অটিজম সচেতনতায় বিপ্লবীর নাম সায়মা ওয়াজেদ পুতুল

তন্বী আক্তার
২২ জুলাই ২০১৯, সোমবার
প্রকাশিত: ০৯:১৪ আপডেট: ০৯:৫০

অটিজম সচেতনতায় বিপ্লবীর নাম সায়মা ওয়াজেদ পুতুল
ফাইল ছবি

 অটিস্টিক ব্যক্তির জগত আমাদের জগত থেকে অনেকটাই ভিন্ন। চাইলেই এই জগতে অপর কেউ প্রবেশ করতে পারেনা বলে এই জগতকে আমরা ‘নীল জগত’ বলতে পারি। অটিজম সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষ সচেতন ছিলেন না; অনেকেই এই বিষয় সম্পর্কে জানতেন না। বাড়ির একটা কোণ; কখনোবা শেকল বদ্ধ ভাবে মানবেতর জীবনযাপন করতে হতো অটিজম আক্রান্ত শিশুদেরকে। আর এমনি সময় অটিজমের ‘নীল জগতে’ অগ্রণী সেনা হিসেবে নতুন পথ দেখালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য কন্যা এবং বাংলাদেশ অটিজম ও নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিসঅর্ডার বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল। শিশুদের অটিজম এবং স্নায়ুবিক জটিলতা সংক্রান্ত বিষয়ে ২০০৮ সাল থেকে নিরলস কাজ শুরু করেন তিনি। 

যে অটিস্টিক জনগোষ্ঠীকে একসময় সমাজের বোঝা ভাবা হতো, তাদেরকেই বিশ্বের মূলধারার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার লক্ষ্যে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সেবা দিয়ে কর্মোপযোগী করতে নিরলসভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এত অল্প সময়ের মধ্যে এই মহৎ কাজের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হন। তাঁর উদ্যোগেই ২০১১ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় অটিজম নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের পরে গড়ে ওঠে সাউথ এশিয়ান অটিজম নেটওয়ার্ক। সংগঠনটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অটিস্টিক শিশুদের স্বাস্থ্য, সামাজিক ও শিক্ষা সহায়তা দেয়ার জন্য অবকাঠামো গড়তে কাজ করছে। ২০১৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ‘ডিজঅ্যাবিলিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক বৈঠকে এবং ‘উইমেন অ্যান্ড ডিজঅ্যাবিলিটি’ শীর্ষক সম্মেলনে তিনি এক জোরালো বক্তব্য রাখেন।  

আন্তর্জাতিক ফোরামে তাঁর মানবতার জন্য কর্মব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে ‘হু অ্যাক্সিলেন্স’ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করেছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্ব ব্যাংকের সদর দফতরে ২০১৫ সালের মধ্যে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতকরণ বিষয়ক এক বৈঠকে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের আমন্ত্রণে এক বৈঠকে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রীদের সাথে সায়মা হোসেন পুতুল-ও অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ,  কঙ্গো, ইথিওপিয়া, হাইতি, ভারত, নাইজেরিয়া,ইয়েমেন ও সাউথ সুদানের অটিজম পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেই সভার পর সায়মা হোসেন পুতুল তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের সাথে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের অটিজম পরিস্থিতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। এ সময় পুতুল বলেন, ‘বাংলাদেশের অবশিষ্ট ৫  শতাংশ শিক্ষাবঞ্চিত শিশুকেও স্কুলে নেয়া সম্ভব হবে, যদি সেসব এলাকার স্কুলগুলোর শিক্ষক এবং অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হয়।’

‘গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিশিয়েটিভ ইন বাংলাদেশ’ এর জাতীয় উপদেষ্টা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অটিজম মোকাবেলায় বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। দক্ষ -অভিজ্ঞ প্রশিক্ষিতদের তত্ত্বাবধান, বিশেষ শিক্ষা কর্মসূচির ব্যবস্থা, খেলাধুলা, শরীর চর্চা, বই পড়া এবং অটিস্টিক শিশুদের উৎসাহ- উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। দেশের ৬৪টি জেলায় এবং ৩৯ টি উপজেলায় ১০৩ টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অটিজম কর্ণার চালু করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ২০১১ সালে একটি সম্পূর্ণ অবৈতনিক অটিস্টিক স্কুল চালু করা হয়েছে। ২০টি দরিদ্র পরিবারের ২০ জন অটিস্টিক শিশুকে স্কুলের মাধ্যমে বিশেষ পদ্ধতিতে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। 

