ। কংগ্রেস ভেঙে হলো তৃণমূল কংগ্রেস। তার জোয়ারে বাম দুর্গ ভেঙে খান খান হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে মনে হয় পশ্চিম বাংলার বাম শাসন যেন অন্য যুগের ঘটনা। বামদের হয়তো পশ্চিমবাংলায় টিকে থাকাই দায় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে যেমন রাজনীতিতে স্বকীয়তা বজায়ে রাখতে না পেরে বামরা কুপিবাতির মতো নিভু নিভু করে জ্বলছে।

মমতা ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা একরোখা। একরোখা বলেই না ঝুঁকি নিতে পারেন। তিস্তার পানি প্রশ্নে অবস্থান আমাদের বিপক্ষে যাওয়ায় বাংলাদেশে ইদানীং তার ভাবমর্যাদা নেতিবাচক। পশ্চিম বাংলার প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। পশ্চিম বাংলায় এখন রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়ার হিড়িক পড়েছে। প্রতিদিন বিধায়ক কাউন্সিলর ও মাঠপর্যায়ের নেতারা যোগ দিচ্ছেন বিজেপিতে। 

তৃণমূলের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক ভিত্তি সর্ব ভারতব্যাপী নয়। দিল্লির মসনদে যাওয়ার মতো সংগঠন নয়। রাজ্যের আগামী নির্বাচনে মমতার ক্ষমতা যাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বামদের জন্য তার পেছনে যে শক্তি ছিল তা ভবিষ্যতে না-ও থাকতে পারে।
 
পশ্চিম বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরার কারণ হলো- বাংলাদেশের সময়ের চাহিদা তিস্তা চুক্তি বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করা। এর আগে আমরা দৃশ্যত দেখেছি, মমতার বিরোধিতার কারণে তিস্তা চুক্তি হয়নি। গণমাধ্যমে এমনটিই প্রচারণা পেয়েছে। কিন্তু এখন কী মমতার ওই রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে যে, তিস্তার পানি চুক্তির বিরোধিতা করার। মমতার এখন তিস্তার ব্যাপারে বাধা দেয়ার মতো আগের অবস্থানে নেই বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে এখন তিস্তা চুক্তি হওয়া অসম্ভব নয়। আমরা বাংলাদেশীরা তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা চাই।

এখন প্রশ্ন উঠেছে- ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম বাংলায় কী রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করবে? রাজ্যের রাজ্যপাল কেশয়ি নাথ ত্রিপাঠি দিল্লিতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়ে তাদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। 

দীর্ঘ সময় আলোচনা করে তারপর দিল্লিতে এক বেসরকারি চ্যানেলে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হলে ভারতের সংবিধানে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করার পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। ৩৫৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে ওই রাজ্যে সরকার যদি তা দমনে ব্যর্থ হয় এবং জীবনহানি ঘটে বা কোনো বহিরাক্রমের আশঙ্কা তৈরি হয়, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি রাজ্যপালের কাজ থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠান। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা করেন। রাজ্যপালের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে রাজ্যসরকার ভেঙে দিয়ে সরাসরি রাজ্যের শাসনভার কেন্দ্র হাতে নিতে পারে। রাজ্যপাল যেহেতু শাসকদলের আজ্ঞাবহ, তাই তার সব প্রতিবেদন গ্রহণ করা না করা নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির ওপর।

পশ্চিমবঙ্গে এর আগে ষাটের দশকে তিনবার রাষ্ট্রপতির শাসন করা হয়েছিল। তখন রাজ্যপাল ছিলেন ধর্মবীর। তিনি একজন জাঁদরেল আইসিএস অফিসার ছিলেন। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। অনেকের ধারণা, বিজেপি সরকার এ কাজটি করবে না। কারণ রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস, বামপন্থীরা একই সাথে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হবে। 

তাই পশ্চিম বাংলার সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিলে বলা যায়, মমতার তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করার রাজনৈতিক সামর্থ্য আর নেই। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যদি সত্যিই বাংলাদেশের সাথে তিস্তা চুক্তি করতে চায়, তা হলে মমতা ব্যানার্জির তাতে সায় দেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প খোলা থাকবে না বলেই মনে হয়।

লেখক : নব্বইয়ের ছাত্রনেতা ও হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ স্ট্রাস্টের সাবেক ট্রাস্টি

ব্রেকিংনিউজ/এমআর