পুতুল ২০০৮ সালের পর থেকে অটিজম সমস্যার উন্নয়নে কাজ করার জন্য অনেক অ্যাওয়ার্ড পান। অটিজম আন্দোলন ও বিশ্বস্বাস্থ্যে অবদান রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ডস প্রদান করে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে। তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘সূচনা ফাউন্ডেশন’ যা বাংলাদেশ সরকার, সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও এনজিওদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারসহ অন্যান্য ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কল্যাণে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের একান্ত প্রচেষ্টা এবং অবহেলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি অটিজম নিয়ে কাজ করেছেন। তাদের দ্বার সুগম করতে এবং প্রতিভাকে বিকশিত করার ক্ষেত্র পরিসর করতে উন্মোচন করে যাচ্ছেন নিজেকে এবং সেই সাথে রাষ্ট্রকে। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ অটিজম সম্পর্কে দেশবাসী সচেতন হয়েছে, আর অটিস্টিক শিশু বা ব্যক্তি পাচ্ছে বিশেষ শিক্ষার সুযোগ। এতে করে তারা স্বাভাবিক ভাবে জীবন যাপন করতে পারবে। তিনি মনে করেন, অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিরা সমাজের অংশ। তাদেরকে সফল, ক্ষমতায়িত ও কর্মক্ষম ব্যক্তিতে পরিণত করতে সকলকে সমন্বিত ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।তিনি বলেন, ‘অটিজম আক্রান্তদের সমাজে জায়গা করে দিতে হবে, যাতে তারা তাদের অবদান রাখতে পারে। অন্যথায় সমাজে বড় ধরণের বিভেদ তৈরি হবে।’ 

তাঁর এই চিন্তা ও কর্মপ্রচেষ্টার আড়ালে অন্তর্নিহিত রয়েছে অফুরন্ত ভালবাসা, নিঃস্বার্থ মানবতা এবং মুক্ত চিন্তার এক বিরল সমন্বয়। অটিজম আক্রান্ত যেসব শিশুর জীবন রঙের অবিরল ধারায় উদ্ভাসিত হবার আগেই ধূসরতায় পরিপূর্ণ নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে যায়, তাদের জীবনে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল যেন এক আশার আলোর নাম। অনুরূপভাবে, সমাজের অবহেলা থেকে মুক্তি প্রত্যাশীদের পরিবারের কাছে-ও তিনি হয়ে উঠেছেন এক ভরসাস্থল। উন্নত দেশসমূহ যখন অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে  ‘Early Intervention’ এর মতো কার্যকরী ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তাদের সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনও আমরা এই সমস্যা সম্পর্কে সচেতন নই। 

সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আজ অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবার সোনালি স্বপ্ন দেখবার সাহস পাচ্ছে। অথচ ক’বছর আগেও এটা ছিল এক অকল্পনীয় ব্যাপার! ধীরে ধীরে সৃষ্টি হচ্ছে নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা। তাঁর প্রচারণায় এবং কর্মে উৎসাহিত হয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, একাডেমিক শিক্ষার অংশ হিসেবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বাচ্চাদের একটি স্কুলে কিছুদিন ইন্টার্নরত শিক্ষক হিসেবে কাজ করবার সুযোগ হয়েছিল আমার। তখন কাজ করতে গিয়ে আমি একজন অটিজম আক্রান্ত শিশুর মায়ের মুখে আশার আলো দেখেছি। এই সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে, তারা যেন আর দশজন সুস্থ-স্বাভাবিক বাচ্চার মতো স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি সাহায্য করে যাচ্ছেন। 

সবশেষে বলা যায়, অটিজমের নীল জগতে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল সদা জাজ্বল্যমান এক ধ্রুব নক্ষত্রের নাম। তিনি যেভাবে অটিস্টিক শিশু এবং ব্যক্তিদে জন্য যে অবদান রেখে যাচ্ছেন, তাতে মানবতার জয় সুনিশ্চিত।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 
ইমেইল: tonniaktar07@gmail.com

ব্রেকিংনিউজ/জেআই